২৬ কর্মকর্তাকে সুপারসিড করে নিয়োগ লাভ করা

জনস্বাস্থ্যের প্রধান প্রকৌশলী আব্দুল আউয়াল’র বিরুদ্ধে ঠিকাদারি সম্পৃক্ততা সহ নানান অনিয়মের অভিযোগ ॥ দেখার কেউ নেই

বিশেষ প্রতিনিধি
বিশেষ প্রতিনিধি
প্রকাশিত: আগস্ট ৩, ২০২৬ ২১:১১:১৯

জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের প্রধান প্রকৌশলীর রুটিন দায়িত্বপ্রাপ্ত মো. আব্দুল আউয়ালের বিরুদ্ধে ঠিকাদারি ব্যবসায় পরোক্ষ সম্পৃক্ততা ও টেন্ডার বাণিজ্যের গুরুতর অভিযোগ উঠেছে। অধিদপ্তরের একাধিক কর্মকর্তা ও সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি, তিনি নিজে সরাসরি ঠিকাদারি না করলেও কথিত এক ‘ভাতিজা’ ও ঘনিষ্ঠ ব্যক্তিদের মাধ্যমে প্রকল্পের দরপত্র, কাজের অনুমোদন ও বিল উত্তোলন প্রক্রিয়া নিয়ন্ত্রণ করেন। এই অভিযোগের মধ্যেই গত বছরের ১৭ নভেম্বর জ্যেষ্ঠতা তালিকায় তার আগে থাকা অন্তত ২৬ জন কর্মকর্তাকে পাশ কাটিয়ে তাকে শীর্ষপদে বসানো হয়। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ঠিকাদারি সম্পৃক্ততার এই ধারা অব্যাহত থাকার পেছনে শীর্ষ পর্যায়ের প্রভাবই মূল কারণ। এ বিষয়ে ইতোমধ্যে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) অনুসন্ধান শুরু করেছে।

অধিদপ্তরের নথি অনুযায়ী আব্দুল আউয়াল ১৯৯৮ সালের ৫ মার্চ প্রকল্পে যোগ দেন। ২০০৬ সালে রাজস্ব খাতে আত্মীকৃত হয়ে ২০১৩ সালে নিয়মিত হন। জ্যেষ্ঠতার হিসাবে তার আগে থাকা কর্মকর্তাদের অস্তিত্ব উপেক্ষা করে তাকে রুটিন দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে বলে অভিযোগ। অধিদপ্তরের একাধিক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, জ্যেষ্ঠতা ও যোগ্যতা উপেক্ষা করে শীর্ষে বসানো হলে পুরো প্রতিষ্ঠানে সিন্ডিকেট শক্তিশালী হয়। তাদের দাবি, টেন্ডার অনুমোদন, বিল উত্তোলন ও পদোন্নতি এখন একটি নির্দিষ্ট গোষ্ঠীর নিয়ন্ত্রণে চলে গেছে। অভিযোগের মূল কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে ঠিকাদারি ব্যবসায় পরোক্ষ নিয়ন্ত্রণ। সূত্রের দাবি, কথিত এক ‘ভাতিজা’কে সামনে রেখে তিনি ব্যবসা পরিচালনা করেন। হুমায়ুন কবীর নামে এক ব্যক্তি নূর ট্রেডার্সসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে ময়মনসিংহের ফুলপুরসহ একাধিক উপজেলায় কাজ করছেন। কাগজে ঠিকাদার অন্য কেউ হলেও দরপত্র তৈরি, কাজের অনুমোদন ও বিল উত্তোলনের পুরো প্রক্রিয়ায় আব্দুল আউয়ালের প্রভাব রয়েছে বলে অভিযোগকারীরা জানান। ময়মনসিংহে দীর্ঘদিন দায়িত্ব পালনকালে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বদলির ভয় দেখিয়ে অর্থ আদায় এবং পেনশন ও পিআরএলের কাগজপত্র অনুমোদনে ১ থেকে ৫ লাখ টাকা পর্যন্ত নেওয়ার অভিযোগও রয়েছে। এই অভিযোগের জবাবে প্রধান প্রকৌশলী মো. আব্দুল আউয়াল বলেন, “আমার বিরুদ্ধে যেসব অভিযোগ তোলা হচ্ছে সেগুলো সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন ও ষড়যন্ত্রমূলক। আমি কখনো কোনো ঠিকাদারি ব্যবসার সঙ্গে সম্পৃক্ত হইনি। সব প্রকল্প ও টেন্ডার প্রক্রিয়া সরকারি বিধিমালা অনুযায়ী সম্পন্ন হয়েছে। জ্যেষ্ঠতা ও যোগ্যতার ভিত্তিতেই আমাকে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। অভিযোগকারীরা ব্যক্তিগত স্বার্থ হাসিলের জন্য এসব অপ্রচার চালাচ্ছে।” তিনি আরও বলেন, “দুদক বা অন্য কোনো সংস্থা তদন্ত করলে আমি পূর্ণ সহযোগিতা করব। আমার কর্মজীবনে কোনো অনিয়ম হয়নি।”

নরসিংদীতে নির্বাহী প্রকৌশলী হিসেবে দায়িত্ব পালনকালে প্রায় ১ কোটি ২৭ লাখ টাকা আত্মসাতের অভিযোগে তদন্ত কমিটি গঠনের কথা জানা যায়। এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের অর্থায়নে নরসিংদী পৌরসভার সারফেস ওয়াটার ট্রিটমেন্ট প্ল্যান্ট ও পাইপলাইন নির্মাণ প্রকল্পে অনিয়ম ও অদক্ষতার অভিযোগ ওঠে। নির্ধারিত সময়ে কাজ শেষ না হওয়ায় প্রকল্পের মেয়াদ শেষ হওয়ার পর বিশেষ টিম গঠন করে অসম্পূর্ণ কাজ শেষ করতে হয়। নরসিংদী ও কিশোরগঞ্জে দরপত্রের কাগজপত্রে কারসাজি ও ক্রয় প্রক্রিয়ায় সরাসরি হস্তক্ষেপের অভিযোগও রয়েছে। এসব বিষয়ে অডিট আপত্তি উঠেছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়।

ময়মনসিংহ সদর উপজেলার গ্রামীণ পানি সরবরাহ উন্নয়ন প্রকল্পে প্রায় শত কোটি টাকা ব্যয় হলেও কাজের গুণগতমান ও মাঠপর্যায়ের বাস্তবায়ন নিয়ে অভিযোগ রয়েছে। ত্রিশাল উপজেলার স্যানিটেশন সুবিধা সম্প্রসারণ প্রকল্পে প্রায় ১৮ কোটি টাকা ব্যয়ের বিপরীতে কাজের অগ্রগতি ও মান নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। গৌরীপুর পৌরসভায় পানি সরবরাহের দুটি প্রকল্পে প্রায় পাঁচ কোটি টাকা ব্যয় হলেও শহরবাসীর পানির সংকট কাটেনি। প্রথম ধাপে ২ কোটি ৭ লাখ ১৩ হাজার ৫৯০ টাকা এবং দ্বিতীয় ধাপে ২ কোটি ৮৬ লাখ ৭ হাজার ৯২০ টাকা ব্যয় করা হয়। স্থানীয়রা বলছেন, এত অর্থ ব্যয়ের পরও পানি সরবরাহ ব্যবস্থা কার্যকর হয়নি। সবচেয়ে আলোচিত হয়েছে নোয়াখালীর নিলাম কেলেঙ্কারি। ডানিডা অর্থায়নে বাস্তবায়নাধীন একটি প্রকল্পের প্রায় ৫ কোটি ৫৫ লাখ টাকা মূল্যের পাইপ ও নির্মাণসামগ্রী মাত্র ১৮ লাখ ৮৫ হাজার টাকায় গোপনীয়ভাবে নিলামে বিক্রি করা হয় বলে অভিযোগ।

অধিকাংশ ঠিকাদার নিলামের খবর না জানায় প্রতিযোগিতামূলক দরপত্রের সুযোগ তৈরি হয়নি। পরে মেসার্স শাহনাজ নামে একটি প্রতিষ্ঠানের কাছে এসব মালামাল নামমাত্র মূল্যে বিক্রি করা হয়। নোয়াখালীর নির্বাহী প্রকৌশলী মো. সাইফুল ইসলাম গণমাধ্যমকে জানিয়েছেন, তিনি নিজে কোনো নিলাম দেননি এবং নিলাম প্রক্রিয়া ঢাকা থেকে পরিচালিত হয়েছে। এই বক্তব্যের পর নিলামের প্রকৃত নিয়ন্ত্রক কারা ছিলেন তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। একাধিক ঠিকাদার নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, ময়মনসিংহ ও আশপাশের এলাকায় কাজ পেতে নির্দিষ্ট ব্যক্তিদের মাধ্যমে যেতে হয়। এক ঠিকাদার বলেন, “কাগজে আমরা ঠিকাদার হলেও অনেক সময় দরপত্র ও বিল প্রক্রিয়ায় উচ্চ পর্যায়ের প্রভাব দেখা যায়। যারা ঘনিষ্ঠ তারা সহজে কাজ পান।” আরেক ঠিকাদার দাবি করেন, “আমি নিজে কোনো চাপের মুখে পড়িনি, তবে শুনেছি কিছু প্রতিষ্ঠানকে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়।” নূর ট্রেডার্সের সঙ্গে যুক্ত এক ব্যক্তি অবশ্য বলেন, “আমরা নিয়ম মেনেই কাজ করি। কোনো অনিয়মের সঙ্গে জড়িত নই।” অভিযোগ রয়েছে, পছন্দের জুনিয়র কর্মকর্তাদের নিয়মবহির্ভূতভাবে নির্বাহী প্রকৌশলী ও তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী পদে পদোন্নতি দেওয়ার চেষ্টা চলছে। বেতন নির্ধারণ ও গ্রেড সংক্রান্ত অনিয়মের অভিযোগও উঠেছে। ১৯৯৮ সালে প্রকল্পে যোগদানের পর ২০০৬ সালে রাজস্ব খাতে আসার আগেই বিভিন্ন সময়ে উচ্চতর গ্রেডে বেতন উত্তোলনের বিষয়টি যাচাইয়ের দাবি উঠেছে।

জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তর দেশের নিরাপদ পানি সরবরাহ ও স্যানিটেশন ব্যবস্থার মূল দায়িত্বে নিয়োজিত। ঠিকাদারি সম্পৃক্ততা, টেন্ডার বাণিজ্য ও প্রকল্পে অনিয়ম অব্যাহত থাকলে জনগণের মৌলিক সেবা ক্ষতিগ্রস্ত হয়। দুদক ইতোমধ্যে এসব অভিযোগ অনুসন্ধান শুরু করেছে বলে জানা গেছে। অভিযোগগুলোর সত্যতা যাচাইয়ে নোয়াখালীর নিলাম প্রক্রিয়া, ময়মনসিংহ ও নরসিংদীর প্রকল্প, টেন্ডার অনুমোদন ব্যবস্থা, জ্যেষ্ঠতা তালিকা এবং সাম্প্রতিক পদোন্নতি প্রক্রিয়া পূর্ণাঙ্গ তদন্তের দাবি জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা। স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি প্রতিষ্ঠা না হলে এই দুর্নীতির চক্র আরও শক্তিশালী হবে বলে মনে করছেন তারা।