অনিয়মের অভিযোগ চেয়ারম্যান নুরুল বাসিরের দিকে
জাতীয় গৃহায়ণ কর্তৃপক্ষ (জাগৃক) তার ২৬৫তম বোর্ড সভায় ঢাকার মিরপুরস্থ ৫টি পুনর্বাসন প্লটের বরাদ্দের ধরন সংশোধন করে বাণিজ্যিক প্লট হিসেবে বরাদ্দ প্রদান করা নিয়ে অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে চেয়ারম্যান সৈয়দ মো. নুরুল বাসির বিরুদ্ধে।
জাতীয় গৃহায়ণ কর্তৃপক্ষ (জাগৃক) তার ২৬৫তম বোর্ড সভায় ঢাকার মিরপুরস্থ ৫টি পুনর্বাসন প্লটের বরাদ্দের ধরন সংশোধন করে বাণিজ্যিক প্লট হিসেবে বরাদ্দ প্রদান করা নিয়ে অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে চেয়ারম্যান সৈয়দ মো. নুরুল বাসির বিরুদ্ধে। এই প্লটগুলোর বর্তমান মালিকানায় যারা রয়েছেন তাদের নামেই বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে।
বোর্ডের এই সিদ্ধান্তের পরেই জাগৃকে গুঞ্জনের সৃষ্টি হয়েছে। অভিযোগ উঠেছে অনৈতিক লেনদেনের মাধমেই এই বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে যা জাতীয় গৃহায়ণ কর্তৃপক্ষের বরাদ্দ নীতিমালার পরিপন্থী। জাতীয় গৃহায়ণ কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান সৈয়দ মো. নুরুল বাসির মোটা অংকের টাকার বিনিময়ে প্রভাব খাটিয়ে এই অবৈধ বরাদ্দ দিয়েছেন বলেও অভিযোগ উঠেছে।
জানা যায়, জাতীয় গৃহায়ণ কর্তৃপক্ষের গত ২৬৫তম বোর্ড সভায় ঢাকার মিরপুরস্থ সেকশন-৬, মেইন রোড, ব্লক-ক এর ১, ২, ৩ ও ৪ নং পুনর্বাসন প্লট এবং ব্লক-খ, বাউন্ডারি রোড এর ৩৯/১ নং পুনর্বাসন প্লটসহ মোট ৫টি প্লটের বরাদ্দ সংশোধন করা হয়। সেখানে বরাদ্দ সংশোধন করে এই পুনর্বাসন প্লটগুলোকে বাণিজ্যিক প্লটে রূপান্তর করে বরাদ্দ দেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়। আরো সিদ্ধান্ত হয় যে প্লটগুলোর বর্তমান মালিকদের কাছেই বরাদ্দ দেওয়া হবে। বোর্ডের সিদ্ধান্তের পরেই জাগৃকে প্রশ্ন উঠে জাতীয় গৃহায়ণ কর্তৃপক্ষের বাণিজ্যিক প্লট বরাদ্দের নীতিমালার পরিপন্থী এই সিদ্ধান্ত কিভাবে নেওয়া হলো। সংশ্লিষ্টরা বলছেন এই বরাদ্দের সিদ্ধান্ত চেয়ারম্যান সৈয়দ মো. নুরুল বাসির মোটা অংকের টাকার বিনিময়ে নিয়েছেন। এতে সরকারের প্রায় ২০০ কোটি টাকা আর্থিক ক্ষতি হয়েছে।
জাতীয় গৃহায়ণ কর্তৃপক্ষের বরাদ্দ সংক্রান্ত নির্দেশিকা-২০০৮-এ এবিষয়ে স্পষ্ট উল্লেখ রয়েছে। নির্দেশিকার ৫ নং অনুচ্ছেদে উল্লেখ রয়েছে যে " অনুমোদিত মূল লে-আউট প্ল্যানে নির্ধারিত বাণিজ্যিক প্লট/দোকান/স্পেস দরপত্রের মাধ্যমে বিক্রয়ের জন্য বোর্ড সভার অনুমোদনক্রমে কর্তৃপক্ষের ওয়বেসাইট সহ কমপক্ষে ১টি ইংরেজী ও ১টি বাংলা জাতীয় দৈনিক পত্রিকায় এবং একটি স্থানীয় দৈনিক পত্রিকায় (যদি স্থানীয় দৈনিক পত্রিকা থাকে) পরপর দুই দিন (একই পত্রিকায় একদিনের বেশী নয়) বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করতে হবে। বাণিজ্যিক প্লট/দোকান/স্পেস দরপত্রের মাধ্যমে অনুমোদিত সর্বোচ্চ দরদাতাকে বরাদ্দ দেয়া হবে। তবে কোনক্রমেই কমার্শিয়াল প্লট/স্পেসের ভিত্তিমূল্য আবাসিক মূল্যের দ্বিগুণের কম হবে না। তবে, ২য় বার দরপত্র প্রকাশের পর অবরাদ্দকৃত বাণিজ্যিক প্লট/দোকান/স্পেস মন্ত্রণালয় কর্তৃক গঠিত কমিটির মাধ্যমে নির্ধারিত পদ্ধতিতে বরাদ্দ প্রক্রিয়া সম্পন্ন করা যাবে। বরাদ্দের শর্তাদি বোর্ড সভায় নির্ধারণ করা হবে। আবেদনকারীদের যোগ্যতা এবং যে সকল দলিল/কাগজাদি দরপত্রের সাথে দাখিল করতে হবে তা বোর্ড সভায় অনুমোদিত হতে হবে।"
সরেজমিনে দেখা যায়, যাদের নামে এই বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে তারা আগেই ক্ষতিগ্রস্থ ব্যক্তি হিসেবে এই পুনর্বাসন প্লট বরাদ্দ পেয়েছিলেন। পুনর্বাসন প্লটগুলোকে তারা নিয়ম বহির্ভূতভাবে বেশ কয়েক বছর ধরেই বাণিজ্যিক প্লট হিসাবে ব্যবহার করছেন। বাণিজ্যিক বহুতল ভাবনসহ বিভিন্ন ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠান রয়েছে প্লটগুলোতে।
অনুসনন্ধানে জানা যায়, জাতীয় গৃহায়ণ কর্তৃপক্ষ-এর ১৮৬তম বোর্ড সভায় এই প্লটগুলোকে বাণিজ্যিক প্লট হিসাবে গণ্য করে বিক্রয়ের জন্য গৃহায়ণ ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের অনুমোদন সাপেক্ষে দুইটি জাতীয় দৈনিক পত্রিকায় বিজ্ঞপ্তি প্রকাশিত করে নিলাম করার সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়। কিন্তু সেই সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন না করেই বোর্ড এই নতুন সিদ্ধান্ত নিয়েছে।
এছাড়া জাতীয় গৃহায়ণ কর্তৃপক্ষের ২৬৫তম বোর্ড সভার আলোচনা ও সিদ্ধান্তপত্র থেকে জানা যায়, প্লটসমূহের বিষয়ে নির্বাহী প্রকৌশলী, ঢাকা ডিভিশন-১ কে প্রতিবেদন প্রেরণের জন্য পত্র দেয়া হলে স্মারক নং-২৫.৩৮.০০০০.৬০৩.১৮.০০১.২৩.৩৮০, তারিখ: ২৭.০১.২০২৫ এর মাধ্যমে প্রতিবেদন প্রেরণ করেছেন। সেই প্রতিবেদন সম্পর্কে ঢাকা ডিভিশন-১ এর নির্বাহী প্রকৌশলী মো. কায়সার ইবনে সাইখ দৈনিক আজকের সংবাদকে বলেন, সরেজমিনে মাঠ পর্যায়ে আমরা পেয়েছি প্লটগুলোকে বাণিজ্যিকভাবে ব্যবহৃত হচ্ছে। সেটাই প্রতিবেদনে উল্লেখ করেছি।
বোর্ড সভার আলোচনা ও সিদ্ধান্তপত্র থেকে আরো জানা যায়, প্লটসমূহ অনুমোদিত নকশায় বাণিজ্যিক হিসেবে চিহ্নিত থাকলেও পূর্বে পুনর্বাসন প্লট হিসেবে বরাদ্দ প্রদান করা হয়েছে।
এই বিষয়ে জাতীয় গৃহায়ণ কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান সৈয়দ মো. নুরুল বাসির দৈনিক আজকের সংবাদকে বলেন, এটা বোর্ডে সিদ্ধান্ত হয়েছে। এটা ব্যাক্তিগত কিছুই না। আমরা নিয়ম-কানুন খুব ভালোই জানি। কোনটা দেওয়া যাবে, যাবে না। ৩১ বছর আগে তাদের দেওয়া হয়েছে। কনভার্শন বলে এটাকে। আর যেহেতু বাণিজ্যিক প্লট এটা সর্বোচ্চ মূল্য দিয়েই তারা নিবে। আর একদম খালি বাণিজ্যিক প্লট যদি থাকে সেটার নিলাম হবে। অবৈধভাবে প্লট বাণিজ্যিক হিসেবে ব্যবহার করছে এরকম অনেক আছে। এসব প্লট থেকে সরকারের হাজার কোটি টাকা আয় হবে। আমাদের অভিযান চলছে। যাদের দেওয়া হয়েছে তাদের কাগজপত্র যাচাই হচ্ছে। সব ঠিক থাকলে সর্বোচ্চ বাজার মূল্য দিয়েই তারা নিবে সেটা কাঠা প্রতি ৫০ লাখ টাকা হোক বা এক কোটি টাকা হোক।
১৮৬তম বোর্ড সভায় প্লটগুলো নিলামে তোলার সিন্ধান্তের বিষয়ে তিনি বলেন, সেটা হয়তো ঠিক না। আর নিলামে হলেই হবে না। এই লোকগুলো ৩১ বছর আগে সম্পূর্ণ টাকা পরিশোধ করে বরাদ্দ নিয়েছে এখন নিলাম করলে তাদেরকে উদ্বাস্তু করতে হবে। এটা বললেই হলো নাকি।
কিন্তু যারা বরাদ্দ পেয়েছে তারা যে বেশ কয়েক বছর ধরে বাণিজ্যিকভাবে প্লটগুলো ব্যবহার করছে যে বিষয়ে প্রশ্ন করলে তিনি বলেন, যে টাকাটা আমরা হারিয়েছি, বাণিজ্যিক হলে যেটা পেতাম, সেই টাকাটা নেওয়ার জন্য বড়জোর চাপ দিতে পারি।