শহরে বসে এসিএফ আবরারের মাসোহারা গ্রহণ: নারায়ণহাটে আনিচুর-পিংকি কুমার সিন্ডিকেটের কবলে উজাড় হচ্ছে বন, পাহাড় ও বন্যপ্রাণী

চট্টগ্রাম উত্তর বনবিভাগের নারায়ণহাট ফরেস্ট রেঞ্জের অধীনে থাকা একসময়ের সমৃদ্ধ বনভূমি এখন বিরান ভূমিতে পরিণত হওয়ার পথে। আর এই ভয়াবহ ধ্বংসযজ্ঞের মূলে রয়েছেন খোদ রেঞ্জ সহযোগী এস এম আনিচুর রহমান এবং বালুখালী বিটের বিট কর্মকর্তা ও ডেপুটি রেঞ্জার পিংকি কুমার ধর (নবীন)।
মীরসরাই হতে নারায়ণহাট যাওয়ার যে নয়নাভিরাম বন সমৃদ্ধ পথটি পর্যটকদের মন জুড়িয়ে দিত, সেই বনের গহীনে এখন কেবলই বৃক্ষহীন ‘উলঙ্গ’ পাহাড়ের হাহাকার। স্থানীয়দের দাবি অনুযায়ী, এই রেঞ্জের বর্তমানে মোট বনভূমির প্রায় ৬০ শতাংশ এলাকা জবরদখল হয়ে গেছে।
এলাকাবাসী আরও অভিযোগ করেন যে, বনবিভাগের এই কর্মকর্তাদের টাকা দিলেই বনের সংরক্ষিত জমিতে অনায়াসেই ঘরবাড়ি নির্মাণ করা যায়। অভিযোগ উঠেছে, আসন্ন কোরবানি ঈদকে সামনে রেখে কোটি টাকার কাঠ পাচারের এক মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়ন করছে এই অসাধু চক্র। তারা রেঞ্জ ও বিটের প্রশাসনিক ক্ষমতাকে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করে বনজ সম্পদ উজাড়ের নেশায় মেতে উঠেছেন।
স্থানীয় সূত্র ও খোদ বনবিভাগের এক কর্মীর ভাষ্যমতে, সরকারি বনের মূল্যবান গাছ অবৈধ কাঠ ব্যবসায়ীদের সাথে যোগসাজশে কেটে সাবাড় করা হচ্ছে। প্রতি ঘনফুট কাঠ পাচারের বিনিময়ে ২ থেকে ৩ হাজার টাকা পকেটে ভরছেন আনিচুর ও নবীন কুমার। শুধু কাঠ পাচারই নয়, তারা নিয়মিত মোটা অংকের টাকার বিনিময়ে সরকারি বনভূমি বিক্রি করে দিচ্ছেন এবং সংরক্ষিত বনাঞ্চল থেকে অবৈধভাবে বালু উত্তোলন ও পাহাড় কাটার মতো চরম ধ্বংসাত্মক কাজে লিপ্ত হয়েছেন। উত্তোলিত সেই বালু অবৈধভাবে মীরসরাই বালুখালী-গোবানিয়া রোড দিয়ে প্রতিদিন ট্রাকে ট্রাকে বিভিন্ন স্থানে পরিবাহিত হচ্ছে।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, ৪১তম বিসিএস-এর কর্মকর্তা সহকারী বন সংরক্ষক (এসিএফ) খান মো: আবরারুর রহমান বর্তমানে চট্টগ্রাম উত্তর বন বিভাগের সদর ও নারায়ণহাট এর সহকারী বন সংরক্ষক হিসাবে অতিরিক্ত দায়িত্বে রয়েছেন। কিন্তু দায়িত্ব পালনে তার চরম অবহেলা, অদক্ষতা ও দায়িত্বহীনতা লক্ষ্য করা গেছে। তিনি সবসময় চট্টগ্রাম শহরে অবস্থান করে অফিস করেন এবং রহস্যজনক কারণে দুর্গম ফিল্ড পরিদর্শনে আসেন না বললেই চলে। তার এই অনুপস্থিতির সুযোগ নিয়ে রেঞ্জ সহযোগী আনিচুর রহমান ও পিংকি কুমার পুরো রেঞ্জের নিয়ন্ত্রণ কুক্ষিগত করে ফেলেছেন। অভিযোগ রয়েছে, এসিএফ আবরারুর রহমান ধরাছোঁয়ার বাইরে থেকে মূলত এই সিন্ডিকেটকেই সব ধরনের অনৈতিক সুবিধা দিচ্ছেন। তিনি নিয়মিত আনিছুরের কাছ থেকে মাসোহারা গ্রহণ করেন এবং আনিছুরের পরামর্শ বা ইশারা ছাড়া কার্যত রেঞ্জে কোনো পদক্ষেপ নেন না। এসিএফ-এর এই নির্লিপ্ততার সুযোগে বালুখালী বিট বর্তমানে কাঠ পাচারের প্রধান করিডোরে পরিণত হয়েছে। প্রতিদিন ১০ থেকে ১৫টি কাঠবোঝাই ট্রাক বালুখালী হয়ে গোবানিয়া বিটের ওপর দিয়ে মীরসরাই হয়ে ঢাকা ও দেশের বিভিন্ন শহরে পাচার হচ্ছে। এসব ট্রাক থেকে গাড়িপ্রতি ৫ হাজার হতে ১০ হাজার টাকা পর্যন্ত চাঁদা আদায় করছে এই সিন্ডিকেট।
অনুসন্ধানে আরও চাঞ্চল্যকর তথ্য বেরিয়ে এসেছে যে, নারায়ণহাট রেঞ্জের অধীনে থাকা বালুখালী, দাঁতমারা, নারায়ণহাট ও ধূরুং বিটে প্রতিনিয়ত বনভূমি উজাড় করে টাকার বিনিময়ে লেবু, কলা, আনারস, পেঁপে সহ বিভিন্ন সবজি চাষের জন্য জায়গা বরাদ্দ দেওয়া হচ্ছে। এই সকল অবৈধ সবজি বাগান থেকে নিয়মিত মাসোহারা হিসেবে বড় অংকের চাঁদা আদায় করা হয়।
অন্যদিকে, রেঞ্জ সহযোগী আনিচুর রহমান এসিএফ আবরারুর রহমানকে কোনো জোতভূমি পরিদর্শনে যেতে না দিয়ে নিজেও ঘরে বসে থাকেন। তারা যৌথভাবে মোটা অংকের অর্থের বিনিময়ে জোত পারমিট এর খাড়া মার্কা ও পাশ মার্কার ভুয়া ও অবৈধ কাগজ তৈরি করে থাকেন। এসব অপকর্মের লভ্যাংশের টাকা সরাসরি এসিএফ আবরারুর এর পকেটে পৌঁছায় বলে জানা গেছে, যার কারণে তিনি রেঞ্জের স্পর্শকাতর দায়িত্বে থেকেও সবকিছু আনিছুরের হাতে ছেড়ে দিয়ে নিশ্চিন্তে শহরে সময় কাটান।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন বনকর্মী জানিয়েছেন, তারা অত্যন্ত দাপটের সাথে এই অপকর্ম চালিয়ে যাচ্ছেন কারণ সংগৃহীত অর্থের একটি বড় অংশ নিয়মিত ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের কাছে পৌঁছে দেওয়া হয়। ফলে তারা কেবল বালুখালীই নয়, বরং নারায়ণহাট ও ধূরুং বিটের বনজ সম্পদ ও বন্যপ্রাণীর জন্যও এখন মূর্তিমান আতঙ্ক। এসিএফ আবরারুর রহমানের অদক্ষতা ও এই অসাধু কর্মকর্তাদের লুটপাটের মহোৎসব অবিলম্বে বন্ধ না হলে চট্টগ্রামের ‘ফুসফুস’ খ্যাত এই বিশাল বনভূমি ও বন্যপ্রাণীর অস্তিত্ব চিরতরে মানচিত্র থেকে হারিয়ে যাওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।
