এনএসআই থেকে সংসদ ভবন: যেখানেই মাহাবুবুল হক চৌধুরী, সেখানেই গণ্ডগোল 

বিশেষ প্রতিনিধি
বিশেষ প্রতিনিধি
প্রকাশিত: এপ্রিল ২৩, ২০২৬ ১৩:৫৫:০৫

ন্যাশনাল সিকিউরিটি ইন্টিলিজেন্স বা রাজধানী ঢাকার সেগুনবাগিচায় এনএসআই ভবনের নির্মাণ কাজে নিম্নমানের লিফট, সিসি ক্যামেরা স্থাপনসহ যাবতীয় ইলেকট্রো ম্যাকানিকাল কাজের তত্ত্বাবধানের দায়িত্ব ছিল আওয়ামী লীগের বিশ্বস্ত প্রকৌশলী মাহাবুবুল হক চৌধুরী। যেখানে অনিয়ম ও দুর্নীতির কারনে পুরো নির্মাণ প্রক্রিয়া বাধাগ্রস্ত হয়েছিল একইভাবে জাতীয় সংসদের সাউন্ড সিস্টেমের বিপর্যয়ের নেপথ্যেও রয়েছে এই প্রকৌশলী।এনএসআই-এর কাজের শাস্তি ভোগ করেছিল নির্বাহী প্রকৌশলী আনোয়ার হোসেন। সংসদ ভবনের কাজেরও শাস্তি ভোগ করলেন তিনি। প্রতিবারই ধরাছোঁয়ার বাইরে থেকে যান মাহাবুবুল হক চৌধুরী। এবারও তিনি কী ধরাছোঁয়ার বাইরে থেকে যাচ্ছেন এমন প্রশ্ন ঘুরপাক খাচ্ছে।

জাতীয় সংসদের চিফ হুইপ নূরুল ইসলাম মণি বলেছেন, আমরা তদন্ত কমিটি করেছি। তদন্ত কমিটির রিপোর্ট ছাড়াও আমাদের জেনারেল অবজারভেশন রয়েছে। আমরা অনেক কিছুই জানি, তদন্ত কমিটির রিপোর্টে তার প্রতিফলন না হলে আমরা পুনরায় তদন্ত করাবো। আমরা কেউই কোন কিছুর ঊর্ধ্বে নই। নাশকতার ঘটনায় কাউকেই ছাড় দেয়ার সুযোগ নেই।

গত ১২ মার্চ জাতীয় সংসদের উদ্বোধনী দিনে সাউন্ড সিস্টেম বিপত্তির জন্য গণপূর্ত সার্কেল-৩ এর তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী, নির্বাহী প্রকৌশলী থেকে শুরু করে অনেকের দায় থাকলেও শুধুমাত্র বলি হলো নির্বাহী প্রকৌশলী মো. আনোয়ার হোসেন। ধরাছোঁয়ার বাইরে থেকে গেলো এ ঘটনার নাটের গুরু তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী মাহাবুবুল হক চৌধুরী। অথচ এখানে তত্ত্বাবধানের কর্মকর্তা হিসেবে সবার আগে শাস্তির মুখোমুখি হওয়ার কথা ছিল তার। তিনি থেকে গেলেন ধরাছোঁয়ার বাইরে।

জাতীয় সংসদের হাউস কমিটি এ ঘটনা নাশকতা কি-না তা তদন্তে সংসদের সার্জেন্ট এ্যাট আর্মসকে প্রধান করে তদন্ত কমিটি গঠন করে। ৫ এপ্রিল তদন্ত কমিটির রিপোর্টে দেয়ার কথা থাকলেও তা দিতে পারেনি। এই ঘটনায় যদি নাশকতার সংযোগ থাকে তাহলে সবার আগে আসবে মাহাবুবুল হক চৌধুরীর নাম। বিগত ফ্যাসিস্ট সরকারের সবচেয়ে সুবিধাভোগী প্রকৌশলী বিগত সময়েও একের পর এক অনিয়ম করে টিকে গিয়েছিলেন বঙ্গবন্ধু প্রকৌশল পরিষদের সদস্য হিসেবে। ৫ আগস্টের পট পরিবর্তনের পর হঠাৎই বিএনপি বনে গেছেন তিনি।

মাহাবুবুল হক চৌধুরী বিগত ফ্যাসিস্ট সরকারের আমলে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সার্কেল-২ এর তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলীর দায়িত্বে ছিলেন। তাঁর অধীনে ছিল সচিবালয়, হাইকোর্ট, ঢাকা মেডিকেল, জাজেস কমপ্লেক্স, তেজগাঁওসহ নানা গুরুত্বপূর্ণ এলাকা। তখন বঙ্গবন্ধু পরিষদের সদস্য হিসেবে ফ্যাসিস্টের আস্থাভাজন লোক হিসেবে তাকে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব দেয়া হতো। তবে অনিয়ম ও দুর্নীতিতে সিদ্ধহস্ত মাহাবুবুল হক চৌধুরী সংসদ ভবনের মতো গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনাকেও ছাড় দেননি।

অথচ গত ৫ আগস্টের পট পরিবর্তনের পর সবচেয়ে সুবিধাভোগী এই কর্মকর্তা নিজেকে বিএনপির  কর্মী হিসেবে পরিচয় দিয়ে সবচেয়ে লোভনীয় পোস্টিং ভাগিয়ে নিয়েছেন। আগারগাঁওয়ে বিএনপি বস্তির সঙ্গে তাঁর বাড়ি এই পরিচয়েই তিনি বিএনপি নেতা হয়ে ওঠেন। সার্কেল-৩ এর তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী হয়ে আসার পর মাহাবুবুল এই সার্কেলের অধীনে চারটি ডিভিশনের কাজ ভাগাভাগি করেন তিনি। সংসদ ভবনে রাতের অফিস বসিয়ে তিনি তথাকথিত বৈষম্য বিরোধী ছাত্রনেতা ও বিএনপির কর্মীদের কাজ ভাগাভাগি করে দিতেন। বিনিময়ে তিনি মোটা অঙ্কের কমিশন হাতিয়ে নিতেন। সংসদের এই কাজের নির্দিস্ট ঠিকাদার থাকলেও বিগত ফ্যাসিস্ট আমলের সবচেয়ে সুবিধাভোগী বনশ্রীর আওয়ামী লীগ নেতা দুলালের আমানত এন্টারপ্রাইজকে কাজ দিতে বাধ্য করেন এই মাহাবুবুল হক চৌধুরী। জাতীয় সংসদের চিফ হুইপ নূরুল ইসলাম মণি এই ঠিকাদারকে মুদি দোকানদার হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন।

দেশের সর্বোচ্চ আইনসভা জাতীয় সংসদের উদ্বোধনী অধিবেশনেই এই প্রযুক্তিগত বিপর্যয়ের জন্য মাহাবুবুল হক চৌধুরীই সবচেয়ে বেশি দায়ী। প্রায় ৪ কোটি ৭৮ লাখ টাকা ব্যয়ে সংস্কার করা সাউন্ড সিস্টেম এবং হেডফোন ব্যবস্থায় মারাত্মক ত্রুটি দেখা দেওয়ায় অধিবেশন চলাকালে মাইক কাজ করেনি, স্পিকারকে হ্যান্ডমাইক ব্যবহার করতে হয়েছে আর সংসদ সদস্যরা অভিযোগ করেছেন নিম্নমানের হেডফোন ব্যবহারের ফলে কান থেকে মাথা পর্যন্ত ব্যথা হয়েছে।

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশন চলাকালে হঠাৎ করেই সাউন্ড সিস্টেমে এই যান্ত্রিক ত্রুটি দেখা দেয়। নবনির্বাচিত স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমেদ বক্তব্য দিতে গিয়ে দেখেন মাইক কাজ করছে না। কয়েকবার চেষ্টা করেও শব্দ শোনা যাচ্ছিল না। একপর্যায়ে তিনি হ্যান্ডমাইক ব্যবহার করতে বাধ্য হন। এসময় স্পিকার বলেন, “যান্ত্রিক গোলযোগের কারণে কথাবার্তা ঠিকমতো শোনা যাচ্ছে না। সবাইকে একটু ধৈর্য ধরতে হবে।” পরিস্থিতি সামাল দিতে তিনি ২০ মিনিটের জন্য অধিবেশন মুলতবি ঘোষণা করেন। বিরতির পর অধিবেশন আবার শুরু হলেও কিছু সময় পর্যন্ত শব্দ বিভ্রাট অব্যাহত ছিল। সংসদের মতো গুরুত্বপূর্ণ স্থানে এমন পরিস্থিতি তৈরি হওয়ায় উপস্থিত সংসদ সদস্যদের মধ্যেও বিব্রতকর পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়।

এই ঘটনার পর প্রাথমিক অনুসন্ধানে গণপূর্ত অধিদপ্তরের তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী মাহাবুবুল হক চৌধুরীর চরম অনিয়ম, দুর্নীতি ও গাফিলতি ধরা পড়লেও তদন্ত কমিটি তাকে বাচিয়েই রিপোর্ট দিতে যাচ্ছে। এই কমিটিতে গণপূর্তের সদস্য কাঠের কারখানা বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী জুবায়ের বিন হায়দার তাকে রক্ষার জন্য জোর চেষ্টা চালাচ্ছেন। এই জুবায়ের বিন হায়দার নারায়ণগঞ্জের জুলাই হত্যা মামলার পলাতক সন্ত্রাসী পিজা শামীমের ছেলে। যে জুবায়ের নিজেই সংসদ ভবনের নাশকতারর জন্য প্রধান হুমকি সেই জুবায়ের নাশকতা তদন্তের জন্য গঠিত কমিটির সদস্য। 

এদিকে শাস্তির মুখে পড়া নির্বাহী প্রকৌশলী আনোয়ার হোসেন ছিলেন হুকুমের দাসমাত্র। তিনি তত্বাবধায়ক প্রকৌশলীর নির্দেশনা মেনে এই কাজের ওয়ার্ক অর্ডারে স্বাক্ষর করেছেন মাত্র। এছাড়া পুরো কাজের তত্ত্বাবধানের দায়িত্ব ছিল মাহাবুবুল হক চৌধুরীর। অবস্থাদৃষ্টে মনে হচ্ছে এবারও প্মাহাবুবুল হক চৌধুরী থেকে যাচ্ছেন ধরাছোঁয়ার বাইরে?