জালীয়াতি চক্রে আবদ্ধ জাতীয় গৃহায়ন কর্তৃপক্ষ

জাতীয় গৃহায়ণ কর্তৃপক্ষে (জাগৃক) একটি চক্র শিক্ষা সনদ জাল করে চাকুরি, জাল কাগজে ভুমি বরাদ্দ দিয়ে হাতিয়ে নিচ্ছে কাটি কোটি টাকা।

জালীয়াতি চক্রে আবদ্ধ জাতীয় গৃহায়ন কর্তৃপক্ষ

জাতীয় গৃহায়ণ কর্তৃপক্ষে (জাগৃক) একটি চক্র শিক্ষা সনদ জাল করে চাকুরি, জাল কাগজে ভুমি বরাদ্দ দিয়ে হাতিয়ে নিচ্ছে কাটি কোটি টাকা। প্রতিষ্ঠানটির নানা অনিয়মের কারনে গত ৩ মাসে আগে মোস্তাফিজুর রহমান চেয়ারম্যান পদ থেকে বদলী হওয়ার পরে অন্য কর্মকর্তাদের আদেশ হলেও যোগদান করছে না। বর্তমানে গৃহায়ণ ও গণফূর্ত মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব হামিদুল হাসান খান অতিরিক্ত দায়িত্ব পালন করছেন।

মোস্তাফিজুর রহমান চেয়ারম্যান থাকাকালীন সময়ে জাগৃকের মিরপুর হাউজিং এস্টেটের নিউক্লিয়াস বাড়িটি জাল কাগজ তৈরী করে একটি সিন্ডকেট লীজ দলিল করে নেন ভূয়া মালিকের নামে। প্রতিষ্ঠানটির চতুর্থ শ্রেণীর কর্মচারী মোস্তফা কামান শাহীন, রেকর্ড রুমের কিপার কামরুল, প্রশাসনিক কর্মকর্তা মুশফিকুল ইসলাম, জাল সনদে চাকুরি নেওয়ার অভিযোগে অভিযুক্ত অফিস সহকারী শওকত হোসেন ও ভুমি ব্যবস্থাপনা শাখার অনেকেই মিলে একটি সিন্ডকেট গড়ে তুলে।

গৃহায়নের মিরপুর শাখার যে সকল বাড়ি বা প্লটের নথি রেকর্ড রুমে নাই সেই প্লট গুলো রেকর্ড কিপারের সহযোগীতায় বের করে ভূয়া বরাদ্দ পত্র,দায়মুক্তির ছাড়পত্র ও প্রতিবেদন বানিয়ে লীজ দলিলের মাধ্যমে বিক্রি করে শত শত কোটি টাকা টাকা হাতিয়ে নিচ্ছে। অনুসন্ধানে দেখা যায়, মিরপুর হাউজিং এস্টেটের সেকশন-১০,ব্লক এ, লেন-১১, নিউক্লিয়াস বাড়ি নং-৯ নথিটি ভূমি শাখার রেকর্ডরুম তালিকায় ডিজিটাল নম্বরে লিপিবদ্ধ নাই। বাড়িটির বরাদ্দে কাগজপত্র অফিসের বাইরে সৃজন করে কর্মকর্তাদের স্বাক্ষর জাল করে নথিটি অনুমোদন নেওয়া হয়। অনুমোদনের পর গত ৩ এপ্রিল পল্লবী সাবরেজিষ্ট্রি অফিসে দলিল সম্পাদন করা হয়। আর দলিল সম্পাদন করেন মোস্তফা কামাল শাহিন ও মুশফিকুল ইসলাম।

উল্লেখিত বাড়িটি স্বাধীনতার পর থেকে ইদ্রিছ আলী,আব্দুর রউফ ও ফজির উদ্দিন বসবাস করে আসছেন। বড়টির গ্যাস, পানি ও বিদ্যু বিল এই ৩ জনের নামেই। জাতীয় গৃহায়ন কর্তৃপক্ষের ভুমি খেকো সিন্ডিকেটটি ৬১ বছর পর রওশন আরা খানমের লীজ দলিল সম্পন্ন করে। কিন্তু এই বাড়িতে গিয়ে রওশন আরা নমের কাউকে পাওয়া যায় নি। জাতীয় গৃহায়ন কর্তৃপক্ষের বিগত ২০১৯ সাল হতে কোন নথি ডিজিটাল নম্বর ছাড়া কোন অনুমোদন প্রদান না করার সিদ্ধান্ত গৃহিত হয়। কিন্তু আলোচ্য বাড়িটি ডিজিটাল নম্বর ছাড়া অনুমোদন দেওয়া হয়।

বাড়িটির নথি ১৯৬২ সালে খোলা হলেও রওশন আরার জন্ম ১৯৬২ সালে আবার স্বাক্ষী হিসেবে জনৈক জামালের যেসব ঠিকানা ব্যবহার করা হয়েছে সেউ ১৮২ সেগুন বাগিচায় কোন জামালকে খুজে পাওয়া যায়নি। বাড়িটির অনুকুলে মূল্য বাবদ যে টাকা ব্যাংকে জমা দেওয়া হয় তার চালান যাছাই-বাছাই না করে স্বাক্ষর করেন। অভিযোগ রয়েছে বাড়ীটির অনুকুলে কোন চালান না থাকায় নতুন চালান বানানো হয়েছে তবে সংশ্লিষ্ট ব্যাংকের শাখা এ বিষয়ে তথ্য জানাতে অপারগতা প্রকাশ করেন। বিষয়টি সদস্য ভুমি কুদ্দুস আলী সরকারকে ক্ষুদে বার্তা প্রেরণ করলে তিনি তরিঘড়ি করে লীজ দলিল বাতিল করে। একইভাবে মূল নথি গায়েব করে ভূয়া কাগজ সৃজন ও কর্মকর্তাদের স্বাক্ষর জাল করে ডিজিটাল নম্বর বিহীনভাবে দলিল সম্পাদন করা হয়।

মিরপুরের সেকশন ১০,ব্লক-সি,লেন-১০ এর ৮/২ নং প্লটটি নুর বানুর একক নামে ২০ নভেম্বর ১৯৭৯ সালে ৭৮২০ নম্বর স্মারকে ৪০০ বর্গ গজ উল্লেখ করে বরাদ্দ প্রদান করা হয়। বরাদ্দের শর্তানুযায়ী ৩০ দিনের মধ্যে টাকার পরিশোধের শর্ত থাকলেও তিনি ব্যাংকে টাকা জমা দেন নি। একই তফশীল ভুক্ত ২৪৩ বর্গ গজের জমি সুন্দর নেছার নামে একই সালে বরাদ্দ দেওয়া হয়। কিন্তু তিনিও টাকা জমা ব্যর্থ হন। শর্ত পুরণে ব্যর্থ হওয়ার পরেও এম.পি-৮০/৯৫ নম্বর নথীর মাধ্যমে পূর্বের বরাদ্দ বাতিল করে ৬ জুন ১৯৯৫ সালে ৬৭৫৪ স্মারকে পুনরায়ে একই প্লট বরাদ্দ রাখা হয়। দ্বৈত বরাদ্দ থাকা সত্ত্বেও একজনের নামে বরাদ্দ রাখা হয়। নুর বানুকে সেকশন ১৩,ব্লক –বি,লেন-১ এর ৩০ ও ৩২ নম্বর পূর্ণবাসন প্লট ২ টি বিকল্প বরাদ্দ দেওয়া হয় গত ৪ মে ১৯৯৫ সালে ৫১৪৪ নম্বর স্মারকের এম.পি-৩৬০/৮৭ নম্বর নথির মাধ্যমে। প্লট দুটির আয়তন ৩১৩.৩৩ বর্গগজ। প্রথম বরাদ্দকৃত নথীটি গায়েব করে এই বরাদ্দ দেওয়া হয়। পূর্বের ১৯৭৯ সালের বরাদ্দকৃত সূত্র ধরে বরাদ্দ দেওয়া হয়।

কিন্তু গ্রহীতা হিসেবে পূবেৃর শর্তানুযায়ী ব্যাংকে টাকা পরিশোধে ব্যর্থ হওয়ায় সেই সুত্র ধরে বরাদ্দ বেআইনী। যে এ্যাওয়ার্ডের মাধ্যমে বরাদ্দ প্রদান করা হয় উক্ত এ্যাওয়ার্ডটি সম্পূর্ণ ভূয়া। কারন তৎকালীন সহকারী পরিচালক এহসানুল হাকীম দ্বারা যাচাই প্রতিবেদন ভলিউমে সংশ্লিষ্ট এল,এ শাখায় লিপিবদ্ধ নেই। কিন্তু নুর বানুর পূর্ণবাসন প্লট দুইটির দখল অবস্থা ও অফিসের নথিমূলে তদন্ত প্রতিবেদন চাওয়া হলে তৎকালীন প্রশাসনিক কর্মকর্তা সামছুদ্দোহা পাটোয়ারী যাচাই- বাছাই না করে প্রতিবেদনে উল্লেখ করেন, উক্ত প্লটে কেয়ার টেকার ও ভাড়াটিয়া বসবাসরত আছেন। যাহা সম্পূর্ণ মিথ্যা বরে প্রতীয়মান হয়।

অনুসন্ধানে দেখা যায়, নুর বানুর নামে বরাদ্দকৃত প্লট দুটির স্মারক নম্বরগুলো অফিসের খাতায় লিপিবদ্ধ নেই। সংশ্লিষ্ট নির্বাহী প্রকৌশলীর দপ্তর হতে বাস্তব দখলের জারীকৃত স্মারক নম্বর ,স্বাক্ষর ও প্রতিবেদন সব জাল। বর্তমানে সৃজনকৃত নথীর শীট পর্যালোচনা করে দেকা যায়, ১৯৭৯ সনের যে বরাদ্দপত্রে প্লট নম্বর সেকশন ১০,ব্লক-সি,লেন-১০ এর ৮/২ নং পূর্ণবাসন প্লট উল্লেখ থাকরেও নোটশীটে প্লট নম্বর লেখা আছে ৪/২। তাছাড়া ২০১৮ সালে লীজ দলিল রেজিস্ট্রির অনুমোদন প্রদান করা হলেও দীর্ঘ ৬ বছর পর ২০২৩ সালের ১৩ ডিসেম্বর ১১৩০১ নং লীজ দলিলের মাধ্যমে রেজিস্ট্রি সম্পাদন করা হয়।