রক্ষকেরূপী ভক্ষকদের গ্রাসে বান্দরবানের সবুজ পাহাড়

ডিএফও ইউসুফ ও ফরেস্টার শফিকুলের যৌথ সিন্ডিকেটে উজাড় সরকারি বনাঞ্চল

বিশেষ প্রতিনিধি
বিশেষ প্রতিনিধি
প্রকাশিত: জুন ২১, ২০২৬ ১৬:৩২:৪৭  আপডেট :  জুন ২১, ২০২৬ ১৬:৩৩:২২

​পার্বত্য জেলা বান্দরবানের পাল্পউড প্লান্টেশন বন বিভাগ যেন এখন এক মূর্তমান দুর্নীতির চারণভূমি, যেখানে বিভাগীয় বন কর্মকর্তা (ডিএফও) মো: আবু ইউসুফ এবং রোয়াংছড়ি রেঞ্জের দায়িত্বে থাকা ফরেস্টার মোঃ শফিকুল আমিন পাটোয়ারীর ক্ষমতার অপব্যবহার আর অর্থের লালসায় বিপন্ন হয়ে পড়েছে সরকারি বনজ সম্পদ ও জীববৈচিত্র্য। এর আগে এসব অনিয়ম ও পরিবেশ বিধ্বংসী কর্মকাণ্ড নিয়ে গণমাধ্যমে একাধিক বস্তুনিষ্ঠ সংবাদ প্রকাশিত হলে উচ্চমহল ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ লোকদেখানো কিছু তদন্ত বা পদক্ষেপ নিলেও তা কেবলই দায়সারা গোছের আইওয়াশ ও ধামাচাপা দেওয়ার অপচেষ্টা প্রমাণিত হয়েছে, যার আড়ালে এখনো সমানে চলমান রয়েছে পাহাড় সমান অবৈধ সম্পদ গড়ার এক রমরমা প্রতিযোগিতা।

এই বন বিভাগে এক সময়ের বিচ্ছিন্ন অনিয়ম এখন ‘টেবিল জোত’ নামক এক ভয়ংকর প্রাতিষ্ঠানিক প্রথায় রূপ নিয়েছে, যার একক নিয়ন্ত্রক ডিএফও ইউসুফ এবং তার অত্যন্ত বিশ্বস্ত সহযোগী ফরেস্টার শফিকুল আমিন। জোত পারমিট নামক এই টেবিল খেলার মাধ্যমে ঘরে বসেই যে ভূয়া পারমিট বা জোত ইস্যু করা হয়, তা থেকে রেঞ্জ অফিসার শফিকুল কোনো প্রকার সরেজমিন তদন্ত ছাড়াই প্রতি ঘনফুট কাঠ বাবদ সরাসরি ৭০ থেকে ৮০ টাকা হারে হাতিয়ে নিচ্ছেন। আর এই কাগজ কলমের ভূয়া ফাইল রেঞ্জ থেকে সদর দপ্তরে পৌঁছানোর পর চূড়ান্ত অনুমতি ও টিপি (ট্রানজিট পারমিট) প্রদানের প্রতিটি ধাপে ডিএফও আবু ইউসুফের পকেটে যাচ্ছে প্রতি ঘনফুটে আরও ৩০ থেকে ৩৫ টাকা হারে বড় অঙ্কের উৎকোচ।

আরও নজিরবিহীন ও বিস্ময়কর বিষয় হলো, এই ডিভিশনে সহকারী বন সংরক্ষক (এসিএফ) এর গুরুত্বপূর্ণ পদটি দীর্ঘদিন ধরে শূন্য বা জনবলহীন থাকার সুবাদে এসিএফ-এর জোত ইস্যুতে যে আইনি ও নির্ধারিত ৭ টাকা ফি বা সুবিধা রয়েছে, তাও সম্পূর্ণ অবৈধ উপায়ে নিজের পকেটে পুড়ছেন ডিএফও আবু ইউসুফ নিজেই। এই নজিরবিহীন আর্থিক অনিয়ম, ক্ষমতার চরম কুক্ষিগতকরণ এবং বনের সম্পদ লোপাটের মূল চালিকাশক্তি হিসেবে কাজ করছে ফরেস্টার শফিকুল আমিনের মতো মাঠ পর্যায়ের দুর্নীতিপরায়ণ কর্মকর্তাদের সাথে ডিএফওর অবৈধ আর্থিক সুবিধা আদান-প্রদানের এই সুগভীর ও গোপন সমঝোতা।

​বন অধিদপ্তরের বিদ্যমান জ্যেষ্ঠতা, সততা ও বদলি নীতিমালাকে সম্পূর্ণ বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে এবং কেবলই মাসোহারা ও আর্থিক সুবিধার অলিখিত শর্তে রোয়াংছড়ি রেঞ্জে প্রায় দুই বছরেরও বেশি সময় ধরে অনেক দক্ষ ও সিনিয়র ডেপুটি রেঞ্জারকে পদ্ধতিগতভাবে টপকে ফরেস্টার শফিকুল আমিন পাটোয়ারীকে রেঞ্জ কর্মকর্তার মতো একটি গুরুত্বপূর্ণ পদে বলবৎ রাখা হয়েছে। এই নিয়ে ক্ষুব্ধ ও বঞ্চিত সিনিয়র ডেপুটি রেঞ্জারদের মনে তীব্র ক্ষোভ ও চরম প্রশাসনিক হতাশার সৃষ্টি হয়েছে। তাদের স্পষ্ট অভিযোগ, নিয়ম মেনে দক্ষ, সৎ ও জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তাদের রেঞ্জের দায়িত্বে না রেখে একজন সাধারণ ফরেস্টার দিয়ে পুরো রেঞ্জ পরিচালনা করার পেছনে ডিএফওদের ব্যক্তিগত আর্থিক লাভের অঙ্কটা অনেক বেশি থাকে, কারণ এমন অনুগত ও জুনিয়ার কর্মকর্তাদের ঢাল হিসেবে ব্যবহার করে অতি সহজেই যেকোনো অবৈধ পারমিট বাণিজ্য ও গাছ চুরির সিন্ডিকেট সফল করা যায়।

এই সর্বগ্রাসী লুটের প্রত্যক্ষ শিকার হয়েছে রোয়াংছড়ি রেঞ্জের অধীনে থাকা ৩৩৮ নং রোয়াংছড়ি মৌজা ও ৩৩৯ নং বেক্ষং মৌজা, যেখানে এক সময়ে দেশের বৃহত্তম কাগজ কল কর্ণফুলী পেপার মিলস (কেপিএম) লিমিটেড চন্দ্রঘোনাকে কাঁচামাল হিসেবে নরম কাঠ সরবরাহ করার জন্য সরকারের কোটি কোটি টাকা রাজস্ব ব্যয় করে সুনিপুণ ও বিশাল সামাজিক বাগান গড়ে তোলা হয়েছিল। অথচ বর্তমান রেঞ্জ কর্মকর্তা শফিকুল ও ডিএফও ইউসুফ সিন্ডিকেটের হাত ধরে শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত ঘরের টেবিলে বসে তৈরি করা ভূয়া জোত পারমিটের আড়ালে সেই দুর্লভ ও মূল্যবান সরকারি বনাঞ্চল আজ সম্পূর্ণ বিলীন হয়ে গেছে। বাস্তবে এই সব মৌজায় এখন আর সরকারি বনাঞ্চলের কোনো দৃশ্যমান অস্তিত্ব নেই বললেই চলে, ছায়া সুনিবিড় সবুজ পাহাড় আজ এই লোভী চক্রের কারণে পরিণত হয়েছে ধুধু ও রুক্ষ মরুভূমিতে, যার ফলে টেবিল জোতের আড়ালে সরকারি বনভূমির সীমানা ও পরিবেশ আজ চরম অসহায়ত্বের মুখোমুখি দাঁড়িয়েছে।

​বিভাগীয় বন কর্মকর্তার এই আত্মকেন্দ্রিক, পরিবেশ-বিধ্বংসী ও চরম দুর্নীতিপরায়ণ নীতির ফলে পার্বত্য অঞ্চলের বনাঞ্চলের নিরাপত্তা, প্রাকৃতিক ভারসাম্য ও বন্যপ্রাণীর আবাসস্থল এখন চরম হুমকির মুখে পড়েছে। মাঠ পর্যায়কে সম্পূর্ণ অরক্ষিত ও জনবলহীন ফাঁকা রেখে দক্ষ কর্মচারীদের কৌশলে সদর দপ্তরে স্তূপ করে রাখার সুকৌশলী অপপ্রয়াসের সুযোগ লুফে নিচ্ছে অবৈধ জোত ব্যবসায়ী ও কাঠ মাফিয়ারা, যারা সরকারি বনের সংরক্ষিত এলাকা উজাড় করে শতবর্ষী ও মূল্যবান গাছ কেটে দেদারসে পাচার করছে নির্বিঘ্নে। পরিবেশবাদীরা ও স্থানীয় সচেতন মহল গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করে বলছেন, বন অধিদপ্তরের ইতিহাসে সরকারি সম্পদ ধ্বংসের এমন আত্মঘাতী ও নীতিবহির্ভূত কর্মকাণ্ড সত্যিই বিরল, যা মূলত বনের গাছ কেটে পাচারের পথকে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার অপব্যবহার করে প্রশস্ত করে দেওয়ার একটি পরিকল্পিত প্রাতিষ্ঠানিক রূপ।

ডিএফও ইউসুফ এবং ফরেস্টার শফিকুল আমিনের এই বিতর্কিত যৌথ পারমিট বাণিজ্য ও প্রশাসনিক অরাজকতা পাল্পউড প্লান্টেশন বিভাগের পুরো চেইন অব কমান্ড বা প্রশাসনিক শৃঙ্খলাকে সম্পূর্ণ ভেঙে গুঁড়িয়ে দিয়েছে, যেখানে সততা ও দেশপ্রেমের চেয়ে কেবল অবৈধ টাকার জোর আর মাসোহারার ভিত্তিতেই নির্ধারিত হচ্ছে বান্দরবান বনের ভাগ্য। বনাঞ্চল রক্ষা, জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকি মোকাবেলা এবং প্রশাসনিক চেইন অব কমান্ড ফিরিয়ে আনতে এই দুর্নীতির মূল হোতাদের বিরুদ্ধে অবিলম্বে বিভাগীয় ব্যবস্থা ও কঠোর আইনি পদক্ষেপ গ্রহণসহ তাদের জ্ঞাত আয়বহির্ভূত পাহাড় সমতুল্য অবৈধ সম্পদের উৎস খতিয়ে দেখতে দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) হস্তক্ষেপ এখন সময়ের দাবি।

বনাঞ্চল ধ্বংস ও কোটি কোটি টাকার এই প্রকাশ্য আর্থিক কেলেঙ্কারির বিষয়ে বক্তব্য জানতে ও সুনির্দিষ্ট অভিযোগের বিষয়ে প্রতিক্রিয়া নিতে বিভাগীয় বন কর্মকর্তা মো: আবু ইউসুফ এবং রোয়াংছড়ি রেঞ্জ কর্মকর্তা শফিকুল আমিন পাটোয়ারী উভয়ের সাথেই একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তারা রহস্যজনকভাবে সাড়া দেননি এবং কোনো প্রকার মন্তব্য করা থেকে সম্পূর্ণ বিরত থেকেছেন।