মামলা যেন ‘বৈধতার’ ঢাল
কক্সবাজার দক্ষিণ বনবিভাগের উখিয়ায় ৩ লাখে মিলছে বনভূমিতে অট্টালিকার অনুমতি

কক্সবাজার দক্ষিণ বনবিভাগের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ও মূল্যবান এলাকা হিসেবে পরিচিত উখিয়া রেঞ্জ আজ এক চরম সংকটের মধ্য দিয়ে অতিবাহিত হচ্ছে। ৪১তম বিসিএস-এর মাধ্যমে বন ক্যাডারে নিয়োগপ্রাপ্ত সহকারী বন সংরক্ষক (এসিএফ) মো: শাহিনুর ইসলাম রেঞ্জ প্রশিক্ষণার্থী হিসেবে উখিয়া রেঞ্জের দায়িত্বে যার অধীনে রহেছে উখিয়া, দোছড়ি, ভালুকিয়া, হলুদিয়া, ওয়ালাপালং, উখিয়ারঘাট ও থাইনখালী—এই সাতটি বিট নিয়ে গঠিত কার্যত এই বিশাল বনভূমি এখন এক শক্তিশালী সিন্ডিকেটের কবলে। অভিযোগ উঠেছে, রেঞ্জের দায়িত্বশীল কর্মকর্তাদের চরম উদাসীনতা এবং কতিপয় অসাধু বনকর্মীর প্রত্যক্ষ লালসার বলি হয়ে ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে পৌঁছেছে সংরক্ষিত বন ও প্রাকৃতিক পরিবেশ।
বিশেষ করে সাবেক রেঞ্জ কর্মকর্তা গাজী সফিউল ইসলামের সময়কাল থেকে শুরু করে বর্তমান সময় পর্যন্ত প্রায় চার হাজার হেক্টর বাগান সৃজন ও রক্ষণাবেক্ষণে ব্যাপক অনিয়মের তথ্য পাওয়া গেছে, এমনকি দাতা সংস্থার অর্থায়নে পরিচালিত ‘হেল্প’ প্রকল্পের বনায়ন কার্যক্রমও সঠিকভাবে সম্পন্ন হয়নি বলে জানা যায়। উখিয়া রেঞ্জের এই অরাজক পরিস্থিতির পেছনে জনশ্রুতি রয়েছে একটি সুসংগঠিত সিন্ডিকেটের, যার অন্যতম প্রধান কারিগর হিসেবে আঙুল উঠেছে উখিয়া বিটের ডেপুটি রেঞ্জার আব্দুল মান্নানের দিকে। স্থানীয় বনকর্মীদের ভাষ্যমতে, এসিএফ শাহিনুর ইসলাম কর্মজীবনের শুরুতে সুনামের সাথে কাজ করলেও আব্দুল মান্নানের যোগদানের পর থেকেই দৃশ্যপট পাল্টে যায়।
মান্নানের প্রভাবে বনের জমি বিক্রির বিষয়টি এখন ওপেন সিক্রেটে পরিণত হয়েছে, যা আগে কখনো এতোটা বেপরোয়া ছিল না। অভিযোগের তীর আরও গভীরে, যেখানে গুঞ্জন রয়েছে যে এই অবৈধ আয়ের একটি বড় অংশ বিভাগীয় বন কর্মকর্তা (ডিএফও) আব্দুল্লাহ আল মামুন পর্যন্ত পৌঁছানো হয়, যা বনবিভাগের অভ্যন্তরীণ স্বচ্ছতাকে প্রশ্নবিদ্ধ করেছে। বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে এসব অনিয়ম নিয়ে সচিত্র প্রতিবেদন প্রকাশিত হলেও ডিএফও-র রহস্যজনক নীরবতা ও কার্যকর পদক্ষেপের অভাব জনমনে নানা প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে। সাম্প্রতিক সময়ে রাজাপালং ইউনিয়নের কুতুপালং পূর্বপাড়া এলাকার ‘স্বর্ণ পাহাড়’ নামক স্থানে সংরক্ষিত বনভূমি দখল করে বহুতল ভবন নির্মাণের ঘটনাটি বনবিভাগের ‘দায়সারা’ ভূমিকার এক জলজ্যান্ত প্রমাণ।
স্থানীয় মৃত রোহিঙ্গা ইলিয়াসের ছেলে মোহাম্মদ হারুন ও মোহাম্মদ মামুন কর্তৃক তিনতলা পর্যন্ত পাকা ভবন নির্মাণ সম্পন্ন হলেও বনবিভাগ রহস্যজনক কারণে শুরু থেকে বাধা প্রদান করেনি। অনুসন্ধানে জানা গেছে, প্রায় ৩ লাখ টাকার বিনিময়ে বনবিভাগের অসাধু কর্মকর্তাদের ম্যানেজ করেই এই অবৈধ স্থাপনা গড়ে উঠেছে। গত ১৬ এপ্রিল এসিএফ শাহিনুর ইসলাম উখিয়া আদালতে একটি মামলা (মামলা নং: উখি-১৭/২৬) দায়েরের কথা নিশ্চিত করলেও সচেতন মহল মনে করছে, এটি মূলত ভবনটিকে পরোক্ষভাবে বৈধতা দেওয়ার একটি অপকৌশল মাত্র। বিট কর্মকর্তা আব্দুল মান্নান লোকবল সংকট এবং প্রশাসনের সহযোগিতার অভাবকে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করলেও, বাস্তবে তিনি প্রশাসনের সাথে কোনো আনুষ্ঠানিক যোগাযোগই করেননি বলে স্বীকার করেছেন। মামলার আড়ালে নির্মাণকাজ অব্যাহত থাকা এবং উচ্ছেদ অভিযানে অনীহা প্রমাণ করে যে, রক্ষকদের আশ্রয়-প্রশ্রয়েই উখিয়ার ফুসফুসখ্যাত এই বনভূমি আজ ভূমিদস্যুদের দখলে চলে যাচ্ছে। আইনি মারপ্যাঁচের আড়ালে এই ধ্বংসযজ্ঞ বন্ধ না হলে অচিরেই এই অঞ্চলের জীববৈচিত্র্য ও প্রাকৃতিক ভারসাম্য চিরতরে হারিয়ে যাবে।
