৬ বছর চাকুরী করেই কোটি টাকার জমি কিনেছেন টাঙ্গাইল সদরের ফরেস্টার এমরান
টাঙ্গাইল বনবিভাগের সদর রেঞ্জে চলছে হরিলুট।
টাঙ্গাইল বনবিভাগের সদর রেঞ্জে চলছে হরিলুট। খোদ ভারপ্রাপ্ত রেঞ্জ কর্মকর্তা ফরেস্টার মোঃ এমরান আলীর নেতৃত্বে বিগত প্রায় সাড়ে ৩ বছর ধরে এই রেঞ্জে অব্যাহত কাঠ পাচার. ভুয়া টিপি ইস্যু, সামাজিক বনায়নের গাছ লুটপাট, অন্য বন বিভাগ থেকে আগত অবৈধ কাঠ ভতি গাড়ী নিজ নামের হ্যামার দিয়ে অবৈধভাবে পাস করে দিয়ে গাড়ী প্রতি লক্ষ লক্ষ টাকা ঘুষ আদায় অব্যাহত রাখলেও থেকে গেছেন ধরাছোঁয়ার বাইরে।
সরেজমিন অনুসন্ধানে জানা যায়, বাংলাদেশ বন বিভাগের সর্বকনিষ্ঠ এই ফরেস্টার গত ২০১৬ সনে চাকুরীতে যোগদান করে মাত্র ৭ বছর সময়কালের মধ্যে ৬ বছরই টাঙ্গাইল বন বিভাগে কর্মরত থেকে অনিয়ম দুর্নীতির মাধ্যমে কয়েক কোটি টাকার মালিক হয়েছেন।
টাঙ্গাইল শহরের শেখ হাসিনা মেডিকেল কলেজের পেছনে দেওলা এলাকায় ১ কোটি টাকা বিনিয়োগে জমি কিনেছেন ১০ শতক। টাঙ্গাইল জেলা রেজিস্টার জানান জমির মূল্য নিশ্চিত করেছেন। এছাড়াও তার নিজ বাড়ী এলাকায়ও বেশ কিছু সম্পত্তির মালিক হয়েছেন। ১৫ তম গ্রেডের একজন কর্মচারী হিসেবে তিনি বেতন পান সর্বসাকুল্যে মাসিক ২০ হাজার টাকা। সাড়ে ৪ লাখ টাকা মূল্যের সুজুকি লেটেস্ট মডেলের মোটরসাইকেলে চড়েন। থাকেন প্রথম শ্রেণীর গেজেটেড কর্মকর্তা এসিএফ’এর বাংলোয়।
তার চালচলন হাবভাবে এমনই মনে হয় যে তিনি এই বন বিভাগের বড় কোনো কর্তাব্যক্তি। তার বিরুদ্ধে উত্থাপিত অভিযোগের মধ্যে রয়েছে একজন সর্বকনিষ্ঠ ফরেস্টার হয়ে ভারপ্রাপ্ত রেঞ্জ অফিসার হিসেবে টাউন রেঞ্জে সাড়ে ৩ বছর দায়িত্ব পালনকালীন সময়ে প্রায়শতাধিক চোরাই কাঠ ভর্তি ট্রাক ধরে গাড়ী প্রতি ১ লাখ টাকা হারে আদায় করে গাছ পাচারে সহযোগিতা বিভিন্ন রেঞ্জে সামাজিক বনায়নের গাছ কাটার ভুয়া টিপি ইস্যু, (টাউন রেঞ্জেই প্রতি মাসে টিপি প্রতি ৫/১০ হাজার টাকার বিনিময়ে মাসে ৩/৪শ টিপি ইস্যু), উর্দ্ধতন কর্মকর্তাদের নামে বদলী বাণিজ্য অন্যতম।
বর্তমানে তিনি দোর্দান্ত প্রতাপশালী কর্মকর্তা। সদর রেঞ্জের মূর্তিমান আতঙ্ক। অন্যান্য রেঞ্জে কর্মরতদেরও তাকে সমীহ করে না চললে ঘটে নানান বিড়ম্বনা। ৩ বছরের বেশি একই বন বিভাগে কর্মরত থাকার বিধান না থাকলেও বদলী নীতিমালা বহির্ভূতভাবে তিনি এই বন বিভাগেই ৬ বছর সময় কর্মরত রয়েছেন। এ লক্ষ্যে প্রধান বন সংরক্ষকের দপ্তর, বন সংরক্ষক, কেন্দ্রীয় অঞ্চলের দপ্তরে নিয়োজিত বদলী সংক্রান্ত ফাইল তদারককারী করণিকদের সাথেও রয়েছে তার নিয়মিত যোগাযোগ। ফলে বদলী সময়সীমা অতিক্রান্ত হলেও তিনি রয়ে গেছেন বহাল তবিয়তে।
তিনি এই রেঞ্জে যোগদানের পূর্বে একই বন বিভাগের ফতেয়া রেঞ্জের অধীনে কালীদাস বিটে ২ বছর, হাটুভাঙ্গা চেক বিটে ১ বছর এবং বর্তমান টাউন রেঞ্জে সাড়ে ৩ বছর সময় ধরে কর্মরত রয়েছেন। প্রতিটি কর্মস্থলেই তিনি দুর্ণীতিতে রেকর্ড সৃষ্টি করেছেন বলেও অভিযোগ রয়েছেন। সর্বোপরি টাঙ্গাইলের স্থানীয় বাসিন্দা বিধায় টাঙ্গাইল বন বিভাগে তার খবরদারীটা অন্যতম বলে তার সহযোগীদের অভিযোগ।
এই বন বিভাগে কর্মরত নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন ফরেস্টার জানান ফরেস্টার এমরান টাংগাইল বন বিভাগের একটি আতঙ্কের নাম। উত্তরাঞ্চল সহ বিভিন্ন বন বিভাগ থেকে টাঙ্গাইলে আগত চোরাই কাঠ ভর্তি ট্রাক ঢুকলেই তাকে টাকা দিতে হয়। তার পোস্টিং টাউন রেঞ্জে হলেও ঘাটাইল, সখীপুর, বাঁশতোল, ভাসাইলসহ টাঙ্গাইলের বিভিন্ন এলাকায় গিয়ে তিনি চোরাই কাঠের গাড়ী ধরে লাখ লাখ টাকার বিনিময়ে ছেড়েদেন। একজন জুনিয়র ফরেস্টার হলেও তার জীবন যাত্রার মান একজন বিভাগীয় বন কর্মকর্তা কেও হার মানায়।
উর্দ্ধতন কর্মকর্তাদের ম্যানেজে পারদর্শী দুর্ণীতিতে রেকর্ড সৃষ্টিকারী এই ফরেস্টার দীর্ঘদিন একই কর্মস্থলে থাকায় তিনি নিজেকে ভীষন প্রভাবশালী হিসেবে জাহির করে থাকেন। একারনেই ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের নামে বদলী বাণিজ্য, চোরাই কাঠ পাচার, বনভূমি বেদখল সহ এমন কোন অনিয়ম নেই যা তিনি করেন না। এই বিভাগের অধীনে অন্যান্য রেঞ্জ ও বিটে কর্মরতদেরও তাকে সমীহ করে চলতে হয়। আবার অনেককে তাকে মাসিক মাসোহারাও দিতে হয়। তার অবাধ্য হলেই পড়তে হয় নানান সমস্যায়।
ইতোপূর্বে করতিয়া চেক পোস্টে জালাল আবেদিন নামের এক গার্ডকে ঘুষের টাকাসহ হাতেনাতে গ্রেফতার করে দুদক। ফরেস্টার এমরানের সহযোগী গার্ড বাবুলকেও ঘুষের টাকাসহ অবৈধ কাঠের উপর এমরানের নামে ইস্যুকৃত হ্যামার মেরে চোরাই কাঠ পাচারে সুযোগ দেয়ায় গ্রেফতার করা হয়। তাদেরকে সাসপেন্ড করা হলে অজ্ঞাত কারণে এমরানের বিরুদ্ধে অদ্যাবধি কোন ব্যবস্থা নেয়া হয়নি।
এভাবে প্রতিনিয়ত এমরানের নামে ইস্যুকৃত হ্যামার দিয়ে কাঠ পাচার ব্যবসা অব্যাহত থাকলেও উর্দ্ধতন কর্তৃপক্ষ অজ্ঞাত কারণে নীরব ভূমিকা পালন করে আসছেন। ফলে সর্বকনিষ্ঠ ফরেস্টার হয়েও মাত্র ৬ বছরের চাকরী জীবনে বনজ সম্পদ উজাড় করে কোটি কোটি টাকার অবৈধ সম্পদের মালিক হতে সক্ষম হয়েছেন। তার মতে টাঙ্গাইল বনবিভাগে স্বচ্ছতা ফিরাতে অবিলম্বে দুর্ণীতিতে রেকর্ড সৃষ্টিকারী এই ফরেস্টারকে অপসারন করা প্রয়োজন।