ফিজিওথেরাপি  চিকিৎসা নিতে বিদেশে যায় বছরে দেড় কোটি মানুষ

প্রফেসর ডাঃ মোঃ আবু সালেহ আলমগীর
প্রফেসর ডাঃ মোঃ আবু সালেহ আলমগীর
প্রকাশিত: সেপ্টেম্বর ২৫, ২০২৩ ১৯:৩৫:৫৩

স্বাভাবিক, সুস্থ কর্মজীবনে ফেরার জন্য দেশে প্রতিদিন এক লাখের বেশি মানুষের ফিজিওথেরাপি চিকিৎসা সেবার দরকার। এই হিসাবে মাসে ৩০ লাখ এবং বছরে ৩ কোটি ৬০ লাখ মানুষের ফিজিওথেরাপি চিকিৎসা সেবার দরকার হয়। কিন্তু রোগীদের অসচেতনতা ও চিকিৎসকদের মধ্যে রেফারেল পদ্ধতির মানসিকতা কম থাকায় প্রতিদিন হাতে গোনা কয়েক হাজার রোগী ফিজিওথেরাপি  চিকিৎসা পাচ্ছে। এতে শারীরিকভাবে স্বাভাবিক কর্মে অক্ষম মানুষের সংখ্যা দিন দিন  বাড়ছে। এমনকি এসব রোগীর এক-তৃতীয়াংশ ফিজিওথেরাপি চিকিৎসার জন্য দেশের বাইরে যাচ্ছে। অর্থাৎ বছরে ১ কোটি ২০ লাখ মানুষ বিদেশে যায়।

অন্যদিকে একটি হাসপাতালের বিভিন্ন বিভাগ ও রোগীর শয্যা অনুপাতে অন্তত ১ হতে ৩ জন ফিজিওথেরাপি কনসালটেন্ট ও ৫ থেকে ২০ জন ফিজিওথেরাপি চিকিৎসক প্রয়োজন। কিন্তু সারা দেশের সরকারি হাসপাতালগুলোতে বি পি টি বা ব্যাচেলর অব ফিজিওথেরাপি ডিগ্রিধারী ফিজিওথেরাপি চিকিৎসক মাত্র ২৫টি পদের বিপরীতে ৫ জন রয়েছেন। ডিপ্লোমা পাসের শতাধিক পদ থাকলেও ২০ থেকে ২৫ জন সেবা দিচ্ছেন। জেলা পর্যায়ের সরকারি হাসপাতালে একটি করে পদ থাকলেও কোনো ফিজিওথেরাপির চিকিৎসক নেই বলে জানিয়েছে বাংলাদেশ ফিজিওথেরাপি অ্যাসোসিয়েশন।

বাংলাদেশ ফিজিওথেরাপি অ্যাসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক ডা. মোহাম্মাদ শাহাদাৎ হোসেন বলেন, ‘সরকারি জেলা ও উপজেলা পর্যায়ের হাসপাতালে স্নাতক ডিগ্রিধারী ফিজিওথেরাপি চিকিৎসক নিয়োগ হচ্ছে না। এতে প্রান্তিক জনগণ সঠিক এবং মানসম্পন্ন ফিজিওথেরাপি চিকিৎসাসেবা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। এ ছাড়া প্রতিবন্ধী ও প্রতিবন্ধিতার ঝুঁকিতে থাকা রোগীরা ভুয়া এবং নিবন্ধনহীন ফিজিওথেরাপি সেন্টার থেকে অপচিকিৎসার শিকার হচ্ছে। যথাযথ তদারকি না থাকায় যেখানে-সেখানে ফিজিওথেরাপি সেন্টার গড়ে উঠছে। অনেক ভুয়া ডিগ্রিধারী ফিজিওথেরাপির নামে অপচিকিৎসা দিচ্ছে।’

চিকিৎসকরা বলছেন, সমাজ কল্যাণ অধিদপ্তরের আওতায় প্রতি জেলায় একজন ফিজিওথেরাপি কনসালট্যান্ট ও দুজন ডিপ্লোমা ফিজিওথেরাপিস্ট চিকিৎসা সেবা দিচ্ছেন। উপজেলা পর্যায়ের হাসপাতালে কোনো নিয়োগ নেই।

দি ইউনিভার্সিটি অব কুমিল্লার, উত্তরা, ঢাকা এর  ডিপার্টমেন্ট অব ডিজঅ্যাবিলিটি অ্যান্ড রিহ্যাবিলিটেশন বিভাগের চেয়ারম্যান, অধ্যাপক ডা. মো. আবু সালেহ আলমগীর বি পি টি, এম ডি এম পি এইচ, এম ডি এম আর , পি এইচ ডি বলেন, ফিজিওথেরাপি চিকিৎসা সেবা নিতে আসা রোগীর সংখ্যা দিনে এক লাখ হলে বছরে এই সংখ্যা ৩ কোটি ৬০ লাখ। এর মধ্যে এক-তৃতীয়াংশ রোগী ফিজিওথেরাপি চিকিৎসার জন্য দেশের বাইরে যায়। কিন্তু এক গবেষণা অনুযায়ী, দেশের ৯০ শতাংশ বিশেষায়িত হাসপাতালে ফিজিওথেরাপি চিকিৎসকের স্বাক্ষরিত ব্যবস্থাপত্রে অন্য পেশজীবীরা এ সেবা দিয়ে থাকেন। এতে করে অসংখ্য মানুষ ভুল চিকিৎসার শিকার হচ্ছেন। বিশেষ করে ইদানিং অর্থোপেডিকস, নিউরো মেডিসিন, নিউরো সার্জারী, ফিজিক্যাল মেডিসিন, মেডিসিন, রিউমাটোলজী কনসালটেন্ট গন ফিজিওথেরাপি আক্রান্ত রোগীদের ফিজিওথেরাপি কনসালটেন্টের কাছে রেফার না করে নিজেরাই ফিজিওথেরাপি চিকিৎসার প্রেসক্রিপশন লিখে দিচ্ছেন। এতে করে রোগীরা ফিজিওথেরাপি চিকিৎসার নামে অপচিকিৎসার শিকার হচ্ছেন এবং বিদেশ যাচ্ছেন সঠিক চিকিৎসা সেবা পাবার আশায়। এতে করে বাংলাদেশের চিকিৎসা নিয়ে বিদেশে চিকিৎসকদের মধ্যে উৎকন্ঠা বেড়েছে। কেননা অপচিকিৎসার নামে প্রতিবছর বহু রোগী প্রতিবন্ধিতার শিকার হয়ে পঙ্গুত্ব বরন করছে।

ব্রিটিশ মেডিকেল জার্নালের তথ্যমতে, দেশে ১৮ বছর বা তদূর্ধ্ব ৭ দশমিক ৩ শতাংশ অস্ট্রিওআর্থ্রাইটিস রোগী রয়েছে। যাদের বেশির ভাগ নারী। তারা স্থুলতায় আক্রান্ত বা শারীরিক কার্যক্রমে কম সক্রিয়। অস্ট্রিওআর্থ্রাইটিস হলে হাড়-জোড়ে ও মাংসপেশিতে ব্যথা হয়, চলাফেরায় কষ্ট হয়, এমনকি প্রতিবন্ধী হওয়ার ঝুঁকি থাকতে পারে। বিদেশে প্রতি ১০ বছরে অস্ট্রিওআর্থ্রাইটিসে আক্রান্ত মানুষ ৪৮ শতাংশ বৃদ্ধি পাচ্ছে; যা প্রতিবন্ধিতার ১১তম কারণ। তবে সঠিক পদ্ধতিতে নিয়মিত ফিজিওথোপি সেবা নিলে দ্রুত আরোগ্য লাভ সম্ভব।

বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকরা বলছেন, অস্ট্রিওআর্থ্রাইটিস হাড়জোড়ের একটি রোগ; যা ক্ষয়জনিত, আঘাত, পারিবারিক ইতিহাস, স্থুলতা বা শারীরিক অক্ষমতার কারণে যেকোনো বয়সী মানুষের এ রোগ হতে পারে। অস্ট্রিওআর্থ্রাইটিসে স্বাস্থ্যসেবার প্রিভেনটিভ (প্রতিরোধযোগ্য), কিউরেটিভ বা (নিরাময়যোগ্য) ও রিহ্যাবিলিটেটিভ (পূর্ণাবাসনযোগ্য) ক্ষেত্রে মাল্টিডিসিপ্লিনারি চিকিৎসা সবচেয়ে কার্যকর। এই রোগের চিকিৎসায় ওষুধ ব্যথা কমাতে সাহায্য করে। তবে ফিজিওথেরাপি কনসালটেন্ট নির্দেশিত এক্সারসাইজ ও ইলেকট্রথেরাপি ব্যথা কমিয়ে হাড়জোড় সচল করে ও মাংসপেশির শক্তি বাড়িয়ে শারীরিক সচলতা নিশ্চিত করে। এভাবে রোগীর প্রতিবন্ধিতা প্রশমিত হয়। রোগী স্বাভাবিক কাজে ফিরে যেতে পারে।

ফিজিওথেরাপি চিকিৎসকেদের সরকারি নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ রিহ্যাবিলিটেশন কাউন্সিল অনুযায়ী, ফিজিওথেরাপি আধুনিক বিজ্ঞানের একটি গুরুতপূর্ণ শাখা ও স্বতন্ত্র চিকিৎসাব্যবস্থা। যেখানে বিভিন্ন ধরনের বাত, ব্যথা, প্যারালাইসিস, প্রতিবন্ধী এবং প্রতিবন্ধিতার ঝুঁকিতে থাকা ব্যক্তি বা রোগীকে বিভিন্ন পরীক্ষণ, নিরীক্ষণ, রোগ নির্ণয় করা হয়। চিকিৎসা পরিকল্পনা প্রণয়ন, প্রয়োগসহ উপদেশ ও ব্যবস্থাপত্র দেওয়ার মাধ্যমে ফিজিওথেরাপি চিকিৎসক রোগীর বিভিন্ন শারীরিক সমস্যার সমাধান করেন। রোগীর প্রতিবন্ধিতা প্রতিরোধ করে শারীরিক ও মানসিক স্বাস্থ্যের উন্নতি সাধন করে। কিন্তু এক গবেষণা অনুযায়ী, দেশের ৮৪ শতাংশ বিশেষায়িত হাসপাতালে ফিজিওথেরাপি চিকিৎসকের স্বাক্ষরিত ব্যবস্থাপত্রে অন্য পেশজীবীরা এ সেবা দিয়ে থাকেন। এতে করে অসংখ্য মানুষ ভুল চিকিৎসার শিকার হচ্ছেন।

বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকরা জানান, ফিজিওথেরাপি চিকিৎসার গুরুত্ব অনুধাবন করে ১৯৭৩ সালে আরআইএইচডিতে (বর্তমানে পঙ্গু হাসপাতাল) ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চিকিৎসা অনুষদের অধীন স্নাতক ডিগ্রি চালু করা হয়। বর্তমানে নিটোর বা পঙ্গু হাসপাতাল, মহাখালীর আইএইচটি, সিআরপি, পিপলস ইউনিভার্সিটি, গণবিশ্ববিদ্যালয়, স্টেট কলেজ অব হেলথ সায়েন্সসহ কয়েকটি ইনস্টিটিউটে ফিজিওথেরাপি গ্র্যাজুয়েশন কোর্স চালু রয়েছে। এসব প্রতিষ্ঠান থেকে পাস করা ৫ হাজারের অধিক এই ডিগ্রিধারী ফিজিওথেরাপি চিকিৎসক রয়েছেন। এ ছাড়া সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠান থেকে উত্তীর্ণ ১০ হাজারের বেশি ডিপ্লোমাধারী ফিজিওথেরাপিস্ট রয়েছেন।

এমন পরিস্থিতিতে সারা বিশ্বের  মতো এ বছর সেপ্টেস্বর মাসে দেশেও পালিত হয়েছে ২৮তম বিশ্ব ফিজিওথেরাপি দিবস। এবার দিবসটির প্রতিপাদ্য নির্ধারণ করা হয়েছে দীঘ মেয়াদী বাত-ব্যথায় ও অস্থি সন্ধির প্রদাহের চিকিৎসায় ফিজিওথেরাপি সবচেয়ে কার্যকর চিকিৎসা পদ্ধতি’। লেখক: বিপিটি, এমডি, এমপিএইচ, এমডিএমআর, পিএইচডি