বেরিয়ে আসছে আওয়ামী পুনর্বাসনের চাঞ্চল্যকর অসংখ্য তথ্য

সাংবিধানিক পদে শেখ হাসিনার নিয়োগপ্রাপ্ত সিএজি মোঃ নুরুল ইসলাম এখনও বহাল তবিয়তে

বিশেষ প্রতিনিধি
বিশেষ প্রতিনিধি
প্রকাশিত: সেপ্টেম্বর ২৮, ২০২৬ ২০:১০:১০
  • পুরনো রিপোর্ট দিয়ে প্রধানমন্ত্রীকে ধোঁকা
  • জুলাই হত্যা মামলার আসামি
  • ক্যান্টনমেন্টে শত কোটি টাকার টেন্ডার বাণিজ্য
  • পরিবারতন্ত্রের অভিযোগ

সাংবিধানিক পদে শেখ হাসিনার নিয়োগপ্রাপ্ত একমাত্র ব্যক্তি হিসেবে এখনও বহাল তবিয়তে রয়ে গেছেন কম্পট্রোলার অ্যান্ড অডিটর জেনারেল (সিএজি) মোঃ নুরুল ইসলাম। অনুসন্ধানে তার বিরুদ্ধে জুলাই হত্যা মামলা থেকে শুরু করে প্রধানমন্ত্রীর সাথে প্রতারণা, শত কোটি টাকা পাচার ও আওয়ামী পুনর্বাসনের চাঞ্চল্যকর ১৩ দফা তথ্য বেরিয়ে এসেছে।

প্রাপ্ত তথ্যমতে, ১৯ জুলাই মোহাম্মদপুরে রাত ৮টায় ছাত্র-জনতার বুকে গুলি চালিয়ে হত্যার ঘটনায় বাদী মোঃ মিস্টার হোসেনের দায়ের করা এজাহার নং-২৪৩ এবং ৩৪/১২৪৪ নম্বর মামলায় শেখ হাসিনা, আসাদুজ্জামান খান কামাল, নানক, তাপস, পরশের সাথে ইন্ধনদাতা ও অর্থের যোগানদাতা হিসেবে আসামি করা হয়েছে বর্তমান সিএজি মোঃ নুরুল ইসলামকে।

প্রধানমন্ত্রীর সাথে সরাসরি প্রতারণা:

গত ৫ মে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে ৩৮টি অডিট রিপোর্ট জমা দিয়ে সমালোচনার জন্ম দেন তিনি। ২০২৩ সালের ২৬ জুলাই সিএজি হিসেবে শপথ নিলেও একটি মেগা প্রকল্পও অডিট করেননি। বরং ২০১৯ সালে সাবেক সিএজি মুসলিম চৌধুরীর করা রূপপুর ও বালিশ কাণ্ডের পুরনো রিপোর্টকে নিজের বলে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে ধোঁকা দিয়েছেন। রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের ৬০ হাজার কোটি টাকা পাচারে টিউলিপ সিদ্দিক ব্রিটিশ মন্ত্রিত্ব হারালেও তার রিপোর্টে এর কিছুই নেই।

মিথ্যা রিপোর্ট দিয়ে হাসিনাকে দায়মুক্তি:

অন্তর্বর্তী সরকার ২৩৪ বিলিয়ন ডলার পাচারে প্রশ্ন তুললে ১ জানুয়ারি ২০২৫ এক বিশেষ অফিস আদেশে ৭টি টিম গঠন করে লোক দেখানো মিথ্যা রিপোর্ট জমা দেন। শাহজালাল বিমানবন্দরের থার্ড টার্মিনাল থেকে পানি পড়া এবং কর্ণফুলী টানেল লস প্রজেক্ট হওয়ার তথ্য গোপন করেছেন, যা শুধু এক আওয়ামী সাংসদের পরিবারের সুবিধার জন্য করা হয়েছিল।

ছাত্রলীগ-যুবলীগ দিয়ে প্রশাসন দখল:

সাবেক শিক্ষামন্ত্রী দিপু মনির ডানহাত ও সলিমুল্লাহ হল ছাত্রলীগ নেতা কবির হোসেনকে এডিশনাল সিজিএ, ফরিদপুর রাজেন্দ্র কলেজ ছাত্রলীগ নেতা নুরুল ইসলামকে বৈদেশিক অডিটের ডিজি, শেখ মুজিবের উপর ৪টি বই লেখা বদিউজ্জামানকে রাজস্ব অডিটের ডিজি, ইসকন সদস্য বিকাশ চন্দ্রকে বাণিজ্য অডিটের ডিজি, বিচারপতি গোলাম রব্বানির ভাতিজি ও রাষ্ট্রদূত এম এ কাদেরের ভাগ্নি ফারমিন মাওলাকে কৃষি অডিটের ডিজি হিসেবে পদায়ন করেন।

আওয়ামী পুনর্বাসন ও রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা ঝুঁকি:

২৩ জুলাই গোপালগঞ্জ ছাত্রলীগ নেত্রী রোনক সুফিয়া আফসারা রহমানকে সরাষ্ট্র CAFO, ডিআইজি লিটন চন্দ্রের ভাই নারায়ণ চন্দ্রকে রাজস্ব অডিটের এডিজি , ঢাকা কলেজ ছাত্রলীগ নেতা জিএম মামুনুর রশিদকে সিসিডিএফ আর্মি হিসেবে সেনানিবাসে, ডিআইজি সঞ্জয় কুন্ডের স্ত্রী শিল্পী দাসকে সড়ক পরিবহনে CAFO, প্রধানমন্ত্রীকে ব্যঙ্গ করা ঢাবি ছাত্রলীগ নেত্রী কাজী মাসুদা সুলতানাকে স্থানীয় সরকারে CAFO এবং জিয়া হত্যায় ফাঁসি হওয়া কর্নেল নওয়াজেশের কন্যা নাশিদ নওয়াজেশকে নিজ কার্যালয়ে পদায়ন করেন। ছাত্রদল নামধারী দালাল ইলিয়াসকে দিয়ে বিএনপি নেতাদের ম্যানেজ করছেন।

শত কোটি টাকার পদ-বাণিজ্য:

শেখ সেলিমের আত্মীয় মাহমুদুল হাসান মামুন, আমির হোসেন আমুর আত্মীয় কাদের মনি, জি এম মামুনুর রশিদ, শাহজাহান সিরাজ ও উজ্জ্বল হোসেনের মাধ্যমে নিয়োগ-পদোন্নতিতে শত কোটি টাকার বাণিজ্য করছেন এই সিএজি।

নেপথ্যে শেখ পরিবার:

শেখ হাসিনার ফুফাতো ভাই মোল্লা ওমর ওরফে ওমর আলী, সাবেক প্রতিরক্ষা উপদেষ্টা তারিক আহমেদ সিদ্দিক, শেখ সেলিম, পলাতক গভর্নর আব্দুর রউফ তালুকদার, তার শ্যালক সেলিম রেজা ও সাবেক পররাষ্ট্র সচিব জসিমের মাধ্যমে সিএজি হিসেবে নিয়োগ পান। এর আগে ২০২১-২০২৩ পর্যন্ত শেখ পরিবারের আশীর্বাদে হিসাব মহানিয়ন্ত্রক ছিলেন।

সাইফুর রহমানের নামফলক ধ্বংস:

সাবেক সফল অর্থমন্ত্রী এম সাইফুর রহমানের স্থাপন করা অডিট ভবনের ভিত্তিপ্রস্তর নামফলক ভেঙে শেখ হাসিনার নামে পুনরায় উদ্বোধন করেন।

মুজিববন্দনায় বাজেট লুট:

সকল অফিসে মুজিব কর্নার, মুরাল স্থাপন, বাধ্যতামূলক দিবস পালন ও ৩২ নম্বর-টুঙ্গিপাড়া ভ্রমণে রাষ্ট্রীয় বাজেট লুটপাট করেন।

গ্যাংডম অফ সিএজি - ক্যান্টনমেন্টে টেন্ডার সিন্ডিকেট:

ওমর আলীর তানবির ও তাসিন এন্টারপ্রাইজের মাধ্যমে ঢাকা ক্যান্টনমেন্টসহ সারাদেশে টেন্ডার বাণিজ্য সিন্ডিকেট "গ্যাংডম অফ সিএজি" নামে পরিচিত। দি এশিয়ান এজ পত্রিকায় এ নিয়ে আলোড়ন সৃষ্টিকারী রিপোর্ট প্রকাশিত হয়, যার মাধ্যমে কয়েকশো কোটি টাকা লুটপাট ও পাচার হয়।

৫ আগস্টের পর পলায়ন ও ভাঁওতাবাজি:

৫ আগস্ট সরকার পতনের পর রাতের অন্ধকারে সপরিবারে ক্যান্টনমেন্টে পালিয়ে যান। ১৫ই পুনরায় অডিট ভবনে আগস্ট বৈষম্যবিরোধী ছাত্ররা পদত্যাগ চাইতে গেলে২২ সেপ্টেম্বর ২০২৪ কর্মকর্তারা গণস্বাক্ষর নিয়ে পদত্যাগ দাবি করলে ২৪ ঘণ্টার মধ্যে পদত্যাগের আশ্বাস দিয়ে ৩ মাস আত্মগোপনে যান। পরে বিভিন্ন ছাত্র ও রাজনৈতিক দলকে ম্যানেজ করে প্রকাশ্যে আসেন এবং আওয়ামী মতাদর্শের অফিসারদের দিয়ে অডিট অ্যান্ড অ্যাকাউন্টস এসোসিয়েশন গঠন করেন। বর্তমানে নিজেকে বগুড়ার পরিচয় দিয়ে বিএনপি নেতাদের কাছে তদবির করছেন, যদিও তিনি মহাখালীর বাসিন্দা এবং ৫৭ বছরে একবারও বগুড়া যাননি।

 বিদেশে টাকা পাচার ও বাসা লুট:

সাড়ে ১৫ বছর আওয়ামী তাবেদারি করে লন্ডন-আমেরিকায় থাকা বোন এবং সৌদিতে থাকা ভাইয়ের কাছে টাকা পাচার করেছেন। মিন্টু রোডের ৩ নম্বর গণপূর্তের বাসা মেরামতের নামে ১১.৫ কোটি টাকা লোপাট করেন। বোনের নামে জ্যামাইকা, নিউইয়র্কে ১১৪২৩ এর ১০০-৩৫/১৯৪ নম্বর রাস্তায় আলিশান বাড়ি কিনেছেন।

পরিবারতন্ত্র ও গাড়ি বিলাস:

অডিট ডিপার্টমেন্টকে পারিবারিক সম্পত্তি বানিয়েছেন। ভাই হযরত আলীকে রেলওয়েতে, মামাতো ভাই জাহিদকে এসএফসি নেভিতে, সিরাজুল ইসলামকে ক্রয় অধিদপ্তরে, ভাইজি জামাই সবুজকে সিএএফও স্বাস্থ্যে পদায়ন করে দুর্নীতি করার জন্য । আউটসোর্সিং এর নামে নিজের ৩১ জনকে নিয়োগ দিয়েছেন। রাষ্ট্রীয় প্রটোকল ভেঙে ২টির জায়গায় ৫টি গাড়ি ব্যবহার করেন - Prado Gha-121753, Jeep Gha-132417 ও Gha-112273, Car Ga-39721 ও Ca-531767।

সংবিধানের ১২৭-১৩২ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী সরকারের বাৎসরিক হিসাব রাষ্ট্রপতির সুপারিশে সংসদে উপস্থাপন করার কথা থাকলেও তার রিপোর্টে ২৩৪ বিলিয়ন ডলার পাচারের তথ্য নেই। সময়মতো অডিট না করায় পাচারকারীরা দেশ ছেড়ে পালিয়েছে। এই রিপোর্ট লোক দেখানো ও মূল্যহীন। তাই অবিলম্বে সাংবিধানিক পদে থাকা এই ফ্যাসিস্টের দোসরকে পদত্যাগে বাধ্য করে গ্রেফতার ও জিজ্ঞাসাবাদ করে পাচারের আসল রহস্য উদ্ধারের দাবি জানিয়েছেন সচেতন মহল।