বন বিভাগের সমাপ্ত সুফল প্রকল্পে হরিলুট- ২
প্রকল্প পরিচালক গোবিন্দ রায় স্বৈরাচারের বন মন্ত্রী শাহাবুদ্দিনপুত্র জুম্মন কসাইকে পার্সেন্টেজ দিয়েছেন অর্ধ শত কোটি টাকা

বন অধিদপ্তর কর্তৃক গৃহীত সম্প্রতি সমাপ্ত টেকসই বন ও জীবিকা (সুফল) প্রকল্পে ব্যায়িত ১৬৪২ কোটি টাকার সিংহভাগই হয়েছে আত্মসাৎ। এহেন পুকুর চুরির বিষয়টি ধামাচাপা দিতে খোদ প্রকল্প পরিচালক গোবিন্দ রায় স্বৈরাচারের বন মন্ত্রী শাহাবুদ্দিন পুত্র জুম্মন কসাইকে পার্সেন্টেজ স্বরূপ দিয়েছেন প্রায় অর্ধশত কোটি টাকা। নিজ হাতে নগদ টাকা তিনি মন্ত্রীর বাসভবনে গিয়ে মন্ত্রিপুত্র জুম্মন কসাইয়ের হাতে দিয়ে আসতেন। পাশাপাশি মন্ত্রীর সাথে দেখা করে তার দিকে খেয়াল রাখতে বলতেন বলে জানিয়েছেন প্রকল্পে কর্মরত নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন জুনিয়র বন কর্মকর্তা। এ কারণেই সুফল প্রকল্পের অনিয়ম নিয়ে উত্থাপিত কোন অভিযোগেরই মন্ত্রণালয় থেকে গঠিত তদন্ত টিম সঠিক প্রতিবেদন দাখিল করতে পারেনি। কারণ মন্ত্রিপুত্রের নির্দেশে ঐ সময়ে মন্ত্রণালয় ও অধিদপ্তরের বদলি নিয়োগ সহ যাবতীয় কার্যক্রম পরিচালিত হতো। তাকে ম্যানেজ করেই সকল অনিয়ম জায়েজ করা হতো বলে ঐ কর্মকর্তা জানান।
প্রকল্পটির মুখ্য উদ্দেশ্য ছিল সহযোগিতামূলক বন ব্যবস্থাপনার উন্নয়ন ও প্রকল্পের এলাকায় বন নির্ভর জনগোষ্ঠীর বিকল্প আয় বর্ধক কাজের সৃষ্টি করা। বন ও রক্ষিত এলাকা সংলগ্ন ৬০০টি গ্রামে ৪০ হাজার বন নির্ভর পরিবারের উন্নয়ন করা। ৫২ হাজার ৭২০ হেক্টর বৃক্ষশূন্য পাহাড়ী ও সমতল বনভূমিতে বনাচ্ছাদন, নতুন জেগে ওঠা চরে ম্যানগ্রোভ বাগান সৃজন করা, ২০টি রক্ষিত এলাকায় ২ হাজার ৫শ হেক্টর বন্য প্রাণীর আবাসস্থল এবং ১ হাজার ৩৩০ হেক্টর এলাকায় বন্যপ্রাণী চলাচলের পথের উন্নয়ন, ৬টি রক্ষিত বনে রক্ষিত বন ব্যবস্থাপনা পরিকল্পনা প্রণয়ন, পাখিশুমারি ও রিং কার্যক্রম পরিচালনা করা, দেশের জাতীয় বনাঞ্চল ১.৫ শতাংশ বৃদ্ধি করা ও ৯৩টি ভবন নির্মান করা।
সূত্রমতে দেশের ২০টি বন বিভাগকে সুফল প্রকল্পের কার্যক্রম বাস্তবায়নের জন্য সর্বোচ্চ বরাদ্দ দেয়া হয় চট্টগ্রাম অঞ্চলের ৫টি বনবিভাগকে।
চট্টগ্রাম বন অঞ্চলের নিয়ন্ত্রণাধীন এই ৫টি বন বিভাগের অর্ধশতাধিক রেঞ্জে সুফল বাগানের নামে বরাদ্দকৃত টাকার সর্বোচ্চ লুটপাটের ঘটনা ঘটেছে। বাকি ১৫ টি বন বিভাগেও প্রায় ৬০ শতাংশ এলাকায় বাগান না করে ডিএফও, এসিএফ, রেঞ্জ কর্মকর্তা, বন সংরক্ষক ও প্রকল্প পরিচালকের মধ্যে ভাগ বাটোয়ারার অভিযোগ উঠেছে। সরেজমিন দীর্ঘ অনুসন্ধানে দেখা গেছে
প্রতিটি বাগানেই টেকসই বন ও জীবিকা (সফল) প্রকল্পের দিকনির্দেশনা উপেক্ষিত হয়েছে। বনায়নের জৈব সার, রাসায়নিক সার প্রয়োগ সহ প্রতিটি গাছের সাথে খুঁটি লাগানোর নিয়ম থাকলেও বেশিরভাগ ক্ষেত্রে তা করা হয়নি। বনায়নের চিকবাশি,গামার, আকাশমনি, চাতিয়া, বকাইন, করই, শিমুল, বহেরা, অর্জুন গাছ লাগানোর নির্দেশনা থাকলেও তা যথাযথ অনুসরণ করা হয়নি। অপরদিকে ৬ ফুট অন্তর চারা রোপণের কথা থাকলেও একেকটি চারার দূরত্ব করা হয়েছে ১০ থেকে ১২ ফুট। চারা রোপণের পূর্বে গোবর সার ও রাসায়নিক সার দেওয়ার কথা থাকলেও তা দেয়া হয়নি। আর এ কারণেই বেশীরভাগ চারা প্রথম অবস্থায় মারা যায়। তাছাড়া বাগানের সম্মুখভাগের বাগান কিছুটা নিয়মমাফিক হলেও ভেতরে ব্যাপক অনিয়ম করা হয়েছে। কারণ হিসেবে জানা যায় মন্ত্রনালয়ের কর্মকর্তারা বাগান পরিদর্শনে গেলে সম্মুখভাগের বাগান দেখেই চলে আসেন। বাগানে বিভিন্ন পোকামাকড় ও কাদা পানি থাকায় তারা ভিতরে ঢুকতে চান না। আবার অনেক কর্মকর্তা পাহাড়ে উঠতে চান না। আর এই সুযোগটাই বাগান তৈরীর কাজে নিয়োজিতরা নিয়ে থাকেন।
কক্সবাজার বন বিভাগ থেকে বদলি হওয়া এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, সুফল বাগান করার জন্য হেক্টরপ্রতি বরাদ্দকৃত টাকা থেকে ৩৫ পার্সেন্ট টাকা ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের ম্যানেজ করার নামে বিভাগীয় বন কর্মকর্তার অফিস থেকে কেটে নেয়া হয়। বাকি ৬৫ শতাংশ টাকা দিয়ে ভারপ্রাপ্ত রেঞ্জ অফিসার গণের শতভাগ বনায়ন করা সম্ভব হয় না। তারপর তাদেরও মাঝে মধ্যে উর্দ্ধতন কর্মকর্তাদের ম্যানেজ করতে হয়। ফলে বাকি টাকার ৫০ থেকে ৬০ শতাংশ এলাকায়ও বাগান করা সম্ভবপর হয়ে উঠেনা। এরপর রেঞ্জ কর্মকর্তা, বীট কর্মকর্তা, ফরেস্ট গার্ড তো রয়েছে। তারাও তো কষ্ট করে বাগান করতে গিয়ে উপরি দু'পয়সা আয় করতে চায়।
সূত্র মতে বাগান করার পূর্বে শ্রমিকদের ডাটাবেজ করার কথা থাকলেও কক্সবাজারে তা উপেক্ষিত হয়েছে। এই ডাটাবেজ নিয়োগকৃত দিনমজুররা সারা বছর কাজ করার কথা। ডাটাবেজে উল্লেখিত শ্রমিকদের এনআইডি কার্ড সংরক্ষণসহ মাস্টাররোলে সই স্বাক্ষর রাখার বিধান রয়েছে। কিন্তু বিট ও রেঞ্জ অফিসারগণ রোহিঙ্গা নেতাদের মাধ্যমে শত শত রোহিঙ্গাকে অনিয়মতান্ত্রিকভাবে ক্যাম্প থেকে বের করে এনে তাদেরকে দিয়ে বাগানের মাটি কাটা, ব্যাগে মাটি ভরা ও ব্যাগে বীজ দেয়ার কাজ করিয়ে ছিলেন। এক্ষেত্রে মাস্টাররোলে দিনমজুরদের মাথাপিছু ৫/৬শ টাকা হারে পারিশ্রমিক তুলে রোহিঙ্গা শ্রমিকদের ১৫০/২০০ টাকা দিয়ে বাকি টাকা আত্মসাৎ করা হয়। এসকল রোহিঙ্গা শ্রমিকদের জাল এনআইডি কার্ড বানিয়ে ভুয়া নাম ঠিকানা ও আইডি নং বসিয়ে প্রিন্ট করে সরকারী ফাইলে সংরক্ষিত করা হয়। আবার গোবর সার, রাসায়নিক সার, বাঁশের খুঁটি ক্রয়ের ক্ষেত্রেও সংশ্লিষ্ট বিভাগীয় বন কর্মকর্তারাগন কিছু দূর্নীতিবাজ ঠিকাদারের সাথে যোগসাজশে কাগজপত্রেই টেন্ডার প্রক্রিয়া সম্পন্ন করে কোন মাল সাপ্লাই ছাড়াই ঠিকাদারকে বরাদ্দকৃত টাকার ১০শতাংশ নগদ দিয়ে বাকি টাকা আত্মসাৎ করার ও অভিযোগ রয়েছে। আর এ কারনেই গাছের গোড়ায় সার দেয়া বা খুটি লাগানো হয়নাই। কক্সবাজার থেকে বদলি হওয়া ওই কর্মকর্তা আক্ষেপ করে বলেন, বনায়ন কর্মসূচী সফল করার জন্য হেক্টর প্রতি যে অর্থ সরকারি কাগজপত্রে দেখানো হয় তা বাস্তবায়নকারী কর্মকর্তার হাতে সঠিকভাবে পৌছায় না। ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের নামে নামে পার্সেন্টেজ দিতে দিতে বাস্তবায়নকারী কর্মকর্তার হাতে যে অর্থ পৌঁছায় তা বিষফোড়ায় পরিণত হয়। না পারে কইতে না পারে সইতে। কেউ অপারগতা প্রকাশ করলে তার ওপর নেমে আসে নির্যাতনের খড়গ। হয় অন্যত্রে খারাপ জায়গায় বদলী নতুবা তাকে বসিয়ে রেখে আস্থাভাজন কর্মকর্তাকে দিয়ে দায়সারা গোছের বনায়নের কাজ সমাধা করে। কর্মসূচী শেষে নিয়ন্ত্রনকারী কর্মকর্তা পরিদর্শনে গিয়ে ৯০ শতাংশ সাকসেস দেখিয়ে আদেশ বইতে লিপিবদ্ধ করেন। পরবর্তীতে বাগানের অস্তিত্ব না পেলে সম্পূর্ণ দায়ভার চাপে বীটে কর্মরতদের উপর। তার মতে, সুফল প্রকল্পে এত অনিয়ম শুধুমাত্র প্রকল্প পরিচালক ও পরামর্শক গনের যথাযথ তদারকী ও সরেজমিন পরিদর্শনের অভাবেই হয়েছে। তারা যথাযথ তদারকি করলে প্রকল্পের উদ্দেশ্য আদর্শ বাস্তবায়ন সম্ভবপর হতো।
গত ৫ আগস্ট সরকার পরিবর্তনের পর কক্সবাজার উত্তর বন বিভাগের বাঘখালি রেঞ্জে ২৫৮০ হেক্টর বাগান সৃজন না করে ভারপ্রাপ্ত রেঞ্জ কর্মকর্তা ফরেস্টার সারোয়ার জাহান ২০-২৫ কোটি টাকা আত্মসাৎ করেছেন বলে মন্ত্রনালয়ে গনস্বাক্ষরিত অভিযোগ দাখিল হলে মন্ত্রণালয় থেকে অভিযোগটি তৎকালীন ডিএফও আনোয়ার হোসেন সরকারকে তদন্তের নির্দেশ দেন। ডিএফও আনোয়ার তদন্তে শতভাগ কাজ হয়েছে বলে প্রতিবেদন দেন। কারণ হিসেবে জানা যায় তিনি বরাদ্দকৃত টাকার ৩৫ শতাংশ প্রথমেই বন সংরক্ষক ও প্রকল্প পরিচালকের নামে কেটে রাখেন। এছাড়া বিভিন্ন অজুহাতে রেঞ্জ অফিসারদের ওপর চাপ প্রয়োগ করে বাড়তি অনেক টাকা হাতিয়ে নিয়েছিলেন বলেই এহেন অসত্য প্রতিবেদন দাখিল করেন। পরবর্তীতে এই প্রতিবেদন ঊর্ধ্বতন ও কর্তৃপক্ষের কাছে গ্রহণযোগ্য না হওয়ায় পূন:তদন্তের জন্য ডিসিএফ মো: আনিসুর রহমানকে দায়িত্ব দেয়া হয়। এ সময় তিনি সরেজমিন তদন্তকালীন ১৫ কোটি টাকা খরচের যে ভাউচার ফাইলে প্রদর্শন করা হয়েছিল ঐ ভাউচারের ওপর স্বাক্ষরকৃত ব্যাক্তির নাম ঠিকানা যাচাই করে কাউকে খুজে না পাওয়া সহ কোন সত্যতা না পেয়ে ১৫ কোটি টাকার ভাউচার সম্পূর্ণ ভুয়া ও বানোয়াট বলে প্রতিবেদন উল্লেখ করেন। বিষয়টি বর্তমানে প্রধান বন সংরক্ষকের দপ্তরে বিবেচনাধীন রয়েছে বলেও সূত্র জানায়।
সুফল প্রকল্পের দুর্নীতি ও অনিয়ম নিয়ে অনুসন্ধানরত দুদক এনফোর্স টিমের এক কর্মকর্তা উল্লেখিত রেঞ্জসহ চট্টগ্রাম সার্কেলের বেশ কয়েকটি রেঞ্জে অনিয়মের তথ্য পেয়েছেন বলে জানান। তিনি সংশ্লিষ্ট দায়ী ডিফও, রেঞ্জ অফিসার, ঠিকাদারদের বিরুদ্ধে অচিরেই ব্যবস্থা নেয়া সহ অবসরে যাওয়া কয়েকজন কর্মকর্তার বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণের প্রক্রিয়া অচিরেই শুরু হবে বলে জানান। এই কর্মকর্তা মন্ত্রী পুত্র জুম্মন কসাইকে প্রকল্প পরিচালক নিজের হাতেই মন্ত্রীর বাসায় গিয়ে টাকা পৌঁছে দিয়ে আসার বিষয়েও সত্যতা পেয়েছেন বলেও জানান।
