‘ক্লাইমেট ডেট রিস্ক ইনডেক্স ২০২৫’–এর মাধ্যমে ন্যায্যতার নতুন পথ খোঁজার আহ্বান'
ব্রাজিলের বেলেমে অনুষ্ঠিত ৩০তম জাতিসংঘ জলবায়ু সম্মেলন (COP30) এ স্বল্পোন্নত দেশগুলোর (LDCs) বাড়তে থাকা ‘জলবায়ু-নির্ভর ঋণঝুঁকি’ নিয়ে একটি গুরুত্বপূর্ণ পরামর্শ বৈঠক সম্পন্ন হয়েছে। ‘গ্লোবাল স্টেকহোল্ডার কনসালটেশন অন দ্য ক্লাইমেট ডেট রিস্ক ইনডেক্স ২০২৫’ শীর্ষক এই অনুষ্ঠানে নতুন এক আন্তর্জাতিক সূচক তৈরি নিয়ে অংশীজনদের মতামত সংগ্রহ করা হয়—যা উন্নয়নশীল অর্থনীতির ওপর জলবায়ু পরিবর্তনের আর্থিক চাপকে পরিমাপের একটি নির্ভরযোগ্য উপায় হিসেবে কাজ করবে।
১৪ নভেম্বর শুক্রবার অনুষ্ঠিত সেশনে উপস্থিত ছিলেন LDC গ্রুপের উপদেষ্টা মনজিৎ ঢাকাল, বাংলাদেশের পরিবেশ অধিদপ্তরের অতিরিক্ত মহাপরিচালক মো. জিয়াউল হক, বুরুন্ডির পরিবেশ মন্ত্রণালয়ের প্রতিনিধি Ndayishimiye Rénilde, এবং আরও বিভিন্ন দেশের জলবায়ু নীতিনির্ধারকরা। তারা নতুন ইনডেক্সটিকে জলবায়ু অর্থায়নে স্বচ্ছতা বাড়ানো ও আর্থিক ন্যায়বিচার নিশ্চিতের একটি কার্যকর হাতিয়ার হিসেবে অভিহিত করেন।
বক্তারা জানান, জলবায়ু পরিবর্তনের ক্ষতি মোকাবিলায় অবকাঠামো মেরামত, পুনর্বাসন ও অভিযোজন খাতে বিপুল ব্যয় বহন করতে হচ্ছে উন্নয়নশীল দেশগুলোকে। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই এই ব্যয় মেটাতে নতুন ঋণ নিতে হয়—যা তাদের জাতীয় ঋণের চাপ আরও বাড়িয়ে দিচ্ছে। বৈশ্বিক নিঃসরণে সামান্য অবদান রাখলেও বিপরীতে ক্ষয়ক্ষতির ভার বহন করতে হচ্ছে এই দেশগুলোকেই—এটিকে তারা ‘Climate Debt Trap’ হিসেবে বর্ণনা করেন।
এই বাস্তবতাকে শক্তিশালী ডেটা দিয়ে তুলে ধরতেই প্রস্তাব করা হয়েছে ক্লাইমেট ডেট রিস্ক ইনডেক্স ২০২৫। এই সূচক দেশগুলোর ঋণঝুঁকি, জলবায়ুজনিত ক্ষতি ও অভিযোজন ব্যয়ের মধ্যে একটি সরাসরি সম্পর্ক দেখাবে এবং উন্নত দেশের ঐতিহাসিক জলবায়ু দায়বদ্ধতা (Historical Climate Debt) স্পষ্টভাবে চিহ্নিত করবে।
বৈঠকে বাংলাদেশের প্রতিনিধিরা উল্লেখ করেন, অভিযোজন, প্রশমন এবং নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে বিনিয়োগের জন্য আন্তর্জাতিক অর্থায়ন বাংলাদেশের মতো জলবায়ু-ঝুঁকিপূর্ণ দেশের জন্য অত্যন্ত জরুরি।
ড. ফজলে রাব্বি সাদেক আহমদ এবং মো. জিয়াউল হক জানান, কার্যকর কার্বন বাজার প্রতিষ্ঠা, সঠিক কার্বন ইনভেন্টরি প্রণয়ন এবং পর্যাপ্ত আন্তর্জাতিক সহায়তা।
বাংলাদেশের আর্থিক সক্ষমতা বাড়াতে সহায়ক হবে। তাদের মতে, এই নতুন ইনডেক্স গঠিত হলে বৈশ্বিক আলোচনায় বাংলাদেশসহ LDC গ্রুপগুলো আরও শক্তিশালী ডেটা দিয়ে ন্যায্য অর্থায়নের দাবি তুলতে পারবে।
আফ্রিকার প্রতিনিধি Ndayishimiye Rénilde বলেন, চরম জলবায়ু ঝুঁকিতে থাকা দেশগুলোকে বৈশ্বিক নিঃসরণ কমানো ও অভিযোজন সক্ষমতা বৃদ্ধির জন্য অবশ্যই একসঙ্গে কাজ করতে হবে। আর্টিকেল ৬ এবং প্রস্তাবিত এই ডেট রিস্ক ইনডেক্স—দক্ষিণ এশিয়া ও আফ্রিকার মধ্যে সহযোগিতা বাড়ানোর নতুন সুযোগ তৈরি করছে।
পরামর্শ সভার আলোচনাগুলো থেকে স্পষ্ট—জলবায়ু আলোচনার মূল সুর এখন শুধু নিঃসরণ কমানো নয়; বরং জলবায়ু ন্যায্যতা, আর্থিক দায়বদ্ধতা এবং টেকসই উন্নয়নের দিকেও বিশ্ব সম্প্রদায় আগের তুলনায় বেশি গুরুত্ব দিচ্ছে।
ইনডেক্সটি চূড়ান্ত হলে আন্তর্জাতিক আর্থিক প্রতিষ্ঠান যেমন IMF ও বিশ্বব্যাংক, এবং উন্নত দেশগুলোর জন্য স্পষ্ট বার্তা যাবে—জলবায়ু সহায়তা আর কেবল ‘উপকারভোগীকে সাহায্য’ নয়, বরং এটি ঐতিহাসিক জলবায়ু ঋণ পরিশোধের অংশ।
COP30-এ অংশ নেওয়া প্রতিনিধিদের মতে, সঠিক তথ্যভিত্তিক নীতি, ন্যায্য কার্বন বাজার এবং ঋণমুক্ত সবুজ ভবিষ্যৎই এখন বৈশ্বিক আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু।