ম্যানেজিং কমিটি, শিক্ষক নিয়োগ ও অর্থ আদায় নিয়ে প্রশ্ন

বিসিএসআইআর স্কুল অ্যান্ড কলেজে প্রশাসনিক ও আর্থিক অনিয়মের অভিযোগ

আমেনা ইসলাম
আমেনা ইসলাম
প্রকাশিত: জুলাই ১৩, ২০২৬ ১৯:৩৩:৪৭

রাজধানীর নিউমার্কেট এলাকায় অবস্থিত বিসিএসআইআর স্কুল অ্যান্ড কলেজের প্রশাসনিক কার্যক্রম, ম্যানেজিং কমিটির বৈধতা, শিক্ষক নিয়োগ, আর্থিক অব্যবস্থাপনা এবং শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে অর্থ আদায় নিয়ে একাধিক অভিযোগ সামনে এসেছে। আর্থিক ব্যবস্থাপনায় চরম অস্বচ্ছতা, বিভিন্ন খাতে অতিরিক্ত অর্থ আদায় এবং হিসাব-নিকাশে এমন অনিয়মের কারনে অভিভাবক ও সচেতন মহলে দেখা দিয়েছে চরম উদ্বেগ ও হতাশা।

অনুসন্ধানে উঠে আসে, প্রতিষ্ঠানটির ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক মো. জাফর উল্লাহ ছিলেন নিষিদ্ধ ঘোষিত আওয়ামীলীগের একনিষ্ঠ দোশর। আওয়ামীলীগের নির্বাচনী প্রচারনায় তিনি ছিলেন এক হাত এগিয়ে। জুলাই আন্দোলনের বিপক্ষে তার অবস্থান ছিলো স্পষ্ট। তার দায়িত্বকালেই একের পর এক বিতর্কিত সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। এসব সিদ্ধান্তের কারণে প্রতিষ্ঠানে সুশাসন, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিয়ে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। সবচেয়ে সমালোচিত  ম্যানেজিং কমিটির অভিভাবক প্রতিনিধিক ডক্টর শাহ জামালকে ঘিরে। যোগ্যতা হারানোর পরও  তাকে বহাল রেখে গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত গ্রহণের অভিযোগও রয়েছে তার বিরুদ্ধে।ম্যানেজিং কমিটির প্রবিধানমালা-২০২৪ অনুযায়ী কোনো অভিভাবক সদস্যের সন্তান সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানে অধ্যয়নরত না থাকলে তিনি অভিভাবক সদস্য হিসেবে থাকার যোগ্যতা হারান। কিন্তু সংশ্লিষ্ট সদস্যের সন্তান অন্য প্রতিষ্ঠানে চলে যাওয়ার পরও তাকে কমিটিতে বহাল রাখা হয়েছে ।শুধু বহাল রাখাই নয়, তার উপস্থিতিতে কমিটির সভায় বিভিন্ন সিদ্ধান্ত গ্রহণ এবং তাকে সভার সম্মানী প্রদান করা হচ্ছে।ম্যানেজিং কমিটির প্রবিধানমালা-২০২৪-এর ষষ্ঠ অধ্যায়ের ৪৮ ধারার বিধান উপেক্ষা করে প্রতিটি সভার জন্য বিদ্যালয়ের সাধারণ তহবিল থেকে প্রায় ৪০ থেকে ৫০ হাজার টাকা সম্মানী হিসেবে ব্যয় করা হয়েছে। এসব অর্থ কমিটির সদস্য ও সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা গ্রহণ করেছেন। এটি সরকারি নীতিমালা ও আর্থিক শৃঙ্খলার গুরুতর লঙ্ঘন হিসেবে বিবেচিত। যার  ফলে ম্যানেজিং কমিটির বৈধতা এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়া নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।

২০২৬ সালের ১৩ এপ্রিল অনুষ্ঠিত ম্যানেজিং কমিটির ১১০তম সভায় ওই সদস্যকে উপস্থিত রেখে একাধিক গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়। শিক্ষা প্রশাসন সংশ্লিষ্টদের মতে, যদি কোনো সদস্য বিধি অনুযায়ী পদে থাকার যোগ্যতা হারিয়ে থাকেন, তাহলে তার উপস্থিতিতে গৃহীত সিদ্ধান্তের বৈধতা নিয়ে প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক। শিক্ষা সংশ্লিষ্টরা বলছেন, কোনো অভিভাবক প্রতিনিধি তার সন্তান প্রতিষ্ঠান ছেড়ে চলে যাওয়ার পরও দায়িত্বে বহাল থাকলে, সে বিষয়ে শিক্ষা অধিদপ্তরের অনুমোদনের বিষয়টি স্পষ্ট হওয়া জরুরি।এছাড়া অভিযোগ রয়েছে, ম্যানেজিং কমিটির সভাপতি ও সদস্যদের সভায় অংশগ্রহণের বিপরীতে প্রত্যেককেই সম্মানী, ভাতা অথবা অন্যান্য আর্থিক সুবিধা দেওয়া হচ্ছে। এসব অর্থ কোন নীতিমালার আওতায় প্রদান করা হয়েছে এবং প্রতিষ্ঠানের তহবিল থেকে কী পরিমাণ অর্থ ব্যয় হয়েছে—এসব বিষয়েও প্রশ্ন উঠেছে সর্ব মহলে।

অবৈধ ও বিধি বহির্ভূত কাজ এইখানেই শেষ নয়,শিক্ষক নিয়োগ নিয়েও রয়েছে গুরুতর অভিযোগ। এনটিআরসিএর সুপারিশপ্রাপ্ত শিক্ষক নিয়োগের ক্ষেত্রেও অনিয়মের অভিযোগ আনা হয়েছে। সরজমিনে উঠে আসে এনটিআরসিএ কর্তৃক সুপারিশপ্রাপ্ত  শিক্ষককে নিয়োগ না দিয়ে অন্য ব্যক্তিদের নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। এতে সরকারি নিয়োগনীতিকে বৃদ্ধাংগুলি দেখানো হয়েছে।

সরকারি নীতিমালা যথাযথভাবে অনুসরণ না করে শিক্ষক নিয়োগ, খণ্ডকালীন শিক্ষক নিয়োগ এবং তাদের বেতন-ভাতা প্রদানের ক্ষেত্রে গুরুতর অনিয়ম ও অভিযোগ উত্থাপিত হয়েছে। নিয়োগ প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা, মেধা এবং প্রতিযোগিতার নীতি অনুসরণ না করে ঘুষ,দুর্নীতি,স্বেচ্ছাচারিতা ও স্বজন প্রীতির আশ্রয় নেয়া হয়েছে বলে সুস্পষ্ট অভিযোগ রয়েছে । সংশ্লিষ্ট দপ্তর কর্তৃক তদন্ত করলে বেরিয়ে আসবে একাধিক অনিয়ম ও অভিযোগের ফিরিস্তি।

তথ্যে আরো উঠে আসে, শিক্ষার্থীদের নির্দিষ্ট প্রকাশনীর গাইড বই কিনতে উৎসাহিত বা বাধ্য করা হয়েছে এবং গাইড বই সংশ্লিষ্ট বিষয়ে রয়েছে বড় ধরনের আর্থিক লেনদেন। পাশাপাশি বিভিন্ন খাতে শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের কাছ থেকে অর্থ আদায়ের অভিযোগও উত্থাপিত হয়েছে। এসব অর্থ প্রতিষ্ঠানের অনুমোদিত নীতিমালা অনুযায়ী আদায় করা হয়েছে কি না, সেপ্রশ্ন থেকেই যায়। শিক্ষা  সংশ্লিষ্টদের মতে, একটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের সাধারণ তহবিল শিক্ষার্থীদের কল্যাণ, শিক্ষা কার্যক্রমের উন্নয়ন এবং অবকাঠামোগত প্রয়োজনে ব্যয় হওয়ার কথা। সেই তহবিল যদি বিধিবহির্ভূতভাবে সম্মানী বা অন্যান্য খাতে ব্যবহার করা হয়ে থাকে, তাহলে বিষয়টি স্বাধীন ও নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি রাখে।এছাড়া অভিযোগ রয়েছে, ক্রয় কার্যক্রমে প্রতিযোগিতামূলক দরপত্র অনুসরণ না করা, একই ধরনের পণ্য বা সেবা বাজারমূল্যের তুলনায় বেশি দামে কেনা এবং আর্থিক সিদ্ধান্ত গ্রহণে যথাযথ জবাবদিহির অভাব রয়েছে। প্রতিষ্ঠানের পরিচালনা কমিটির সভার কার্যবিবরণী ও আর্থিক সিদ্ধান্ত নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন অনেকে। প্রতিষ্ঠানের আর্থিক ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতা, তহবিল ব্যয়, নিয়োগসংক্রান্ত প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত এবং ম্যানেজিং কমিটির কার্যক্রম নিয়েও বিভিন্ন মহলে চলছে আলোচনা । উল্লেখ্য যে,সরেজমিনে প্রতিষ্ঠান প্রধান জাফর উল্লাহর কাছে এ বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি উক্ত বিষয়ে ম্যানেজিং কমিটির সভাপতির অনুমতি ছাড়া  কথা বলতে অপারগতা প্রকাশ করেন  এবং তথ্য অধিকার আইনে তথ্য প্রার্থীর আবেদন রাখতে অস্বীকার করেন এবং বলেন তিনি এসব তথ্য দিতে বাধ্য নন। পরবর্তীতে এ বিষয়ে তথ্য অধিকার আইনে তথ্য প্রাপ্তির  আবেদন রেজিস্ট্রি করে ডাকযোগে পাঠালে আবেদনটি গ্রহণ না করে ফেরত পাঠান। একটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান  প্রধানের  এ ধরনের আচরণ প্রমাণ করে যে, আনীত অভিযোগ ধামাচাপা দিতেই তিনি বদ্ধপরিকর। এতে করে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষক, কর্মচারী এবং ছাত্র অভিভাবকদের মধ্যে এক মিশ্র প্রতিক্রিয়ার জন্ম দিয়েছে, বিষয়টি তদন্তের দাবি রাখে।