এনবিআর চেয়ারম্যানকে জিম্মি করে সদস্য শুল্ক ভ্যাট ও প্রশাসন মোয়াজ্জেম হোসেন’র রমরমা বদলি বাণিজ্য ॥ দেখার কেউ নেই
জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের চেয়ারম্যানের অত্যন্ত আস্থাভাজন হিসেবে পরিচয় দানকারী জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের সদস্য মোয়াজ্জেম হোসেন।
জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের চেয়ারম্যানের অত্যন্ত আস্থাভাজন হিসেবে পরিচয় দানকারী জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের সদস্য মোয়াজ্জেম হোসেন।
বর্তমানে নোয়াখালী বাড়ির সুযোগ নিয়ে তিনি চেয়ারম্যান আব্দুর রহমান খানের আস্থাভাজন হয়েছেন। কারন চেয়ারম্যানের বাড়িও বৃহত্তর নোয়াখালী। দেশী লোক হওয়ার সুবাদে তিনি চেয়ারম্যানকে সুকৌশলে ম্যানেজ করে সদস্য (শুল্ক ও ভ্যাট প্রশাসন) শাখার দায়িত্বপ্রাপ্ত হয়েছেন। এরপর থেকে তিনি তার নিজস্ব লোকজনকে গুরুত্বপূর্ন দপ্তরে বদলী করে শত শত কোটি টাকা হাতিয়ে নিচ্ছেন। এনবিআর চেয়ারম্যান ড. আব্দুর রহমানের বিরুদ্ধে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের আন্দোলনের কারণে ঝামেলায় পড়ে যাওয়ায় তাকে উদ্ধারের নামে ঐ সময়ে তিনি ব্যপক চাঁদাবাজি করেন। এক্ষেত্রে তার ঘনিষ্ঠ সহযোগী ছিলেন সম্প্রতি ওএসডি হওয়া সদস্য বেলাল হোসেন চৌধুরী।
তাদের এসব চাঁদাবাজির কাজে প্রধান সৈনিক হিসাবে কাজ করছেন চট্টগ্রাম কাস্টম হাউসে যুগ্ম কমিশনার মারুফ ও কাস্টমস গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদপ্তরের যুগ্ম পরিচালক মোহাম্মদ ছালাউদ্দিন রিপন। মাঠ পর্যায়ের সকল অভ্যন্তরীণ পোস্টিং তিনি কমিশনারদের চেয়ারম্যানের নানা ভয়ভীতি দেখিয়ে নিয়ন্ত্রন করেন এবং এসব দপ্তর থেকে মাসে শত কোটি টাকা ঘুষ বাণিজ্য করেন। তিনি সৎ অফিসার হিসাবে নিজেকে প্রমানের জন্য সরাসরি কর্মকর্তাদের কাছ থেকে ঘুষের বিনিময়ে বদলী বানিজ্য না করলেও তার ধামাধরা অফিসারদের গুরুত্বপূর্ণ দপ্তরে পদস্থ করেছেন। এরাই তার ক্যাশিয়ার হিসাবে কাজ করছে বলে জানা যায়।
সুত্রমতে কাস্টমস শুল্ক ও গোয়েন্দার যুগ্ম পরিচালক মোহাম্মদ ছালাউদ্দিন রিপনকে দিয়ে তিনি মাসে ৫ কোটি টাকা চাঁদা আদায় করেন। মোহাম্মদ ছালাউদ্দিন রিপন প্রতিটি কাস্টম হাউজ হতে মাসে ১ কোটি টাকা করে নেওয়া শর্তে প্রয়োজনীয় অফিসার সমূহ মোয়াজ্জেম হোসেন’কে দিয়ে পোষ্টিং করিয়ে নিয়েছেন। তিনি তার নিজস্ব কিছু লোকজনকে কালেক্টর হিসেবে নিয়োগ দিয়েছেন। যেমন- ঢাকা কাস্টম হাউসের ফ্রেইটে আর.ও. আতিক, সিআইসি-এর সোলাইমান, চট্টগ্রাম কাস্টমে জে.সি মারুফ, ঢাকা উত্তর ভ্যাট-এর ডিসি আল-আমিনসহ প্রতিটি কাস্টম হাউজে মোয়াজ্জেম হোসেন-এর নিজস্ব লোকজন বসিয়েছেন। এর মধ্যে আতিক সাবেক মন্ত্রী পলকের চাচাতো ভাই। এইসব কর্মকর্তাদের সুপারিশ অনুযায়ী তিনি আস্থাভাজন লোকজনকে বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ন অফিসে পোস্টিং দিচ্ছেন এবং মাসে শতশত কোটি টাকা কামাচ্ছেন। মূল বদলী আদেশ জারির কয়েকদিন পর পর আবার এডজাস্টমেন্ট আদেশের নামেও তিনি ব্যাপক অনিয়ম করছেন। অর্থাৎ যারা ঠিকমত কথা রাখতে ব্যর্থ হন, তাদেরকে ১/২ মাসের মধ্যে এডজাস্টমেন্ট আদেশের নামে বদলী করে দিচ্ছেন। পত্র-পত্রিকায় ব্যপক ঘুষ-দুর্নীতির অভিযোগের পরে বাধ্য হয়ে মোয়াজ্জেম সাহেব চট্টগ্রাম কাস্টমের জে.সি মারুফকে যশোর ভ্যাটে বদলী করলেও রহস্যজনক কারণে তাকে সেখান থেকে ৩ সপ্তাহ পার হওয়ার পরেও রিলিজ দিচ্ছেন না। এ বিষয়ে চট্টগ্রাম কাস্টমের সৎ কমিশনার শফি খুবই অসহায়ত্ব প্রকাশ করেন মর্মে তার সহকর্মীদের থেকে জানা যায়।
মোয়াজ্জেম সাহেবের সবচেয়ে স্পর্শকাতর জায়গা হলো তিনটি বন্ড কমিশরারেট। শুল্ক গোয়েন্দার যুগ্ম মহাপরিচালক মোহাম্মদ ছালাউদ্দিন রিপন দিয়ে তিনি তার নোয়াখালী অঞ্চলের একজন সহকারী রাজস্ব কর্মকর্তা হায়াতুন নবীকে দিয়ে বন্ডের প্রতিষ্ঠানগুলো থেকে প্রতিমাসে কোটি কোটি টাকা ঘুষ আদায় করছেন। ঢাকা কাস্টম হাউসের সহকারী কমিশনার থাকার সময় স্বর্ণ চোরাচালানের দায়ে এই মোহাম্মদ ছালাউদ্দিন রিপননের চাকরী চলে যায়। পরে কোর্ট-কাচারী করে চাকুরী ফেরত পাওয়ার পরই মোয়াজ্জেম-বেলাল সিন্ডিকেটের খুবই শক্তিশালী ডান হাত হয়ে উঠেন এবং এর পুরষ্কার হিসাবে শুল্ক গোয়েন্দার যুগ্ম মহাপরিচালক হিসাবে পদস্থ হন যেন সারাদেশের কাস্টম হাউস ও বন্ড কমিশনারেট গুলিতে অবাধে ঘুষ বানিজ্য করতে পারেন।
মেম্বার এডমিন হওয়ার আগে তিনি আরেক গুঢ়ের হাড়ি রপ্তানি ও বন্ড শাখার মেম্বার ছিলেন। সেখানেও ক্ষমতার অপব্যবহার করে কোটি কোটি টাকা উৎকোচ নিয়েছেন। এ কাজে তার ঘনিষ্ট অনুচর ছিল ঢাকা (দক্ষিণ) বন্ডের যুগ্ম কমিশনার কামরুল যার বিরুদ্ধে অনেক দুর্নীতির অভিযোগ থাকার পরেও বদলী করেন নাই। এছাড়াও, এনবিআর চেয়ারম্যানের বিরুদ্ধে আন্দোলনের ভুয়া অভিযোগের কথা বলে চেয়ারম্যানকে ভুল বুঝিয়ে অনেক অভিজ্ঞ কর্মকর্তাদের সাসপেন্ড করে রেখেছেন যারা তার ঘুষ বানিজ্যে বাধা হতে পারে। ডিপার্টমেন্টের অনেক কর্মকর্তাদের অনুরোধ সত্বেও তিনি তাদের কর্মস্থলে ফেরত আনার কোন উদ্যোগ নিচ্ছেন না।
জানা যায়, সম্প্রতি তিনি নব্য বিএনপি হয়েছেন। এতদিন ওবায়দুল কাদের, মোফাজ্জল হোসেন মায়ার ক্ষমতা দেখালেও এখন বিএনপির আলাল, এ্যানি, ব্যারিস্টার নাসিরউদ্দিন অসীম, ছাত্রদল বিষয়ক উপদেষ্টা বকুল, উপদেষ্টা রেজওয়ানা হাসান এর স্বামী এ.বি. সিদ্দিক প্রমুখ তার এখন ঘনিষ্ট বন্ধু বলে নিজেকে জাহির করে বেড়াচ্ছেন।
বিগত ফ্যাসিবাদ আমলে আওয়ামীলীগ নেতা মায়ার বাসায় তার নিয়মিত যাতায়াত ছিল। মায়া তার সম্পর্কে আত্মীয়। তার ক্ষমতার মূল খুটি ছিল আওয়ামীলীগ সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের যে তার খালু শ্বশুর হতেন। এরা তার সকল অবৈধ কার্যক্রমের সহায়ক ছিলেন। মায়ার ছেলে এবং সিএন্ডএফ নেতা শাহজাহানের মাধ্যমেই সোনা চোরাচালানের সিন্ডিকেট পরিচালিত হতো যার প্রোটেকশন দিতেন মোয়াজ্জেম এবং এর বিনিময়ে তিনি কামিয়েছেন শত কোটি টাকা। তার ক্যশিয়ার ছিল তার একান্ত আস্থাভাজন ডিসি সোলায়মান যাকে তিনি বর্তমানে অত্যন্ত স্পর্শকাতর দপ্তর এনবিআর এর সিআইসিতে। তার মাধ্যমে তিনি সিআইসির সকল গোপন তথ্য সংগ্রহ করেন।
সুত্রমতে সিএন্ডএফ নেতা শাহজাহানের উত্তরায় একটি জলসা ঘরে তার নিয়মিত যাতায়াত ছিল যেখানে অনেক মডেল ও চিত্র নায়িকাদের তার মনোরঞ্জনের জন্য আনা হত। সেখানে তিনি একজন বিখ্যাত নায়িকার সাথে একবার ধরা খাওয়ার পরে তিন কোটি টাকার বিনিময়ে এই ঘটনা ধামাচাপা দেন।
পরবর্তীতে চেয়ারম্যান রাহমাতুল মুনিম আসার পরে তার স্বরূপ বুঝতে পারেন এবং তাকে যশোর বদলী করেন। সেই বদলী আদেশ বাতিলের জন্য তিনি অসুস্থতার ভান করে দীর্ঘদিন স্কয়ার হাসপাতালে ভর্তি হন। পরে চেয়ারম্যান তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়ার হুমকি দিলে দ্রুত যশোরে যোগদান করেন। সেখানেও তিনি তার দুর্নীতির বাণিজ্য জারি রাখেন। বিআরবি কেবল সহ বিভিন্ন বিড়ি-সিগারেট ফ্যাক্টরি থেকে তার প্রতি মাসে কয়েক কোটি টাকার উপরে চাঁদা ধার্য ছিল। কেউ একটু গাফিলতি করলেই তার বিরুদ্ধে হয়রানিমূলক মামলা দিতেন। কুষ্টিয়া ও ফরিদপুরের কয়েকটি বিড়ি ফ্যাক্টরির এরকম একটি জাল ব্যান্ডরোল আটকের পরে ঘুষের বিনিময়ে দফারফার ঘটনার অডিও রেকর্ড রাহমাতুল মুনিম সাহেবের হাতে আসার পরে তাকে চট্টগ্রাম আপীলে বদলী করে দেয়া হয়।
উল্লেখ্য মোয়াজ্জেম হোসেন ঢাকা (দক্ষিণ) ভ্যাটের কমিশনার হিসাবে দায়িত্ব গ্রহণের ৫ মাসের মধ্যে তৎকালীন চেয়ারম্যান মোশাররফ হোসেনের ভাইকে ঘুষ দিয়ে ঢাকা কাস্টম হাউসের দায়িত্ব পান। সেখানে স্বর্ণ চোরাচালানের মাধ্যমে বিপুল পরিমাণ অর্থ উপার্জন করেন। সেখানে তিনি সিএন্ডএফ নেতা শাহজাহান, আওয়ামীলীগের নেত্রী সাথীকে এবং তার নিজস্ব কিছু অফিসারদের সাথে নিয়ে ব্যপক দুর্নীতি করেন। তার কথা বার্তা একজন বুদ্ধিজীবীর মত হলেও তিনি টাকা ছাড়া কিছুই বুঝেন না। কিন্তু উপরে উপরে সততার লেবাস পরে থাকেন। মোবারা খানম (তার ব্যাচমেট) পবর্তীতে সেখানে পদস্থ হওয়ার পর এসব অনেক তথ্য বের হয়।
এর আগে তিনি রাজশাহী কমিশনারেটের একটি খাদ্য উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানের কয়েকশত কোটি টাকার ভ্যাট ফাঁকির মামলা নষ্ট করে দেন যার সাক্ষী ২৯ ব্যাচের যুগ্ম কমিশনার জাহিদ। পরবর্তীতে এই বিষয়ে বোর্ডে লিখিত অভিযোগ দায়ের করা হলেও তার বিরুদ্ধে কোন ব্যবস্থা নেয়া হয়নি। অর্থাৎ তিনি কাস্টমস বিভাগে একজন প্রতিষ্ঠিত দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তা।