ডিএফও এখন রেঞ্জ কর্মকর্তার দায়িত্বে
বান্দরবান পাহাড় থেকে ঈদ ছুটিতে শতাধিক ট্রাক ভর্তি কাঠ অবৈধভাবে কেটে পাচার
বন বিভাগে বিভাগীয় বন কর্মকর্তার (ডিএফও) অধীনে রেঞ্জ অফিসার কর্মরত থাকার কথা। অথচ বান্দরবান বন বিভাগে রেঞ্জ কর্মকর্তার অবর্তমানে লোভনীয় শহর রেঞ্জ নিজ কব্জায় ধরে রাখার অভিযোগ উঠেছে বান্দরবান বিভাগীয় বন কর্মকর্তা মো. তৌফিকুল ইসলামের বিরুদ্ধে। তার এই কাজের সহযোগি হিসেবে কাজ করছেন সহকারী বন সংরক্ষক (এসিএফ) রিটা আকতার।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক বান্দরবান বন বিভাগে কর্মরত কয়েকজন জানান, বহুমুখি দুর্নীতিতে অভিযুক্ত শহর রেঞ্জ কর্মকর্তা কাজী মো. সাইফুল ইসলাম ঘন ঘন ছুটিতে গেলেও তার অবর্তমানে কাউকে দায়িত্ব দিয়ে যাওয়ার নজির নেই। সুযোগ পেয়ে বান্দরবান জেলার চোরাই কাঠ কারবারিদের সাথে ঘুষ লেনদেনের অভিযোগ উঠেছে বান্দরবান ডিএফওর বিরুদ্ধে। শহর রেঞ্জ কর্মকর্তার দুর্নীতি চিহ্নিত করে দেশের বিভিন্ন গণমাধ্যমে সচিত্র প্রতিবেদন প্রকাশিত হওয়া এখন নিয়মিত ঘটনায় পরিণত হয়েছে। অথচ শহর রেঞ্জ কর্মকর্তাকে ছুটি দিয়ে আড়ালে রেখে রেঞ্জটি কব্জায় রেখেছেন ডিএফও। বান্দরবান বন বিভাগে বনের গাছ পাচারকারী চিহ্নিত, গাছ পাচার প্রতিরোধ এবং অবৈধ ভাবে পাচারের সময় ট্রাক জব্দের দায়িত্ব স্পেশাল রেঞ্জ কর্মকর্তার। অথচ ডিএফওর ইশারায় স্পেশাল রেঞ্জ কর্মকর্তাকে কর্মহীন করে বসিয়ে রাখা হয়েছে। এতে সুযোগ পেয়ে চোরাই কাঠ কারবারিরা অবাধে বনের গাছ কেটে শহর রেঞ্জ থেকে ভূয়া ট্রানজিট পাশ নিয়ে পাচার করছে। সম্প্রতি ঈদ ছুটিতে বান্দরবানের পাহাড় থেকে কয়েক লক্ষ সিএফটি কাঠ অবৈধভাবে কেটে ট্রাকে ভর্তি করে দেশের বিভিন্ন স্থানে পাচার হয়েছে। বিনিময়ে সদর রেঞ্জের ভারপ্রাপ্ত দায়িত্বে নিয়োজিত ডিএফও/এসিএফ হাতিয়ে নিয়েছেন কোটি টাকা। বিষয়টি ওপেন সিক্রেট হলেও দেখার কেউ নেই।
অনুসন্ধান বলছে, বৃক্ষ নিধনের ফলে হুমকির মুখে পড়েছে বান্দরবান জেলার বনাঞ্চল। অবাধে বনের গাছ কর্তন করে বান্দরবান থেকে পাচার করা হচ্ছে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে। বৃক্ষ নিধনে হুমকিতে পড়েছে বান্দরবানের বন্যপ্রাণী ও প্রাকৃতিক জীববৈচিত্র্য। বনভূমি ও বনজ সম্পদ দেখভালের দায়িত্বে থাকা বন্দরবান বন বিভাগ বৃক্ষ নিধন বন্ধে কঠোর না হয়ে উল্টো বৃক্ষ নিধনে সহযোগিতার অভিযোগ উঠেছে। এতে চরম অনিয়ম ও অব্যবস্থাপনায় দুর্নীতির আখড়ায় পরিণত হয়েছে বান্দরবান বন বিভাগ।
অনুসন্ধান আরো বলছে, বান্দরবানে বনের গাছ কর্তন, ভুয়া টিপি (চলাচল পাস), গাছ পাচার ও পোস্টিং বাণিজ্য বন্ধ করতে নিরব ভূমিকায় বন বিভাগের নীতি নির্ধারকরা। বান্দরবানে রেঞ্জ কর্মকর্তা ও স্টেশনে পোস্টিং পেতে গুণতে হয় ১৫ থেকে ২০ লাখ টাকা। রেঞ্জ সহযোগী ৫ থেকে ৭ লাখ টাকা। ফরেস্ট গার্ডদের সদর রেঞ্জ ও স্টেশনে পোস্টিংয়ে নির্ধারিত ৩ লাখ থেকে ৫ লাখ টাকা পর্যন্ত।
বান্দরবান বন বিভাগে ঘুষের হার নির্ধারণ করে দিয়েছেন ডিএফও। ঘুষের হারের মধ্যে রয়েছে টিপি প্রতি ১৩ হাজার টাকা। সেখান থেকে ডিএফওর ভাগে ২৩০০ টাকা, সহকারী বন সংরক্ষক (এসিএফ) ৬০০ টাকা, রেঞ্জ অফিসার ৮০০ টাকা, অফিস সেকশন ৬০০ টাকা, ফরেস্টার ২৬০০ টাকা, ফরেস্ট গার্ড ২৫০০ টাকা। এ ছাড়া স্টক চেকিংয়ের ক্ষেত্রে প্রতি ঘনফুটে মোট ৯ টাকা। ভাগবাটোয়ারায় রেঞ্জ অফিসার ২ টাকা, ডিএফও ৬ টাকা, অফিস ১ টাকা। জোত পারমিটের ক্ষেত্রে প্রতি ঘনফুটে ৫০ থেকে ৫৫ টাকা। এর মধ্যে ডিএফও ১৭ টাকা, সিএফ অফিস ৫ টাকা, রেঞ্জ অফিসার ২০ টাকা, স্টাফ ও ফরেস্টার ৫ টাকা, অফিস এবং অন্যান্য ৮ টাকা হারে ভাগবাটোয়ারা হচ্ছে। পার্মিটের পর ট্রাকপ্রতি কাঠ লোড করতে বন বিভাগকে ঘুষ দিতে হয় ২৫০০ টাকা থেকে ৪ হাজার টাকা পর্যন্ত। বনের গাছ বৈধ টিপির আড়ালে অবৈধ ভাবে পাচার করতে গেলে সুয়ালক চেক স্টেশনে ট্রাক প্রতি দিতে হয় ২-৩ হাজার টাকা পর্যন্ত।
সুয়ালক চেক স্টেশনের দায়িত্বে থাকা ডেপুটি রেঞ্জার মো. আবুল হোসেন এই চক্রের অন্যতম প্রধান সংগ্রাহক হিসেবে কাজ করেন, যিনি তৎকালীন ডিএফও আব্দুর রহমানকে ১৫ লক্ষ টাকা এবং মাসিক দেড় লক্ষ টাকা মাসোহারার চুক্তিতে এই স্টেশন কর্মকর্তা (এসও) পদটি বাগিয়ে নিয়েছিলেন এবং বর্তমানেও ডিএফও তৌফিকুল ইসলামকে এককালীন ৫ লক্ষ টাকা দিয়ে নিজের চেয়ার টিকিয়ে রেখেছেন। আবুল হোসেন নিজে স্টেশনে উপস্থিত না থেকে ফরেস্ট গার্ডদের দিয়ে ভুয়া ও অবৈধ পাস স্বাক্ষর করান এবং রাতে চম্পাফুল, গুটগুটিয়া, গর্জন ও শিউরীর মতো মূল্যবান ও কর্তন নিষিদ্ধ কাঠ পাচারের লাইন মেইনটেইন করে মাসে ১০ লক্ষাধিক টাকা অবৈধ আয় করেন। ডিজিটাল ট্র্যাক এড়াতে এই বিপুল পরিমাণ কালো টাকা ব্যাংকিং চ্যানেলের বাইরে রেখে নগদ অর্থের মাধ্যমে ঢাকা ও কুমিল্লায় নিজের এবং আত্মীয়-স্বজনের নামে নামে-বেনামে বিলাসবহুল ফ্ল্যাট ও কোটি কোটি টাকার জমি কেনা হয়েছে। অন্যদিকে, সিন্ডিকেটের মূল হোতা ডিএফও তৌফিকুল ইসলামের সম্পদের পরিমাণ আরও আকাশচুম্বী ও অকল্পনীয়; ঢাকা ও খুলনায় তার একাধিক আলিশান ফ্ল্যাট রয়েছে এবং খুলনার অভিজাত রয়েল মোড় এলাকায় রয়েছে কোটি কোটি টাকা মূল্যের বাণিজ্যিক জমি। নীতি-নির্ধারকদের চরম উদাসীনতা ও নীরবতার সুযোগ নিয়ে ডিএফও তৌফিকুল রহমান, এসিএফ রিটা আকতার, সদর রেঞ্জার কাজী সাইফুল ইসলাম এবং সুয়ালকের স্টেশন কর্মকর্তা আবুল হোসেনের এই চতুর সিন্ডিকেটটি পুরো বান্দরবান বন বিভাগকে একটি লাভজনক বাণিজ্যিক সংস্থায় রূপান্তর করেছে, যা দেশের দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলের প্রাকৃতিক ফুসফুস খ্যাত এই বনাঞ্চলকে সম্পূর্ণ ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে উপনীত করেছে।
এসব অভিযোগের ব্যাপারে বান্দরবান বিভাগীয় বন কর্মকর্তা মো. তৌফিকুল ইসলাম বলেন, অনিয়ম হলে তদন্ত করে ব্যবস্থা নেয়া হবে৷ অন্যদিকে বান্দরবান বন বিভাগের শহর রেঞ্জ কর্মকর্তা কাজী মো. সাইফুল ইসলাম বলেন, তার বিরুদ্ধে অভিযোগগুলো সঠিক নয়।