প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের প্রথম রাষ্ট্রীয় ও দ্বিপাক্ষিক মালয়েশিয়া  সফর উপলক্ষে প্রেস কনফারেন্স

স্টাফ রিপোর্টার
স্টাফ রিপোর্টার
প্রকাশিত: জুন ২২, ২০২৬ ২১:০৮:০৮

সোমবার (২২ জুন) বাংলাদেশ সময় ১২ টায় প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের প্রথম রাষ্ট্রীয় ও দ্বিপাক্ষিক মালয়েশিয়া সফর উপলক্ষে এক প্রেস কনফারেন্সের অনুষ্ঠিত হয় প্রেস কনফারেন্সে প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা ও প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের মুখপাত্র ড. মাহ্দী আমিন সাংবাদিকদের উদ্দেশে বলেন, উপস্থিত গণমাধ্যমের প্রিয় সাংবাদিক ভাই ও বোনেরা,

আপনাদের সবাইকে আন্তরিক ধন্যবাদ ও শুভেচ্ছা জানাচ্ছি। আপনাদের মধ্যে অনেকেই কষ্ট করে ঢাকা থেকে এখানে এসেছেন, আবার অনেকে মালয়েশিয়ায় স্থানীয়ভাবে বসবাস করছেন। আজ এই প্রেস কনফারেন্সে উপস্থিত হওয়ার জন্য আপনাদের সকলের প্রতি কৃতজ্ঞতা।

আমার সঙ্গে আজ এখানে উপস্থিত আছেন মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর পররাষ্ট্র বিষয়ক উপদেষ্টা জনাব হুমায়ুন কবির, মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর অতিরিক্ত প্রেস সচিব আতিকুর রহমান রুমন, মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর প্রেস টিম, পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তাবৃন্দ এবং বাংলাদেশ হাইকমিশন, মালয়েশিয়ার কর্মকর্তাগণ।

আপনারা জানেন, মাননীয় প্রধানমন্ত্রী জনাব তারেক রহমান রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব গ্রহণের পর প্রথমবারের মতো বিদেশ সফরে মালয়েশিয়ায় এসেছেন। অত্যন্ত সংক্ষিপ্ত এই সফরে গতকাল রাতে পৌঁছানোর পর আমরা আজই কিছুক্ষণের মধ্যে মালয়েশিয়া ত্যাগ করছি। প্রায় অর্ধ দিবসের এই সফরে আমরা দেখেছি, মাননীয় প্রধানমন্ত্রী অত্যন্ত ব্যস্ত কর্মসূচির মধ্য দিয়ে অনেক গুরুত্বপূর্ণ কাজ সম্পন্ন করেছেন।

আপনারা ইতোমধ্যে অবগত রয়েছেন যে, ত্রয়োদশ জাতীয় নির্বাচনে বিজয়ী হওয়ার পর মাননীয় প্রধানমন্ত্রী জনাব তারেক রহমানকে সর্বপ্রথম অভিনন্দন জানানো কয়েকজন বিশ্বনেতার অন্যতম ছিলেন মালয়েশিয়ার মাননীয় প্রধানমন্ত্রী দাতো সেরি আনোয়ার ইব্রাহিম।

শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান ১৯৭৯ সালে রাষ্ট্রপতি হিসেবে মালয়েশিয়া সফর করেছিলেন এবং তাঁর হাত ধরেই বাংলাদেশ থেকে এখানে জনশক্তি রপ্তানি শুরু হয়েছিল। দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়াও প্রথমবার প্রধানমন্ত্রী হওয়ার পর ১৯৯৩ সালে মালয়েশিয়া সফর করেন এবং এখানকার উন্নয়ন ও অগ্রযাত্রার বিভিন্ন দিক বাংলাদেশে বাস্তবায়নের উদ্যোগ গ্রহণ করেন। স্বাভাবিকভাবেই বিএনপি সরকারের সঙ্গে মালয়েশিয়ার একটি ঐতিহাসিক সম্পর্ক রয়েছে এবং সেই ধারাবাহিকতার বহিঃপ্রকাশ হিসেবেই মাননীয় প্রধানমন্ত্রী নির্বাচনে বিজয়ী হওয়ার পর তাঁর বিদেশ সফর শুরু করলেন এই দেশ থেকে।

প্রচলিত ধারার বিপরীতে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী খুব ছোট একটি প্রতিনিধি দল নিয়ে বাংলাদেশ থেকে এখানে এসেছেন। মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর সফরসঙ্গী হিসেবে আছেন তাঁর সহধর্মিণী ডা. জুবাইদা রহমান। তিনি আজ মালয়েশিয়ার মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর সহধর্মিণী ডা. ওয়ান আজিজাহ ওয়ান ইসমাইলের সঙ্গে বেশ কয়েকটি পৃথক কর্মসূচিতে অংশগ্রহণ করেন।

অফিশিয়াল ডেলিগেশনে মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর সফরসঙ্গী হিসেবে আছেন আরও ২৩ জন, যার মধ্যে মন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রী ও উপদেষ্টা পদমর্যাদার ১০ জন। তাছাড়া অতি অত্যাবশ্যকীয় কিছু সাপোর্ট স্টাফ, যেমন সিকিউরিটি, প্রটোকল ও মিডিয়া সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের কয়েকজন এসেছেন।

বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের রেগুলার যে ফ্লাইটে আমরা এখানে এসেছি, সেই ফ্লাইটের অন্যান্য সাধারণ যাত্রীদের সঙ্গে মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর অত্যন্ত আন্তরিক, সৌহার্দ্যপূর্ণ ও উষ্ণ পরিবেশে দেখা হয় এবং কুশল বিনিময় হয়।

প্রধানমন্ত্রীর এই মুখপাত্র বলেন, মালয়েশিয়ার মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর আমন্ত্রণে বাংলাদেশের মাননীয় প্রধানমন্ত্রী জনাব তারেক রহমান কুয়ালালামপুর আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে পৌঁছালে বিমানবন্দরের ভিভিআইপি টার্মিনালে তাঁকে ও তাঁর সহধর্মিনীকে স্বাগত জানান মালয়েশিয়ার সরকারের ধর্ম বিষয়ক মন্ত্রী জুলকিফলি হাসান ও তাঁর সহধর্মিণী। পরবর্তীতে মালয়েশিয়া  সরকারের পক্ষ হতে আমাদের মাননীয় প্রধানমন্ত্রীকে লালগালিচা সংবর্ধনা ও গার্ড অব অনার দেওয়া হয়। সুসজ্জিত বাহিনীর দেওয়া গার্ড অব অনারের সময় দুই দেশের জাতীয় সংগীত বাজানো হয়। এরপর বিমানবন্দর থেকে মাননীয় প্রধানমন্ত্রীকে বিশেষ মোটর শোভাযাত্রাসহকারে কুয়ালালামপুরের ‘শাংগ্রি লা’ হোটেলে নিয়ে যাওয়া হয়।

এছাড়াও বাংলাদেশের মাননীয় প্রধানমন্ত্রীকে স্বাগত জানাতে কুয়ালালামপুর আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে হোটেল পর্যন্ত ৫০ মিনিটের সড়কপথ বাংলাদেশ ও মালয়েশিয়ার জাতীয় পতাকায় সজ্জিত করা হয়।

আজ পুত্রাজায়ায়ও বাংলাদেশের মাননীয় প্রধানমন্ত্রীকে লালগালিচা সংবর্ধনা দেওয়া হয়। মাননীয় প্রধানমন্ত্রীকে স্বাগত জানিয়ে সড়কপথে বাংলাদেশ ও মালয়েশিয়ার জাতীয় পতাকায় সজ্জিত করা হয়। পুত্রাজায়ায় মাননীয় প্রধানমন্ত্রী ও তার সহধর্মিনী ডা. জুবাইদা রহমানের ছবি বিলবোর্ডে শোভা পায়।

তিনি আরো বলেন, গতকাল রাতে কুয়ালালামপুরে পৌঁছানো মাত্রই এখানে স্থানীয় প্রবাসী বাংলাদেশিদের সঙ্গে একটি মতবিনিময় সভার আয়োজন করা হয়। বিভিন্ন শ্রেণী-পেশার প্রবাসীর উপস্থিতিতে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী তাঁর চিন্তা, আকাঙ্ক্ষা এবং আগামীর বাংলাদেশ বিনির্মাণের রূপকল্প তুলে ধরেন। উষ্ণ ও আন্তরিক সেই আলাপচারিতায় আগামীর বাংলাদেশ গড়ার প্রত্যয় ফুটে উঠেছে। প্রায় এক ঘন্টার আলাপচারিতায়, মাননীয় প্রধানমন্ত্রী বাংলাদেশের উন্নয়নে বিদেশে বসবাসরত প্রবাসী ভাই-বোনদের ইতিবাচক অবদানের কথা কৃতজ্ঞচিত্তে স্মরণ করেন।

আপনারা অবগত আছেন, স্বল্পসময়ের এই সফরে বাংলাদেশের মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে মালয়েশিয়ার মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর দীর্ঘ বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়েছে। প্রথমে দুই প্রধানমন্ত্রীর মধ‍্যে একান্ত বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। এর পর সীমিত পরিসরে অনুষ্ঠিত বৈঠকে খোলামেলা আলোচনায় দুই দেশের দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের গুরুত্বপূর্ণ বিভিন্ন বিষয় উঠে আসে। পরবর্তীতে ডেলিগেশন পর্যায়ে উভয় পক্ষের প্রতিনিধিদের নিয়ে বৃহত্তর পরিসরে সৌহার্দ্যপূর্ণ আলোচনা অনুষ্ঠিত হয়।

মালয়েশিয়ার মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর আমন্ত্রণে বাংলাদেশের মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর নেতৃত্বে ডেলিগেশন মধ্যাহ্নভোজে অংশগ্রহণ করেন। পরে মালয়েশিয়ার মহামান্য রাজা সুলতান ইব্রাহিম সুলতান ইস্কান্দারের সঙ্গে বাংলাদেশের মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর সাক্ষাৎ অনুষ্ঠিত হয় এবং সেখানেও দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ বিষয় নিয়ে আলোচনা হয়। উচ্চপর্যায়ের এই বৈঠকসমূহে বাংলাদেশ-মালয়েশিয়া সম্পর্কের বিভিন্ন দিক নিয়ে আলোচনার পাশাপাশি আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক অঙ্গনের পারস্পরিক স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিষয়েও মতবিনিময় করা হয়। একইসাথে দুই দেশের সম্পর্ককে নতুন উচ্চতায় নিয়ে যাওয়ার ব্যাপারে দৃঢ় অঙ্গীকার ব্যক্ত করা হয়।

মাহ্দী বলেন, এবারের ঐতিহাসিক সফরে বাংলাদেশ এবং মালয়েশিয়ার মধ‍্যে অনেকগুলো গুরুত্বপূর্ণ খাত নিয়ে আলোচনা হয়েছে। খাতগুলো হল- রাজনৈতিক সহযোগিতা, বাণিজ্য ও বিনিয়োগ সম্প্রসারণ, হালাল শিল্প, ডিজিটাল অর্থনীতি, এআই এবং সেমিকন্ডাক্টর খাত, বাংলাদেশ থেকে কর্মী নিয়োগ এবং তাঁদের কল্যাণে সহযোগিতা, শিক্ষা ও পর্যটন খাতে সহযোগিতা, জ্বালানি খাত, প্রতিরক্ষা ও নিরাপত্তা এবং আঞ্চলিক ও বহুপাক্ষিক সহায়তা সম্প্রসারণ। উল্লেখ‍্য, সর্বমোট ৯টি বিষয়ে পারস্পরিক সহযোগিতা বৃদ্ধির লক্ষ‍্যে দুই দেশের সম্মতিতে ৩৩ টি পয়েন্টে একটি যৌথ বিবৃতি ইস‍্যু করা হয়েছে। 

সভাশেষে বাংলাদেশের মাননীয় প্রধানমন্ত্রী এবং মালয়েশিয়ার মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর যৌথ প্রেস কনফারেন্স হয়েছে। এই যৌথ প্রেস কনফারেন্সে মালয়েশিয়ার মাননীয় প্রধানমন্ত্রী বাংলাদেশের ইতিহাসে শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান ও দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়ার ভূমিকার ভুয়সী প্রশংসা করেছেন। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের যে ত্যাগ ও সংগ্রাম রয়েছে, দেশের মানুষের অধিকার ও স্বাধীনতা প্রতিষ্ঠার জন্য, তা স্মরণ করেছেন। এবং বাংলাদেশের সঙ্গে মালয়েশিয়ার যে ভিন্নমাত্রিক ঐতিহাসিক ভ্রাতৃত্বপূর্ণ এবং বন্ধুত্বপূর্ণ ‌ সম্পর্ক রয়েছে, তা স্মরণ করেন।

পারস্পরিক স্বার্থকে প্রাধান্য দিয়ে বাণিজ্য ও বিনিয়োগ বৃদ্ধি করে অর্থনৈতিক সহযোগিতা আরও কীভাবে শক্তিশালী করা যায় সে বিষয়ে দুই রাষ্ট্রনায়ক আলোচনা করেন। দুই দেশ মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি (এফটিএ) স্বাক্ষরের লক্ষ্যে আলোচনা এগিয়ে নেওয়ার বিষয়ে সম্মত হয়েছে। প্রযুক্তি, বিনিয়োগ ও দক্ষতা উন্নয়নের মাধ্যমে শিল্প ও ব্যবসা খাতে সহযোগিতা বাড়িয়ে নতুন কর্মসংস্থান ও অর্থনৈতিক সুযোগ তৈরিতে দুই দেশ একসাথে কাজ করার বিষয়ে আলোচনা হয়। একই সাথে হালাল শিল্প ও হালাল ব্যবসার সম্ভাবনার ওপর গুরুত্বারোপ করা হয়। এ খাতে মালয়েশিয়ার অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়ে বাংলাদেশে হালাল পণ্য, সনদ প্রদান ব্যবস্থা, দক্ষ জনবল তৈরি এবং গবেষণা ও প্রশিক্ষণ কার্যক্রমে সহযোগিতা বাড়ানোর বিষয়ে তারা একমত হয়েছেন।

মুখপাত্র বলেন, আজকের আলোচনায়, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই), ডিজিটাল অর্থনীতি, সাইবার নিরাপত্তা ও আধুনিক প্রযুক্তি খাতে সহযোগিতা বাড়ানোর বিষয়ে গুরুত্বারোপ করা হয়। পাশাপাশি বাংলাদেশের তথ্য প্রযুক্তি খাতে, বিশেষ করে প্রযুক্তি পার্ক ও অর্থনৈতিক অঞ্চলে, মালয়েশিয়ার বিনিয়োগ বৃদ্ধির বিষয়েও গুরুত্বারোপ করা হয়েছে।

আপনারা জানেন, মালয়েশিয়ায় বর্তমানে প্রায় ১১ হাজার বাংলাদেশি শিক্ষার্থী অধ্যয়নরত। বাংলাদেশ এবং মালয়েশিয়ার আর্থ-সামাজিক উন্নয়নে তাঁদের ইতিবাচক অবদানকে উভয় দেশ স্বীকৃতি দেয়। দুই দেশের সরকারপ্রধান শিক্ষা ক্ষেত্রে সহযোগিতা, বিশেষ করে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর মধ্যে অংশীদারিত্ব, যৌথ গবেষণা এবং কারিগরি ও দক্ষতাভিত্তিক শিক্ষা সম্প্রসারণে একমত পোষণ করেন। একই সঙ্গে কর্মবাজারের চাহিদা অনুযায়ী দক্ষ মানবসম্পদ গড়ে তোলা এবং শিক্ষার্থীদের দক্ষতা উন্নয়নের ওপর গুরুত্বারোপ করেন উভয় সরকার প্রধান।

প্রতিরক্ষা সহযোগিতা আরও জোরদার, সামরিক প্রশিক্ষণ ও দক্ষতা উন্নয়ন কার্যক্রম সম্প্রসারণ এবং জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা মিশনে পারস্পরিক সহযোগিতা বৃদ্ধির বিষয়ে উভয় দেশ একমত হন। পাশাপাশি সন্ত্রাসবাদ মোকাবিলায় প্রশিক্ষণ এবং সক্ষমতা উন্নয়নের মাধ্যমে দ্বিপাক্ষিক সহযোগিতা আরও শক্তিশালী করার অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করেন। পর্যটন ও সাংস্কৃতিক ক্ষেত্রে কীভাবে পারস্পরিক সহযোগিতা বৃদ্ধি করা যায় সে বিষয়ে বৈঠকে আলোচনা হয়।

তিনি আরো বলেন, আপনারা জানেন, ঐতিহাসিকভাবে বিএনপি সরকারের সময়েই বাংলাদেশ থেকে মালয়েশিয়ায় জনশক্তি রপ্তানি শুরু হয় এবং শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের সময়েই মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার প্রথম উন্মুক্ত হয়। বিভিন্ন কারণে কয়েক বছর ধরে এই বাজার বন্ধ রয়েছে।

স্বাভাবিকভাবেই জনগণের স্বার্থ প্রতিষ্ঠায়, বাংলাদেশের মাননীয় প্রধানমন্ত্রী তাঁর দ্বিপাক্ষিক বৈঠকে মালয়েশিয়ার মাননীয় প্রধানমন্ত্রী এবং মহামান্য রাজার সঙ্গে শ্রমবাজার পুনরায় উন্মুক্ত করার বিষয়টি নিয়ে আলোচনা করেছেন।

দুই দেশের প্রধানমন্ত্রী ঐক্যমত পোষণ করেছেন যে, অভিবাসনের ক্ষেত্রে ব্যয় যত কমানো যায়, অভিবাসনের ক্ষেত্রে যত স্বচ্ছ প্রক্রিয়ায় আনা যায় এবং নিরাপদ কর্মপরিবেশে শ্রমিকদের সুরক্ষা যেন নিশ্চিত করা যায়। বাংলাদেশের মাননীয় প্রধানমন্ত্রী সম্ভব হলে দ্রুততার সঙ্গে মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার বাংলাদেশের জন্য পুনরায় উন্মুক্তকরণের আহ্বান জানিয়েছেন। একই সঙ্গে স্বল্প অভিবাসন ব্যয়ে আরও বেশি সংখ্যক বাংলাদেশি শ্রমিকের কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করার বিষয়ে উদ্যোগ গ্রহণের আন্তরিক অনুরোধ জানিয়েছেন।

পাশাপাশি বিভিন্ন কারণে যেসব বাংলাদেশি শ্রমিক অবৈধ অবস্থায় রয়েছেন, কিংবা কারাগারে অন্তরীণ আছেন, তাঁদেরকে কীভাবে মানবিক ও সহানুভূতিশীল উপায়ে বৈধতার আওতায় আনা যায় অথবা প্রয়োজনে নিরাপদে দেশে ফেরত পাঠানো যায়, মালয়েশিয়ার বিদ্যমান আইন অনুযায়ী সে বিষয়েও মাননীয় প্রধানমন্ত্রী আন্তরিক অনুরোধ জানিয়েছেন।

উভয় বৈঠকে মালয়েশিয়ার আর্থ-সামাজিক উন্নয়নে বাংলাদেশি কর্মীদের গুরুত্বপূর্ণ অবদানের প্রশংসা করা হয়। একইসাথে বাংলাদেশ-মালয়েশিয়ার সম্পর্কোন্নয়নে প্রবাসী বাংলাদেশিরা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকার কথা উল্লেখ করা হয় বৈঠকে।

জ্বালানি খাতে সহযোগিতা ও বিনিয়োগ বৃদ্ধিতে বাংলাদেশ ও মালয়েশিয়া একমত হয়েছে। বিশেষ করে এলএনজি, তেল-গ্যাস অনুসন্ধান এবং নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাতে মালয়েশিয়ার বিনিয়োগের বিষয়ে ইতিবাচক আলোচনা হয়েছে।

বাংলাদেশে আশ্রয় নেওয়া রোহিঙ্গাদের কীভাবে নিরাপদ, স্বেচ্ছামূলক ও সম্মানজনকভাবে মিয়ানমারে প্রত্যাবাসন করা যায় এবং এ ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক বিভিন্ন প্ল্যাটফর্মে মালয়েশিয়া কীভাবে বাংলাদেশকে সহযোগিতা করতে পারে, সে বিষয়েও আলোচনা হয়েছে।

একইভাবে, আসিয়ানের সেক্টরাল ডায়ালগ পার্টনার হিসেবে এবং Regional Comprehensive Economic Partnership (RCEP) এ বাংলাদেশের অন্তর্ভুক্তির বিষয়ে মালয়েশিয়া  কিভাবে সহযোগিতা করতে পারে সে বিষয়ে আলোচনা হয়। ফিলিস্তিনি জনগণের ন্যায়সঙ্গত অধিকার প্রতিষ্ঠা এবং মধ্যপ্রাচ্যে একটি স্থায়ী ও শান্তিপূর্ণ সমাধান অর্জনের লক্ষ্যে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের প্রতি সংলাপ, কূটনৈতিক উদ্যোগ ও গঠনমূলক প্রচেষ্টা অব্যাহত রাখার আহ্বান জানান। একই সঙ্গে তারা জাতিসংঘ ও ওআইসিসহ আন্তর্জাতিক ফোরামে পারস্পরিক সমন্বয় বৃদ্ধি এবং আন্তর্জাতিক আইন ও ন্যায়ভিত্তিক বিশ্বব্যবস্থা প্রতিষ্ঠায় যৌথভাবে কাজ করার প্রত্যয় ব্যক্ত করেছেন।

জলবায়ু পরিবর্তন, খাদ্য নিরাপত্তা, মানবপাচার ও আন্তঃসীমান্ত অপরাধসহ বিভিন্ন বৈশ্বিক নিরাপত্তা চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় ঘনিষ্ঠ সহযোগিতা জোরদারে দুই দেশের সরকার একত্রে কাজ করার বিষয়ে সম্মত হয়েছে।

প্রধানমন্ত্রীর মুখপাত্র বলেন,
এই সফরে দুই দেশের মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর উপস্থিতিতে বাংলাদেশ ও মালয়েশিয়ার মধ্যে সংস্কৃতি বিষয়ে একটি Memorandum of Understanding স্বাক্ষরিত হয়েছে।  এর মূল উদ্দেশ্য হলো দুই দেশের ইতিহাস, ঐতিহ্য এবং দীর্ঘদিনের সৌহার্দ্যপূর্ণ সম্পর্ককে সাংস্কৃতিক বিনিময়ের মাধ্যমে আরও শক্তিশালী করা। এছাড়া বিনিয়োগ বৃদ্ধি ও সন্ত্রাস দমনে ২টি Exchange of Notes বিনিময় করা হয়েছে।

সফরকালে মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে মালয়েশিয়ার পাঁচটি বৃহৎ ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের শীর্ষ কর্মকর্তারা পৃথকভাবে সাক্ষাৎ করেছেন। এর মধ্যে রয়েছে পেট্রোনাস, আজিয়াটা, এয়ারএশিয়া, পার্ডুয়া এবং এমএমসি পোর্ট।

সফরকালে বাংলাদেশের মাননীয় প্রধানমন্ত্রী ও তাঁর সহধর্মিণী মালয়েশিয়ার মাননীয় প্রধানমন্ত্রী দাতো সেরি আনোয়ার ইব্রাহিম ও তাঁর সহধর্মিণী ডা. ওয়ান আজিজাহ ওয়ান ইসমাইলকে তাঁদের সুবিধাজনক সময়ে বাংলাদেশ সফরের আন্তরিক আমন্ত্রণ জানান। একই সঙ্গে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী এই ঐতিহাসিক সফর আয়োজনের জন্য মালয়েশিয়া সরকার এবং জনগণের প্রতি আন্তরিক কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন। তিনি মালয়েশিয়ার উষ্ণ আতিথেয়তা, আন্তরিক সহযোগিতা ও সৌহার্দ্যপূর্ণ অভ্যর্থনার জন্য ধন্যবাদ জানান।

দুই প্রধানমন্ত্রীর একান্ত বৈঠকের পর সীমীত পরিসরে অনুষ্ঠিত‌ মিটিংয়ে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ও মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী দাতো’ সেরি আনোয়ার ইব্রাহিমের সঙ্গে দুই দেশের প্রতিনিধি দল অংশগ্রহণ করেন। বাংলাদেশের প্রতিনিধি দলে ছিলেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমান, প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থানমন্ত্রী জনাব আরিফুল হক চৌধুরী, প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা (অর্থ মন্ত্রণালয় ও পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়) জনাব রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর, প্রধানমন্ত্রীর পররাষ্ট্র বিষয়ক উপদেষ্টা জনাব হুমায়ুন কবির এবং প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা (প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়) এবং প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের মুখপাত্র মাহ্‌দী আমিন। মালয়েশিয়ার প্রতিনিধি দলে ছিলেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী দাতুক সেরি সাইফুদ্দিন নাসুতিওন ইসমাইল, পররাষ্ট্রমন্ত্রী দাতুক সেরি মোহাম্মদ হাসান, মানবসম্পদমন্ত্রী দাতুক সেরি আর রামানান, প্রধানমন্ত্রীর ব্যক্তিগত সচিব দাতো’ শাহরোল আনুয়ার বিন সারমান এবং সেক্রেটারি জেনারেল তান শ্রী আমরান মোহাম্মদ জিন।

বাংলাদেশের মাননীয় প্রধানমন্ত্রী তাঁর দ্বিপাক্ষিক বৈঠকের অংশ হিসেবে মহামান্য রাজার সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। সাক্ষাতকালে বাংলাদেশের প্রতিনিধিদলের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থানমন্ত্রী জনাব আরিফুল হক চৌধুরী, মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা (প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়) এবং প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের মুখপাত্র জনাব মাহ্‌দী আমিন এবং মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা (ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তি মন্ত্রণালয়) জনাব রেহান আসিফ আসাদ। 

আজকের এই সফর কেবল একটি রাষ্ট্রীয় সফর নয়; এটি বাংলাদেশ ও মালয়েশিয়ার বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্কের এক ঐতিহাসিক অধ্যায় এবং ভবিষ্যৎ সহযোগিতার এক নতুন দিগন্তের সূচনা। মাত্র ১৮ ঘণ্টার এই সংক্ষিপ্ত কিন্তু অত্যন্ত ফলপ্রসূ সফরে যে আলোচনা, সমঝোতা ও পারস্পরিক সহযোগিতার সিদ্ধন্ত গৃহীত হয়েছে, তা আগামী দিনে দুই দেশের জন্য বহুমাত্রিক সম্ভাবনার নতুন দ্বার উন্মোচন করবে।

জনগণের ভোটে নির্বাচিত সরকারের মাননীয় প্রধানমন্ত্রী জনাব তারেক রহমানের প্রথম এই বিদেশ সফর বাংলাদেশ-মালয়েশিয়া সম্পর্কের ইতিহাসে গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক হিসেবে স্মরণীয় হয়ে থাকবে, ইনশাআল্লাহ। এই সফরের মাধ্যমে দুই দেশের পারস্পরিক আস্থা, বন্ধুত্ব ও জনগণের সাথে জনগণের সম্পর্ক আরও সুদৃঢ় ও সুসংহত হয়েছে।

আপনাদের সবাইকে ধৈর্য সহকারে বক্তব্য শোনার জন্য আন্তরিক ধন্যবাদ। ইনশাআল্লাহ, আমরা কিছুক্ষণের মধ্যে এখান থেকে চীনের উদ্দেশে রওনা হব এবং সেখানকার কার্যক্রম সম্পর্কেও আপনাদের নিয়মিতভাবে অবহিত করব।