রাঙামাটি বন বিভাগে বদলি বাণিজ্য ও জোত পারমিটের ‘মহোৎসব’ ধ্বংসের মুখে সংরক্ষিত বনাঞ্চল

পার্বত্য চট্টগ্রামের প্রাকৃতিক ফুসফুস খ্যাত রাঙামাটি অঞ্চলের বন বিভাগ সমূহ এখন দুর্নীতির আখড়ায় পরিণত হয়েছে। খোদ বন সংরক্ষক (সিএফ) মোহাম্মদ আবদুল আউয়াল সরকারের নেতৃত্বে গড়ে ওঠা এক শক্তিশালী সিন্ডিকেটের হাতে জিম্মি হয়ে পড়েছে এই অঞ্চলের বনজ সম্পদ। বদলি বাণিজ্য থেকে শুরু করে অবৈধ কাঠ পাচার—সবখানেই এখন টাকার খেলা।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, বন সংরক্ষক আবদুল আউয়াল সরকার তার প্রশাসনিক ক্ষমতা ব্যবহার করে বিশাল এক সিন্ডিকেট গড়ে তুলেছেন। এই সিন্ডিকেটের মূল কারিগর হিসেবে কাজ করছেন কয়েকজন ‘ধুরন্ধর’ ডেপুটি রেঞ্জার। তাদের মাধ্যমেই নিয়ন্ত্রিত হয় নিয়োগ ও বদলি প্রক্রিয়া।
পোস্টিংয়ের ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট ‘রেট’ নির্ধারিত রয়েছে। খাগড়াছড়ি বন বিভাগ থেকে শুরু করে উত্তর, দক্ষিণ, ঝুম নিয়ন্ত্রণ, অশ্রেণীভুক্ত বনায়ন এবং কাপ্তাই পাল্পউড বাগান বিভাগ পর্যন্ত প্রতিটি বিভাগের জন্য রয়েছে আলাদা আলাদা দর।
পদভেদে (ফরেস্ট রেঞ্জার, ডেপুটি রেঞ্জার, ফরেস্টার ও ফরেস্ট গার্ড) বদলি হতে হলে ২ লক্ষ টাকা থেকে শুরু করে ৫ লক্ষ টাকা পর্যন্ত ঘুষ দিতে হয়। এই অর্থ আদায়ের সম্পূর্ণ তদারকি করে সিএফ-এর বিশ্বস্ত সেই সিন্ডিকেট। বনের কাঠ বৈধ করার সবচেয়ে বড় হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে ‘ভূয়া জোত পারমিট’। অভিযোগ রয়েছে, বিভিন্ন ডিভিশনে জোত পারমিট ইস্যুর বিনিময়ে প্রতি ঘনফুট কাঠ থেকে ৫ টাকা হারে কমিশন গ্রহণ করেন বন সংরক্ষক। এই ভূয়া পারমিটের আড়ালে সংরক্ষিত বনাঞ্চলের (Reserve Forest) শতবর্ষী গাছ উজাড় করে পাচার করা হচ্ছে। বন বিভাগের নাকের ডগা দিয়ে প্রতিদিন বিপুল পরিমাণ কাঠ পাচার হলেও ‘মাসিক মাসোহারা’র কারণে কর্মকর্তারা নির্বিকার। শুধু বদলি বা পারমিট নয়, বিভিন্ন রেঞ্জ ও বনজ শুল্ক পরীক্ষাকেন্দ্র (চেক স্টেশন) থেকে নিয়মিত মাসিক চাঁদা তোলার অভিযোগও দীর্ঘদিনের। প্রতিটি স্টেশন থেকে একটি নির্দিষ্ট অংকের টাকা সরাসরি সিন্ডিকেটের মাধ্যমে বন সংরক্ষকের পকেটে যায় বলে তথ্য মিলেছে। সংরক্ষিত বনাঞ্চল রক্ষা করার দায়িত্ব যাদের, তাদের এমন পরিকল্পিত লুটপাটে রাঙামাটির পরিবেশ আজ হুমকির মুখে। স্থানীয়দের মতে, গত কয়েক বছরে বনের ঘনত্ব আশঙ্কাজনকভাবে কমেছে। বন্যপ্রাণী হারাচ্ছে তাদের আবাসস্থল, আর সরকারি রাজস্ব ফাঁকি দিয়ে পকেট ভারী হচ্ছে গুটি কয়েক অসাধু কর্মকর্তার।
এসব অভিযোগের বিষয়ে বন সংরক্ষক মোহাম্মদ আবদুল আউয়াল সরকারের সাথে যোগাযোগ করার চেষ্টা করা হলে তাকে পাওয়া যায়নি। তবে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কয়েকজন কর্মকর্তা জানিয়েছেন, এই সিন্ডিকেটের দাপটে সৎ কর্মকর্তারা কোণঠাসা হয়ে পড়েছেন। রাঙামাটির বনজ সম্পদ রক্ষায় এবং এই প্রাতিষ্ঠানিক দুর্নীতি বন্ধে উচ্চ পর্যায়ের বিচার বিভাগীয় তদন্ত প্রয়োজন বলে মনে করছেন পরিবেশবাদী ও সচেতন মহল।
