৮০ কিমি দূরের রেঞ্জ ফেলে সদরে আস্তানা
সচিবের ‘আত্মীয়’ জলিলুরের পোস্টিং বাণিজ্যে ও দুর্নীতির তেলেসমাতি নিরবতার দায়িত্বে কর্তৃপক্ষ

পার্বত্য জেলা বান্দরবানের প্রাকৃতিক বনাঞ্চল ও বন্যপ্রাণী নিধনের নেপথ্যে যে কজন দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তা নিয়ামক হিসেবে কাজ করছেন, তাদের মধ্যে অন্যতম শীর্ষ তালিকায় রয়েছেন ফরেস্টার এইচ.এম. জলিলুর রহমান। বান্দরবান বন বিভাগের সদর রেঞ্জে গত দুই বছর যাবত সহযোগী রেঞ্জ কর্মকর্তার অতিরিক্ত লোভনীয় দায়িত্ব পালন করছেন তিনি। বন বিভাগের প্রচলিত নিয়ম অনুযায়ী প্রতি রেঞ্জে পদায়নের মেয়াদ সর্বোচ্চ এক বছর নির্ধারণ করা থাকলেও, জলিলুর রহমান ক্ষমতার সব নিয়মকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে চলছেন।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, মন্ত্রণালয়ের এক সচিবের আত্মীয় পরিচয় এবং বিভাগীয় বন কর্মকর্তা (ডিএফও) ও সহকারী বন সংরক্ষক (এসিএফ)-কে মোটা অঙ্কের নগদ টাকা ও নিয়মিত মাসোহারা প্রদানের মাধ্যমে তদবির করে তিনি এই ‘প্রাইজ পোস্টিং’ নিজের কব্জায় ধরে রেখেছেন। তার মূল কাজ হয়ে দাঁড়িয়েছে বৈধ ট্রানজিট পাসের (টিপি) আড়ালে অমিল কাঠের ট্রাকে অতিরিক্ত ও অবৈধ কাঠ বোঝাই করা। টিপিতে উল্লিখিত পরিমাপের বাইরে চম্পা, বৈলাম, গোদা, গুটগুটিয়ার মতো সরকারের কর্তন নিষিদ্ধ ও অত্যন্ত মূল্যবান বন্য কাঠ ট্রাকে ঢুকিয়ে পাচারে সরাসরি সহযোগিতা করছেন তিনি, যার অবৈধ লভ্যাংশের একটি বড় অংশ নিয়মিত ডিএফও ও এসিএফ-এর পকেটে পৌঁছায়।
শুধু তাই নয়, কাগজের হিসাবের সাথে মাঠের কাঠের গরমিল লুকাতে তিনি ভুয়া ‘ডি-ফরম’ দেখিয়ে নতুন করে টিপি ইস্যু করেন, যার ফলে টিপি, ডি-ফরম এবং ট্রাকে থাকা কাঠের পরিমাপের মধ্যে কোনো বাস্তব মিল থাকে না। বান্দরবান ও পাল্পউড ডিভিশনে আগে থেকেই ভুয়া টিপির যে চক্র সক্রিয় ছিল, জলিলের মতো দুর্নীতিবাজ বনকর্মীদের কারণে তা এখন আরও বেপরোয়া রূপ নিয়েছে। আশ্চর্যের বিষয় হলো, এসব সুনির্দিষ্ট অপরাধ হাতেনাতে ধরা পড়ার পরও বিভাগীয় কর্তৃপক্ষ তার বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক কোনো ব্যবস্থা না নিয়ে, উল্টো অবৈধ সুবিধা পেয়ে তাকে আরও বেশি পরিমাণে কাঠের গাড়ি লোডিংয়ের লাভজনক দায়িত্বে পদায়ন করে পুরস্কৃত করছে।
জলিলুর রহমানের অতীত কর্মজীবন পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, তিনি মূলত একজন পেশাদার বন ধ্বংসকারী ও মুখোশধারী কর্মকর্তা। এর আগে কক্সবাজার দক্ষিণ বন বিভাগে পোস্টিং থাকাকালীন সরাসরি গাছ পাচারের সাথে সম্পৃক্ততা প্রমাণিত হওয়ায় তাকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছিল। কিন্তু সেবারও তিনি তার সচিব আত্মীয়ের প্রভাব খাটিয়ে চাকরিতে পুনর্বহাল হন এবং তদবিরের জোরে লামা বন বিভাগে পদায়ন বাগিয়ে নেন। লামা বন বিভাগেও তিনি সংরক্ষিত বনাঞ্চলের সরকারি গাছ পাচার এবং মূল্যবান বনভূমি জবরদখলের সাথে জড়িয়ে পড়লে পরিস্থিতি বেগতিক দেখে তাকে চট্টগ্রামে উপকূলীয় বন বিভাগে অকাল বদলি করা হয়।
চট্টগ্রাম উপকূলীয় বন বিভাগে যোগ দিয়েও জলিলুর রহমান তার পুরনো স্বভাব বদলাননি; সেখানে ম্যানগ্রোভ বনাঞ্চল কেটে গাছ পাচার, বনভূমি জবরদখল করে চিংড়ি ও লবণের ঘের তৈরি করার মতো গুরুতর অপরাধে লিপ্ত হন। অবৈধ কাঠ ব্যবসায়ী এবং প্রভাবশালী ভূমিদস্যুদের সাথে শক্তিশালী সিন্ডিকেট গড়ে তুলে বিপুল অর্থ উপার্জনের অভিযোগ প্রমাণিত হওয়ায় একপর্যায়ে তিনি চাকরিচ্যুত হন। কিন্তু পূর্বের ধারাবাহিকতায় অদৃশ্য ক্ষমতার জোরে তিনি আবারও চাকরিতে বহাল হতে সক্ষম হন। দুর্নীতির দীর্ঘ ফিরিস্তি ও একাধিক বিভাগীয় মামলার কারণে চাকরিতে প্রায় দুই যুগ পার হয়ে গেলেও আজ পর্যন্ত তার কোনো পদোন্নতি হয়নি। তবে পদোন্নতির চেয়ে অবৈধ অর্থ উপার্জনই তার কাছে মূল লক্ষ্য হওয়ায় তিনি আজীবন এই ফরেস্টার পদেই বহাল থেকে মাঠ পর্যায়ে লুটপাট চালাতে বেশি স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করেন।
বর্তমানে জলিলুর রহমান কাগজে-কলমে বান্দরবান জেলা সদর থেকে প্রায় ৮০ কিলোমিটার দূরে থানচি উপজেলায় অবস্থিত দুর্গম এলাকার ‘সেকদু রেঞ্জ’-এর রেঞ্জ কর্মকর্তার দায়িত্বে আছেন। সদর থেকে এত দূরত্ব হওয়া সত্ত্বেও ডিএফও ও এসিএফ মোটা অঙ্কের আর্থিক সুবিধা নিয়ে তাকে দুই বছর ধরে সদরের সহযোগী হিসেবে অতিরিক্ত দায়িত্ব দিয়ে রেখেছেন। সেকদু রেঞ্জে সরকারি বাসভবন ও থাকার সুব্যবস্থা থাকা সত্ত্বেও তিনি মাসে একবারের জন্যও সেখানে যান না। বান্দরবান জেলা সদরে বিলাসবহুল জীবনযাপন করে শহরের আরামদায়ক কক্ষে বসেই তিনি দুর্গম সেকদু রেঞ্জের জোট পারমিটের যাবতীয় ফাইল ও আর্থিক লেনদেন নিয়ন্ত্রণ করেন।
শহরে বসেই তিনি তার রেঞ্জের সংরক্ষিত বনাঞ্চল ও পাহাড়ি পাড়া বন থেকে মূল্যবান কাঠ পাচারের নিরাপদ লাইন মেইনটেইন করছেন। বিশেষ করে ঐতিহ্যবাহী সাঙ্গু রিজার্ভ ফরেস্ট থেকে অবাধে অবৈধ কাঠ পাচারে তিনি কাঠ ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে গাড়িপ্রতি মোটা অঙ্কের টাকা নিচ্ছেন এবং সেই আয়ের ভাগ ওপর মহলে পৌঁছানোর কারণে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ সম্পূর্ণ নীরব ভূমিকা পালন করছে। সদর রেঞ্জের সহযোগী পদের দাপট দেখিয়ে তিনি টিপির প্রতিটি গাড়ি থেকে বাধ্যতামূলক ৩ হাজার টাকা এবং টিপির আড়ালে অবৈধ কাঠ বহনের বিশেষ সুবিধা দেওয়ার নামে প্রতি গাড়ি থেকে ৫ হাজার টাকা করে সরাসরি চাঁদা আদায় করেন। এমনকি স্থানীয় ফার্নিচার ব্যবসায়ীদের বৈধ ফার্নিচার পরিবহনের টিপি পাওয়ার জন্যও জলিলুর রহমানকে নির্দিষ্ট হারে মাসোহারা দিতে হয়, অন্যথায় ফাইল আটকে রেখে ব্যবসায়ীদের চরম হয়রানি করা হয়।
আর্থিক লোভের বশবর্তী হয়ে জলিলুর রহমান শুধু বনের কাঠই উজাড় করছেন না, বরং পার্বত্য অঞ্চলের বিপন্ন বন্যপ্রাণী পাচার চক্রের সাথেও তার প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ সম্পৃক্ততা রয়েছে। দুই মাস আগে হরিণের মাংসসহ পাচারকারী চক্রের সদস্যদের হাতেনাতে আটক করা হলেও, পর্দার আড়ালে মোটা অঙ্কের টাকা ঘুষ নিয়ে তিনি মূল হোতাদের ছেড়ে দেন। এই ঘটনাটি নিয়ে সে সময় স্থানীয় ও জাতীয় গণমাধ্যমে সচিত্র সংবাদ প্রকাশিত হলেও অদৃশ্য খুঁটির জোরে ফরেস্টার এইচ.এম. জলিলুর রহমান বরাবরের মতোই ধরাছোঁয়ার বাইরে থেকে যান।
অনুসন্ধানে আরও জানা গেছে, আত্মীয়তার এই প্রভাব খাটানোর ইতিহাস তার চাকুরিজীবনের শুরু থেকেই; নিয়ম অনুযায়ী এক বছরের পোস্টিংয়ের বাধ্যবাধকতা থাকলেও চাকুরির শুরুতে তিনি তদবিরের জোরে ঢাকা সংলগ্ন সোনারগাঁও চেক স্টেশনে দুই বছরেরও বেশি সময় ধরে দায়িত্ব পালন করেছিলেন। মূলত সেই প্রথম পোস্টিং থেকেই তার অবৈধ উপার্জনের যাত্রা শুরু হয়, যা বর্তমানে বান্দরবান বন বিভাগকে গ্রাস করে এক বিশাল দুর্নীতির মহীরুহে পরিণত হয়েছে। রাষ্ট্রীয় বনাঞ্চল রক্ষা এবং বন্যপ্রাণী পাচার রোধে এই চরম দুর্নীতিবাজ ও ক্ষমতার অপব্যবহারকারী কর্মকর্তার বিরুদ্ধে দুর্নীতি দমন কমিশনসহ উচ্চপর্যায়ের আশু তদন্ত ও কঠোর আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করা জরুরি হয়ে পড়েছে।
