উচ্চ মহলের চাপে লামায় বন বিভাগের ‘নাটকীয়’ অভিযান
তৈণ ও মাতামুহুরী রেঞ্জের রিজার্ভ থেকে কাঠ এনে মজুদ, তিন লাখ টাকার লেনদেনের অভিযোগ

বান্দরবানের লামা উপজেলায় বন বিভাগের ‘বিশেষ অভিযান’ নিয়ে শুরু হয়েছে ব্যাপক আলোচনা ও বিতর্ক। অভিযোগ উঠেছে—উচ্চ মহলের চাপেই অভিযান চালাতে বাধ্য হয়েছে বন বিভাগ। এ অভিযানে উদ্ধার হয়েছে আনুমানিক ৮০০ ঘনফুট সেগুন ও গামার কাঠ।
১৫ জুন রাত ১০টার দিকে লামা বাজার সংলগ্ন এলাকা থেকে বিশেষ টহল দলের নেতৃত্বে প্রথম ধাপে উদ্ধার হয় প্রায় ৫০০ ঘনফুট কাঠ। পরদিন, ১৬ জুন সকাল ১১টা থেকে দুপুর ২টা পর্যন্ত দ্বিতীয় দফায় উদ্ধার হয় আরও প্রায় ৩০০ ঘনফুট কাঠ। অভিযানে অংশ নেন বাংলাদেশ সেনাবাহিনী, সাংগু ও তৈণ রেঞ্জের রেঞ্জ কর্মকর্তা ও ২০ জনের বেশি বনকর্মী। অভিযানের নেতৃত্বে ছিলেন বিভাগীয় বন কর্মকর্তা (ডিএফও) মোস্তাফিজুর রহমান এবং বিশেষ টহল দলের প্রধান এ কে এম আলতাফ হোসেন, ফরেস্টার।
বন বিভাগ সূত্রে জানা যায়, চক্রটি ঈদের ছুটিকে কাজে লাগিয়ে কাঠগুলো লুকিয়ে রাখে লামা বাজারের পাশে চম্পাতলি ব্রীজ সংলগ্ন জোত মালিক সমিতির সভাপতি সেলিমের বাড়ির ভিতরে। যে স্থানে কাঠ মজুদ করা হয়, সেটি লামা মুখ স্টেশন অফিস থেকে মাত্র ১৫০ গজ দূরে—যার দায়িত্বে রয়েছেন অভিযানে নেতৃত্বদানকারী এ কে এম আলতাফ হোসেন ফরেস্টার নিজেই।
স্থানীয়রা অভিযোগ করছেন, তৈণ ও মাতামুহুরী রেঞ্জ থেকে অবৈধভাবে সংগ্রহ করা এই কাঠগুলো মজুদ করার জন্য বন বিভাগের আলতাফ ফরেস্টার কে প্রায় ৩ লক্ষাধিক টাকা ঘুষ দেওয়া হয়েছে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক ব্যক্তি বলেন, “টাকা দিয়ে ম্যানেজ করেই কাঠগুলো আনা হয়েছে। যদি উপরের চাপে না পড়ত, তাহলে বন বিভাগ এসব জব্দ করত না।”
অভিযানকে কেন্দ্র করে লামার কাঠ ব্যবসায়ীদের মাঝে চরম ক্ষোভ বিরাজ করছে। একটি পক্ষ বন বিভাগের অভিযানকে সাধুবাদ জানালেও অন্য পক্ষ অভিযোগ করছে, এ অভিযান আসলে একটি ‘শো’ মাত্র। তারা বলছেন, আগে টাকা নিয়ে কাঠ ঢুকতে দিয়েছে, এখন আবার সেই কাঠ জব্দ করছে—এতে বন বিভাগের বিশ্বাসযোগ্যতা প্রশ্নবিদ্ধ।
এক ব্যবসায়ী বলেন, “ মোল্লা রেজাউল করিম, সিএফ, চট্টগ্রাম অঞ্চল হতে ডিএফও পর্যন্ত সবাই ভাগ পেয়েছে। আর লেনদেনের মূল হোতা আলতাফ হোসেন, যিনি সিএফ মোল্লা রেজাউল করিমের সবচেয়ে আস্থাভাজন ব্যক্তি।” জানা যায় এই আলতাফ ফরেস্টার পূর্বেও মোল্লা রেজাউল করিম এর সাথে রাংগামাটি দক্ষিণ বন বিভাগ এর কাপ্তাই রেঞ্জে এক সংগে কর্মরত ছিলো।
অনুসন্ধানে জানা যায়, আলতাফ হোসেন বর্তমানে একাই পালন করছেন চারটি গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব—বিশেষ টহল দলের প্রধান, লামা মুখ চেক স্টেশন ইনচার্জ, বমু বিটের বিট কর্মকর্তা এবং লামা সদর রেঞ্জের দায়িত্বপ্রাপ্ত রেঞ্জ কর্মকর্তা। মোল্লা রেজাউল করিম তার একান্ত আস্থাভাজন হিসাবে নিয়ম নীতি তোয়াক্কা না করে ৯ জানুয়ারি ২০২৫ সালে চট্টগ্রাম উত্তর বন বিভাগ থেকে লামা বন বিভাগে বদলি করেন মোল্লা বাহিনীর চাঁদা আদায়কারী বাহিনী হিসাবে। লামায় আসার পর তাকে সিএফ মোল্লার নির্দেশে চারটি “প্রাইজ পোস্টিং”-এ পদায়ন করা হয়।
বন বিভাগের ভেতর থেকে কেউ কেউ বলছেন, তার এই একাধিক দায়িত্বপ্রাপ্তি চট্টগ্রাম অঞ্চলের বন সংরক্ষক (C.F) মোল্লা রেজাউল করিমের হস্তক্ষেপেই হয়েছে। কানাঘুষায় জানা যায়, আলতাফ হোসেন মূলত সিএফ এর “বিশেষ পোষ্য” এবং লামা অঞ্চলের অবৈধ আয়ের হিস্যা সংগ্রহের দায়িত্বে রয়েছেন। কে এম আলতাফ হোসেনকে মোল্লা রেজাউল করিম এর নির্দেশে আগের চারটি পোস্টিং এর পাশাপাশি নতুন করে লামা সদর রেঞ্জের দায়িত্বে বসানো হয়েছে এ নিয়ে লামা বন বিভাগের কর্মকর্তা কর্মচারীদের মধ্যে অসন্তোষ দেখা দিয়েছে।
