পার্বত্য চট্টগ্রাম দক্ষিণ বন বিভাগে বদলী নীতিমালা উপেক্ষা করে চলছে বদলী বাণিজ্যসহ নানান অনিয়ম ॥ দেখার কেউ নেই
পার্বত্য চট্টগ্রাম দক্ষিণ বন বিভাগে চলছে বদলী নীতিমালা বহির্ভূত বদলী বাণিজ্য।
পার্বত্য চট্টগ্রাম দক্ষিণ বন বিভাগে চলছে বদলী নীতিমালা বহির্ভূত বদলী বাণিজ্য। নিজ স্বার্থ হাসিলের জন্য খোদ বিভাগীয় বন কর্মকর্তা বদলী সংক্রান্ত নীতিমালা ২০০৪ উপেক্ষা করে ২ ফরেস্টারকে অনিয়মতান্ত্রিক বদলী নিয়োগ করেছেন বলে অভিযোগ রয়েছে।
অনিয়মিত বদলী সরকারী শৃংখলার পরিপন্থী জেনেও তিনি এহেন বদলী নিয়োগ করায় তার দক্ষতা ও স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। পাশাপাশি গোটা বন সার্কেলে কর্মরতদের মধ্যে চরম অস্থিরতা বিরাজ করছে। অনুসন্ধানে জানা যায়, গত ২৪ অক্টোবর ৫৬ নং অফিসাদেশে ফরেস্টার নজরুল ইসলামকে বরকল বনশুল্ক ও পরীক্ষণ ফাড়ি তে স্টেশন কর্মকর্তা হিসেবে নিয়োগ দেন। অথচ ফরেস্টার নজরুল ২০১৮ সালে এই বরকক স্টেশনে নিয়োগপ্রাপ্ত হয়ে ১ বছর ৬ মাস চাকুরী করেন। এ সময় তিনি স্টেশন কর্মকর্তার অ্যাটাচ হিসেবে নিয়োগ পেলেও স্টেশন কর্মকর্তা নাজমুলকে পাশ কাটিয়ে কয়েক লক্ষ ঘণফুট কাঠের জোট ইস্যু করার মূল নায়ক ছিলেন।
পরবর্তীতে ঐ সময়ের ডিএফও কে ম্যানেজ করে ফরেস্টার নজরুল পুনরায় বরকল ষ্টেশনের অতিরিক্ত দায়িত্বমূলে স্টেশন কর্মকর্তা হিসেবে নিয়োগ নিয়ে আরও ১ বছর দায়িত্ব পালন করেন। গত ২৪ অক্টোবর পুনরায় ৩য় বারের মতো বর্তমান বিভাগীয় বন কর্মকর্তা ছালেহ মোঃ শোয়াইব খান বদলী নীতিমালার তোয়াক্কা না করে অতিরিক্ত দায়িত্ব হতে ফরেস্টার নজরুলকে উক্ত বরকল স্টেশনের মূল দায়িত্বে ১ বছরের জন্য নিয়োজিত করেন।
ফলে এই ফরেস্টার নজরুলের একই স্টেশনে একাধারে সাড়ে ৩ বছর চাকুরীর বিষয়টি নিশ্চিত হয়। জানা যায় এই বিভাগীয় বন কর্মকর্তা ইতোপূর্বে সুন্দরবন বন বিভাগে কর্মরত থাকাকালীন ফরেস্টার নজরুল তার অধীনে চাকুরীতে থেকে বিভিন্ন অনৈতিক কাজে তাকে সহযোগিতা করতেন। পরবর্তীতে পার্বত্য চট্টগ্রাম দক্ষিণ বন বিভাগে আবার ও ২জনের দেখা হওয়ায় শুরু হয় নতুন করে অপতৎপরতা।
২০১৮ সালে বরকল ফরেস্ট অফিসের অধীনে আটককৃত ২ লাখ ঘণফুট কাঠের সাথে বিভিন্ন বাগান থেকে নতুনভাবে আরো ২ লাখ ঘণফুট কাঠ সংগ্রহ করে পুরানো ডি ফরমের আড়ালে তা হালাল করতে বিভাগীয় বন কর্মকর্তা ও ফরেস্টার নজরুল লক্ষ লক্ষ টাকা অবৈধ উপার্জন করেন। আর ঐ কারণেই ২ জনের সখ্যতা আরো বৃদ্ধি পায়। বিভাগীয় বন কর্মকর্তাকে এই খাত থেকেই কয়েক লক্ষ টাকা উপরি আয় করে দেয়ায় ডিএফও সাহেব ফরেস্টার নজরুলকে আবারো প্রাইজ পোস্টিং একই বরকল স্টেশনের স্টেশন কর্মকর্তা হিসেবে নিয়োগ দেন।
অথচ বদলী নীতিমালার ৩ (খ) অনুচ্ছেদে সুস্পষ্ট উল্লেখ রয়েছে শুল্ক, টোলফাড়ি, চেক স্টেশন ও দুর্গম পাহাড়ী এলাকায় নিয়োজিত কর্মচারীগণকে ১ বছর পর বদলী করতে হবে। পুনরায় এ সকল স্থানে বদলী করতে হলে সেক্ষেত্রে ৮ বছর অতিক্রান্ত হতে হবে। নীতিমালার ১ (গ) অনুচ্ছেদে উল্লেখ আছে প্রত্যেক অফিসের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের তালিকা সম্বলিত রেজিস্টার সংরক্ষণ করে সেখানে প্রত্যেকের বর্তমান ও অতীত কর্মস্থল লিপিবদ্ধ করতে হবে। সুতরাং ডিএফও সাহেব জেনে শুনেই নীতিমালা উপেক্ষা করেছেন যা সরকারী শৃঙ্খলার পরিপন্থী।
অপরদিকে এই বিভাগীয় বন কর্মকর্তা ইতোপূর্বে কুষ্টিয়া সামাজিক বন বিভাগে কর্মরত থাকাকালীন তার বিভিন্ন অপকর্মের সহযোগী ২০১৪ সালে নিয়োগপ্রাপ্ত ফরেস্টার আব্দুল হামিদকে এই বন বিভাগে বদলী করিয়ে এনে সদর রেঞ্জের নিয়োগ দেন। অথচ এখানে ১৯৯০ ও ১৯৯৬ সালে নিয়োগ প্রাপ্ত ৪জন জ্যেষ্ঠ ফরেস্টার রয়েছেন। সিনিয়রদের বাইপাস করে অপেক্ষাকৃত জুনিয়রকে এহেন নিয়োগকে কেন্দ্র করে গোটা বন বিভাগে কর্মরতদের মধ্যে চাপা ক্ষোভ বিরাজ করছে।
অন্যদিকে কর্ণফুলী ও কাপ্তাই রেঞ্জে থাকা সরকারের কোটি কোটি টাকার বনজ সম্পদ মাত্র কয়েকজন ফরেস্টার দ্বারা চালানো হচ্ছে। যার এক একজন প্রায় ২-৩টি বিটের দায়িত্ব জীবন বাজি রেখে দায়িত্ব পালন করে আসছেন। কাপ্তাই মুখ বিটে একজন পঙ্গু ফরেস্টার কে দায়িত্ব দেয়া আছে। সেই বিটে ব্যাপক হারে মূল্যবান সেগুন গাছ কাটা ও পাচার হচ্ছে হরদম। এ নিয়ে বিভাগীয় বন কর্মকর্তার কোন মাথাব্যথা নেই।
জানা যায় এই কর্মকর্তা কুষ্টিয়া সামাজিক বন বিভাগে কর্মরত থাকাকালীন নারী কেলেঙ্কারী সহ বিভিন্ন অনিয়মের সাথে জড়িয়ে পড়েন। এ নিয়ে মামলা পর্যন্ত গড়ায়। ফরেস্টার হামিদ তাকে মামলা থেকে অব্যাহতি পেতে আপ্রাণ চেষ্টা করায় তার প্রতিদান স্বরূপ তাকে কুষ্টিয়া থেকে বদলী করিয়ে এনে সদর রেঞ্জে নিয়োগ দেয়া হয়।
সূত্রমতে এই কর্মকর্তার বিরুদ্ধে উত্থাপিত অন্যান্য অভিযোগের মধ্যে রয়েছে এলাকায় জোত ভূমিতে অল্প গাছ থাকা সত্বেও বেশি গাছ দেখিয়ে জোট পারমিট ইস্যু করিয়ে কোটি কোটি টাকার বনজ সম্পদ উজাড়ের মাধ্যমে সিএফটি প্রতি ৬ টাকা হারে আদায় করিয়ে কয়েক লক্ষ টাকা অবৈধ উপার্জন, গত অর্থবর্ষে ৭শ হেক্টর বনভূমিতে ANR বাগান সৃজনের নামে বরাদ্দকৃত টাকা থেকে ২০ শতাংশ কমিশন হিসেবে আদায়, রেঞ্জ ও স্টেশন গুলি থেকে ৩০ হাজার টাকা হারে নিজের খাওয়া খরচার নামে আদায়, বরকল স্টেশনে আটকৃত ২ লাখ ঘনফুট কাঠের সাথে নতুন করে আরো প্রায় ২ লাখ ঘনফুট কাঠ আরোহন করে লক্ষ লক্ষ টাকা অবৈধ আয়ের বিষয়সমূহ অন্যতম।
উল্লেখ্য এই দুটি অনিয়মতান্ত্রিক নিয়োগ সহ বিভাগীয় বন কর্মকর্তার বিরুদ্ধে উত্থাপিত অন্যান্য অভিযোগ সুষ্ঠু তদন্ত পূর্বক ব্যবস্থা গ্রহণের নিমিত্তে ক্ষুব্দ কর্মকর্তা-কর্মচারীগণ সংশ্লিষ্ট বন সংরক্ষক সহ প্রধান বন সংরক্ষকের আশু হস্তক্ষেপ কামনা করছেন।