প্যারাবন ও খাল দখল করে নির্মান করা হচ্ছে রিসোর্ট

কক্সবাজারে পরিবেশ ও প্রতিবেশ সংকটাপন্ন এলাকায় চালানো হচ্ছে জীববৈচিত্র বিধ্বংসী কর্মকান্ড

বিশেষ প্রতিনিধি
বিশেষ প্রতিনিধি
প্রকাশিত: মার্চ ৯, ২০২৪ ২০:১১:০৪  আপডেট :  মার্চ ৯, ২০২৪ ২০:১১:৩৪

কক্সবাজার মেরিন ড্রাইভ সড়কের পেঁচারদ্বীপে প্যারাবন ও খাল দখল করে রিসোর্ট নির্মাণ করা হচ্ছে। জানা গেছে, স্থানীয় কয়েক প্রভাবশালীর সহযোগিতায় মারমেইড কর্তৃপক্ষ সাগরপাড়ের সরকারি জমি জবরদখল করলেও প্রশাসন নীরব ভূমিকায় রয়েছে।

পরিবেশ ও প্রতিবেশ সংকটাপন্ন এলাকায় এসব জীববৈচিত্র্য বিধ্বংসী কর্মকান্ড চালানো হলেও সংশ্লিষ্ট প্রশাসন কোনো ব্যবস্থা নিচ্ছে না। এ ঘটনায় উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন স্থানীয় বাসিন্দারা ও পরিবেশবাদীরা।সূত্রে জানায়, সাগরপাড়ের খাস খতিয়ানের বিশাল এলাকা দখল করে নানাভাবে স্থাপনা নির্মাণ করা হচ্ছে অবাধে। এক্সকেভেটর দিয়ে মাটি কেটে প্যারাবনের ব্যাপক ক্ষতিসাধন করা হচ্ছে প্রতিনিয়ত।

নির্বিচারে কাটা হচ্ছে প্যারাবনের বাইন, কেওড়াসহ বিভিন্ন প্রজাতির ছোট-বড় হাজার হাজার গাছ। আগুন দিয়ে পুড়িয়ে ধ্বংস করা হচ্ছে প্যারাবনের জীববৈচিত্র্যসহ পাখির আবাসস্থল। ইতোমধ্যে প্যারাবন দখল করে দেওয়া হয়েছে সীমানা পিলার ও ঘেরা। নির্মাণ করা হয়েছে ৫শ’ ফুটের লম্বা কাঠের সাঁকো। এভাবে একরের পর একর প্যারাবন জবরদখল ও ধ্বংসযজ্ঞ চালানো হচ্ছে নির্বিচারে।

সূত্রে আরও জানায়, মেরিন ড্রাইভ সড়কের পশ্চিমে পেঁচারদ্বীপের আবাহানা ও জাদুঘর এলাকার পশ্চিম পাশে ছিল বিশাল চর ও রেজু নদীর অংশ। কালের পরিক্রমায় রেজু নদীর এ অংশ আস্তে আস্তে ভরাট খালে পরিণত হয়। এ খাল থেকে এক সময় স্থানীয়রা মাছ ধরে জীবিকা নির্বাহ করতেন।জানা যায়, মেরিন ড্রাইভ সড়কের পশ্চিম পাশে পেঁচারদ্বীপের আবাহানা এলাকায় ক্যাম্প-ইন কক্স নামের রয়েছে মারমেইড কর্তৃপক্ষের রিসোর্ট। এর পশ্চিমে বিশাল চর, প্যারাবন ও ভরাট খাল। যেখানে প্রতিদিনই আসে জোয়ারের পানি। এ বিশাল চর ও খালে নির্মাণ করা হয়েছে প্রায় ৫০০ ফুট লম্বা কাঠের সাঁকো।

এ এক্সকেভেটর দিয়ে কাটা হচ্ছে মাটি। নির্মাণ করা হচ্ছে বিভিন্ন স্থাপনা। কাটা হচ্ছে প্যারাবন ও ঝাউগাছ। আগুন দিয়ে পুড়িয়ে দেওয়া হচ্ছে গাছের ডালপালা। প্যারাবনের গাছ ও ঝাউগাছ দিয়ে নির্মাণ করা হচ্ছে কটেজ। প্যারাবনের মধ্যে নির্মাণ করা হয়েছে রেস্টুরেন্ট। এভাবে নির্বিচারে প্যারাবনে ধংসযজ্ঞ চালানো হচ্ছে। এতে ধ্বংস হচ্ছে এলাকার পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্য। মারমেইডের জমি দেখাশুনার দায়িত্বে থাকা সৈয়দ আলম সুলতান বলেন, জমিটি খাস খতিয়ানের ঠিকই। কিন্তু আরএস ৬৫ ও ৪৩ খতিয়ানের দুই একর ২৪ শতক জমির নথিমূলে মালিক মরহুম গোলাম বারীর পাঁচ পুত্র ও তিন কন্যা বিএস সংশোধনে ২৪১ নম্বর মামলা দায়ের করে ডিক্রিপ্রাপ্ত হন। তাদের কাছ থেকে মারমেইড কর্তৃপক্ষ রেজিস্ট্রি বায়নামূলে কাজ করে চলেছে।

রামু খুনিয়াপালং ইউনিয়ন ভূমি সহকারী কর্মকর্তা সেলিম জানান, এ জমি সম্পূর্ণ খাস খতিয়ানভুক্ত। এক নম্বর খাস খতিয়ানের ৫০০ দাগের সরকারি এ জমিতে তারা অবৈধভাবে জবরদখল ও স্থাপনা নির্মাণ করছে। এমনকি এক্সকেভেটর দিয়ে মাটি কাটার কথা শুনে সরেজমিনে পরিদর্শন করে এসবের সত্যতা পেয়েছেন তিনি। তাদের কাজ বন্ধ রাখতে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। বিষয়টি উর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকেও অবহিত করা হয়েছে।

স্থানীয় ইউপি সদস্য বলেন, যেখানে দখল ও স্থাপনা নির্মাণ করা হচ্ছে, আমরা ছোটকাল থেকে দেখে আসছি সেখানে জোয়ার-ভাটা খাল, প্যারাবন, বিশাল চর ও ঝাউবন। সরকারি খাস খতিয়ান বলে জানা রয়েছে। জমি দেখাশুনার দায়িত্বরত সৈয়দ আলম সুলতান জানান, তারা দেশের বাইরে রয়েছেন। প্যারাবন কেটে স্থাপনা নির্মাণের সত্যতা স্বীকার করে রামু উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা নিরূপম মজুমদার জানান, বিষয়টি জানার পর ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে কাজ বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে নতুন করে কাজ না করার জন্য বলা হয়েছে। নতুন করে কাজ করলে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে। অন্যদিকে, কুতুবদিয়ায় উত্তর ধুরুং ইউপি চেয়ারম্যান আবদুল হালিমের বিরুদ্ধে প্রকাশ্যে খাল দখল করে মাটি ভরাটের অভিযোগ উঠেছে। প্রতিদিন এহেন কান্ড চললেও প্রশাসন নীরব।

জানা যায়, উপজেলার ধুরুং বাজারের উত্তর পাশে তিন রাস্তার সংযোগস্থলে আজম সড়কের কালবার্ট সংলগ্ন এলাকায় রাস্তার পশ্চিমে খালের পূর্ব পাশের বিশাল একটা অংশ দখল করে রেখেছেন উত্তর ধুরুং ইউপির চেয়ারম্যান আবদুল হালিম সিকদার। এখন দুটি এক্সকেভেটর দিয়ে মাটি কেটে প্রতিদিন খাল ভরাট করছেন। তার দেখানো পথে অন্যরাও যে যার মতো দখল করে রেখেছেন খালটি। এর আগেও তিনি স্থানীয় প্রশাসনকে ম্যানেজ করে খালসহ খাস জমি দখল করেছেন। দখলকৃত সেই সব জায়গায় গড়ে তুলেছেন ব্যবসা প্রতিষ্ঠান। এসব অবৈধ কর্মকান্ড উপজেলা প্রশাসন দেখেও যেন দেখেন না।

স্থানীয়রা জানান, উত্তর ধুরুং ও দক্ষিণ ধুরুং ইউনিয়নের মধ্যবর্তী এই খাল। পশ্চিমে উত্তর ধুরুং ইউনিয়নের আমিরার পাড়া, দক্ষিণ ধুরুং অলিপাড়া থেকে প্রদীপপাড়া হয়ে পিলটকাটা খালে সংযুক্ত হয়েছে। এক সময় খালটি খরস্রোতা ছিল। নৌকা দিয়ে লবণসহ বিভিন্ন মালামাল আনা-নেওয়া করা হতো। এখন দেখভাল না থাকায় খালটি দখল-বেদখলে প্রায় মৃত। বাজারের ময়লা পানি আর দখল দূষণের ময়লার ভাগাড়ে পরিণত হয়েছে। এ ব্যাপারে বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলন (বাপা) কুতুবদিয়া উপজেলা শাখার সাধারণ সম্পাদক আবুল কাশেম বলেন, উত্তর ধুরুং ইউপির চেয়ারম্যান আবদুল হালিমের বিরুদ্ধে খাল দখলের অভিযোগটি সত্য।আমরা কুতুবদিয়া বাপার নেতৃবৃন্দ তার সঙ্গে কথা বলে সেখান থেকে সরে আসতে বলেছি।

স্থানীয় সাংবাদিক কাইছার সিকদার বলেন, প্রতিনিয়ত কুতুবদিয়ার সব জায়গায় প্রভাবশালীদের দ্বারা খালসহ সরকারি জমি দখল হয়ে যাচ্ছে। এই অবস্থা চলতে থাকলে এক সময় পানি নিষ্কাশন বিঘ্নিত হয়ে জলাবদ্ধতা সৃষ্টিসহ মানুষের বসতবাড়ি ও ফসলি জমি ডুবে যাবে। মারাত্মক ব্যাহত হবে লবণ উৎপাদন। ধুরুং ইউপি চেয়ারম্যান আবদুল হালিম সিকদার বলেন, আমি উপজেলা প্রশাসনকে জানিয়ে খালে মাটি ভরাট করছি। নিজের পকেটের টাকা খরচ করে যাত্রী ছাউনি  তৈরি করব। সেখানে একটি সীমানা গেট থাকবে। উপজেলা সিটিজেন পার্কের মতো করে সৌন্দর্য বৃদ্ধি করব। পরে প্রকল্প দিয়ে সেই খরচ মেটাব বলে জানান তিনি।

এ বিষয়ে কুতুবদিয়া উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) জর্জ মিত্র চাকমা জানান, তিনি বিষয়টি খোঁজ নিয়ে দেখবেন। খাল ভরাটের সত্যতা পেলে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে বলে জানান।