হাজার হাজার প্লট মালিকগন হতাশাগ্রস্থ

রাজউকের সর্বোবৃহৎ আবাসন প্রকল্প পূর্বাচল নতুন শহর তিন দশকেও পূর্ণাঙ্গ নগরীর রূপ পায়নি

মো. শাহজাহান
মো. শাহজাহান
প্রকাশিত: আগস্ট ৩, ২০২৬ ২১:১৭:০৯

ঢাকার পূর্ব প্রান্তে বিস্তীর্ণ খোলা মাঠ আর আধা-নির্মিত সড়কের ওপর দিয়ে হেঁটে গেলে মনে হয়, এখানে কোনো এক সময় একটা নতুন শহর গড়ার পরিকল্পনা ছিল। কিন্তু বাস্তবে সেই পরিকল্পনা এখনো মাটির নিচে চাপা পড়ে আছে। তিন দশকেরও বেশি সময় ধরে রাজউকের সবচেয়ে বড় আবাসন প্রকল্প পূর্বাচল নতুন শহর আজও পূর্ণাঙ্গ নগরীর রূপ নেয়নি। হাজার হাজার প্লট মালিক তাদের জীবনের সঞ্চয় এই জমিতে বিনিয়োগ করে অপেক্ষা করছেন। অথচ নির্মাণ হয়েছে মাত্র কয়েক শতাধিক বাড়ি।

বাকি জায়গায় এখনো চাষাবাদ চলছে, গরু-ছাগল চরছে, আর রাতের অন্ধকারে সড়কবাতির অভাবে এলাকা প্রায় নির্জন হয়ে যায়। সম্প্রতি প্রশাসনিক সীমানা বদলে পূর্বাচলকে ঢাকা জেলা ও ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের আওতায় আনা হয়েছে। এই পরিবর্তনকে অনেকেই নতুন সম্ভাবনার দরজা হিসেবে দেখছেন। তবে বাস্তবতা বলছে, শুধু কাগজে সীমানা বদলালেই তিন দশকের জমে থাকা সমস্যা কেটে যাবে না। ১৯৯৫ সালে যখন প্রকল্পের কাজ শুরু হয়, তখন লক্ষ্য ছিল স্পষ্ট।

রাজধানীর ওপর ক্রমবর্ধমান জনসংখ্যার চাপ কমিয়ে একটি পরিকল্পিত, স্বয়ংসম্পূর্ণ উপনগরী গড়ে তোলা। ৬ হাজার ১৫০ একর জমিতে ৩০টি সেক্টর তৈরি করে প্রায় ২৬ হাজার আবাসিক প্লট ও লক্ষাধিক অ্যাপার্টমেন্টের ব্যবস্থা করা। প্রায় ৮ হাজার কোটি টাকা ব্যয় হয়েছে ইতোমধ্যে। কিন্তু নির্ধারিত সময় ২০১৩ সাল পেরিয়ে গেলেও প্রকল্প পূর্ণতা পায়নি। ভূমি উন্নয়ন ও কিছু সড়ক নির্মাণে অগ্রগতি হলেও নাগরিক সুবিধার অভাব আজও প্রকট। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, নিরাপত্তা ব্যবস্থা, গ্যাস সংযোগ, নিয়মিত বাজার ও পর্যাপ্ত যানবাহন নেই বললেই চলে। ফলে প্লট হস্তান্তরের সংখ্যা ২১ হাজারের ঘর ছুঁলেও নির্মাণকাজ শুরু হয়েছে মাত্র তিন শতাধিক প্লটে। প্লট মালিকদের অভিজ্ঞতা এই ব্যর্থতার জীবন্ত প্রমাণ। জহিরুল ইসলাম ২০০৯ সালে প্লট বরাদ্দ পেয়েছিলেন। তিনি বলেন, রাজউক যেসব সুবিধার কথা বলেছিল- স্কুল-কলেজ, সড়কবাতি, নিরাপত্তা- সেগুলোর অভাবে বছরের পর বছর অপেক্ষা করেছেন।

প্ল্যান পাশের সময় তিন বছরের মেয়াদ দেওয়া হয়েছিল। শেষ পর্যন্ত বাধ্য হয়েই সুবিধা ছাড়াই নির্মাণ শুরু করেছেন। শাহজাহান মিয়ার অবস্থাও একই রকম। ২০১৪ সালে বরাদ্দ পেয়েও তিনি এখনো জায়গা ফাঁকা রেখেছেন। পানি-বিদ্যুৎ কিছুটা থাকলেও সড়কবাতি ও নিরাপত্তার অভাবে বাড়ি বানানোর সাহস পাচ্ছেন না। মালিকরা জানান, এখানে গ্যাস নেই, বাজার নেই, নিয়মিত যানবাহন নেই। সীমানা প্রাচীর না থাকায় অনেক প্লটে স্থানীয়রা চাষাবাদ করছেন। তিন জেলার সীমানা বিরোধ ও রাজউকের আমলাতান্ত্রিক জটিলতায় ফাইল আটকে থাকায় হয়রানির শিকার হতে হয় প্রায় প্রতিদিন। এই অচলাবস্থা কাটাতে সম্প্রতি বড় প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত এসেছে।

নিকারের বৈঠকে পূর্বাচলকে নারায়ণগঞ্জ ও গাজীপুরের অংশ থেকে ঢাকা জেলার অন্তর্ভুক্ত করে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন, ডিএমপি ও ঢাকা ওয়াসার আওতায় আনা হয়েছে। ডিএনসিসি প্রশাসক মো. শফিকুল ইসলাম খান জানান, নাগরিক সুবিধা নিশ্চিতে রাজউকের সঙ্গে সমন্বয় করে প্রাথমিক প্রস্তুতি শুরু হয়েছে। তিনি বলেন, শিগগিরই প্রশাসনিক ভবন ও জোনাল অফিস স্থাপন করা হবে। কাজ শুরু হলে প্লট মালিকরা নিজ উদ্যোগে নির্মাণে এগিয়ে আসবেন এবং প্রয়োজনে সময়সীমা নির্ধারণের জন্য আবেদন করতে পারবেন। রাজউক চেয়ারম্যান ইঞ্জিনিয়ার মো. রিয়াজুল ইসলাম বলছেন, পূর্বাচলকে দ্রুত বাসযোগ্য করতে নতুন প্রকল্প হাতে নেওয়া হয়েছে। তিনি জানান, শুধু অবকাঠামো নয়, প্লট মালিকদের সঙ্গে মতবিনিময় চালিয়ে তাদের সমস্যা শোনা হচ্ছে। ফাইল দ্রুত নিষ্পত্তির জন্য নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।

নতুন করে প্রায় ৮ হাজার ৮৭০ কোটি টাকার অবকাঠামো উন্নয়ন প্রকল্প পরিকল্পনা কমিশনে পাঠানো হয়েছে। এতে সড়ক সম্প্রসারণ, ড্রেনেজ, মার্কেট, খেলার মাঠ ও অন্যান্য সুবিধা অন্তর্ভুক্ত। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান নির্মাণ এবং পুলিশের বড় অবকাঠামো গড়ার পরিকল্পনাও চলছে। চারটি থানা, ছয়টি তদন্ত কেন্দ্র ও হাজার হাজার পদ সৃষ্টির প্রস্তাব রয়েছে যাতে নিরাপত্তা নিশ্চিত হয়। নগর পরিকল্পনাবিদ আদিল মুহাম্মদ খান বলেন, সরকারের বিকেন্দ্রীকরণ নীতির বিপরীতে আমরা হাঁটছি। পূর্বাচলকে ঢাকার সঙ্গে যুক্ত করে ঢাকা আরও বড় করা হচ্ছে। এতে ঢাকামুখিতা কমবে না, বরং বাড়বে। যদি আলাদা সিটি করপোরেশন বা নারায়ণগঞ্জের সঙ্গে রাখা হতো, তাহলে ভিন্ন কেন্দ্র গড়ে উঠত। কাগজে সীমানা বদলালেও মাঠপর্যায়ে উন্নয়ন নিয়ন্ত্রণ ও সেবা সমন্বয় না হলে মূল উদ্দেশ্য ব্যর্থ হতে পারে। পূর্বাচলের ব্যর্থতা শুধু একটি প্রকল্পের ব্যর্থতা নয়।

এটি মধ্যবিত্তের সঞ্চয় আটকে রাখার গল্প। হাজার হাজার পরিবার তাদের ভবিষ্যতের বাসস্থানের স্বপ্ন এই প্লটে বিনিয়োগ করেছে। অথচ জমি পড়ে আছে, মূল্যবৃদ্ধির সুফল তারা পুরোপুরি পাচ্ছেন না। একই সঙ্গে পরিবেশগত চ্যালেঞ্জও বাড়ছে। পরিকল্পিত লেক ও সবুজ বেল্ট রক্ষা না হলে জলাবদ্ধতা ও তাপমাত্রা বৃদ্ধির ঝুঁকি তৈরি হতে পারে। ঢাকার আবাসন সংকট সমাধানে যে প্রকল্পকে আদর্শ ভাবা হয়েছিল, তা এখন নিজেই সংকটের প্রতীক হয়ে দাঁড়িয়েছে। এখন প্রশ্ন হলো, নতুন প্রশাসনিক কাঠামো ও বড় অংকের বিনিয়োগ কি সত্যিই পরিস্থিতি বদলাবে?

রাজউক ও ডিএনসিসির সমন্বয় যদি দ্রুত বাস্তবায়িত হয়, সড়কবাতি, নিরাপত্তা, শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবা যদি নিশ্চিত করা যায়, তাহলে খালি প্লটগুলোতে নির্মাণকাজ গতি পাবে। না হলে পূর্বাচল শুধু কাগজের মাস্টারপ্ল্যান আর খালি জমির সমষ্টি হয়েই থেকে যাবে। মধ্যবিত্তের স্বপ্ন আরও কয়েক বছর বন্দি থাকবে সেই খোলা মাঠে। ঢাকার জনসংখ্যার চাপ কমানোর যে বড় লক্ষ্য নিয়ে প্রকল্প শুরু হয়েছিল, তা পূরণ করতে হলে এখনই সমন্বিত ও স্বচ্ছ উদ্যোগ দরকার। অন্যথায় এই বিশাল এলাকা আধুনিক নগরীর বদলে এক বিশাল অসম্পূর্ণ পরীক্ষার মাঠ হিসেবেই ইতিহাসে ঠাঁই নেবে।