যেখানে কয়েল জবাবদিহি করে, ওষুধ কেন নয়?
বাজার থেকে কেনা একটি সাধারণ মশার কয়েলের প্যাকেট হাতে নিলেই চোখে পড়ে একাধিক গুরুত্বপূর্ণ তথ্য।
বাজার থেকে কেনা একটি সাধারণ মশার কয়েলের প্যাকেট হাতে নিলেই চোখে পড়ে একাধিক গুরুত্বপূর্ণ তথ্য। ট্রেড লাইসেন্স নম্বর, বিএসটিআই অনুমোদন, উৎপাদন ও মেয়াদোত্তীর্ণের তারিখ, প্রস্তুতকারক প্রতিষ্ঠানের নাম-ঠিকানা, রাসায়নিক উপাদানের তালিকা, সতর্কীকরণ বার্তা—সবই স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা থাকে। একজন সাধারণ ভোক্তা সহজেই বুঝতে পারেন তিনি কী কিনছেন, কার কাছ থেকে কিনছেন এবং পণ্যটি কতদিন ব্যবহারযোগ্য।
কিন্তু প্রশ্ন হলো, মানুষের জীবন ও স্বাস্থ্যের সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত ওষুধের ক্ষেত্রে কি একই ধরনের স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা হয়েছে?
ওষুধ এমন একটি পণ্য, যা ভুলভাবে ব্যবহার করলে কিংবা মেয়াদোত্তীর্ণ হলে একজন মানুষের জীবন পর্যন্ত ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে। অথচ বাস্তবে দেখা যায়, অনেক ওষুধের মোড়কে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য অত্যন্ত ছোট অক্ষরে লেখা থাকে। বয়স্ক মানুষ তো দূরের কথা, অনেক তরুণ ক্রেতার পক্ষেও সেই তথ্য পড়া কঠিন হয়ে পড়ে। কোথাও কোথাও উৎপাদন ও মেয়াদোত্তীর্ণের তারিখ এতটাই অস্পষ্ট থাকে যে তা খুঁজে বের করতেই সময় লেগে যায়।
সম্প্রতি একটি মশার কয়েলের প্যাকেট পর্যবেক্ষণ করে দেখা গেছে, সেখানে ট্রেড মার্ক, রেজিস্ট্রেশন নম্বর, ফর্মুলেশন লাইসেন্স নম্বর, আমদানি লাইসেন্স নম্বর, হোলসেল লাইসেন্স নম্বর, বিজ্ঞাপন লাইসেন্স নম্বর, উৎপাদন তারিখ, মেয়াদোত্তীর্ণের সময়সীমা, এমনকি সর্বোচ্চ খুচরা মূল্যও সুস্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়েছে। একটি সাধারণ ভোক্তা পণ্য যদি এত বিস্তারিত তথ্য বহন করতে পারে, তাহলে মানুষের শরীরে ব্যবহৃত ওষুধের ক্ষেত্রে আরও বেশি তথ্য সহজলভ্য হওয়া উচিত ছিল।
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা দীর্ঘদিন ধরেই বলে আসছেন, ওষুধের প্যাকেটে শুধু নাম ও ডোজ নয়, বরং সম্ভাব্য পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া, সতর্কতা, সংরক্ষণ পদ্ধতি, লাইসেন্স নম্বর এবং প্রস্তুতকারকের তথ্য আরও দৃশ্যমানভাবে উল্লেখ করা প্রয়োজন। কারণ ওষুধ সম্পর্কে সঠিক তথ্য জানা একজন রোগীর মৌলিক অধিকার।
বাংলাদেশে নকল ও ভেজাল ওষুধ নিয়ে বিভিন্ন সময়ে উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়েছে। ওষুধের প্যাকেটে যদি সহজে যাচাইযোগ্য লাইসেন্স নম্বর, কিউআর কোড, অনুমোদনের তথ্য এবং অন্যান্য প্রয়োজনীয় বিবরণ বড় আকারে প্রদর্শন করা হয়, তাহলে সাধারণ মানুষও নকল ও আসল পণ্যের মধ্যে পার্থক্য করতে পারবেন। এতে ভোক্তা সুরক্ষা যেমন বাড়বে, তেমনি স্বাস্থ্যঝুঁকিও কমবে।
আরও বিস্ময়ের বিষয় হলো, একটি মশার কয়েলের প্যাকেটে ব্যবহারবিধি ও সতর্কীকরণ বার্তা যতটা গুরুত্ব দিয়ে লেখা হয়, অনেক সময় ওষুধের ক্ষেত্রেও সেই তথ্যগুলো সাধারণ মানুষের বোধগম্য ভাষায় উপস্থাপন করা হয় না। ফলে রোগীরা চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া ওষুধ সেবন করে নানা ধরনের জটিলতার মুখোমুখি হন।
ভোক্তা অধিকার কর্মীরা মনে করেন, ওষুধ শিল্পে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা বাড়াতে নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলোর আরও কঠোর নজরদারি প্রয়োজন। প্রতিটি ওষুধের মোড়কে বড় অক্ষরে উৎপাদন তারিখ, মেয়াদোত্তীর্ণের তারিখ, ব্যাচ নম্বর, লাইসেন্স তথ্য এবং জরুরি সতর্কতা প্রদর্শন বাধ্যতামূলক করা উচিত। পাশাপাশি ডিজিটাল যাচাইয়ের জন্য কিউআর কোড যুক্ত করা যেতে পারে, যাতে একজন ক্রেতা মোবাইল ফোন দিয়ে স্ক্যান করেই ওষুধের সব তথ্য জানতে পারেন।
একটি মশার কয়েল মানুষকে কেবল মশার কামড় থেকে রক্ষা করে। কিন্তু একটি ওষুধ মানুষের জীবন বাঁচায়। তাই যে পণ্যের গুরুত্ব বেশি, তার তথ্য প্রকাশেও হওয়া উচিত সর্বোচ্চ স্বচ্ছতা। ভোক্তার জানার অধিকার নিশ্চিত করতে হলে এখনই প্রশ্ন তুলতে হবে—
“যেখানে একটি মশার কয়েল তার পরিচয়, অনুমোদন ও লাইসেন্সের তথ্য গর্বের সঙ্গে প্রকাশ করে, সেখানে মানুষের জীবনরক্ষাকারী ওষুধের ক্ষেত্রে কেন সেই তথ্য আরও স্পষ্ট, সহজ ও দৃশ্যমান করা হবে না?”