করেরহাট বিট কাম চেকস্টেশনে প্রকাশ্য চাঁদাবাজি ও গাছ পাচারের মহোৎসব: অদৃশ্য কারণে ডিএফও ও এসিএফ-এর নীরবতা পালন

চট্টগ্রাম উত্তর বন বিভাগের অধীন করেরহাট বিট কাম চেক স্টেশন কর্মকর্তা মো: আলাল উদ্দিনের বিরুদ্ধে প্রকাশ্য চাঁদাবাজি, বনের জায়গা বিক্রি এবং সংরক্ষিত বনাঞ্চলের নির্বিচারে গাছ পাচারের মারাত্মক অভিযোগ উঠেছে। বনজ সম্পদ পরিবহনে তদারকি ও অবৈধ কাঠ পাচার রোধে স্টেশনটির গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখার কথা থাকলেও এটি দীর্ঘদিন ধরে ‘ঘুষের টোল প্লাজা’ এবং গাছ পাচারের নিরাপদ রুটে পরিণত হয়েছে। ঢাকা-চট্টগ্রাম রোডের বারৈয়ারহাট হয়ে খাগড়াছড়ি যাওয়ার নয়নাভিরাম বনসমৃদ্ধ পথটি করেরহাট রেঞ্জের অধীন করেরহাট বিট কাম চেক স্টেশন এলাকার অন্তর্গত। বর্তমানে এই করেরহাট বিটের কর্মকর্তার দায়িত্বে আছেন আলাউদ্দিন। তিনি কোনো স্টেশন সহযোগী না নিয়ে একাই দ্বৈত দায়িত্ব পালন করছেন বলে জানা যায়। তার এই দ্বৈত ক্ষমতার অপব্যবহারে পুরো করেরহাট বন এখন ধ্বংসের মুখে। স্থানীয়দের মতে, আলাউদ্দিন আর কয়েক মাস এখানে থাকলে করেরহাট রেঞ্জের সংরক্ষিত বনের অবশিষ্ট মূল্যবান গাছগুলিও বিক্রি হয়ে যাবে।
অনুসন্ধানে জানা যায়, এই স্টেশনটিতে স্টেশন কর্মকর্তা হতে হলে ৮ হতে ১০ লক্ষ টাকা ডিএফও ও বিভাগীয় দপ্তরে থাকা কেরানীকে উৎকোচ দিতে হয়। মোটা অঙ্কের ঘুষ দিয়ে এই লোভনীয় চেয়ার বাগিয়ে নেন ডেপুটি রেঞ্জার মো: আলাল উদ্দিন। একই সাথে অতিরিক্ত ২ লক্ষ টাকার বিনিময়ে স্টেশন সহযোগীর পদটিও বাগিয়ে নেন এই কর্মকর্তা। পরিবেশ সচেতন মহলের মতে, উচ্চ পর্যায়ের কর্মকর্তাদের সাথে বিশাল অঙ্কের আর্থিক লেনদেন করে পোস্টিং নেওয়ায়, সেই টাকা সুদে-আসলে তুলতে এখানে ঘুষ ও চাঁদাবাজিকে নিয়মে পরিণত করা হয়েছে। কোটি কোটি টাকার সংরক্ষিত বনের কাঠ কেটে অবৈধ ব্যবসায়ীদের সাথে যোগসাজশে পাচারের ফন্দি এঁটেছেন আলাউদ্দিন। সরকারি বনের কাঠ কাটিয়ে প্রতি ঘনফুট হিসেবে ২ থেকে ৩ হাজার টাকা নিয়ে তিনি প্রতিনিয়ত লক্ষ লক্ষ টাকা ইনকাম করছেন। বনের একটু ভেতরে ঢুকলেই এখন দেখা যায় বৃক্ষহীন উলঙ্গ পাহাড়।
শুধু বনের গাছ কেটেই ক্ষান্ত নন আলাউদ্দিন, খাগড়াছড়ি টু ঢাকা রুটে প্রতিদিন খাগড়াছড়ি থেকে ফেনী, কুমিল্লা ও ঢাকায় আসা ২০ থেকে ২৫টি কাঠবোঝাই ট্রাক থেকে তিনি প্রকারভেদে পরীক্ষার নামে ৫ থেকে ৭ হাজার টাকা করে আদায় করছেন। নিয়ম অনুযায়ী এসব ট্রাকে থাকা কাঠের জাত, মাপ, পরিমাপ, মালিকানা হাতুড়ির সঠিকতা পরীক্ষা করার কথা থাকলেও, নির্ধারিত টাকার বিনিময়ে কোনোপ্রকার যাচাই ছাড়াই জাল হাতুড়ির চিহ্নযুক্ত এবং অবৈধভাবে আসা কাঠের গাড়িগুলো ছেড়ে দেওয়া হচ্ছে। এছাড়া ট্রানজিট পাস (টিপি) থাকার পরও প্রতিটি বৈধ পরিবহনকে বাধ্যতামূলকভাবে ৪ হতে ৫ হাজার টাকা ঘুষ দিতে হয়। আর টিপি ছাড়া সম্পূর্ণ অবৈধভাবে আসা (ওটি) প্রতিটি ট্রাক থেকে প্রতি রাতে ১০ থেকে ১৫ হাজার (কোনো কোনো ক্ষেত্রে ৬-১০ হাজার) টাকা নিয়ে করেরহাট চেক স্টেশন পার করে দেওয়া হয়। খাগড়াছড়ি, দিঘীনালা, পানছড়ি, মাটিরাঙ্গা, মানিকছড়ি ও ফটিকছড়ি থেকে আসা কাঠ পাচার রোধে এই চেক স্টেশনটি প্রতিষ্ঠিত হলেও বর্তমানে এখানে ঘটছে ঠিক তার উল্টোটা। টাকা না দিলে মালামাল জব্দ ও মামলার হুমকি দিয়ে ঘণ্টার পর ঘণ্টা গাড়ি আটকে রাখা হয় বলে অভিযোগ করেছেন কাঠ ব্যবসায়ী লোকমান হোসেন ও জাহাঙ্গীর আলম।
আলাল উদ্দিনের এই দুর্নীতি ও লালসার থাবা থেকে রক্ষা পায়নি বনের জমিও। করেরহাট বিট এলাকার আশেপাশে বন বিভাগের সংরক্ষিত বনাঞ্চলের জায়গায় আলালের প্রত্যক্ষ তৎপরতায় গড়ে উঠেছে বালু মহল, অবৈধ স-মিল এবং অবৈধভাবে বসতবাড়ি নির্মাণ। এর বিনিময়ে বালু মহলের বালু উত্তোলনের জন্য প্রতি ট্রাক বালু বাবদ ৫ হাজার টাকা এবং স্টেশন অতিবাহিত করার জন্য ট্রাক প্রতি ৩০০ হতে ৫০০ টাকা পর্যন্ত দিতে হয়। এছাড়া সংরক্ষিত বনের জায়গায় ঘরবাড়ি নির্মাণে জায়গার পরিমাপ অনুযায়ী ৫০ হাজার হতে ২ লক্ষ টাকা এবং অবৈধভাবে নতুন স-মিল বসানোর জন্য এককালীন ৫০ হাজার টাকা ঘুষ নিতে হয়। পাশাপাশি প্রতি মাসে স-মিল সচল রাখার বিনিময়ে ৫ হাজার টাকা পর্যন্ত মাসোহারা আদায় করেন এই বিট কাম চেক স্টেশন কর্মকর্তা। আসবাবপত্র পরিবহনের জন্য নেওয়া হয় আইটেম প্রতি ৪০০ টাকা। এমনকি সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বৈধ অনুমতিপত্র থাকা সত্ত্বেও দিতে হয় আইটেম প্রতি টাকা। একজন ভুক্তভোগী পুলিশ সদস্য ক্ষোভ প্রকাশ করে জানান, বদলিজনিত কারণে তার ব্যবহৃত ৭ আইটেম আসবাবপত্র পরিবহনের জন্য জেলা প্রশাসকের বৈধ অনুমতিপত্র থাকা সত্ত্বেও করেরহাট স্টেশনে ছাড়পত্র নিতে তাকে ৪ হাজার টাকা দিতে হয়েছে। এছাড়া কুরিয়ার সার্ভিসে আসা ফার্নিচারের গাড়ি থেকেও আইটেম প্রতি টাকা আদায় করা হয় এই স্টেশনে। করেরহাট রেঞ্জের অধীন অন্দারমানিক বিট, কয়লা ও হিয়াকো বিটের গাছসমূহও এখন আলাউদ্দিনের কারণে সম্পূর্ণ অনিরাপদ হয়ে পড়েছে।
অনুসন্ধানে আরও জানা যায়, করেরহাট স্টেশন থেকে উত্তোলিত এই বিপুল পরিমাণ ঘুষের টাকা প্রতি মাসে সুনির্দিষ্ট হারে বন বিভাগের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের পকেটে পৌঁছে যায়। সিএফ থেকে শুরু করে এসিএফ, রেঞ্জ কর্মকর্তা এমনকি বিভাগীয় দপ্তরের স্টাফদেরকেও নিয়মিত মাসোহারা দিতে হয়। ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে এভাবে ম্যানেজ করার কারণেই আলাউদ্দিন কোনো কিছুকেই তোয়াক্কা করেন না।
এ ব্যাপারে করেরহাট বিট ও চেক স্টেশন কর্মকর্তা মো: আলাল উদ্দিন দাবি করেন, তিনি ঘুষ লেনদেনের সঙ্গে জড়িত নন এবং ঘুষ দিয়ে পোস্টিং নেননি। অন্যদিকে, চট্টগ্রাম উত্তর বন বিভাগের সহকারী বন সংরক্ষক (এসিএফ) মো: মাহদী হাসান বলেন, ‘অভিযোগ প্রমাণিত হলে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য ঊর্ধ্বতন মহলে রিপোর্ট করা হবে।’ তবে বর্তমানে দায়িত্বে থাকা চট্টগ্রাম উত্তর বন বিভাগের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা (ডিএফও) মোহাম্মদ হোছাইনের সাথে মোবাইলে যোগাযোগ করা সম্ভব হয় নাই।
