বনের রক্ষকই যখন মূল ভক্ষক
৩৮তম বিসিএস-এর এসিএফ মাসুদের অতিরিক্ত লোভ ও সিন্ডিকেটে ধ্বংসের মুখে লামার বনাঞ্চল

জলবায়ু সংকটের এই মহাসন্ধিক্ষণে যখন বৈশ্বিক উষ্ণতা রুখতে বনাঞ্চল রক্ষা করা সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ, ঠিক তখনই দেশের অন্যতম প্রধান প্রাকৃতিক ফুসফুস খ্যাত পার্বত্য বান্দরবানের লামা বনবিভাগে চলছে প্রকাশ্য দিবালোকে দায়িত্বরত কর্মকর্তাদের প্রত্যক্ষ মদদে এক অভূতপূর্ব ও নৃশংস বন নিধনযজ্ঞ। সরকারের ৩৮তম বিসিএস (বন) ক্যাডারের কর্মকর্তা এবং বর্তমান সহকারী বন সংরক্ষক (এসিএফ) মো: মাসুদ আলমের লাগামহীন ও অতিরিক্ত লোভ-লালসা এবং চরম দুর্নীতির কারণে আজ ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে উপনীত হয়েছে বান্দরবান লামা বন বিভাগের মাতামুহুরী সংরক্ষিত বনাঞ্চলসহ লামা রেঞ্জ, তৈন রেঞ্জ, নাইক্ষ্যংছড়ি রেঞ্জ, মাতামুহুরী রেঞ্জ, ডলু রেঞ্জ, সাংগু রেঞ্জ এবং বিট ও ক্যাম্প সমুহের অধীনে রক্ষিত থাকা বনাঞ্চল, আর এসব রেঞ্জ, বিট ও ক্যাম্প থেকে নিয়মিত মাসোহারা আদায় করছেন সহকারী বন সংরক্ষক মাসুদ । প্রকৃতির অমূল্য সম্পদ ও শতবর্ষী সব মাতৃবৃক্ষ কেটে উজাড় করে ফেলা হচ্ছে, যার ফলে বিঘ্নিত হচ্ছে বন্যপ্রাণীর আবাসস্থল এবং তীব্র হুমকিতে পড়ছে এ অঞ্চলের জীববৈচিত্র্য ও পানির প্রধান উৎস মাতামুহুরী নদী। স্থানীয় বাসিন্দাদের সুনির্দিষ্ট ও গুরুতর অভিযোগ, এই বিপুল প্রাকৃতিক ধ্বংসযজ্ঞের মূল হোতা মূলত এসিএফ মাসুদ আলম এবং রেঞ্জার আব্দুল মালেকসহ তাদের তৈরি করা একটি শক্তিশালী ও অসাধু বন কর্মকর্তা-কর্মচারীদের সিন্ডিকেট, যাদের সরাসরি জড়িত থাকার কারণে সংরক্ষিত বনাঞ্চলের গাছ দিনদিন বিলীন হয়ে যাচ্ছে আর বিনিময়ে কোটি কোটি টাকার অবৈধ জোয়ারে ভাসছে এই কর্মকর্তাদের পকেট।
অনুসন্ধানে জানা যায়, ৩৮তম বিসিএসের ক্যাডারে এসিএফ হিসাবে চাকরিতে প্রবেশ করে মাসুদ আলম ট্রিনিং কাল চরকাই রেঞ্জ, দিনাজপুর সামাজিক বন বিভাগে কর্মরত ছিলেন এবং অত্যন্ত দুঃখজনকভাবে নিজের প্রশিক্ষণকালীন সময়েও তিনি বনভূমি দখলদারদের সাথে গভীর যোগসাজশ স্থাপন করে একটি সিন্ডিকেটের মাধ্যমে অবৈধ অর্থ উপার্জনের হাত পাকান। পরবর্তীতে বিগত ফ্যাসিবাদী আওয়ামী সরকারের সাবেক প্রভাবশালী তথ্যমন্ত্রী হাছান মাহমুদের রাজনৈতিক ছত্রছায়ায় রাঙ্গামাটি অঞ্চলের পার্বত্য চট্টগ্রাম দক্ষিণ বন বিভাগে কর্মরত থাকাকালীন তার দুর্নীতির চাকা আরও বেগবান হয়; সেখানে তিনি কোনো প্রকার সরেজমিনে তদন্ত না করেই টেবিলে বসে ভুয়া জোত পারমিট প্রদান করে রাষ্ট্রীয় বনের কাঠ পাচারকে কাগজের কলমে বৈধতা দেন এবং পারমিট ইস্যুর ক্ষেত্রে প্রতি ঘনফুট কাঠে ৮ টাকা হারে ঘুষ গ্রহণ করে খাড়া মার্কার প্রায় ৫০% গাছ স্পটে না গিয়েই চেকের মাধ্যমে জালিয়াতি করেন, যার সাথে পাশমার্কা চেক, স্টক চেক ও ডি-ফরমের মাধ্যমে টিপি ইস্যুর মোটা অংকের বাণিজ্য জড়িত ছিল। চাকরিতে একদম নতুন হওয়া সত্ত্বেও তার অবৈধ আয়ের অংক এতটাই আকাশচুম্বী যে বর্তমানে ৩৮ বিসিএস তো দূর, ৩১ বা ৩৩ বিসিএসের জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তাদের কাছেও সমপরিমাণ নগদ টাকা নেই এবং এই কাঁচা টাকার গরমে তিনি বন অধিদপ্তরের অত্যন্ত কঠোর ও সুনির্দিষ্ট বদলি নীতিমালাকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখানোটা মামুলি ব্যাপারে পরিণত করেছেন। সাধারণত পার্বত্য এক জেলা অর্থাৎ রাঙ্গামাটি হতে পার্বত্য বান্দরবান জেলায় সরাসরি নিয়মবহির্ভূত পদায়নের নিয়ম না থাকলেও মাসুদ আলম ক্ষমতার পালাবদলের খেলাকে কাজে লাগিয়ে সাবেক এক উপদেষ্টার স্বামীকে মোটা অংকের টাকা দিয়ে ম্যানেজ করে গত ২০ নভেম্বর ২০২৫ তারিখে লামা বন বিভাগে এসিএফ হিসেবে যোগদান করেন। জন্মসূত্রে খাগড়াছড়ি জেলার কল্যাণপুর গ্রামের বাসিন্দা হলেও পার্বত্য অঞ্চলে নিজের আধিপত্য বজায় রাখতে ও আদিবাসীদের ধোঁকা দিতে নিজেকে চট্টগ্রামের ছেলে হিসেবে জাহির করে তীব্র প্রভাব বিস্তার করে রেখেছেন তিনি, যার দাপটে স্বয়ং বিভাগীয় বন কর্মকর্তা (ডিএফও) ও বন সংরক্ষক (সিএফ) পর্যন্ত তটস্থ থাকেন এবং লামা বন বিভাগে যোগদানের পর থেকেই ক্ষমতার অপব্যবহার করে আইন ও বিধিনিষেধ কে সম্পূর্ণ বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে নিজেকে অত্র বনের একমাত্র অলিখিত ‘রাজা’ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছেন।
লামা বন বিভাগের যে কয়েকটি রেঞ্জে জোত পারমিট ইস্যু করা হয়, তার সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ এই এসিএফ মাসুদ আলমের হাতে এবং তিনি স্পটে না গিয়ে (যদিও নিয়ম আছে ফিল্ড পর্যায়ে সরেজমিনে ৫০% খাড়া গাছ চেক করা) সংশ্লিষ্টদের সাথে যোগসাজশে টেবিলে বসেই সমস্ত ভুয়া তদন্ত প্রতিবেদন তৈরি করেন এবং প্রতি ঘনফুটে ৮ টাকা হারে কমিশন নেন। শুধু তাই নয়, কাঠের ও অন্যান্য বনজ দ্রব্যের গাড়ি চলাচলের জন্য তার সুনির্দিষ্ট একটি অবৈধ টোল বা চাঁদার চার্ট রয়েছে, যেখানে প্রতি কাঠের গাড়ি থেকে এক হাজার টাকা, ফার্নিচারের গাড়ি থেকে পাঁচশত টাকা, উলুফুলের গাড়ি থেকে এক হাজার পাঁচশত টাকা এবং অন্যান্য মালবাহী গাড়ি থেকে এক থেকে দুই হাজার টাকা পর্যন্ত বাধ্যতামূলকভাবে আদায় করা হয়। দিনের আলোয় সরকারি বনের কাঠ কাটার উৎসব চালানোর পাশাপাশি এই লোভী কর্মকর্তা রাতের আঁধারে মোটা অংকের টাকার বিনিময়ে রাজকীয় কায়দায় সিন্ডিকেটের কাঠ পাচারের নিরাপদ লাইন বা রুট দিয়ে থাকেন, যার ফলে রাতের অন্ধকারে শত শত ট্রাক পার্বত্য অঞ্চলের অমূল্য কাঠ নিয়ে সমতলের দিকে পাড়ি জমাচ্ছে। পরিবেশবিদদের মতে, বনের রক্ষক যখন নিজেই এমন ভক্ষকের ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়ে ক্ষমতার অপব্যবহার ও দুর্নীতির মাধ্যমে অবৈধ সম্পদের পাহাড় গড়েন, তখন তা কেবল একটি দাপ্তরিক অপরাধ নয় বরং দেশের পরিবেশগত সার্বভৌমত্ব ও ভবিষ্যৎ প্রজন্মের বিরুদ্ধে এক চরম রাষ্ট্রদ্রোহিতার শামিল, যা অনতিবিলম্বে কঠোর আইনি প্রক্রিয়ায় রুখে না দাঁড়ালে মানচিত্র থেকে চিরতরে হারিয়ে যাবে পার্বত্য বান্দরবান ও লামার অপরূপ প্রাকৃতিক বনাঞ্চল।
