বান্দরবান বন বিভাগ দুর্নীতি-০২
বান্দরবান বন বিভাগে বিতর্কিত বদলি ও ‘কুমিল্লা সিন্ডিকেট’র রাজত্ব: ৭ লাখ টাকার ঘুষে সুয়ালক চেক স্টেশন দখল, কাঠ পাচারের রমরমা বাণিজ্য

বান্দরবান বন বিভাগের প্রশাসনিক কাঠামো ভেঙে একটার পর একটা বিতর্কিত বদলি আদেশ জারি করায় মাঠ পর্যায়ে তীব্র তোলপাড় ও চরম ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে। বিভাগীয় বন কর্মকর্তা (ডিএফও) মো. তৌফিকুল ইসলামের একের পর এক প্রশ্নবিদ্ধ বদলি আদেশের নেপথ্যে অনিয়ম ও আর্থিক বাণিজ্যের মূল কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে বান্দরবান সদর রেঞ্জ।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, উপকূলীয় টেকনাফ রেঞ্জে কোটি কোটি টাকার সরকারি বরাদ্দ হরিলুট করে আসা বহুল বিতর্কিত ডেপুটি রেঞ্জার মো. বশির আহমেদ খানকে বান্দরবান ডিভিশনের কৌশলগতভাবে অত্যন্ত সংবেদনশীল সুয়ালক চেক স্টেশনে পদায়নের পেছনে সদর রেঞ্জ কর্মকর্তা কাজী মোহাম্মদ সাইফুল ইসলামের মধ্যস্থতায় ৭ লাখ টাকার বিশাল ঘুষ লেনদেন হয়েছে।
অভিযোগ উঠেছে, পুরো বান্দরবান ডিভিশনকে একটি নির্দিষ্ট আঞ্চলিক বলয় বা তথাকথিত ‘কুমিল্লা সিন্ডিকেট’-এর নিয়ন্ত্রণে নিয়ে যাওয়ার নীল নকশা বাস্তবায়ন চলছে; যার অংশ হিসেবে প্রধান প্রধান রেঞ্জ, চেক স্টেশন ও গুরুত্বপূর্ণ পদে সুকৌশলে কুমিল্লা অঞ্চলের ডেপুটি রেঞ্জার, ফরেস্টার ও ফরেস্ট গার্ডদের বসানো হচ্ছে। বশিরের বাড়ি কুমিল্লা হওয়ায় তাকে এই আঞ্চলিক সিন্ডিকেটে অন্তর্ভুক্ত করে সুয়ালক চেক স্টেশনের দায়িত্ব তুলে দেওয়া হয়েছে, যাতে বান্দরবান জেলা সদরে সদর রেঞ্জের অধীনে যেসব কাঠবোঝাই গাড়ি অবৈধভাবে লোডিং হয়, সেগুলো কোনো প্রকার বাধা ছাড়াই বশিরের মাধ্যমে অনায়াসে পাচার হয়ে সমতলে চলে যেতে পারে।
এই সিন্ডিকেটের দৌরাত্ম্যে প্রশাসনিক নিয়মনীতির কোনো তোয়াক্কা না করে সদর রেঞ্জে ফরেস্ট গার্ডদের টানা দুই বছর বহাল রাখার বিশেষ সুবিধা দেওয়া হলেও সিন্ডিকেটের বাইরের ফরেস্টারদের মাত্র এক বছরের মাথায় দূরবর্তী এলাকায় ছুড়ে ফেলা হচ্ছে। অন্যদিকে মাঠ পর্যায়ের পছন্দের ফরেস্টার ও ফরেস্ট গার্ডদের অতিরিক্ত দায়িত্বের নামে ৬০ থেকে ৯০ কিলোমিটার দূরবর্তী কর্মস্থল থেকে সদর রেঞ্জে এনে পুরস্কৃত করা হচ্ছে।
সুবিধাভোগী এসব কর্মচারীর মধ্যে অন্যতম ফরেস্টার জয়ন্ত কুমার রায়, ফরেস্ট গার্ড মো. শফিকুল ইসলাম, ফরেস্ট গার্ড মো. হুমায়ুন কবির এবং ফরেস্ট গার্ড মো. আমিনুল ইসলাম; যাদের প্রত্যন্ত কর্মস্থল ফেলে রেখে সদরে কাঠের গাড়ি লোডিংয়ের দায়িত্বে বসানো হয়েছে, ফলে তাদের মূল দায়িত্বপ্রাপ্ত বনাঞ্চলগুলো সম্পূর্ণ অরক্ষিত হয়ে নির্বিচারে উজাড় হচ্ছে। সদর রেঞ্জ কর্মকর্তা কাজী মোহাম্মদ সাইফুল ইসলামের তদবির এবং ডিএফও তৌফিকুল ইসলামের আর্থিক সুবিধার মাধ্যমে গড়ে ওঠা এই চক্রের বিরুদ্ধে প্রকাশ্যেই টিপি (ট্রানজিট পাস) দিয়ে কাঠের গাড়ি ছাড়ানোর ক্ষেত্রে প্রতি গাড়িতে ১৫ হাজার টাকা, স্টক চেকিংয়ের নামে প্রতি জোতে ৫০ হাজার টাকা, প্রতিটি জোত পারমিটে ৬ থেকে ৭ লাখ টাকা এবং বনাঞ্চল থেকে নির্বিচারে গাছ কেটে অবৈধ গাড়ি পারাপারে গাড়িপ্রতি ১০ হাজার টাকা হারে প্রকাশ্য চাঁদাবাজির অভিযোগ উঠেছে।
সদর রেঞ্জে সরকারি টহল গাড়ি থাকলেও নিয়মিত বন সুরক্ষার টহল বন্ধ রেখে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের দিয়ে সার্বক্ষণিক জোত পারমিট ও টিপির গাড়ি লোডিং তদারকি করানো হচ্ছে এবং সন্ধ্যার পর রেঞ্জ অফিসে কাঠ ব্যবসায়ীদের সঙ্গে গোপন বৈঠক ও অবৈধ টাকার ভাগবাটোয়ারা চলছে। দুর্নীতি, আঞ্চলিক সিন্ডিকেট ও বদলি বাণিজ্যের এমন লাগামহীন তাণ্ডবে একদিকে বিভাগীয় শৃঙ্খলা ও কর্মপরিবেশ পুরোপুরি ধ্বংস হয়ে পড়েছে, অন্যদিকে অস্তিত্ব সংকটে পড়েছে পার্বত্য বান্দরবানের সবুজ বনভূমি ও প্রাকৃতিক ভারসাম্য।
