রাঙামাটি দক্ষিণ বন বিভাগের ২ লাখ একরের রিজার্ভ গিলে খাচ্ছে সাজ্জাদ-মুরাদ সিন্ডিকেট
রাঙ্গামাটি দক্ষিণ বন বিভাগের ২ লাখ একরের রিজার্ভ গিলে খাচ্ছে ডিএফও সাজ্জাদ ও সদর রেঞ্জ অফিসার মুরাদ। প্রায় ২ লাখ একর আয়তনের বিশাল এই বনাঞ্চলের রক্ষণাবেক্ষণ, বনভূমি রক্ষা, বন্যপ্রাণী সুরক্ষা ও মূল্যবান বনজ সম্পদ রক্ষার দায়িত্বে নিয়োজিত বিভাগীয় বন কর্মকর্তা সাজ্জাদ নিজেই তার অধীনস্থদের নিয়ে টেবিল জোট ইস্যুর মাধ্যমে রিজার্ভ উজাড় করে পকেট ভারি করার লাভজনক ব্যবসা চালিয়ে গেলেও দেখার কেউ নেই।
প্রাপ্ত তথ্য মতে রাঙামাটি দক্ষিণ বন বিভাগ মূলত রেঞ্জ সদর, কাপ্তাই, কর্ণফুলী, আলিখিয়ং, ফারুয়া, সাংগ্রাছড়ি ও সুবলং এই ৭টি গুরুত্বপূর্ণ রেঞ্জ নিয়ে গঠিত, যার অধীনে প্রায় ২ লক্ষ একরেরও অধিক বিশাল সংরক্ষিত বনাঞ্চল বিদ্যমান রয়েছে। নিয়ম অনুযায়ী এই বিশাল বনাঞ্চলের রক্ষণাবেক্ষণ, বনভূমি রক্ষা, বন্যপ্রাণী সুরক্ষা ও মূল্যবান বনজ সম্পদ রক্ষা করাই ডিএফও সাজ্জাদ হোসেন সহ সকল বন কর্মকর্তার মূল দায়িত্ব ও আইনি কর্তব্য হলেও বর্তমানে সেই পবিত্র দায়িত্বটি শুধুমাত্র ভূয়া জোত পারমিট ইস্যুর মাধ্যমে সংরক্ষিত বনাঞ্চল ধ্বংস করে পকেট ভারী করার লাভজনক ব্যবসায় পরিণত হয়েছে। চাঞ্চল্যকর তথ্যমতে, রাঙামাটি দক্ষিণ বন বিভাগ থেকে প্রতি মাসে আনুমানিক ১ লক্ষ হতে শুরু করে প্রায় ২ লক্ষ ঘনফুট পর্যন্ত কাঠের ভূয়া জোত পারমিট ইস্যু করা হয়। অথচ সরেজমিনে অনুসন্ধান করে দেখা গেছে, দক্ষিণ বন বিভাগের আওতাধীন অধিকাংশ জায়গাই শতভাগ সরকারি রিজার্ভ বা সংরক্ষিত বনাঞ্চল, যেখানে জোত পারমিট ইস্যু করা তো দূরের কথা, ১৯২৭ সনের সুনির্দিষ্ট বন আইনের ২০ ধারা অনুযায়ী বিনা অনুমতিতে সাধারণ জনসাধারণের প্রবেশ পর্যন্ত সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। কিন্তু বিপুল অঙ্কের কালো টাকার বিনিময়ে দেশের প্রচলিত বন আইন শুধু ডায়েরির পাতায় বন্দী থেকে যাচ্ছে, যার বাস্তব প্রয়োগ তো দূরের কথা, বন বিভাগের খোদ কর্মকর্তারাই এখন উৎকোচ গ্রহণে চরম মরিয়া হয়ে উঠেছেন। এই সব রেঞ্জের অধীনে থাকা ঐতিহ্যবাহী সংরক্ষিত বনাঞ্চল বর্তমানে ডিএফও এস এম সাজ্জাদ ও রেঞ্জ কর্মকর্তাগণের ভূয়া ‘টেবিল জোত পারমিট’ ইস্যুর মাধ্যমে বৃক্ষশূন্য করে কোটি কোটি টাকা ইনকাম করার একমাত্র প্রধান অবলম্বনে রূপ নিয়েছে। অনুসন্ধানে আরও জানা যায়, এই সকল রেঞ্জ থেকে জোত পারমিট দেওয়ার নামে সাধারণ মানুষের কাছ থেকে ৭০ হতে ৮০ টাকা প্রতি ঘনফুট কাঠের জন্য অবৈধভাবে আদায় করেন সংশ্লিষ্ট রেঞ্জ কর্মকর্তা, যার সিংহভাগ অর্থাৎ প্রতি ঘনফুটে ৩৫ টাকা সরাসরি চলে যায় ডিএফও সাজ্জাদের ব্যক্তিগত তহবিলে।
অন্যদিকে বিপুল অঙ্কের আর্থিক লেনদেন ও অবৈধ প্রভাবের জোরে বরকলে সদ্য পদায়ন পাওয়া রেঞ্জার ওমর ফারুক স্বাধীন এখন বনাঞ্চলে ‘কারও পরাধীন না থাকার’ একচ্ছত্র নীতিতে চলছেন। বরকলে পোস্টিং পেয়েই তিনি সরকারি আইন-কানুনের তোয়াক্কা না করে সেখানকার সংরক্ষিত বনাঞ্চল দেদারসে উজাড় করে বছরে কোটি কোটি টাকা আয়ের এক গোপন মিশনে নেমে পড়েছেন। এই অবৈধ কাঠের সাম্রাজ্য ও আয়ের পথকে আরও মসৃণ করতে রেঞ্জার স্বাধীন এখন কাপ্তাই রেঞ্জে কর্মরত ফরেস্ট গার্ড (এফজি) মো: ছাব্বির হোসেনকে দ্রুত বদলি করে বরকলে নিজের ডেরায় নিয়ে যাওয়ার জন্য জোর তদবির চালাচ্ছেন। নির্ভরযোগ্য সূত্রে জানা গেছে, এই বদলি নিশ্চিত করতে তিনি ডিএফও সাজ্জাদকে আরও ১০ লক্ষ টাকা অগ্রিম উৎকোচ দিয়েছেন। মূলত কাপ্তাই রেঞ্জে কর্মরত থাকাকালীন এই এফজি ছাব্বির হোসেন ও অফিস সহায়ক ওসমান গণি তৎকালীন রেঞ্জারের সব ধরনের অবৈধ আয়ের প্রধান সংগ্রাহক বা মাঠপর্যায়ের ‘কালেক্টর’ হিসেবে কাজ করতেন, আর ঠিক সেই একই চোরচক্রের সিন্ডিকেটকে এখন বরকলে পুনর্বাসনের অপচেষ্টা চলছে। ডিএফও সাজ্জাদের এমন প্রত্যক্ষ মদদ ও দুর্নীতির অলিখিত ছত্রছায়ায় রাঙামাটির সামগ্রিক প্রাকৃতিক ভারসাম্য ও পরিবেশ আজ চরম ধ্বংসের মুখোমুখি এসে দাঁড়িয়েছে। তাঁর এই শক্তিশালী ও বেপরোয়া সিন্ডিকেটের কারণে কাপ্তাই রেঞ্জ, কর্ণফুলী রেঞ্জ, ফারুয়া রেঞ্জ এবং আলিখিয়াং রেঞ্জের চিরহরিৎ সংরক্ষিত বন আজ সম্পূর্ণ বিলুপ্তির দ্বারপ্রান্তে উপনীত হয়েছে। বিশেষ করে কাপ্তাই খাল মুখ বিটের চিত্র সবচেয়ে ভয়াবহ ও উদ্বেগজনক, যেখান থেকে প্রতিদিন দিনদুপুরে প্রকাশ্য দিবালোকে সরকারি মূল্যবান মাদার ট্রি ও গাছ কেটে নদীপথে পাচার করা হচ্ছে। স্থানীয়দের প্রকাশ্য অভিযোগ, এই কাঠ পাচার চক্রের মূল গডফাদার ও নেপথ্য নায়ক স্বয়ং ডিএফও সাজ্জাদ এবং এই একটি মাত্র স্পর্শকাতর বিট থেকে নির্বিঘ্নে কাঠ পাচারের ‘সবুজ সংকেত’ দেওয়ার বিনিময়ে তিনি প্রতি মাসে ২ লক্ষ টাকা করে নিয়মিত মাসোহারা নিজের পকেটে ভরছেন। একজন দায়িত্বশীল বিভাগীয় বন কর্মকর্তার এমন প্রকাশ্য বনখেকো কর্মকাণ্ড এবং একের পর এক দুর্নীতির অকাট্য তথ্য থাকার পরও ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের রহস্যজনক নীরবতা ও নিষ্ক্রিয়তা এখন স্থানীয় সর্বস্তরের জনমনে তীব্র ক্ষোভ ও নানা প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে।
উল্লেখ্য একটা সময়ে রাঙামাটির এই দক্ষিণ বন বিভাগে কোনো কর্মকর্তা বা কর্মচারী বদলি হয়ে আসতে চাইতেন না এবং লজিস্টিক সংকটের কারণে চলে যেতে চাইতেন, অথচ বর্তমান সিন্ডিকেটের যুগে বন সংরক্ষক ও ডিএফও-কে মোটা অঙ্কের অগ্রিম টাকা ঘুষ দিয়ে রেঞ্জ কর্মকর্তারা এখানে লোভনীয় পোস্টিং বা চেয়ার পাওয়ার জন্য রীতিমতো প্রতিযোগিতায় লিপ্ত হন। এই ভিউয়া জোত পারমিট, ভিউয়া টিপি (ট্রান্সপোর্ট পারমিট) ইস্যু এবং বদলি বাণিজ্য সম্পূর্ণ এককভাবে নিয়ন্ত্রণ করার জন্য ডিএফও এস এম সাজ্জাদ নিজের অধীনে একটি শক্তিশালী অপরাধী সিন্ডিকেট তৈরি করেছেন, যার মূল চালিকাশক্তি বা ‘রাইট হ্যান্ড’ হলো সদর রেঞ্জের ডেপুটি রেঞ্জার খন্দকার মাহমুদুল হক মুরাদ এবং এর অন্য সক্রিয় প্রভাবশালী সদস্যরা হলেন ফরেস্ট রেঞ্জার ওমর ফারুক স্বাধীন ও মামুনুর রহমান সহ আরও কয়েকজন অনুগত ফরেস্ট রেঞ্জার। উল্লেখ্য, দক্ষিণ বন বিভাগের অধীনে কাঠ পাচার রোধে ৫টি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বনশুল্ক পরীক্ষণ ফাঁড়ি বা চেকিং স্টেশন রয়েছে, সেগুলো হলো বরকল, রাইংখিয়ংমুখ, চন্দ্রঘোনা, বরইছড়ি ও ঘাগড়া। এই স্টেশনগুলোর মূল আইনি কাজ হলো সরকারি বনাঞ্চল হতে অবৈধভাবে কাঠ পাচার কঠোরভাবে প্রতিরোধ করা, কিন্তু সেখানে একজন স্টেশন কর্মকর্তা বা ইনচার্জকে পোস্টিং দেওয়ার নাম করে ডিএফও সাজ্জাদ প্রত্যেকের কাছ থেকে ২ হতে শুরু করে ১০ লক্ষ টাকা পর্যন্ত অগ্রিম নেন। আর টাকার বিনিময়ে পোস্টিং পাওয়া এই সকল দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তার মূল কাজই হলো মাঠপর্যায় থেকে আসা ভূয়া জোত পারমিটের সমস্ত অবৈধ ও চোরাই কাঠ চেকিংয়ের নামে সাজানো নথিপত্রে রাতারাতি ‘বৈধতা প্রদান’ করে নির্বিঘ্নে ঢাকা ও চট্টগ্রাম সহ সারা দেশে পাচারের রুট ক্লিয়ার করে দেওয়া। এছাড়াও অনুসন্ধানে জানা গেছে, কথিত ‘উপর মহলের’ খরচ মেটানো ও ফাইল ধামাচাপা দেওয়ার অজুহাতে প্রতিটি রেঞ্জ ও চেকিং স্টেশন থেকে মাসিক নির্ধারিত মাসোহারা হিসেবে ৫০ হাজার থেকে ১ লক্ষ টাকা পর্যন্ত বাধ্যতামূলক চাঁদা ধরা আছে, যা ডিএফও-র পক্ষে ক্যাশিয়ার মুরাদের মাধ্যমে কেন্দ্রীয় তহবিলে নিয়মিত আদায় করা হয়। এর বাইরেও স্থানীয় বিভিন্ন তদারকি সংস্থা ও প্রশাসনকে সম্পূর্ণ ‘ম্যানেজ’ করার নামে এস এম সাজ্জাদ ও তাঁর বিশ্বস্ত মুরাদ প্রতি মাসে ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে মোটা অঙ্কের গোপন চাঁদা আদায় করেন, যা সাধারণ মানুষের চোখের আড়ালে এক বিশাল অন্ধকার সাম্রাজ্য হিসেবে পরিচালিত হচ্ছে।