নির্বাক উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা
নান্দাইলের দিলালপুর উচ্চ বিদ্যালয়ে চলছে হরিলুট ॥ দেখার কেউ নেই

ময়মনসিংহের নান্দাইলে দিলালপুর উচ্চ বিদ্যালয়ের লক্ষ লক্ষ টাকা মূল্যের বৃক্ষ সম্পদ, বিদ্যালয়ের সম্পত্তি দখল, অবৈধ পন্থায় বিদ্যালয়ে নাইটগার্ড নিয়োগ সহ হরিলুটের রাজ্যে পরিণত হয়েছে এই বিদ্যালয়। বিদ্যালয়ের উন্নতি তো দূরের কথা ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে নিয়ে গেছে সাবেক কমিটি এবং তার সহযোগী একদল প্রতারক, ও আইন শৃংখলা ভঙ্গকারী শিক্ষাবিদ্বেষী লোক। উক্ত বিদ্যালয়ে বর্তমান ম্যানেজিং কমিটির ভারপ্রাপ্ত সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন নান্দাইল উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ফাতেমা জান্নাত। তদুপরি বিদ্যালয়ের উন্নয়ন এবং সম্পত্তি রক্ষায় নেই কোন পদক্ষেপ। হরিলুটে পরিণত হয়েছে বিদ্যালয়ের কার্যক্রম এবং সম্পদসহ সম্পত্তি। এ রকম হাজারো অভিযোগ উত্থাপিত হয় উক্ত বিদ্যালয় এর কার্যক্রমকে ঘিরে।
অনুসন্ধানে উঠে আসে,আব্দুল আজিজ তাহার জীবদ্দশায় দিলালপুর উচ্চ বিদ্যালয়কে পৈত্রিক সম্পত্তি থেকে বিগত ০৮/০৯/৬৯ খ্রিঃ তারিখে ৫৩৬৮ নং স্বত্বর্পন দলিল মূলে প্রায় ০.৩১ একর সম্পত্তি দান করেন। এলাকাবাসী এবং স্কুলের ছাত্র-ছাত্রীদের চলাচলের সুবিধার জন্য বিগত ৩০/০৩/১৯৮৮ খ্রিঃ তারিখে বিদ্যালয়ের সাধারণ সভায় এলাকার গণ্যমান্য ৭৪ জনের উপস্থিতিতি এবং স্বাক্ষরে দিলালপুর উচ্চ বিদ্যালয়ের মাঠের দক্ষিণ পার্শ্বে পূর্ব সীমানা হতে পশ্চিম পাশ বরাবর ৫ হাত প্রন্থ একটি রাস্তার জন্য সর্বসম্মতিক্রমে সিদ্ধান্ত গৃহীত হয় । উল্লেখিত রাস্তার দক্ষিণ পার্শ্বে বিদ্যালয়ের অর্থায়নে বিগত ৪০ বছর যাবৎ বিভিন্ন বৃক্ষ রোপণ করে বিদ্যালয়ের সৌন্দর্য ও অর্থনৈতিক স্বাবলম্বীর জন্য কাজ করেছে বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ । কিন্তু পরিতাপের বিষয় মো: ছিদ্দিকুর রহমান গং উক্ত বিদ্যালয়ের ৪০ বছরের পুরনো কয়েক লক্ষ টাকার গাছ এবং স্কুল সংলগ্ন স্কুলের জমি জোরপূর্বক দখল করে গাছ কেটে নিয়ে যায়। জানা যায় ছিদ্দিকুর রহমানগং বাদী হয়ে স্কুলের প্রধান শিক্ষক মোঃ রুহুল আমিন এবং জমি দাতার ওয়ারিশগণের বিরুদ্ধে একটি মিথ্যা এবং প্রতারণা মূলক মামলা দায়ের করেন। মামলার নম্বর ১৩৭২/২০২৫ অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট নান্দাইল আদালত, ময়মনসিংহ। উক্ত আমলি আদালত কাগজপত্র ও সাক্ষ্য পর্যালোচনার ভিত্তিতে বাদী ছিদ্দিক রহমান গং এর বিপক্ষে বিবাদী দিলালপুর উচ্চ বিদ্যালয়ের পক্ষে আদালত আদেশ প্রদান করেন। আদালতের আদেশ ছিদ্দিকুর রহমানের বিপক্ষে যাওয়ার কারণে আমলী আদালতের আদেশকে অমান্য করে গায়ের জোর ও সন্ত্রাস বাহিনীর মাধ্যমে প্রকাশ্যে দিবালোকে কয়েক লক্ষ টাকার গাছ কেটে নিয়ে যায়। এ সময় নির্বাক ভূমিকায় ছিলেন দিলালপুর উচ্চ বিদ্যালয়ের বর্তমান ভারপ্রাপ্ত সভাপতি, নান্দাইল উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ফাতেমা জান্নাত সহ সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাবৃন্দ।
এ বিষয়ে মুঠোফোনে জানতে চাইলে নান্দাইল উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ভারপ্রাপ্ত সভাপতি, দিলালপুর উচ্চ বিদ্যালয়) ফাতেমা জান্নাত বলেন, যার জায়গায় গাছ তিনি গাছ কেটে নিয়েছেন ,মামলা অথবা ১৪৪ ধারা সম্পর্কে আমি কিছুই জানিনা। এমনকি স্কুল প্রধান এই ব্যাপারে আমাকে অবগত করেন নাই।
এ বিষয়ে নান্দাইল উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা অফিসার মোঃ মফিজুল ইসলাম (ভারপ্রাপ্ত) বলেন, দিলালপুর উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মোঃ রুহুল আমিনের মাধ্যমে মামলার বিষয়ে আমি এবং উপেজলা নির্বাহী কর্মকর্তা জানতে পারি। যেহেতু স্যার দিলালপুর উচ্চ বিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত সভাপতি বিস্তারিত তিনি বলতে পারবেন।
অনুসন্ধানে আরো উঠে আসে, দিলালপুর উচ্চ বিদ্যালয়ের সম্পদ ও লক্ষ লক্ষ টাকার গাছ কাটার সময় স্কুলের প্রধান শিক্ষক মোঃ রুহুল আমিন এবং জমি দাতার ওয়ারিশগণ বাধা প্রদান করলে মো: ছিদ্দিকুর রহমান গং বাদী হয়ে একটি মিথ্যা এবং প্রতারণা মূলক মামলা দায়ের করেন । মামলার নম্বর ১৩৭২/২০২৫ অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট নান্দাইল আদালত ময়মনসিংহ। ময়মনসিংহ জেলার অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট নান্দাইল আদালত মামলাটি আমলে নিয়ে একাধিক তথ্য প্রমাণের ভিত্তিতে বিগত ২৩-৪-২০২৬ খ্রি তারিখ একটি আদেশ প্রদান করেন। আসাদুজ্জামান অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট ময়মনসিংহ স্বাক্ষরিত আদেশে উল্লেখ করা হয়, ১ম পক্ষ (ছিদ্দিকুর রহমানগং) হীন মানসিকতায় উক্ত বিদ্যালয়ের ভূমি ও বৃক্ষ সম্পদ অবৈধভাবে দখল করে নেওয়ার প্রয়াসে মিথ্যা মোকদ্দমা দায়ের করেন। এ অবস্থায় ১ম পক্ষের শান্তি ভঙ্গের কারন অযৌক্তিক ও ভিত্তিহীন মর্মে মোকদ্দমাটি নথিজাতের প্রার্থনা করেন।
বিবেচ্য বিষয়ঃ নালিশী ভূমির পাশে বিদ্যালয় অবস্থিত। নালিশী ভূমির একপাশে রাস্তা রয়েছে। উক্ত রাস্তা ১ম পক্ষের পিতা সেচ্ছায় সর্বসাধারণসহ স্কুলে ছাত্র-ছাত্রীদের চলাচলের জন্য উন্মুক্ত করেন। তৎসময় হতে অদ্যাবধি পর্যন্ত স্কুলের ছাত্র-ছাত্রীসহ সর্বসাধারণের চলাচলের রাস্তা হিসেবে ব্যবহারিত হচ্ছে। এ পর্যায়ে ১ম পক্ষকে ১৪৪ ধারায় প্রতিকার দেওয়ার মতো সুযোগ নেই মর্মে আদালতে নিকট প্রতীয়মান হওয়ায় মোকদ্দমাটি খারিজযোগ্য।
অতএব, আদেশ হচ্ছে যে, সার্বিক পর্যালোচনায়, নালিশী ভূমিতে অবস্থিত চলমান রাস্তায় স্কুলের ছাত্র-ছাত্রীসহ সর্বসাধারণের চলাচলের বিঘ্ন সৃষ্টি না করার জন্য ১ম পক্ষকে (ছিদ্দিকুর রহমানগং) বলা হলো। মামলাটি নথিজাত করা হলো। আদেশের কপি সংশ্লিষ্ট সকলকে প্রদান করা হোক।
এ বিষয়ে বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের একজন বিজ্ঞ আইনজীবী বলেন, যেহেতু আদালতে একটি মামলা হয়েছে এবং মামলার আদেশ স্কুলের পক্ষে এসেছে, সেক্ষেত্রে অনুমতি ছাড়া গাছ কেটে বিদ্যালয়ের ক্ষতি করার কারণে সম্পত্তির ক্ষতিসাধন এবং অন্যের সম্পত্তি আত্মসাৎ করার কারণে তার বিরুদ্ধে ফৌজদারি মামলা হতে পারে।
বিশেষভাবে উল্লেখ্য যে, ২০২৬ সালের বৃক্ষ সংরক্ষণ সংক্রান্ত নতুন অধ্যাদেশ অনুযায়ী শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের গাছ কাটার ক্ষেত্রে বৃক্ষ সংরক্ষণ কর্মকর্তার পূর্ব অনুমোদন লাগবে। তাছাড়া যথাযথ প্রক্রিয়া অবলম্বন না করিয়া অন্যায় ভাবে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের গাছ কাটার কারণে তার বিরুদ্ধে (ঋড়ৎবংঃ অপঃ ১৯২৭) এর অধীন মামলা ও ক্ষতিপূরণ আদায়ের ব্যবস্থা গ্রহণ করা যেতে পারে।
এ বিষয় দিলালপুর উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মোঃ রুহুল আমিন বলেন, স্কুল জনসাধারণ এবং সরকারের সম্পদ, আমি প্রধান শিক্ষক হিসেবে পরিচালনার দায়িত্বে রয়েছি। স্কুলের জমি মাপা এবং ৪০ বছরের পুরনো গাছ কেটে নেয়ার দাবি করা ছিদ্দিকুর রহমান গং এর বিষয়ে সমস্ত কিছু নান্দাইল উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ফাতেমা জান্নাত স্যারকে লিখিতভাবে অবগত করি। মামলা হয়েছে স্কুলের বিরুদ্ধে, মামলায় রায় পেয়েছে স্কুল, প্রতিটি বিষয় লিখিতভাবে নান্দাইল উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ফাতেমা জান্নাত স্যারকে (ভারপ্রাপ্ত সভাপতি দিলালপুর উচ্চ বিদ্যালয়) অবগত করি। তিনি বিষয়টি দেখবেন বলে আমাকে জানান। তারপর ছিদ্দিকুর রহমান গং স্কুলের অর্থায়নে লাগানো দীর্ঘ ৪০ বছরের পরিচর্যায় বেড়ে ওঠা গাছগুলো কেটে নেওয়ার সময়ও স্যারকে অবহিত করি। কিন্তু গাছগুলো কেটে নেওয়ার সময় স্কুলের পক্ষ থেকে আর কোন ভূমিকা আমরা রাখতে পারিনি।
প্রধান শিক্ষক রুহুল আমিন আরো জানান, যেহেতু দিলালপুর উচ্চ বিদ্যালয় এর পক্ষে আমলি আদালত একটি আদেশ প্রদান করেছেন ,সে কারণে দাতাগনের ওয়ারিশগন বিগত ২৭/০৮/২০২৬ ইং তারিখ মোঃ শরীফ মিয়া, পিতা আব্দুল হাই ভূঁইয়া, সাং নওগাঁও, দিলালপুর, নান্দাইল ময়মনসিংহ বাদী হয়ে আব্দুল হাকিম এবং মো: ছিদ্দিকুর রহমান গংদের বিরুদ্ধে ফৌজদারী কার্যবিধির ১৩৩ ধারায় একটি মামলা দায়ের করেন। মোকদ্দমা নম্বর ৮৬৩/২০২৬, তারিখ ২৭/০৮/২০২৬ ইং অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট নান্দাইল আদালত ময়মনসিংহ।
এ বিষয়ে মোঃছিদ্দিকুর রহমানের সাথে মুঠো ফোনে যোগাযোগ করলে তিনি বলেন, নান্দাইল উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মামলাসহ সকল বিষয় জানেন। স্কুল কর্তৃপক্ষ এবং আমাদের মধ্যে বিভেদ তৈরি হওয়ার পর উভয় পক্ষকে ডেকে নিয়ে নান্দাইল উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা বিরোধ নিষ্পত্তির লক্ষ্যে গাছ কাটার অনুমতি প্রদান করেন এবং আমরা গাছ কেটে নেই। উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার অনুমতি ক্রমে আমরা সমস্ত কিছু করেছি। মামলার আদেশের বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি এড়িয়ে যান।
