বিপর্যেয়ের মুখে বান্দরবানের রিজার্ভ ফরেস্ট-২
ঈদকে সামনে রেখে গাছ পাচারে বান্দরবান বন বিভাগের ত্রি-রত্ম সিন্ডিকেট বেপরোয়া

ঈদকে সামনে রেখে বান্দরবন বন বিভাগে চলছে সংরক্ষিত বন উজাড় করে গাছ পাচার, পারমিটবিহীন গাছ কাটা, ভুয়া টিপি দিয়ে রিজার্ভের গাছ পাচার প্রতিযোগিতা। এ প্রতিযোগিতায় মুখ্য ভূমিকা পালন করছেন ফরেস্ট গার্ড নাসিরুল আলম। তাকে প্রত্যক্ষ সহযোগিতা করছেন সদর রেঞ্জ কর্মকর্তা ফরেস্টার সামসুল হক ও অফিস সহকারী সুশান্ত কুমার সরকার। প্রতিদিনই রাতের অন্ধকারে ২০-৩০ ট্রাক রিজার্ভ ফরেস্ট থেকে অবৈধভাবে আহরিত কাঠ ঢাকা অভিমুখে বান্দরবান থেকে পাচার হচ্ছে। ফরেস্ট গার্ড নাছিরুল আলম সিএফ সাহেবের ঘনিষ্ঠজন বিধায় কেউই টু শব্দটি করতে সাহস পাচ্ছে না। পাচারকৃত অবৈধ কাঠ ভর্তি ট্রাক থেকে ও নাছির নিজেই ২০-৩০ হাজার টাকা হারে ডিএফও আব্দুর রহমান এবং সিএফ রেজাউল করিমের নামে চাঁদা তুলছেন বলে একজন কাঠ ব্যবসায়ী জানিয়েছেন।
সূত্রমতে দূর্নীতিবাজ, ঘুষখোর, বদলী বানিজ্যকারী ফরেস্ট গার্ড মোঃ নাছিরুল আলম চৌধুরী গোটা চট্টগ্রাম সার্কেলেই তার আধিপত্য বজায় রেখেছেন। তিনি সব ডিভিশনে কিছু ফরেস্ট গার্ড ও ফরেস্টারদের লোভনীয় পোস্টিং এ বসান। এইজন্য তারা নাছিরের সিন্ডিকেটে ঢুকে পড়েন।
অনঅদিকে কিছুদিন ধরে তিনি সিএফ মোল্লা রেজাউল করিমের গনিষ্টজন হিসেবে পরিচয়দানকারী মোঃ সামসুল হক-ফরেস্টার, বান্দরবান বন বিভাগের সদর রেঞ্জ কর্মকর্তার সহিত দূর্নীতি ও নানান অপকর্মে একাত্মতা ঘোষনা করছেন। সামসুল হক আর ২ মাস পরেই অবসরে যাবেন। তাই তিনি গাছ, পাহাড়, বন্যপ্রানী কোন কিছুই বাদ দিচ্ছেন না, সব খেয়ে ফেলছেন। অপরদিকে বিভাগীয় বন কর্মকর্তার কার্যালয়ের এতদ্বসংক্রান্ত নথিপত্র আপ টু ডেট করছেন অফিস সহকারী সুশান্ত কুমার সরকার। এই ৩ জন মিলে শোষন করে চলেছেন বান্দরবান বন বিভাগ।
গিরগিটির মতন রং বদলিয়ে চট্টগ্রাম সার্কেলে দূর্নীতির গডফাদার হয়ে উঠেছেন বান্দরবান বন বিভাগের ফরেস্ট গার্ড মোঃ নাছিরুল আলম চৌধুরী। দীর্ঘ প্রায় ২ যুগ ধরে এই সার্কেলে কর্মরত থেকে ক্ষমতাসীন দলের স্থানীয় নেতৃবৃন্দের সাথে সক্ষতা গড়ে সংশিল্ষ্ট উর্দ্ধতন কর্মকর্তাদের জিম্মি করে বন উজাড়, কাঠ পাচারে সক্রিয় ভূমিকা রেখে কোটি কোটি টাকার মালিক হলেও দেখার কেউ নেই। প্রতিনিয়ত রিজার্ভ ফরেস্ট উজাড় করে গাছ পাচারকারীদের কাছ থেকে ডিএফও এবং সিএফ’র নামে লাখ লাখ টাকা চাঁদাবাজি করেও থেকে গেছেন ধরা ছোয়ার বাইরে। ১৭ গ্রেডের একজন কর্মচারী হয়েও কিভাবে কিনেছেন নতুন চট্টগ্রাম ভিআইপি এলাকা হালিশহরে কোটি টাকার ফ্লাট। বাশখালী নিজ এলাকায় নামে বেনামে শত শত একর জমি কিনেছেন।
ফরেস্ট গার্ড মোঃ নাছিরুল আলম চৌধুরী একসময় বাশখালীর বিএনপি নেতা জাফরুল ইসলাম চৌধুরীর পোষ্যপুত্র পরিচয়ে বন বিভাগের চট্টগ্রাম সার্কেল চাপিয়ে বেড়িয়েছে। তার নিয়ন্ত্রনে ফরেস্ট গার্ড, ফরেস্টারদের পোস্টিং করতে বাধ্য হত চট্টগ্রাম সার্কেলের বন সংরক্ষক, বিভাগীয় বন কর্মকর্তাগন। এরপর আওয়ামী লীগ আমলে তিনি গিরগিটির মতন রং বদলিয়ে চট্টগ্রামের আওয়ামী লীগ মন্ত্রী হাছান মাহমুদ, মেয়র মহিউদ্দিন চৌধুরী, নাছির উদ্দিনদের অনুসারী পরিচয়ে তার অপকর্ম চালিয়ে গেছেন। বদলী বানিজ্য, ভূমি দখল, বনের গাছ কেটে পাচারসহ এমন কোন অপকর্ম নাই যে তিনি করতেন না।
৫ আগস্টের পর পুনরায় তিনি রং পাল্টিয়ে শিবির নেতা বলে তিনি পরিচয় দিচ্ছেন। জামায়াত নেতারা তার আত্বীয় পরিচয় দিয়ে তিনি প্রায় সময়ই তার ফেসবুক পোস্টের মাধ্যমে প্রকাশ করেন। জামায়াত এর নিবন্ধন পুনরায় ফিরে পাওয়ায় তিনি তার এলাকায় শত লোক ডেকে মেজবানী খাওয়াবেন বলেও বিভিন্ন মহলে বলা বলি করছেন। এত টাকা তিনি পান কিভাবে? তিনি আবারো তার বদলী বানিজ্য শুরু করেছে। বর্তমান সিএফ মোল্লা রেজাউল করিম জামায়াত পন্থি হওয়ায় এখন তার পোয়া বারো। প্রায় সময় সিএফ সাহেবের বাসায় তিনি ফরেস্ট গার্ড ও ফরেস্টারদের বদলির নীল নকশা তৈরী করেন। সিএফ মোল্লা রেজাউল করিম বন্যপ্রানী পাচার, গাছ পাচার, বনের ভূমি বিক্রি, বদলী বানিজ্য, চেক স্টেশন, রেঞ্জ, বিভিন্ন থেকে প্রতিমাসে কোটি কোটি টাকা কালেকশন এ মুল হোতা ফরেস্ট গার্ড নাছিরুল আলম চৌধুরী তার নেতৃত্বে গড়ে উঠেছে একটি সিন্ডিকেট। যেখানে ১ জন রেঞ্জার ও ৪ জন ফরেস্টার রয়েছে যারা সার্কেলের বিভিন্ন বন বিভাগে কর্মরত।
তিনি চট্টগ্রাম সার্কেলে চট্টগ্রাম উত্তর বন বিভাগ, চট্টগ্রাম দক্ষিন বন বিভাগের লোভনীয় পোস্টিং এ থেকেছেন। এখন তিনি বান্দরবান বন বিভাগে চাকুরী করছেন। বান্দরবান বন বিভাগে ২ বছরের পোস্টিং হলেও ক্ষমতার দাপটে তিনি ৩ বছর ৫ মাস হলো এখনও বহাল তবিয়তে আছেন। তিনি যখন চাবেন তখন আবারো চট্টগ্রাম উত্তর, দক্ষিন বন বিভাগে যাবেন এভাবেই দাম্ভিকতার সহিত বলে বেড়ান।
ফরেস্ট গার্ড নাছিরুল আলম চৌধুরী বান্দরবান বন বিভাগের সুয়ালক চেক স্টেশনে নিয়ম বর্হিভূতভাবে এক বছর ছয় মাস অতিবাহিত হওয়ার সময় নাছিরুল আলমের বিরুদ্ধে নারী কেলেংকারীর অভিযোগ উঠলে তড়িঘড়ি করে তাকে সেকদু রেঞ্জে বদলী করেন। ৪ মাস যেতে না যেতেই তিনি ক্ষমতার জোরে পত্রমূলে আবারো লোভনীয় পোস্টিং সদর রেঞ্জে অর্ডার করেন। এখানে এসে তিনি আরো ভয়ংকর হয়ে ওঠেন।
ক্ষমতার জোরে তিনি চাকুরীর শৃঙ্খলা পরপন্থীভাবে চট্টগ্রামে বসবাস করে কুকর্মের নেতৃত্ব দেন এবং মাঝে মাঝে বান্দরবানে এসে চাঁদার লাখ লাখ টাকা কালেকশন করেন। তিনি বান্দরবান থেকে চোরাই পথে কাঠ পাচারের সিন্ডিকেট গড়ে তোলেন। সদর রেঞ্জে ১ বছরের পোস্টিং হলেও তিনি অফিস সহকারী শুসান্ত কুমার সরকারকে মাসিক টাকার বিনিময়ে বাগিয়ে বহাল তবিয়তে অনিয়মের রাজ্য কায়েম করেছেন। তার মাধ্যমে অন্য ফরেস্ট গার্ড ও ফরেস্টাররা সদর রেঞ্জে দেড় বছর কেউবা ২ বছর সময় পার করছেন আর শুসান্ত কুমার সরকারকে মাসিক ভিত্তিতে ম্যানেজ করে। এদিকে বান্দরবান বন বিভাগের পাইন্দু, রুমা, টংকাবতী, খেচালং, থানচি, বেতছড়া, সেকদু রেঞ্জে নেই কোন ফরেস্ট গার্ড ও বাগান মালি।
একদিকে বন ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে আর এক দিকে ফরেস্ট গার্ড বাগানমালিরা বান্দরবান শহরে রাজকীয়ভাবে বসবাস করছেন। এক সপ্তাহ আগেও সিএফ দপ্তর থেকে ফরেস্ট গার্ডদের বদলী অর্ডার করলেও দীর্ঘ ২ যুগ একই সার্কেলে থাকা ফরেস্ট গার্ড মোঃ নাছিরুল আলম চৌধুরী এর বদলী অর্ডার না হওয়ায় সংশ্লিষ্ট মহলে ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে। বিধি বহির্ভুতভাবে টাকার বিনিময়ে ফরেস্টার ও ফরেস্ট গার্ডদের সিরিয়াল ব্রেক করে বদলীযোগ্য ফরেস্টার ও ফরেস্ট গার্ডদের বদলী না করে পরবর্তী তালিকার নিরীহ ফরেস্টার ও ফরেস্ট গার্ডদের বদলী করেন।
এব্যাপারে মাঠপর্যায়ে অসন্তোষ বিরাজ করছে। বৈষ্যম্যের স্বীকার ফরেস্টার ও ফরেস্ট গার্ডরা দূর্নীতি দমন কমিশন, বন উপদেষ্টা ও প্রধান বন সংরক্ষক এর নিকট অভিযোগ দায়ের করেছেন বলে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কয়েরকজন ফরেস্টার ও ফরেস্ট গার্ড উল্লেখ করেন। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন প্রভাবশালী ফরেস্ট গার্ড বলেন, মেয়াদ পূর্তি না হবার আগেও অনেক গার্ড, ফরেস্টারকে বদলী করা হলেও নাছিরুল আলমকে দীর্ঘ ৪ বছর অনিয়মতান্ত্রিকভাবে বান্দরবান বন বিভাগে বহাল রাখা হয়েছে শুধুমাত্র উর্দ্ধতন কর্মকর্তাদের নামে অবৈধ কাঠ ব্যবসায়ী ও ভূয়া টিপির মাধ্যমে সংরক্ষিত বনাঞ্চল উজাড়ের সাথে জড়িতদের কাছ থেকে চাঁদা আদায় করে উর্দ্ধতন কর্মকর্তাদের কাছে পৌঁছে দেয়ার জন্য।
