ব্লু-ইকোনমি: চ্যালেঞ্জ ও সম্ভাবনা

এস এম সাইফ আলী
এস এম সাইফ আলী
প্রকাশিত: ডিসেম্বর ৮, ২০২৪ ১৭:১০:৫৯  আপডেট :  ডিসেম্বর ৮, ২০২৪ ১৯:৪৭:৩৮

বিশ্বব্যাংকের মতে, ব্লু-ইকোনমি বা সুনীল অর্থনীতি এমন একটি ধারণা যা দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি, সামাজিক অন্তর্ভুক্তি এবং জীবিকার সংরক্ষণে সহায়তা করার পাশাপাশি সমুদ্র ও উপকূলীয় অঞ্চলের পরিবেশগত স্থায়িত্বও নিশ্চিত করে। ব্লু-ইকোনমির মূল লক্ষ্য হচ্ছে কর্মসংস্থান সৃষ্টি, সম্পদের সুষ্ঠু ব্যবহার, আয় বৃদ্ধি, এবং পরিবেশে সঞ্চয় ও বিনিয়োগের মধ্যে ভারসাম্য স্থাপন করা। এটি সমুদ্রসম্পদকে ব্যবহারের মাধ্যমে অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি আনতে সহায়তা করে এবং একই সাথে পরিবেশের ক্ষতি রোধ করতে সহায়ক হয়।

ব্লু-ইকোনমির ধারণাটি প্রথম প্রবর্তন করেন বেলজিয়ান অর্থনীতিবিদ গুন্টার পাওলি ১৯৯৪ সালে। তবে ২০১২ সালের রিও+২০ সম্মেলনে এটি বৈশ্বিক পর্যায়ে গুরুত্ব পায় এবং সারা বিশ্বে এটি টেকসই উন্নয়নের একটি অন্যতম প্রধান স্তম্ভ হিসেবে বিবেচিত হয়। বাংলাদেশের জন্য ব্লু-ইকোনমি একটি বিশাল সম্ভাবনা সৃষ্টি করেছে, বিশেষ করে বঙ্গোপসাগরের উপকূলীয় অঞ্চলের সমুদ্র সম্পদ নিয়ে।

বাংলাদেশে ব্লু-ইকোনমির সম্ভাবনা:

বাংলাদেশের সাগর, বঙ্গোপসাগর, সমুদ্রসীমা এবং উপকূলীয় অঞ্চল বাংলাদেশের ব্লু-ইকোনমির মূল ভিত্তি। বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, এই বিশাল সমুদ্র অঞ্চলের সঠিক ব্যবহার দেশের অর্থনীতিতে বিপুল উন্নতি আনতে পারে। ২০১২ সালের আন্তর্জাতিক আদালতের রায়ে মিয়ানমারের সঙ্গে এবং ২০১৪ সালে ভারতের সঙ্গে সমুদ্রসীমা বিরোধ নিষ্পত্তির পর বাংলাদেশের সামুদ্রিক এলাকা ১১৮,৮১৩ বর্গকিলোমিটার বেড়েছে। এখন বাংলাদেশ ২০০ নটিক্যাল মাইল একচ্ছত্র অর্থনৈতিক অঞ্চলের অধিকারী, যেখানে রয়েছে বিপুল পরিমাণ প্রাকৃতিক সম্পদ।

এই সমুদ্রসীমায় তেল, গ্যাস, খনিজ সম্পদ, মাছ এবং অন্যান্য সামুদ্রিক জীবজাত সম্পদ রয়েছে। বিশেষ করে, বাংলাদেশে গ্যাস ও তেলের সম্ভাবনা বিশাল, এবং মিথেন গ্যাস (গ্যাস হাইড্রেট) আবিষ্কারও হয়েছে। সামুদ্রিক মাছ আহরণের জন্য বাংলাদেশে প্রচুর সম্ভাবনা রয়েছে, বিশেষত গভীর সমুদ্রে টুনা, টুনা জাতীয় মাছ এবং অন্যান্য মূল্যবান সামুদ্রিক জীব। বঙ্গোপসাগরের গভীর সমুদ্রে মূল্যবান খনিজ যেমন ইলমেনাইট, টাইটেনিয়াম অক্সাইড, জিরকন, ব্লুটাইল ইত্যাদির উপস্থিতি পাওয়া গেছে, যা যথাযথভাবে উত্তোলন করা গেলে প্রচুর বৈদেশিক মুদ্রা আয় করা সম্ভব।

বিশ্বে প্রায় ৮০৭ কোটি মানুষের ১৫% প্রোটিন সরবরাহ হয় সামুদ্রিক খাদ্যপণ্য থেকে, এবং সমুদ্রের তলদেশে বিশ্বের ৩০% গ্যাস ও তেল সরবরাহ হচ্ছে। অর্থাৎ, ব্লু-ইকোনমি শুধু বাংলাদেশের জন্য নয়, বৈশ্বিক অর্থনীতির জন্যও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

এছাড়া, বাংলাদেশের উপকূলীয় অঞ্চলে প্রায় ১২০ কিলোমিটার দৈর্ঘ্যের বিশ্বের সবচেয়ে বড় অবিচ্ছিন্ন বালুময় সমুদ্র সৈকত রয়েছে, যা পর্যটনের জন্য সম্ভাবনাময়। সমুদ্র সৈকত, কৃত্রিম দ্বীপ সৃষ্টির মাধ্যমে পর্যটন খাতে বিপুল সম্ভাবনা সৃষ্টি করা সম্ভব। উপকূলীয় পর্যটন থেকে বিশ্বের মোট জিডিপির প্রায় ৫% আসে এবং বিশ্বব্যাপী প্রায় ৬-৭% মানুষ এই খাতে কর্মসংস্থানের সুযোগ পায়।

ব্লু-ইকোনমি: বাংলাদেশের চ্যালেঞ্জসমূহ:

ব্লু-ইকোনমির বিকাশের জন্য কিছু চ্যালেঞ্জ রয়েছে, যা মোকাবিলা করা প্রয়োজন। প্রথমত, বাংলাদেশে ব্লু-ইকোনমি সম্পর্কিত যথেষ্ট নীতিমালা ও সঠিক কর্মপরিকল্পনা নেই। ব্লু-ইকোনমি সম্পর্কে সঠিক তথ্যের অভাব, মেরিন রিসোর্সভিত্তিক গবেষণার অভাব, এবং সমুদ্র বিষয়ক প্রযুক্তিগত জ্ঞানের অভাব রয়েছে। এছাড়া, গবেষণার জন্য প্রয়োজনীয় সমুদ্র গবেষণা জাহাজের অভাব রয়েছে।

দ্বিতীয়ত, এই খাতে দক্ষ জনবল তৈরি এবং জনসচেতনতার অভাব রয়েছে। ব্লু-ইকোনমি সম্পর্কিত বিশেষজ্ঞ, বিজ্ঞানী, এবং প্রশিক্ষিত শ্রমিকের সংখ্যা অত্যন্ত কম। বাংলাদেশে এখনও পর্যাপ্ত পরিমাণে সমুদ্রের জীবজন্তু এবং অন্যান্য সম্পদের উপর বৈজ্ঞানিক গবেষণা পরিচালিত হয়নি। পাশাপাশি, উপকূলীয় অঞ্চলে পরিবেশগত দূষণ ও মানবসৃষ্ট সমস্যা যেমন অবৈধ মাছধরা, দূষণ, ভূমিক্ষয় ইত্যাদি ব্লু-ইকোনমির বিকাশে বাধা সৃষ্টি করতে পারে।

এছাড়া, বাংলাদেশে ব্লু-ইকোনমি খাতে পর্যাপ্ত আন্তর্জাতিক এবং আঞ্চলিক সহযোগিতা ও সংযোগ নেই। সামুদ্রিক পরিবহন, বিদ্যুৎ উৎপাদন, খনিজ সম্পদের উত্তোলন ইত্যাদির জন্য আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর সঙ্গে যৌথ উদ্যোগ গঠন প্রয়োজন।

ব্লু-ইকোনমির উন্নয়নে প্রস্তাবিত কার্যক্রম:

ব্লু-ইকোনমি বিকাশের জন্য একাধিক কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া যেতে পারে। প্রথমত, ব্লু-ইকোনমি সম্পর্কিত একটি জাতীয় নীতিমালা প্রণয়ন করা উচিত। এর মধ্যে সমুদ্র গবেষণার জন্য প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি, প্রযুক্তি এবং জাহাজের ব্যবস্থা করা প্রয়োজন। সরকার এবং বেসরকারি খাতের সহযোগিতায় উন্নত প্রযুক্তির মাধ্যমে সামুদ্রিক সম্পদের সর্বোচ্চ ব্যবহার নিশ্চিত করা যেতে পারে।

দ্বিতীয়ত, ব্লু-ইকোনমি খাতে গবেষণা ও প্রশিক্ষণের সুযোগ বৃদ্ধি করা উচিত। বিশেষ করে মৎস্য, সামুদ্রিক জীববিদ্যা, সমুদ্র পরিবহন, ব্লু-গ্রোথ, এবং সমুদ্র খনিজ উত্তোলন বিষয়ে গবেষণার জন্য পর্যাপ্ত অর্থায়ন এবং আন্তর্জাতিক সহযোগিতা প্রয়োজন।

এছাড়া, স্থানীয় জাহাজ নির্মাণ শিল্পের উন্নয়ন এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্য সম্প্রসারণের জন্য গভীর সমুদ্র বন্দর নির্মাণ এবং বন্দরের আধুনিকীকরণ প্রয়োজন। বাংলাদেশের সমুদ্রের উপকূলীয় অঞ্চলকে নতুন প্রযুক্তি ব্যবহারের মাধ্যমে আরো কার্যকরী এবং পরিবেশবান্ধব করা যেতে পারে।

সমুদ্র শক্তি উৎপাদন:

ব্লু-ইকোনমি বিকাশে একটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হলো সমুদ্র শক্তি উৎপাদন। সমুদ্রের ওয়েভ (তরঙ্গ), জোয়ার-ভাটার গতিপথ, এবং তাপমাত্রার পার্থক্য থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদন করা সম্ভব। বর্তমান প্রযুক্তির সাহায্যে, এই ধরনের শক্তি উৎপাদন বাংলাদেশের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে। এ জন্য গবেষণা এবং পরীক্ষামূলক প্রকল্প চালানো দরকার।

ব্লু-ইকোনমি বাংলাদেশের জন্য একটি বিশাল সম্ভাবনার ক্ষেত্র হতে পারে। তবে এর বিকাশে অনেক চ্যালেঞ্জ রয়েছে, যা সরকারের পদক্ষেপ এবং আন্তর্জাতিক সহযোগিতার মাধ্যমে সমাধান করা সম্ভব। ব্লু-ইকোনমি খাতে কার্যকরী পরিকল্পনা ও বাস্তবায়ন, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির ব্যবহারে বিনিয়োগ এবং স্থানীয় জনগণের সচেতনতা বৃদ্ধি এই খাতের উন্নয়নে সহায়ক হবে। ব্লু-ইকোনমির মাধ্যমে বাংলাদেশ কেবল অর্থনৈতিক উন্নতি অর্জন করবে না, পরিবেশগত সুরক্ষা এবং সামুদ্রিক সম্পদের সুষ্ঠু ব্যবহারে দৃষ্টান্ত স্থাপন করতে সক্ষম হবে।