মনিপুর উচ্চ বিদ্যালয় ও কলেজে ৪ দিনব্যাপী বার্ষিক প্রশিক্ষণ কর্মশালা সম্পন্ন

নিজস্ব প্রতিবেদক
নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রকাশিত: জুলাই ১২, ২০২৬ ১৮:২৮:৫২

দেশের অন্যতম শীর্ষ ও ঐতিহ্যবাহী শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান মনিপুর উচ্চ বিদ্যালয় ও কলেজ-এর শিক্ষক-শিক্ষিকা ও কর্মচারীদের পেশাগত দক্ষতা বৃদ্ধি এবং শিক্ষার গুণগত মানোন্নয়নের লক্ষ্যে আয়োজিত ৪ (চার) দিনব্যাপী ‘বার্ষিক প্রশিক্ষণ কর্মশালা-২০২৬’ সফলভাবে সম্পন্ন হয়েছে। রূপনগর কলেজ ক্যাম্পাসে গত ২০ জুন থেকে শুরু হওয়া এই কর্মশালার সমাপনী অধিবেশন গতকাল শনিবার (১১ জুলাই) অনুষ্ঠিত হয়। সমাপনী দিনে একাডেমিক ও প্রশাসনিক উন্নয়ন, মানসিক স্বাস্থ্য এবং শিক্ষাক্ষেত্রে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (অও)-এর কার্যকর ব্যবহার বিষয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশিক্ষণ ও আলোচনা অনুষ্ঠিত হয়।

অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের (বিএনপি) সিনিয়র যুগ্ম-মহাসচিব, প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক উপদেষ্টা এবং শিল্প মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা (মন্ত্রী পদমর্যাদা) এ্যাডভোকেট মোঃ রুহুল কবির রিজভী। বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়ের মাননীয় প্রতিমন্ত্রী এবং ঢাকা মহানগর উত্তর বিএনপির আহ্বায়ক মোঃ আমিনুল হক এবং ঢাকা উত্তর সিটি কর্পোরেশনের প্রশাসক ও যুবদলের সাবেক ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক  মোঃ শফিকুল ইসলাম খাঁন (মিল্টন)। অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন মনিপুর উচ্চ বিদ্যালয় ও কলেজের বিশেষ কমিটির সভাপতি  ম. হামিদুল হক মানিক।

প্রধান অতিথির বক্তব্যে এ্যাডভোকেট রুহুল কবির রিজভী বলেন, “শিক্ষকদের উপযুক্ত ও আধুনিক প্রশিক্ষণ ছাড়া টেকসই শিক্ষা নিশ্চিত করা সম্ভব নয়। শিক্ষকদের ভেতর থেকে ডেডিকেশন বা উৎসর্গীকৃত মনোভাব হারিয়ে গেলে শিক্ষাব্যবস্থা নিম্নগামী হয়। শিক্ষকরা প্রাজ্ঞ ও অভিজ্ঞ না হলে শিক্ষার্থীরা আলোকিত মানুষ হতে পারবে না।” শিক্ষার উৎকর্ষ সাধন সরকারের অন্যতম প্রধান এজেন্ডা উল্লেখ করে তিনি স্কুল ফিডিং কার্যক্রমে অনিয়মের কঠোর সমালোচনা করেন। তিনি বলেন, “কিছু অসাধু ঠিকাদার উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে স্কুল ফিডিংয়ে নিম্নমানের খাবার দিচ্ছে, যারা মানবতার শত্রু।” ঐতিহ্যবাহী মনিপুর উচ্চ বিদ্যালয় ও কলেজের সঠিক পরিচালনা ও শিক্ষার পরিবেশ রক্ষায় তিনি সর্বদা শিক্ষকদের পাশে থাকার প্রত্যয় ব্যক্ত করেন।

বিশেষ অতিথির বক্তব্যে যুব ও ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রী মোঃ আমিনুল হক বলেন, “বিদ্যালয়ের যেকোনো চলমান সংকট সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সাথে আলোচনার মাধ্যমে সমাধান করা সম্ভব। অতীতেও আমি এই প্রতিষ্ঠানের পাশে ছিলাম, ভবিষ্যতেও থাকব।” তিনি শিক্ষার্থীদের মাঝে নৈতিক ও সামাজিক মূল্যবোধ তৈরিতে প্রতিদিন শ্রেণীকক্ষে ন্যূনতম ৫ মিনিট বিশেষ পাঠদানের জন্য শিক্ষকদের প্রতি আহ্বান জানান। ক্রীড়া ক্ষেত্রে সরকারের উন্নয়ন তুলে ধরে তিনি জানান, মাননীয় প্রধানমন্ত্রী খেলাধূলাকে পেশা হিসেবে গ্রহণে উদ্বুদ্ধ করতে ৩০০ জন খেলোয়াড়কে মাসিক ১ লক্ষ টাকা করে ভাতা প্রদান করছেন এবং ৪র্থ শ্রেণী থেকেই খেলাধূলাকে পাঠ্যসূচির অন্তর্ভুক্ত করা হচ্ছে। এছাড়া অনুষ্ঠানে গাজীপুরের স্থানীয় মাননীয় সংসদ সদস্য প্রতিষ্ঠানের উন্নতি ও অখণ্ডতা রক্ষায় সর্বাত্মক সহযোগিতার আশ্বাস ও শিক্ষকদের মঙ্গল কামনা করেন।

পূর্ববর্তী কমিটির দুর্নীতি ও বর্তমান সংকটে সভাপতির গভীর উদ্বেগ

সভাপতির বক্তব্যে বিশেষ কমিটির সভাপতি  ম. হামিদুল হক মানিক এবং কমিটির অন্যান্য সদস্যবৃন্দ (শিক্ষক ও অভিভাবক প্রতিনিধি) প্রতিষ্ঠানের বর্তমান কিছু জটিলতা ও প্রশাসনিক সংকট তুলে ধরে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেন।

সভাপতি দ্ব্যর্থহীন কণ্ঠে বলেন, “আমাদের বর্তমান কমিটির বয়স মাত্র ২ মাস। বিগত কামাল মজুমদার এবং ৫ই আগস্ট-পরবর্তী অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের দেওয়া কমিটির দুর্নীতি ও অর্থ আত্মসাতের দায়ভার সম্পূর্ণ অন্যায়ভাবে বর্তমান কমিটির ওপর চাপানোর চেষ্টা চলছে। পরিদর্শন ও নিরীক্ষা অধিদপ্তর (উওঅ) নিয়মনীতি লঙ্ঘন করে প্রতিবেদনটি সরাসরি মন্ত্রণালয়ে পাঠিয়েছে, আমাদের কোনো আত্মপক্ষ সমর্থনের বা জবাব দেওয়ার সুযোগ দেওয়া হয়নি। এই প্রতিবেদনের ৯০ শতাংশ তথ্যই ভুল ও বানোয়াট, আর বাকিগুলো বিদ্যালয়ের স্বাভাবিক দৈনন্দিন রুটিন কাজ।” তিনি এই মিথ্যা রিপোর্টের দায় এবং পূর্ববর্তী কমিটির দুর্নীতির বোঝা থেকে বর্তমান কমিটিকে মুক্ত করতে সরকারের সংশ্লিষ্ট মহলের দ্রুত হস্তক্ষেপ কামনা করেন।

একাডেমিক সাফল্যের চিত্র তুলে ধরে বক্তারা জানান, জিপিএ প্রাপ্তিতে এই বিদ্যালয়টি এখনো দেশে ১ থেকে ৩ নম্বরের মধ্যে রয়েছে। এবার পঞ্চম শ্রেণীর মোট ৩৮২টি বৃত্তির মধ্যে এই একটি প্রতিষ্ঠানই অর্জন করেছে ৩৫৮টি।

বক্তারা ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, চমৎকার প্রশাসনিক ও একাডেমিক রেকর্ড থাকা সত্ত্বেও কোনো যৌক্তিক কারণ ছাড়া প্রতিষ্ঠানের ৫টি ক্যাম্পাসে ৫ জন বিসিএস শিক্ষা ক্যাডার কর্মকর্তাকে বিশেষ দায়িত্বে পদায়ন করা হয়েছে। এর ফলে শিক্ষক-কর্মচারীদের মধ্যে চরম দ্বিধাদ্বন্দ্ব, সন্দেহ ও চেইন অব কমান্ডে জটিলতা সৃষ্টি হয়েছে। অভিযোগ করে বলা হয়, দায়িত্বে থাকা বিসিএস ক্যাডার কর্মকর্তারা মূল প্রতিষ্ঠানের উন্নয়নে ভূমিকা না রেখে, ব্যক্তিস্বার্থে প্রতিষ্ঠানটিকে ভেঙে ৫টি আলাদা স্বতন্ত্র প্রতিষ্ঠান গড়ে নিজেরা প্রতিষ্ঠান প্রধান হওয়ার পাঁয়তারা করছেন। সভাপতি এই ষড়যন্ত্র রুখে দিয়ে প্রতিষ্ঠানের ঐতিহ্য ও অখণ্ডতা বজায় রাখার জন্য সরকারের দৃষ্টি আকর্ষণ করেন।

অনুষ্ঠানের শুরুতে পবিত্র কুরআন থেকে তিলাওয়াত করেন সহকারী প্রধান শিক্ষক মাওলানা নুরুল আলম। অতিথিবৃন্দকে স্বাগত জানিয়ে অভ্যর্থনা সঙ্গীত পরিবেশন করে অদ্বৈত ও তার দল। বিশেষ কমিটির সদস্য সচিব ও প্রধান শিক্ষক মোঃ সিরাজুল ইসলামসহ সহকারী প্রধান শিক্ষক ও শিক্ষক প্রতিনিধিবৃন্দ অতিথিদের পুষ্পস্তবক দিয়ে বরণ করে নেন। কর্মশালায় শিক্ষকের পেশাগত দায়িত্ব ও সৃজনশীলতা নিয়ে প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন সহকারী প্রধান শিক্ষক মোস্তাফিজুর রহমান ও সিনিয়র সহকারী শিক্ষক মামুন  হোসেন।

এজেএ