মুখে দেশ সংস্কারের বুলি

মননে বঙ্গবন্ধুর আদর্শ গণপূর্তের প্রধানসহ ১৬ প্রকৌশলীর

আশরাফুল ইমন ও এস এম সাইফ আলী
আশরাফুল ইমন ও এস এম সাইফ আলী
প্রকাশিত: নভেম্বর ১০, ২০২৪ ১৭:৫৭:০৪

ছাত্র-জনতাকে নির্মমভাবে গুলি করে হত্যা করতে যারা পতিত আওয়ামী লীগ, যুবলীগ ও ছাত্রলীগকে অর্থ জোগান দিয়ে সহায়তা করেছিল তারাই এখন ভোল পাল্টে রাষ্ট্র সংস্কারের কান্ডারি হয়েছেন বলে অভিযোগ উঠেছে। গণপূর্ত অধিদপ্তরের প্রধান প্রকৌশলীসহ ১৫ জন প্রকৌশলী ও জাতীর গৃহায়ন কর্তৃপক্ষের ১ জন প্রকৌশলীর নামে ঢাকা ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে একটি হত্যা মামলা দায়ের করা হয়েছে। গণপূর্ত অধিদপ্তরের প্রধান প্রকৌশলীর কার্যালয় এই মামলা থেকে নিজেদের নাম প্রত্যাহার করার তদবির চালিয়ে যাচ্ছে বলেও অভিযোগ উঠেছে।

কে.এম শাহরিয়ার শুভ বাদী হয়ে ঢাকা মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে গত ৩১ অক্টোবর এই হত্যা মামলা দায়ের করার আবেদন করেন। মামলার ফিরিস্তিতে বিস্তারিতভাবে সরকারি এই ১৬ জন কর্মকর্তার রাজনৈতিক পরিচয় তুলে ধরা হয়েছে। তারা প্রত্যেকেই পতিত আওয়ামী লীগ সরকারের খুবই আস্থাভাজন, ঘনিষ্ট লোক ছিলেন বলে মামলার এজহারে উল্লেখ করা হয়েছে। বিশেষ করে সাবেক গণপূর্ত ও গৃহায়ন মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী আ. ম. উবায়দুল মোক্তাদির চৌধুরী ও প্রতিমন্ত্রী শরীফ আহ্‌মেদের নির্দেশেই প্রকৌশলীরা ছাত্র-জনতাকে হত্যা করতে অর্থের জোগান দিয়েছিলেন।

গণপূর্ত অধিদপ্তরের প্রধান প্রকৌশলী মোহাম্মদ শামীম আখতার নিজেকে পীর হিসেবে গণপূর্ত অধিদপ্তরে প্রতিষ্ঠা করেছেন। পীর ছাড়াও তিনি আওয়ামী পন্থী আই বি বঙ্গবন্ধু প্রকৌশল পরিষদের নির্বাচিত সদস্য। দলীয় ক্ষমতার বলে তিনি নিজের গদি বাচিয়ে রাখা থেকে শুরু করে বিভিন্ন দুর্নীতি ও অনিয়ম করেছেন। গণপূর্ত সংশ্লিষ্টরা জানান, শামীম আখতার আওয়ামী সরকারের পতনের পর অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রধান উপদেষ্টার কাছে তদবির করে এখনো গণপূর্ত অধিদপ্তরের প্রধান প্রকৌশলীর পদ দখলে রেখেছেন। ছাত্র-জনতা হত্যা তিনিই সবচেয়ে বেশি অর্থ সহায়তা করেছেন বলেও অভিযোগ আছে। 

মোসলেহ উদ্দিন আহাম্মদ গণপূর্ত অধিদপ্তরে অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী। বর্তমানে প্রেষণে জাতীয় গৃহায়ন কর্তৃপক্ষের প্রকৌশল ও সমন্বয় উইং এর সদস্য হিসেবে আছেন। তার বিরুদ্ধেও দলীয় ক্ষমতা ব্যবহার করে দুর্নীতি ও অনিয়ম করে বিপুল টাকা আত্মসাতের অভিযোগ আছে। তিনি শামীম আখতারের পরে প্রধান প্রকৌশলী হওয়ার জন্য মরিয়া হয়ে উঠেছেন। কিন্তু তাদের দুজনের এই দ্বন্দ্ব দলীয় কার্যকালাপে কোনো প্রভাব ফেলেনি। মামলার ফিরিস্তি অনুযায়ী ছাত্র-জনতা হত্যা করতে বিপুল পরিমাণ অর্থ সহায়তা দিছিলেন তিনি। তিনি বঙ্গবন্ধু প্রকৌশলী পরিষদের সহ সভাপতি পদে আছেন।

গণপূর্ত অধিদপ্তরের ঢাকা জোনের অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী মো. শামসুদ্দোহা। ছাত্র-জনতা হত্যা করতে অর্থদানকারী এই কর্মকর্তা বঙ্গবন্ধু প্রকৌশলী পরিষদের সহ সভাপতি পদে আছেন।

মো. শহিদুল আলম গণপূর্ত অধিদপ্তরের এস্টাবলিশমেন্ট ও কোঅর্ডিনেশনের অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী পদে আছেন। বঙ্গবন্ধু প্রকৌশলী পরিষদের এই সহ সভাপতি ছাত্র-জনতাকে নির্মমভাবে হত্যা করতে আর্থিক সহযোগিতা করেছেন।

ছাত্র-জনতা হত্যায় অর্থ যোগানদাতা বঙ্গবন্ধু প্রকৌশলী পরিষদের আরেক সহ সভাপতি মো. আলমগীর হোসেন। গণপূর্ত অধিদপ্তরের ই/এম জোনের অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী তিনি।

মামলার ফিরিস্তি অনুযায়ী সতী নাথ বাসকও ছাত্র-জনতা হত্যা করতে আর্থিক সহায়তা দিয়েছিলেন। হত্যায় সহায়তাকারী এই কর্মকর্তা গণপূর্ত অধিদপ্তরে তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী হিসেবে গণপূর্ত উন্নয়ন উইং এ রিজার্ভে আছেন। তিনি দিনাজপুর বঙ্গবন্ধু প্রকৌশল পরিষদের সদস্য।

কয়েকদিন আগে গণপূর্ত অধিদপ্তরের নির্বাহী প্রকৌশলী থেকে তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী পদে পদান্নতি পাওয়া বঙ্গবন্ধু প্রকৌশল পরিষদের সদস্য মো. ইলিয়াস আহম্মেদ ছাত্র-জনতা হত্যার সময় গণপূর্ত অধিদপ্তরের সার্কেল-১ এর দায়িত্বে ছিলেন।

ছাত্র-জনতা হত্যায় অর্থ যোগানদাতা বঙ্গবন্ধু প্রকৌশল পরিষদের সদস্য মুহাম্মদ জাকির হোসেন রিজার্ভ, গণপূর্ত অধিদপ্তরের তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলীর চলতি দায়িত্বে আছেন।

বঙ্গবন্ধু প্রকৌশল পরিষদের সহ সাংগঠনিক সম্পাদকের দায়িত্বে আছেন মোহাম্মদ মনিরুল ইসলাম। তিনি গণপূর্ত অধিদপ্তরের সার্কেল-৩ এর তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী থাকা অবস্থায় ছাত্র-জনতা হত্যায় অর্থ যোগান দিয়েছিলেন। বর্তমানে তিনি তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী হিসেবে গণপূর্ত অধিদপ্তরের সার্কেল-১ এ আছেন।

মো. মিরাজ হোসেন বঙ্গবন্ধু প্রকৌশল পরিষদের জাতীয় গৃহায়ন শাখার সহ সভাপতি হিসেবে আছেন। এছাড়াও তিনি জাতীয় গৃহায়ন কর্তৃপক্ষের ই/এম ডিভিশনের নির্বাহী প্রকৌশলী।

নগন গণপূর্ত বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলীর দায়িত্বে থাকার সময় মো. মাহবুবুর রহমান জুলাইয়ের নৃশংস হত্যাযজ্ঞে অংশগ্রহন করেছিলেন। বর্তমানে তিনি শরিয়তপুর গণপূর্তে বদলি হয়ে গেছেন। ঢাকায় থাকা অবস্থায় তিনি দলীয় সর্বোচ্চ ক্ষমতা ব্যবহার করে দুর্নীতি ও অনিয়ম করে বিপুল অর্থ সম্পত্তির মালিক হয়েছেন বলে অভিযোগ আছে। তার বিরুদ্ধে প্রমাণিত দুর্নীতিও তিনি দলীয় প্রভাবে ধামাচাপা দিয়েছেন বলেও জানা যায়। তিনি বঙ্গবন্ধু প্রকৌশল পরিষদের সক্রিয় সদস্য।

বর্তমানে উত্তরা এপার্টমেন্ট নির্মাণ প্রকল্প (গণপূর্ত অংশ)-এর রিজার্ভ নির্বাহী প্রকৌশলী হিসেবে রয়েছেন আবুল কালাম আজাদ। তিনি বঙ্গবন্ধু প্রকৌশল পরিষদের সহ সাংগঠনিক সম্পাদক। মতিঝিল গণপূর্ত বিভাগে থাকাকালীন তিনি এই হত্যাকান্ডে অংশ নেন বলে মামলার ফিরিস্তিতে উল্লেখ রয়েছে।

বঙ্গবন্ধু প্রকৌশল পরিষদের সাংগঠনিক সম্পাদক মো. সাইফুজ্জামান চুন্নু। তিনি গণপূর্ত বিভাগ-১ এর নির্বাহী প্রকৌশলী থাকাকালীন আওয়ামী লীগ, যুবলীগ, ছাত্রলীগকে অর্থের যোগান দিয়েছিলেন।

এছাড়া গণপূর্ত পিএন্ডডি বিভাগ-১ এর নির্বাহী প্রকৌশলী সমিরন মিস্ত্রির নামে শুধু হত্যাকান্ডে আর্থিক সহায়তার অভিযোগ রয়েছে। তার কোনো রাজনৈতিক পরিচয় মামলার ফিরিস্তিতে উল্লেখ নেই।

মামলার ফিরিস্তিতে ছাত্র-জনতা হত্যায় অর্থদাতা হিসেবে নাম রয়েছে সাবেক বুয়েট হল শাখার ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক ও বঙ্গবন্ধু প্রকৌশল পরিষদের সহ সাংগঠনিক সম্পাদক গণপূর্ত অধিদপ্তরের নির্বাহী প্রকৌশলী মোস্তাফিজুর রহমান-এর। তিনি শেরেবাংলা নগর বিভাগ-১ এ দায়িত্ব পালনকালে হত্যায় বিপুল অর্থ সহায়তা করেছেন বলে অভিযোগ উঠেছে।

গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের সচিব মো. হামিদুর রহমান খান দৈনিক আজকের সংবাদকে এই হত্যা মামলার বিষয়ে বলেন, আমি শুনেছি মামলা হয়েছে। আজকে কোর্টের অর্ডার পেয়েছি। এখনো দেখা হয়নি। সরকারি কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে অনেক প্রতিবন্ধকতা থাকে। কোর্টের রায় যাদের বিরুদ্ধে হবে তাদের বিরুদ্ধেই ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক গণপূর্ত অধিদপ্তরের এক কর্মকর্তা দৈনিক আজকের সংবাদকে বলেন, একটা বড় গণঅভ্যুত্থানে দেশটা স্বাধীন হয়েছে। দেশ সংস্কারের দায়িত্ব ছাত্র-জনতা হাতে নিয়েছে। এখনো যদি চিহ্নিত আওয়ামী লীগের লোকের হাতে গণপূর্ত অধিদপ্তরের মত সংস্থার দায়িত্ব থাকে তাহলে দেশ সংস্কার কিভাবে হবে। এরা তো এই সুযোগে দেশের যে বাকি কিছু অর্থ আছে তা লুট করে পাচার করে দিবে। এদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা এখনই নেওয়া উচিত।