ফ্যাসিস্টের ঋণখেলাপি প্রতিষ্ঠান ‘লুপডট ফ্যাশন’কে সুবিধা দিতে মরিয়া অগ্রণী ব্যাংকের প্রধান শাখার জিএম ফজলুল হক

কেন্দ্রীয় স্বেচ্ছাসেবক লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক সাজ্জাদ সাকিব বাদশার ‘লুপডট ফ্যাশন লিমিটেড’ নামের প্রতিষ্ঠানটি ইতোমধ্যে ঋণখেলাপি হিসেবে বাংলাদেশ ব্যাংকের তালিকাভুক্ত হয়েছে।
লুপডট ফ্যাশন অগ্রণী ব্যাংক পিএলসি প্রধান শাখা থেকে ৬৫ কোটি ৪০ লাখ টাকা নিয়ে পরে তা আর পরিশোধ না করায় প্রতিষ্ঠানটি ঋণখেলাপির তালিকায় ওঠে। এই অবস্থায় প্রতিষ্ঠানটির ঋণ পূন:তফসিলকরণ এবং ঋণের টাকার একটি বড় অংশ সুদ মওকুফের জন্য সম্প্রতি প্রস্তাব করেছেন প্রধান শাখার জিএম একেএম ফজলুল হক। সংশ্লিষ্ট ব্যাংকের একাধিক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, তিনি নিজে একজন ছাত্রলীগের ক্যাডার ছিলেন, লুপডটের মালিকও আ. লীগের দোসর; যে কারণে এই প্রতিষ্ঠানটিকে নতুন করে সুবিধা প্রদানের জন্য ব্যক্তিগতভাবে জোরতদ্বির চালিয়ে যাচ্ছেন। বোর্ডের অন্য সদস্যরা লুপডটকে সুবিধা প্রদানের বিষয়ে দ্বিমত পোষণ করলেও তিনি প্রভাব বিস্তার করে পূণ:তফসিলকরণ প্রক্রিয়াটি জিইয়ে রেখেছেন এবং পরবর্তী মিটিংয়ে প্রস্তাবাটি পাস হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে বলেও জানাগেছে সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্রে।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, লুপডট ফ্যাশন মন্দ ও ক্ষতিজনক মানে শ্রেনীকৃত খেলাপি ঋণ গ্রহিতা অর্থাৎ বিগত সময়গুলোতে ৬৫ কোটি ৪০ লাখ টাকার ঋণের কিস্তি কিংবা আংশিক টাকাও পরিশোধে পুরোপুরি ব্যর্থ হয়েছে। এছাড়াও তার মর্গেজের পরিমান অনেক কম এবং বারংবার কমিটমেন্ট দেওয়া সত্বেও প্রতষ্ঠানটি কোনও টাকা পরিশোধ করেনি।
এজন্য ব্যাংক প্রতিষ্ঠানটির ব্যাংক হিসাব এর শ্রেণী মান মন্দ ও ক্ষতিজনক হিসেবে চিহৃিত করেছে। এক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠানটির মর্গেজের পরিমাণ নামমাত্র হতে পারে বলেও আসঙ্কা করছে একাধিক সূত্র।
অন্য একটি সূত্র জানিয়েছে, এই মুহুর্তে ব্যাংকের উচিত ছিল প্রতিষ্ঠানের মালিকপক্ষের মালিকানাধীন অন্যান্য এসেট সংযুক্ত করে লুপডটের বিরুদ্ধে মামলা করা। ব্যাংকটি তা না করে বরং এই ফাসিস্টের দোসরকে আরও সুবিধা দেয়ার জন্য খেলাপি ঋণের পূণ:তফসিলিকরণ প্রক্রিয়া ত্বরান্বিত করার পায়তারা করছে শাখার ব্যবস্থাপক জিএম একে এম ফজলুল হক।
প্রতিষ্ঠানটি মূলত বৈদেশিক বাণিজ্য সুবিধার অপব্যবহার করে বিগত সময়ে অগ্রণী ব্যাংক থেকে প্রায় ৬৬ কোটি ট্কা হাতিয়ে নিয়েছে। এবার আরও টাকা নেওয়ার জন্য নতুন করে রিসিডিউলের মাধ্যমে প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে বলেও সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্রে জানা গেছে।
যে প্রতিষ্ঠান বছরের পর বছর ধরে বৈদেশিক বাণিজ্যের অপব্যবহার করে ব্যাংক থেকে টাকা পাচারে লিপ্ত ছিল সে প্রতিষ্ঠানের ঋণের টাকা সরাসরি আদায়ের ব্যবস্থা না করে নতুন করে সুযোগ সুবিধা দেয়া রহস্যজনক বলেও মনে করেন ব্যাংকের এক কর্মকর্তা। এছাড়া লুপডট ফ্যাশন বছরের বৈদেশিক বাণিজ্যের নাম করে ব্যাংক থেকে টাকা নিয়ে বিদেশে পাচার করেছে বলেও একটি সূত্রে জানা গেছে।
প্রতিষ্টনটির গৃহিত ঋণের সুদ মওকুফের বিষয়টি বাংলাদেশ ব্যাংকের কোন সার্কুলার বা কোন আইনের আওতায় প্রস্তাব করা হয়েছে— এমন প্রশ্নও করেন একজন ব্যাংক কর্মকর্তা। বিআরপিডি সার্কুলার নম্বর ৭, তারিখ ১৬.০৯.২৫ এর আওতায় প্রতিষ্ঠানটি সুদ মওকুফ ও পুন:তফসিল এবং নতুন করে ব্যাক টু ব্যাক এলসি বা ঋণপত্রের সীমা কীভাবে নবায়ন করার প্রস্তাব করা হচ্ছে, এই প্রশ্নও করেন তিনি।
তিনি আরও বলেন, প্রতিষ্ঠানটি বিগত সময় ব্যাংক থেকে বৈদেশিক বাণিজ্যের অপব্যবহার করে যারা এসব সুযোগ-সুবিধা গ্রহণ করেছেন বা এরর পেছনে ব্যাংক কর্মকর্তা বা কার কী ভূমিকা ছিল তার কি কোন তদন্ত কিংবা অডিট হওয়া উচিত ছিল। পূর্বের অনিয়ম ও দূর্বলতা চিহৃিত না করে নতুন করে কার সার্থে প্রতিষ্ঠানটিকে পুণরায় সুযোগ-সুবিধা দেয়া হচ্ছে?
প্রতিষ্ঠানটির পূর্বের ঋণ ৬৫ কোটি ৪০ লাখ সেইসঙ্গে নন-ফান্ডেড সুবিধা অর্থাৎ ২৫ কোটি টাকার ব্যাক টু ব্যাক ঋণপত্রের সীমা ১ বছরের জন্য নবায়নের জন্য মর্গেজ কত আছে এবং নতুন করে কি মর্গেজ নিচ্ছে ব্যাংকটি তারও একটি খসড়া থাকা প্রয়োজন ছিল বলেও তিনি ব্যক্ত করেন।
এসব বিষয় নিয়ে বক্তব্য জানতে চাইলে, অগ্রণী ব্যাংক প্রধান শাখার জিএম একেএম ফজলুল হক বলেন, সিদ্ধান্ত বোর্ডের। আমার পার্সোনাল কিছু নাই। আমার বিরুদ্ধে অভিযোগ সত্য নয়। ১৭ ডিসেম্বর এটা নিয়ে মিটিং হবে। সুদ মওকুফের বিষয়টি বাতিল হতে পারে।
উল্লেখ্য লুপডট ফ্যাশনের চেয়ারম্যান মোঃ আমিরুল ইসলাম এবং ব্যবস্থাপনা পরিচালক সাজ্জাদ সাকীব বাদশা দুজনই স্বৈরাচারীর দোসর। বিগত লীগ সরকার আমলের পূর্ণ সময়ই তারা সরকারি প্রভাব খাটিয়ে চালিয়েছেন লুটপাট।
অগ্রণী ব্যাংকের জিএম ফজলুল হক ছাত্র জীবনে ছাত্রলীগের রাজনীতির সাথে জড়িত ছিলেন। চাকরিতে যোগ দেবার পর আওয়ামীলীগের গবেষণা সেল এ কাজ করেছেন। আহমেদ ফিরোজ কবির, পাবনা -২ এর বিনাভোটের সাবেক এমপি, তার স্ত্রীর আপন বড় ভাই। এসব প্রভাবকে অন্যায় ভাবে কাজে লাগিয়ে গ্রীন রোড শাখা এবং সদর ঘাট শাখায় এসএল আপত্তি থাকা সত্ত্বেও তিনি জিএম পদে প্রমোশন বাগিয়ে নেন। আওয়ামী প্রভাব খাটিয়ে উনার মেয়েকে খুলনা বিশ্ববিদ্যালয় এ শিক্ষক হিসেবে ঐ সময়ে নিয়োগ দেন।
ব্যাংকের অপর একজন জিএম বলেন, অগ্রণী ব্যাংকে বর্তমানে চলছে আওয়ামী স্বৈরাচারীদের পুনর্বাসন প্রক্রিয়া। এরই অংশ হিসেবে ছাত্রলীগের সাবেক সভাপতি বাহাদুর ব্যাপারী অগ্রণী ব্যাংকে দীর্ঘদিন যাবৎ বেসরকারি সিকিউরিটি গার্ড সরবরাহের ব্যবসা করছেন। আশ্চর্জনকভাবে এখনো উনার ব্যবসা চালু আছে। তার কোম্পানির নাম বিবি ভিজিলেন্স। কোনোরকম টেন্ডার ছাড়া একচেটিয়াভাবে ব্যবসা করেছেন সম্পূর্ণ অন্যায়ভাবে। যা দেখার কেউ নেই।
