জলবায়ু পরিবর্তন: উন্নয়নের মূল্য কি অস্তিত্বের বিনিময়ে?
বাংলাদেশের মানচিত্রের দিকে তাকালে মনে হয়, যেন কোনো শিল্পী সবুজ ক্যানভাসের ওপর নীল রঙের অসংখ্য আঁকিবুঁকি এঁকে দিয়েছেন। সেই আঁকিবুঁকিই আমাদের নদী, খাল, বিল ও জলাভূমি। শত শত বছর ধরে এই জলধারা শুধু প্রকৃতিকে নয়, এ দেশের মানুষের জীবন, সংস্কৃতি, অর্থনীতি ও সভ্যতাকে বাঁচিয়ে রেখেছে।একসময় ঋতুর পালাবদল ছিল প্রকৃতির সবচেয়ে সুন্দর আয়োজন। গ্রীষ্মের পর বর্ষা, বর্ষার পর শরৎ, হেমন্তের স্নিগ্ধতা আর শীতের মৃদু স্পর্শ—সবকিছুই ছিল নিয়মের মধ্যে। কিন্তু আজ প্রকৃতি যেন তার চিরচেনা ছন্দ হারিয়ে ফেলেছে। পৃথিবী উত্তপ্ত হচ্ছে, সমুদ্র ফুলে উঠছে, হিমবাহ গলছে, নদী হারাচ্ছে তার স্বাভাবিক প্রবাহ। আর এই পরিবর্তনের সবচেয়ে নির্মম আঘাত এসে পড়ছে বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল দেশগুলোর ওপর।
বলা হয় বাংলাদেশ নদীমাতৃক দেশ। একসময় এ দেশের বুক চিরে বয়ে যেত অসংখ্য নদী, খাল ও বিল। গ্রামের মানুষ ঘুম ভাঙাত নদীর কলতানে, কৃষকের মাঠ সেচ পেত খালের জলে, আর জেলেদের জীবিকা চলত বিলের মাছ ধরে। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সেই জলরাশি আজ যেন হারিয়ে যাচ্ছে মানুষের লোভ আর অবহেলার কাছে। নদী শুধু পানির উৎস নয়, এটি একটি দেশের ইতিহাস, সংস্কৃতি ও সভ্যতার ধারক। নদী মরে গেলে কৃষি ক্ষতিগ্রস্ত হয়, মৎস্যসম্পদ কমে যায়, পরিবেশের ভারসাম্য নষ্ট হয়। দখল, দূষণ, ভরাট ও অপরিকল্পিত উন্নয়নের কারণে দেশের অসংখ্য নদী-নালা ও খাল-বিল আজ অস্তিত্ব সংকটে। যে খালে একসময় নৌকা চলত, সেখানে এখন আবর্জনার স্তূপ। যে নদীর বুকে ঢেউ খেলত, সেখানে আজ ধুলো উড়ে। বিলগুলো ভরাট হয়ে গড়ে উঠছে বসতি ও স্থাপনা, হারিয়ে যাচ্ছে জলজ প্রাণী ও জীববৈচিত্র্য।"প্রকৃতি প্রতিশোধ নেয় না, প্রকৃতি শুধু হিসাব মেলায়। আর সেই হিসাবের খাতা আজ মানবজাতির জন্য ক্রমেই ভারী হয়ে উঠছে।
মানুষের সীমাহীন লোভ আর অবহেলায় ধীরে ধীরে মুছে যাচ্ছে প্রকৃতির এই অমূল্য সম্পদ। নদীর তীর দখল হচ্ছে, খাল ভরাট হচ্ছে, শিল্পকারখানার বর্জ্যে দূষিত হচ্ছে পানি। অথচ আমরা ভুলে যাচ্ছি, নদী শুধু একটি জলধারা নয়; নদী একটি জাতির স্মৃতি, ইতিহাস ও পরিচয়ের অংশ।
একজন বৃদ্ধ কৃষক যখন বলেন, "এই নদীতে একসময় নৌকা বাইতাম," তখন তার কণ্ঠে শুধু স্মৃতি নয়, হারিয়ে যাওয়ার কষ্টও লুকিয়ে থাকে। একজন জেলে যখন খালি হাতে ঘরে ফেরেন, তখন শুধু তার সংসার নয়, নদীকেন্দ্রিক একটি জীবনব্যবস্থাও সংকটে পড়ে। গ্রামের শিশুরা আজ নদীর গল্প শুনে, কিন্তু সেই নদীকে চোখে দেখে না। তারা জানে না কেমন ছিল ভোরের কুয়াশায় নদীর বুক, কিংবা বর্ষার জলে টইটম্বুর খালের সৌন্দর্য।
প্রকৃতি কখনো কথা বলে না, কিন্তু তার নীরবতাও অনেক কিছু বলে দেয়। নদী শুকিয়ে গেলে খরা বাড়ে, জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হয়, মাছ কমে যায়, কৃষি ক্ষতিগ্রস্ত হয়। জীববৈচিত্র্য ধ্বংস হয়, পরিবেশের ভারসাম্য নষ্ট হয়। শেষ পর্যন্ত ক্ষতিগ্রস্ত হয় মানুষই।
সবচেয়ে কষ্টের বিষয় হলো, আমরা নদীকে ব্যবহার করেছি, কিন্তু ভালোবাসিনি। খাল থেকে পানি নিয়েছি, কিন্তু খালকে বাঁচিয়ে রাখার দায়িত্ব পালন করিনি। নদীর বুক চিরে সম্পদ নিয়েছি, কিন্তু নদীর অস্তিত্ব রক্ষায় যথেষ্ট উদ্যোগ দেখাইনি।
আজ যদি আমরা আমাদের নদী-নালা, খাল-বিল রক্ষা করতে ব্যর্থ হই, তাহলে ভবিষ্যৎ প্রজন্ম হয়তো বইয়ের পাতায় পড়বে—বাংলাদেশ ছিল নদীমাতৃক দেশ। তারা হয়তো বিশ্বাসই করতে পারবে না যে একসময় এই দেশের প্রতিটি জনপদ নদীর সুরে মুখরিত ছিল।
তাই এখনই সময় জেগে ওঠার। নদী দখল ও দূষণের বিরুদ্ধে সামাজিক আন্দোলন গড়ে তোলার। খাল-বিল পুনরুদ্ধারে কার্যকর উদ্যোগ নেওয়ার। কারণ নদীকে বাঁচানো মানে শুধু পানি বাঁচানো নয়; বাঁচানো আমাদের ইতিহাস, সংস্কৃতি, কৃষি, জীববৈচিত্র্য এবং ভবিষ্যৎকে।
নদী শুকিয়ে গেলে শুধু একটি জলধারা হারায় না, হারিয়ে যায় একটি জনপদের প্রাণ, একটি জাতির স্মৃতি এবং অসংখ্য মানুষের জীবনের গল্প। আজও দেশের কোনো নির্জন নদীর তীরে দাঁড়ালে মনে হয়, নদী যেন মানুষের কাছে একটাই প্রশ্ন করছে— "আমি তো যুগের পর যুগ তোমাদের জীবন দিয়েছি, তোমরা কি আমাকে বাঁচিয়ে রাখবে না?"