বৈধ কাঠ ব্যবসায়ীরা অতিষ্ঠ

চট্টগ্রাম উত্তর বন বিভাগের করেরহাট রেঞ্জে শিক্ষানবিশ এসিএফ লালুর বেপরোয়া ঘুষ বাণিজ্য

চট্টগ্রাম থেকে নজরুল ইসলাম
চট্টগ্রাম থেকে নজরুল ইসলাম
প্রকাশিত: ফেব্রুয়ারী ১২, ২০২৩ ১৬:১০:৫৩

চট্টগ্রাম উত্তর বন বিভাগের করেরহাট রেঞ্জ কর্মকর্তা শিক্ষানবিশ সহকারী বন সংরক্ষক (এসিএফ) শেখ মাহবুব হোসেন লালুর বিরুদ্ধে সীমাহীন অনিয়ম ও দুর্নীতির মাধ্যমে অবৈধ কাঠ পাচারে সহযোগীতা করে প্রতিদিন লাখ লাখ টাকা অবৈধ উপার্জনের অভিযোগ উঠেছে। তাকে নিয়ন্ত্রণকারী কর্মকর্তা করেরহাটের এসিএফ জামিল মোহাম্মদ খান’র সাথেও তিনি ওদ্বত্য আচরণ করায় বিভাগীয় বন কর্মকর্তা দপ্তরে অভিযোগ দায়ের হয়েছে।

সাতক্ষীরার জামায়াত পরিবারের সন্তান ৩৮ তম বিসিএস এ বন ক্যাডারে নিয়োগ পাবার পর শিক্ষানবিশ এসিএফ হিসেবে করেরহাট রেঞ্জ কর্মকর্তার দায়িত্বপ্রাপ্ত হন। এরপর থেকেই জড়িয়ে পড়েন সরাসরি কাঠ পাচারে। রাতারাতি লাখ লাখ টাকা ঘুষ পেয়ে হয়ে পড়েন বিত্তশালী।

এই অবৈধ অর্থের জোরে তিনি অধ:স্থনদের ডিপ্লোমা বলে গালিগালাজ, ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের নন ক্যাডার বলে তুচ্ছ তাচ্ছিল্য সহ প্রধান বন সংরক্ষককে স্যার বলে সম্বোধন না করে বিশ্ববিদ্যালয়ের বড় ভাই হিসেবে সম্বোধন করতেও দ্বিধা করেন না। তার এহেন ওদ্বত্যপূর্ণ আচরণ ও কাঠ পাচারের মাধ্যমে বেপরোয়া ঘুষ গ্রহণের ফলে চট্টগ্রাম উত্তর বন বিভাগে কর্মরত কর্মকর্তা-কর্মচারী ও বৈধ কাঠ ব্যবসায়ীদের মধ্যে চরম অসন্তোষ বিরাজ করছে। 

সরেজমিন অনুসন্ধানে দেখা যায়, পার্বত্য জেলা সমূহ থেকে আগত বৈধ কাঠ ভর্তি ট্রাক আটকিয়ে তিনি বিভিন্ন হুমকি ধামকি দিয়ে গাড়ী প্রতি ১০/১৫ হাজার টাকা করে ঘুষ আদায় করেন। প্রতিদিন কমপক্ষে ২০/২৫ টি গাড়ি থেকে এভাবে ঘুষ আদায় করার দৃশ্যটি অনেকের কাছে ওপেন সিক্রেট। এই ঘুষ আদায়ে প্রত্যক্ষ সহযোগিতা করেন স্টেশন কর্মকর্তা ফরেস্টার শিবু দাস রায় ও মেম্বর কালা জামাল।

এ ছাড়া টিপি বিহীন রিজার্ভ উজাড় করা কাঠ ভর্তি ট্রাক, পিকআপ, লড়ি আটকিয়ে, মামলার ভয়ভীতি দেখিয়ে লাখ লাখ টাকা হারে আদায় করে থাকেন। বর্তমানে তার অত্যাচারে বৈধ কাঠ ব্যবসায়ীরাও অতিষ্ঠ হয়ে উঠেছে। তার এহেন অপতৎপরতা অব্যাহত রাখার কারণে একদিকে যেমন কাঠ পাচার বৃদ্ধি পাচ্ছে অপরদিকে চট্টগ্রাম উত্তর বন বিভাগের প্রশাসনিক ভাবমূর্তি ক্ষুন্ন হচ্ছে।

প্রাপ্ত তথ্য মতে, গত ২ নভেম্বর, ২০২২ ইং তারিখে এসিএফ লালু মিয়া একটি জ্বালানী কাঠের পিকআপ আসামিসহ জব্দ করে নিয়ে এসে জ্বালানী কাঠ নামিয়ে নিয়ে মামলা না দিয়ে পিকআপটি এক লক্ষ টাকায় রফাদফা করে গভীর রাতে আসামী ও পিকআপ ছেড়ে দেন। পরবর্তীতে তার নিয়ন্ত্রণকারী কর্মকর্তা এসিএফ জামিল মোহাম্মদ খান এতদ্বসংক্রান্তে জিজ্ঞাসা করলে লালু মিয়া ক্ষিপ্ত হয়ে তাকে আইনের বিষয়ে লেখাপড়া করা সহ বিভিন্ন হুমকি ধামকি নন ক্যাডার বলে গালিগালাজ করেন। এতদ্বসংক্রান্তে এসিএফ জামিল মোহাম্মদ গত ১ ডিসেম্বর বিভাগীয় বন কর্মকর্তার কাছে লিখিত অভিযোগ করেন। যা বর্তমানে তদন্তাধীন বলে জানা গেছে। 

সূত্রমতে করেরহাট রেঞ্জের অধীনে করেরহাট বিট কাম চেক স্টেশন, ধুমঘাট চেক স্টেশন, কয়লা বিট ও হোয়াকো বিট হবার সুবাদে তিনি প্রতিটি চেক স্টেশন ও বিট কর্মকর্তাদের কাছ থেকে মাসিক স্টেশন প্রতি ২লাখ ও বিট প্রতি ১ লাখ টাকা হারে ঘুষ আদায় করে থাকেন। সম্প্রতি ধুমঘাট চেক স্টেশন কর্মকর্তার কাছে ৫ লাখ টাকা মাসিক ঘুষ দাবী করায় স্টেশন কর্মকর্তা না দেওয়ায় তিনি তাকে ডিপ্লোমা সহ অকথ্য ভাষায় গালিগালাজ সহ বদলী করার হুমকি দেন। যা নিয়ে সমগ্র উত্তর বন বিভাগের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মধ্যে চরম অসন্তোষের সৃষ্টি হয়।

শিক্ষানবিশ এসিএফ লালু মিয়া আগামী ২ বছরের মধ্যে ডিএফও হবেন বলে প্রকাশ্যে জাহির করে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের হুমকি প্রদান করার কারণে নিম্ন কর্মচারীরা সব সময় থাকেন আতঙ্কে। প্রাপ্ত তথ্য মতে করেরহাট রেঞ্জ অফিসের সামনে কয়েকমাস ধরে আটকৃত জ্বালানি কাঠের বিষয়ে কোনো মামলা না করে তিনি তা গোপনে বিক্রি করার জন্য বিভিন্ন কাঠ ব্যবসায়ীদের সাথে দরদাম অব্যাহত রেখেছেন।

সম্প্রতি পার্বত্য জেলা থেকে আগত রিজার্ভ উজাড়ের গাছের তৈরি ২ ট্রাক ভর্তি ৩ কোটি টাকা মূল্যের ফার্নিচার আটকিয়ে এই শিক্ষানবিশ এসিএফ ৬ লাখ টাকা ঘুষ নিয়ে পাচারে সহযোগিতা করেন। প্রথমাবস্থায় ঘুষ লেনদেনের পরিমাণ কম থাকায় তিনি ট্রাক ড্রাইভার ২জনকে নামিয়ে এনে চড় লাথি মারতে থাকেন। এক পর্যায়ে চট্টগ্রাম শহর থেকে ট্রাক ২টির মালিকরা এসে শিক্ষানবিশ এসিএফকে ৬ লাখ টাকা নগদ দিয়ে ঐ রাতেই অবৈধ ফার্নিচার ভর্তি ট্রাক ছাড়িয়ে নিয়ে যান। অবৈধ ফার্নিচার ভর্তি ট্রাক বিধায় ট্রাক মালিকদ্বয় পরিচয় গোপন রাখতে ও প্রতিবেদককে অনুরোধ জানান। 

সাতক্ষীরার বাসিন্দা বন বিভাগের একজন পদস্থ কর্মকর্তা বলেন শিক্ষানবিশ এসিএফ লালু সাতক্ষীরার একটি জামায়াত পরিবারের ছেলে। ছাত্র জীবনে শিবিরের রাজনীতির সাথে সম্পৃক্ত থাকার কারণে তার এহেন ওদ্বত্যপূর্ণ আচরণের কারণ। তাছাড়া চাকুরীতে নবীন। অতিরিক্ত অর্থ লিপ্সায় এবং স্বল্প সময়ে কাঠ পাচারে সহযোগিতা করে অঢেল টাকার মালিক হওয়ায় নিজেকে ড্যামকেয়ার ভাব প্রদর্শন করছেন। যা তার জন্য ক্ষতির কারণ হতে পারে। কারণ তিনি এখনো শিক্ষানবিশ। চাকুরীতে কনফার্ম হননি। তাই তার সংযত ও বিনয়ী হওয়া উচিত। তবে এহেন ঘুষ লিপ্সা, অসদাচারণ, এমনকি কাঠ পরিবহনের সাথে জড়িতদের গায়ে হাত তোলার বিষয়টি সমগ্র বনবিভাগে কর্মরতদের ভাবমূর্তি ক্ষুন্ন করেছে। তার বিরুদ্ধে অচিরেই তদন্তপূর্বক সংশ্লিষ্ট ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে গোপন প্রতিবেদন পাঠানো প্রয়োজন।