এমবিএম লুৎফুল হাদী এফসিএ: একজন সফল আলোকিত মানুষের প্রতিকৃতি

এমবিএম লুৎফুল হাদী দেশের খ্যাতিমান একজন চার্টার্ড অ্যাকাউন্ট্যান্ট। নিরীক্ষা প্রতিষ্ঠান হাদী লুৎফুল অ্যান্ড কোং (এইচএলসি)’র কর্ণধার। মাত্র নয় বছরের পথযাত্রায় “হাদী লুৎফুল অ্যান্ড কোং” -এর সাফল্যের গল্প শুনতে আমরা সম্প্রতি গিয়েছিলাম তাঁর বনানী ডিওএইচএস’র কার্যালয়ে। মানুষের কোলাহল আর যানজটের শব্দদূষণের এই নগরীতে এমন নিরব শান্ত পরিবেশ ভাবাই যায় না। শনিবারের ছুটির দিনেও তাঁর তুমুল ব্যস্ততা। নিরবেই কাজ করছেন একঝাঁক কর্মী। ব্যস্ততার মাঝেও তিনি বেশ আন্তরিকতার সাথে আমাদের সঙ্গে একান্তে কথা বলেছেন এবং শুনিয়েছেন তাঁর জীবনগাঁথা। এরই চুম্বক অংশ প্রিয় পাঠকদের জন্য তুলে ধরা হলো।
জন্ম ও শৈশব:
এমবিএম লুৎফুল হাদী ১৯৭৪ সালের ১২ই মার্চ কিশোরগঞ্জ জেলার বাজিতপুর উপজেলার দিঘিরপাড় ইউনিয়নের পাটুলি গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। পরিবার, বন্ধুবান্ধব, আত্মীয়-স্বজন ও নিজস্ব মহলে তিনি “সজল” নামে এবং পেশাগত পরিমণ্ডলে “হাদী” নামে সমধিক পরিচিত। চার ভাইবোনের মধ্যে তাঁর অবস্থান তৃতীয়। শৈশবের সোনালী দিন কেটেছে পাটুলী গ্রামে। পড়াশোনায় হাতেখড়ি পাটুলি গ্রামের মক্তবে। পাটুলি তজবিদুল কোরআন মাদ্রাসায় নিয়েছেন ধর্মীয় শিক্ষার হাতেখড়ি। শিক্ষানুরাগী মাতা লুৎফি আরা খাতুন ছিলেন তাঁদের সব ভাইবোনের বড় শিক্ষক। সরাসরি তাঁকে ২য় শ্রেণীতে ভর্তি করা হয় দিঘীরপাড় সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে। পরবর্তীতে তিনি ৫ম শ্রেণীতে ভর্তি হন বাজিতপুর টাউন হাই স্কুলে (বর্তমানে নাজিরুল ইসলাম কলেজিয়েট স্কুল)।
শিক্ষা ও কর্মজীবন:
১৯৮৬ সালে দানবীর মরহুম আলহাজ্ব জহুরুল ইসলাম বাজিতপুর উপজেলার ভাগলপুরে আফতাব উদ্দিন উচ্চ বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করার পরপরই তাকে সেখানে ৬ষ্ঠ শ্রেণীতে ভর্তি করা হয়। ১৯৯১ সালে তিনি আফতাব উদ্দিন উচ্চ বিদ্যালয় থেকে বিজ্ঞান বিভাগের ছাত্র হিসেবে এসএসসি ও ১৯৯৩ সালে ঢাকা সিটি কলেজ থেকে এইচএসসি পাস করেন। তিনি একই কলেজ থেকে বি কম পাস করেন এবং ১৯৯৬ সালে হাওলাদার ইউনুস এন্ড কোং -এ চার্টার্ড অ্যাকাউন্ট্যান্সি (সিএ) কোর্সে ভর্তি হন।
২০০০ সালে গ্রামীণফোনে ফাইন্যান্স অফিসার হিসেবে লুৎফুল হাদীর কর্মজীবন শুরু। ২০০৩ সালের আগস্ট মাসে তিনি গ্রামীণফোন ছেড়ে সিটিসেলে যোগদান করেন। চাকরির পাশাপাশি পড়াশোনাও চালিয়ে যান সমানতালে। জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় কলেজ (বর্তমানে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়) থেকে অ্যাকাউন্টিং বিষয়ে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি লাভ করেন।
২০১১ সালের জানুয়ারিতে সিটিসেলের জেনারেল ম্যানেজার পদে ইস্তফা দিয়ে হাওলাদার ইউনুস এন্ড কোং-এ পার্টনার হিসেবে যোগদান করেন। এরপর ২০১৬ সালের নভেম্বর-এ হাদী লুৎফুল এন্ড কোং এর কর্ণধার হিসেবে যাত্রা শুরু করে আজকের সফল উদ্যোক্তার আসনে অধিষ্ঠিত হয়েছেন তিনি। পড়াশোনার প্রতি তার আগ্রহের বিষয়টি এর আগেও উল্লেখ করা হয়েছে। এরই ধারাবাহিকতায় এশিয়া প্যাসিফিক ইউনিভার্সিটি থেকে ২০১৩ সালে এলএলবি এবং ২০১৮ সালে অতীশ দীপঙ্কর ইউনিভার্সিটি থেকে এলএলএম সম্পন্ন করেন।
পেশাগত জীবনে অনন্য সাফল্যের পাশাপাশি সাংগঠনিক দক্ষতারও সাক্ষর রেখে চলেছেন লুৎফুল হাদী। তিনি ঢাকা চেম্বার অফ কমার্স এন্ড ইন্ডাস্ট্রিজ (ডিসিসিআই) এর ট্যাক্স, ভ্যাট, কাস্টমস ও এনবিআর বিষয়ক স্থায়ী কমিটির কনভেনর। রাজধানীর বনানী ডিওএইচএসের স্থায়ী বাসিন্দা হিসেবে ডিওএইচএস পরিষদের অডিট কমিটির কনভেনর, মেম্বার সেক্রেটারি, প্রেসিডেন্ট এবং এডিআর কমিটির মেম্বার হিসেবে একদশকেরও বেশি সময় ধরে দায়িত্ব পালন করছেন। এছাড়াও বর্তমানে তিনি রিকম কনসাল্টিং লিঃ এর পরিচালক। শাশা ডেনিম লিঃ, প্রাইম ব্যাংক সিকিউরিটি লিঃ ও প্রাইম ফাইন্যান্স এ্যান্ড ইনভেস্টমেন্ট লিঃ -এর সাবেক পরিচালক হিসেবেও রয়েছে তাঁর বর্ণাঢ্য অতীত। পাশাপাশি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে অ্যাকাউন্টিং বিভাগে ২০২০ থেকে ২০২২ পর্যন্ত প্রায় তিন বছর খন্ডকালীন শিক্ষকতার স্মৃতি ও মনে থাকবে আমৃত্যু।
আজকের অবস্থানে আসার প্রেক্ষাপট বর্ণনায় লুৎফুল হাদী বলেন, ছোট বেলায় সবার মতো আমিও ডাক্তার হতে চাইতাম, তারপর এক পর্যায়ে স্বপ্ন দেখতাম বিসিএস দিয়ে এডমিন ক্যাডারে জয়েন করবো। এর একটা কারণ ছিল, আমার মেজো মামা বাংলাদেশ সরকারের একজন সচিব ছিলেন। উনাকে দেখে খুব উৎসাহিত হতাম। তারপর যখন একটু বড় হলাম, তখন অনুপ্রাণিত হলাম আমার সেজো মামা দ্বারা, তিনি বাংলাদেশ ট্যাক্স আপীলাত ট্রাইব্যুনালের প্রেসিডেন্ট ছিলেন। তিনি আমার বাবা-মাকে বললেন যে আমাদেরকে যেন চার্টার্ড অ্যাকাউন্ট্যান্সি কোর্সে ভর্তি করে। সেখান থেকেই মূলত সিএ পড়ার উৎসাহটা পাওয়া। এর পেছনে আরেকটা কারণ ছিল আমার বাবা পাকিস্তান ইনস্টিটিউট অব ইন্ডাস্ট্রিয়াল অ্যাকাউন্ট্যান্টস (পিআইআইএ) -এর ছাত্র ছিলেন। বাবার মনেও একটা সুপ্ত বাসনা ছিল, ছেলেরা যেন এরকম প্রফেশনাল কোনো কোয়ালিফিকেশন অর্জন করে। পারিবারিক গাইডেন্স এবং উৎসাহে আমার বড় ভাই চার্টার্ড অ্যাকাউন্ট্যান্ট হলেন। বড় ভাইয়ের পথ ধরে আমিও চার্টার্ড অ্যাকাউন্ট্যান্ট হলাম। এ হচ্ছে আমার সিএ হওয়ার গল্প।
সিএ পড়াশোনার তখনকার আর এখনকার কারিকুলামের মধ্যে পার্থক্য কি, কতোটা আপডেটেড হলো এবং কতটুকু উপকৃত হলো এখনকার ছাত্ররা-এ প্রশ্নের উত্তরে তিনি বলেন, আমরা যখন পড়াশোনা করেছি তখন প্রতিটা লেভেলে আমাদেরকে সবগুলো সাবজেক্টে একসাথে পরীক্ষা দিতে হতো এবং একসাথে পাস করতে হতো। এটা খুবই চ্যালেঞ্জিং ছিলো। ধরেন একটা লেভেলে আমি ৫টা বিষয়ে পরীক্ষা দিলাম, সেখানে ৪টা পাস করলাম , কিন্তু ১টা বিষয় পাস করতে পারি নাই, তখন আবার শুরু থেকেই শুরু করতে হতো এবং পুনরায় ৫টা সাবজেক্ট একসাথে পরীক্ষা দিতে হতো। বর্তমানে প্রচলিত পরীক্ষা পদ্ধতিতে যে একটা সাবজেক্টে পরীক্ষা দিয়ে পাশ করে যাচ্ছে, ঐ সাবজেক্ট তার শেষ। আবার যে ৫ টি সাবজেক্ট পরীক্ষা দিয়ে ৩ টি সাবজেক্ট পাস করলো কিন্তু ২ টি সাবজেক্ট পাস করতে পারলো না, তাকে শুধু নতুন করে ২ টি সাবজেক্ট পরীক্ষা দিতে হবে। এই যে পরিবর্তন -এটা সিএ হওয়ার জন্য বা সিএ পরীক্ষা পাস করার জন্য খুবই ইফেক্টিভ একটা রোল প্লে করছে। বলা যায় আন্তর্জাতিক মান বজায় রেখে পরীক্ষা পদ্ধতি অনেক সহজতর করা হয়েছে। তিনি বলেন, আমার সময়তো অনলাইন পরীক্ষা ছিল না। এখন সিএ সার্টিফিকেট লেভেল পর্যন্ত অনলাইন পরীক্ষা দিতে পারে। তারপর প্রি আর্টিক্যাল স্টুডেন্ট (পাস) নামে একটা স্কিম আইসিএবি চালু করেছে। কেউ যদি ইউনিভার্সিটিতে গ্র্যাজুয়েশন বা মাস্টার্স লেভেলে স্টাডি অবস্থায় থাকেন, তিনি সাতটা সাবজেক্ট অনলাইনে পরীক্ষা দিতে পারেন। সেক্ষেত্রে আর্টিক্যালশিপ বা সিএ ফার্মে এসে তার কাজ করার কোনো প্রয়োজন নেই। আমাদের সিলেবাস আন্তর্জাতিক মানের এবং আপডেটেড। আমরা আইসিএইডব্লিউ -এর সাথে কোলাবরশনের মাধ্যমে ওদের সিলেবাসটাকে আমাদের দেশের কনটেক্সটে আপডেট করেছি। লাস্ট আপডেট হয়েছে ২০২৩ সালে। আইসিএইডব্লিউ -এর সহযোগীতায় প্রস্তুতকৃত আমাদের ম্যানুয়ালগুলো নিঃসন্দেহে আন্তর্জাতিক মানের। তারপরও এটাই তো শেষ না, আমাদের আরো এগিয়ে যেতে হবে। বিশেষ করে গ্লোবালি সিএ প্রফেশন যে চেঞ্জগুলো ফেস করছে, যেমন সিলেবাসে আর্টিফিসিয়াল ইন্টেলিজেন্স অন্তর্ভুক্ত করা, নিরীক্ষা মান বজায় রাখা, মানিলন্ডারিং, ইত্যাদি বিষয়ে কাজ করতে হবে। এছাড়া, আর্টিফিসিয়াল ইন্টেলিজেন্সকে ব্যবহার করে শিক্ষা ও পরীক্ষা পদ্ধতি প্রণয়ন নিয়ে অনেক কাজ এখনো বাকি । তো সেদিকেও আমরা এগোচ্ছি। আর যদি আমাদের সাবকন্টিনেন্টের কনটেক্সটে বলি, অবশ্যই আমাদের প্রোগ্রেস স্যাটিসফেক্টরি।
বড় সিএ ফার্মের চেয়ে মাঝারি আকারের সিএ ফার্ম থেকে আর্টিক্যালশিপ করলে তাদের জন্য পড়াশোনা করতে সহজ হয় কিনা এ বিষয়ে জানতে চাইলে লুৎফুল হাদী বলেন, আসলে আমাদের আইসিএবির আইনি কাঠামোতে এরকম বড় ফার্ম বা ছোট ফার্ম বলে কিছু নেই। সিএ ফার্মে রাউন্ড দ্যা ইয়ার কাজের প্রেসার কিন্তু একইরকম থাকে না। কোনো সময় প্রেসার বেশি আবার কোনো সময় প্রেসার কম থাকে। কেউ যদি পরীক্ষায় পাস করতে চায় সেক্ষেত্রে ছোট ফার্ম বা বড় ফার্ম বলে কোনো কথা নেই। তার নিজের ডিটার্মিনেশন থাকতে হবে, তাকে সিরিয়াস হতে হবে, তার কমিটমেন্ট থাকতে হবে। পরীক্ষা পাস করার পাশাপাশি আমাদের সিএ প্রফেশনের মূল বিউটি হলো- আর্টিক্যালশিপ। আর্টিক্যালশিপে কেউ যদি সিরিয়াসলি কাজ না করে, তাহলে সিএ পাস করার পরও কিন্তু তার দুর্বলতা থেকে যাবে। মনে রাখতে হবে, এটা কিন্তু একাডেমিক ডিগ্রি না, ইটস এ প্রফেশনাল কোয়ালিফিকেশন। সেজন্যই সিএ প্রফেশনে যেমন আর্টিক্যালশিপে কাজ শেখা দরকার, তেমনি পরীক্ষা পাশের জন্য পড়াশোনাটাও করা দরকার। কিভাবে একজন এই দুইয়ের ব্যালেন্স করবে, সেটাই হলো সিএ স্টুডেন্টদের আর্ট।
তবে সিএ পরীক্ষায় পাস না করলেও বা আংশিক পাশ করলেও আর্টিক্যালশিপে হাতে কলমে কাজ করার শক্ত ভিত্তি থাকার কারণে সিএ কোর্স কমপ্লিট স্টুডেন্টদের চাকরির বাজারে যথেষ্ট চাহিদা আছে। আইসিএবির আন্ডারে সিএ করে বাইরের দেশে সুইচ করার ক্ষেত্রে আইসিএবি কোনো সহযোগিতা করতে পারবে কিনা? এমন প্রশ্নের উত্তরে লুৎফুল হাদী বলেন, আইসিএবিতে যদি আর্টিক্যালশিপের জন্য রেজিস্টার্ড হয়, তাহলে বিদেশে কোনো ক্রেডিট ট্রান্সফারের প্রয়োজন নেই। আইসিএবি -এর সিএ কিন্তু গ্লোবালি রিকোগনাইসড একটি কোয়ালিফিকেশন। আমাদের কোয়ালিফাইড মেম্বাররা পাথওয়ের মাধ্যমে আইসিএইডব্লিউ -এর মেম্বার হতে পারবে। এছাড়াও অনুরূপ এমআরএ ও পাথওয়ে মেম্বারশীপের জন্য কানাডা-আমেরিকার সাথে আমাদের আলোচনা চলমান। তাই কেউ যদি আইসিএবি থেকে কোয়ালিফাই করে, তিনি কিন্তু অন্য দেশের সিএ বা অনুরূপ ইনস্টিটিউটের মেম্বারশিপ অনেক সহজে পেতে পারেন। কেউ যদি টার্গেট করে যে, আমি কোয়ালিফাই করবো আইসিএবি থেকে এবং কোয়ালিফাই করে ইউকে গিয়ে আইসিএইডব্লিউ -এর মেম্বারশিপ নিবো -সেটা সম্ভব। তিনি বলেন, আইসিএবি’র মাধ্যমে বিশ্বমানের ডিগ্রি অর্জন আমাদের দেশেই সম্ভব, দেশের বাইরে যাওয়ার কোনো প্রয়োজন পড়ছে না। যেহেতু সিএ একটা প্রফেশনাল কোয়ালিফিকেশন, তাই যেকোনো ডিসিপ্লিন থেকে সিএ স্টাডি করা সম্ভব।
সিএ কত দ্রুত শেষ করা যায়? আমরা অনেকেই বলি যে, অনেক দেরি হয়, এটা দ্রুত শেষ করার জন্য কোনো কৌশল আছে কিনা?
এ প্রশ্নের উত্তরে তিনি বলেন, অবশ্যই পার্সিভিয়ারেন্স, ডিটার্মিনেশন, কমিটমেন্ট, টাইম ম্যানেজমেন্ট আর রেগুলার স্টাডি -এই বৈশিষ্ট্যগুলো একজন সিএ স্টুডেন্টের মধ্যে থাকতেই হবে। এছাড়া প্রবলেম সলভিং, ডিসিশন ম্যাকিং এবং অ্যানালিটিক্যাল স্কিল থাকাও জরুরী। পাশাপাশি, যারা সিএ-তে অধ্যয়নরত আছেন তাদের বিগত বছরগুলোর প্রশ্নগুলোর সল্যুশন করা উচিত। ১০ বছরের প্রশ্ন নিয়ে নিজে নিজে মক পরীক্ষা দিলে অনেক উপকারে আসবে।
কেজেএফডি-লুৎফি আরা খাতুন শিক্ষাবৃত্তি ও কিছু কথা:
আপন আলোয় উদ্ভাসিত এমবিএম লুৎফুল হাদী চারপাশ আলোকিত করারও স্বপ্ন দেখেন। সম্প্রতি তাঁর মাতা লুৎফি আরা খাতুনের নামে ঢাকায় বসবাসরত কিশোরগঞ্জের সাংবাদিকদের সংগঠন কিশোরগঞ্জ সাংবাদিক ফোরাম ঢাকার আয়োজনে কেজেএফডি-লুৎফি আরা খাতুন শিক্ষাবৃত্তি ২০২৫ প্রদান করেছেন। ২০ জন শিক্ষার্থীর হাতে নগদ দশ হাজার টাকা ও ক্রেস্ট প্রদানের মাধ্যমে জাতীয় প্রেসক্লাবে এ শিক্ষাবৃত্তি প্রদান করেন তিনি। অনুষ্ঠানে মাতা লুৎফি আরা খাতুন সম্পর্কে তিনি বলেন, ১৯৫৪ সালের ১লা সেপ্টেম্বর কিশোরগঞ্জের কুলিয়ারচর উপজেলার পীরপুর গ্রামের এক সম্ভ্রান্ত ও শিক্ষানুরাগী পরিবারে আমার মা জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতা ছিলেন তৎকালীন গ্রামের প্রেসিডেন্ট (বর্তমান সময়ের চেয়াম্যান পদবী) ও বিশিষ্ট সমাজসেবক মুন্সী ফজলুর রহমান এবং মাতা ছিলেন অতিথি ও ধর্মপরায়না মামুদা বেগম।
আমার মা ছিলেন পাঁচ ভাইবোনের মধ্যে একমাত্র বোন। তার বড় ভাই ড. এম. মাহবুবুর (ডি-লিট, ভারত) ছিলেন বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের রেজিস্টার, দ্বিতীয় ভাই মো. মাহফুজুজ সোবহান সাবেক ধর্মসচিব (২০০১) ও তৃতীয় ভাই মো. মাসুদউস সুলতান সাবেক প্রেসিডেন্ট বাংলাদেশ ইনকাম ট্যাক্স আপিলাত ট্্রাইব্যুনাল আর ছোট ভাই মো. মারফুল হাসান ছিলেন জনতা ব্যাংকের সিনিয়র অফিসার। তাঁদের পিতা অর্থাৎ আমার নানা ছিলেন অত্যন্ত শিক্ষানুরাগী, যার প্রভাব সন্তানদের জীবন ও কর্মজীবনে প্রতিফলিত হয়েছে।
আমার মা ১৯৬৮ সালে ময়মনসিংহ বিদ্যাময়ী সরকারি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয় থেকে ম্যাট্রিক পাস করেন। ১৯৭০ সালে টাঙ্গাইলের কুমুদিনী সরকারি কলেজ থেকে ইন্টারমিডিয়েট সম্পন্ন করেন। পরীক্ষার ফল প্রকাশের আগেই তিনি নিজ গ্রামে ফিরে আসেন এবং একই বছর (১৯৭০ সালে) আমার পিতা হাজী মো. হেলাল উদ্দিন আহমেদ এর সঙ্গে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হন।
আমরা চার ভাইবোন। বড় ভাই এম কিউ এম লুৎফুল বাকী একজন চার্টার্ড অ্যাকাউন্ট্যান্ট (অস্ট্রেলিয়া প্রবাসী), দ্বিতীয় ভাই মানজুর রশিদ মোহাম্মদ লুৎফুল গনি একজন ব্যবসায়ী এবং ছোটবোন রুমিন আরা শারমিন মতিঝিল কলোনী হাই স্কুলের শিক্ষিকা।
প্রায় একযুগ পর ১৯৮২ সালে বাজিতপুর ডিগ্রি কলেজে ভর্তি হন আমার মা। ১৯৮৩ সালে প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক নিয়োগ পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে চূড়ান্তভাবে নির্বাচিত হন। কিন্তু নিয়োগকে কেন্দ্র করে মামলা হওয়ায় তা বাতিল হয়ে যায়। পরবর্তীতে সরকারি চাকরির বয়সসীমা অতিক্রম করায় তিনি আর সে পথে অগ্রসর হতে পারেননি। তবে তিনি থেমে থাকেননি । সংসার সমাজসেবা, ধর্ম এবং সুফিবাদের ভাবধারায় নিজেকে নিবেদন করেন। গরীব, অসহায় ও অসুস্থ মানুষের পাশে দাঁড়ানো ছিল তাঁর নিত্যদিনের অভ্যাস।
আমার মা ছিলেন অত্যন্ত ধার্মিক, দানশীল এবং মানবপ্রেমী। তিনি স্বনির্ভর বাংলাদেশের কর্মকান্ডের সঙ্গেও যুক্ত ছিলেন। সংসার, সমাজ, ধর্ম ও সংস্কৃতির প্রতি তাঁর ভালোবাসা তাঁকে অনন্য ব্যক্তিত্বে পরিণত করেছিল। আমার জীবনের অনুপ্রেরণা আমার মা।
হ্যাঁ, মায়ের দেখানো পথেই অবিরাম হেঁটে চলেছেন এমবিএম লুৎফুল হাদী । মা তাকে আদর করে সজল নামে ডাকতেন । মায়ের পর আরেকজন মানুষ তাঁকে পরম ভালোবাসায় আগলে রেখেছেন। তিনি হলেন মোহ্সানা আক্তার পান্না। তাঁর সহধর্মিনী। ছিলেন সরকারি প্রাথমিক স্কুলের শিক্ষিকা। কল্লোল পরাগমেলা কিন্টারগার্ডেন ও আফতাব উদ্দিন উচ্চ বিদ্যালয়েও শিক্ষকতা করেছেন তিনি। সবকিছু ছেড়ে এখন আপন সংসার নিয়েই আছেন । কাজ করছেন নিজেদেরই প্রতিষ্ঠান হাদী লুৎফুল এন্ড কোং এর কনসালট্যান্ট হিসেবে। এক পুত্র আর এক কন্যা নিয়ে রয়েছে তাদের সুখের সংসার। পুত্র মাহিদ আহমেদ ডিপি-২ আর কন্যা মাইজাহ্ আহমেদ ডিপি-১ আইবি কারিকুলামে পড়ছে ঢাকার আগা খান একাডেমীতে।
সাফল্যের বরপুত্র এমবিএম লুৎফুল হাদী এফসিএ। আপনজনদের কাছে তিনি সজল। কিশোরগঞ্জের বাজিতপুরের পাটুলি গ্রামের ছোট্ট সজল আজ এক আলোকিত মানুষ। যার আলোকচ্ছটায় চারপাশ আলোকিত হচ্ছে। ছড়িয়ে পড়ছে মানবিকতার দ্যূতি। তাঁর স্বপ্ন- দেশটা শান্তিপূর্র্ণ হোক। ঘুচে যাক দুঃখ ঝঞ্ঝাট গ্লানি । বন্ধ হোক হানাহানি এবং প্রতিহিংসা।
এজেএ
