১০ লক্ষ টাকার ঘুষ বাণিজ্যে কারণ দর্শানোর নোটিশও তোয়াক্কা করেননি রেঞ্জ কর্মকর্তা কবির, এবার নতুন জালিয়াতির টিপিতে পদুয়ায় আটক ট্রাক ২ লক্ষ টাকার সমঝোতায় রাতের আঁধারে রফা

​বান্দরবানের লামা বন বিভাগ।

১০ লক্ষ টাকার ঘুষ বাণিজ্যে কারণ দর্শানোর নোটিশও তোয়াক্কা করেননি রেঞ্জ কর্মকর্তা কবির, এবার নতুন জালিয়াতির টিপিতে পদুয়ায় আটক ট্রাক ২ লক্ষ টাকার সমঝোতায় রাতের আঁধারে রফা

​বান্দরবানের লামা বন বিভাগের বিতর্কিত সদর রেঞ্জ কর্মকর্তা (ডেুপটি রেঞ্জার) কে এম কবির উদ্দিনের সিন্ডিকেটের লাগামহীন দুর্নীতির মাত্রা যেন দিনদিন বেড়েই চলছে, অথচ সমগ্র পার্বত্য অঞ্চলের সবুজায়ন ধ্বংসকারী এই কর্মকর্তার বিরুদ্ধে কার্যকর কোনো পদক্ষেপ নেওয়ার কেউ নেই। এই চরম দুর্নীতি ও বনাঞ্চল ধ্বংস প্রতিহত করার আইনি দায়িত্ব যাদের কাঁধে ন্যস্ত, খোদ তাদেরই ক্ষমতার প্রভাব খাটিয়ে ও ছত্রছায়ায় কবির একের পর এক সরকারি সম্পদ লুণ্ঠন ও কোটি কোটি টাকার অবৈধ বাণিজ্য চালিয়ে যাচ্ছেন।

গত ২২ জুন ২০২৬ তারিখে ১০ লক্ষ টাকার বিশাল অংকের উৎকোচের বিনিময়ে রেঞ্জ কর্মকর্তা কে এম কবির উদ্দিন এবং তার বিশ্বস্ত দুই বন প্রহরী আমিরুল ইসলাম ও জুলহাস উদ্দিনের প্রত্যক্ষ সহযোগিতায় সংরক্ষিত বনের অবৈধ কাঠ পাচারের সময় রূপসীপাড়া আর্মি ক্যাম্পের সদস্যরা হাতেনাতে কাঠবোঝাই দুইটি ট্রাক আটক করেছিল।

এই নজিরবিহীন ঘটনার পর লামা বন বিভাগের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা (ডিএফও) মোস্তাফিজুর রহমান গত ২৮ জুন ২০২৬ তারিখে এক পত্রে অভিযুক্ত রেঞ্জ কর্মকর্তা কবির উদ্দিনের কাছে অবৈধ কাঠ পাচারে সম্পৃক্ততার বিষয়ে সুনির্দিষ্ট ব্যাখ্যা চেয়ে কারণ দর্শানোর নোটিশ প্রদান করেন এবং বিষয়টি অবগত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য চট্টগ্রাম অঞ্চলের বন সংরক্ষক মিহির কুমার দো-কেও পত্রের অনুলিপি দেওয়া হয়। কিন্তু অত্যন্ত আশ্চর্যজনক ও চাঞ্চল্যকর তথ্য হলো, পত্র প্রদানের ১৮ দিন অতিবাহিত হলেও কে এম কবির উদ্দিন ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের অলিখিত প্রশ্রয়ে ডিএফও কর্তৃক চাহিত ব্যাখ্যার কোনো উত্তর আজ পর্যন্ত প্রদান করেন নাই, যা সরকারি চাকরি বিধিমালা অনুযায়ী চরম অসদাচরণ এবং গুরুদণ্ডযোগ্য অপরাধ হওয়া সত্ত্বেও প্রধান বন সংরক্ষক (সিসিএফ), চট্টগ্রাম অঞ্চলের বন সংরক্ষক (সিএফ) মিহির কুমার দো এবং সহকারী বন সংরক্ষক (এসিএফ) মাসুম আলমের মতো শীর্ষ কর্তাদের প্রত্যক্ষ অনৈতিক ব্যাকআপ ও দীর্ঘদিনের সক্ষতার সুবাদে কবির প্রতিবারই পার পেয়ে যাচ্ছেন এবং গোটা প্রশাসনিক ব্যবস্থাকে বৃদ্ধাঙ্গুলি প্রদর্শন করছেন।

​সেনাবাহিনীর হাতে ট্রাক ধরা পড়ার এবং ডিএফও-র নোটিশকে অবমূল্যায়ন করার সেই চাঞ্চল্যকর ঘটনার রেশ কাটতে না কাটতে এবং মাত্র ২৫ দিনের মাথায় গত ১৪ জুলাই ২০২৬ তারিখে আবারও রেঞ্জ কর্মকর্তা কে এম কবির উদ্দিনের সরাসরি ইস্যুকৃত জালিয়াতিপূর্ণ টিপি (চলাচল পাশ) মূলে সংরক্ষিত বনাঞ্চলের মূল্যবান কাঠ অভিনব কায়দায় পাচারকালে চট্টগ্রাম দক্ষিণ বন বিভাগের পদুয়া রেঞ্জের অধীন পদুয়া বিট কাম চেক স্টেশন কর্তৃক ঢাকা মেট্রো-ট ১১-৫৩১৯ নাম্বারের একটি বড় ট্রাক আটক করে রেঞ্জ কার্যালয়ে নিয়ে যাওয়া হয়। এই ঘটনার খবর পেয়েই লামা থেকে ঝটিকা সফরে ছুটে এসে রেঞ্জ কর্মকর্তা কবির উদ্দিন রাতের অন্ধকারে পদুয়া রেঞ্জ কর্মকর্তা রিয়াদুর রহমান ভূঁইয়া, স্টেশন কর্মকর্তা আবু সাইদ এবং কাঠের প্রকৃত মালিক ও কবিরের মূল সহযোগী আদিল চৌধুরীকে নিয়ে এক নজিরবিহীন রুদ্ধদ্বার বৈঠকে বসেন। অনুসন্ধানে নির্ভরযোগ্য সূত্রে জানা গেছে, সেই রাতেই মাত্র ২ লক্ষ টাকার অনৈতিক আর্থিক সমঝোতার মাধ্যমে ট্রাক থেকে ৩০ টুকরা সম্পূর্ণ অবৈধ চোরাই কাঠ রাতের আঁধারেই আনলোড করে সরিয়ে ফেলা হয় এবং পরের দিন সম্পূর্ণ লোকদেখানো ও ভুয়া পরিমাপের নাটক সাজিয়ে কাঠের কথিত বৈধতা দেখিয়ে ট্রাকটি ছেড়ে দেওয়া হয়। যে বিশ্বস্ত সোর্স সুনির্দিষ্ট তথ্যের ভিত্তিতে ট্রাকটি আটক করিয়েছিলেন, তিনি ক্ষোভ প্রকাশ করে প্রতিনিধিকে জানান যে, জব্দকৃত ট্রাকটিতে থাকা অধিকাংশ কাঠই সম্পূর্ণ অবৈধ ছিল এবং সঠিকভাবে যাচাই করলে কবির উদ্দিনের ইস্যু করা টিপির বিবরণের সাথে ট্রাকে থাকা কাঠের প্রকৃত জাত, ডিজিটাল পরিমাপ এবং হাতুড়ির হ্যামার চিহ্নের কোনো ধরনের মিল খুঁজে পাওয়া যেত না। কিন্তু চট্টগ্রাম দক্ষিণ বন বিভাগের অসৎ কর্মকর্তাদের কারণে এবং টাকার অন্ধ প্রভাবে কুখ্যাত কাঠের মালিক ও রেঞ্জ কর্মকর্তা কবির এই যাত্রায় বড় ধরনের অবৈধ ছাড় পেয়ে গেছেন, যেখানে চট্টগ্রাম দক্ষিণ বন বিভাগের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা (ডিএফও) মোহাম্মদ সোহেল রানা টাকার একটি বড় অংশ পেয়েছেন বলে একাধিক সূত্র নিশ্চিত করেছে।

​অনুসন্ধানে আরও চাঞ্চল্যকর তথ্য বেরিয়ে এসেছে যে, লামা বন বিভাগের যাবতীয় অবৈধ কাঠ পাচার ও বনাঞ্চল ধ্বংসের কাজ কবির মূলত এই আদিল চৌধুরীর প্রকাশ্য সহযোগিতাতেই সম্পন্ন করেন এবং কবির লামায় যোগদানের পর হতে আদিলকে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করে একের পর এক অপরাধ করেও পার পেয়ে যাচ্ছেন। শুধু তাই নয়, বনের কাঠ পাচারই নয়, বন বিভাগের অভ্যন্তরীণ গোপনীয়তা ভঙ্গ করে রাষ্ট্রীয় বাজার মূল্য আড়াল করার উদ্দেশ্যে সরকারি মূল্য আগেই ফাঁস করে দিয়ে বন বিভাগের লটের যাবতীয় বড় বড় টেন্ডারগুলো কবির সম্পূর্ণ অবৈধ উপায়ে তার এই সহযোগী আদিল চৌধুরীকে পাইয়ে দেন। সোলেমান নামে এক স্থানীয় কাঠ ব্যবসায়ী তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করে জানান যে, কে এম কবির উদ্দিনের দুর্নীতির কৌশল অত্যন্ত সুদূরপ্রসারী ও মারাত্মক; তিনি যেমন বনের কাঠ পাচারকারীদের কাছ থেকে নিজে কোটি কোটি টাকা ঘুষ গ্রহণ করেন, ঠিক তেমনিভাবে সেই কালো টাকার একটি বড় অংশ দিয়ে নিজস্ব বন প্রশাসন ও ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকেও সবসময় ম্যানেজ বা অবশ করে রাখেন। আর এই বিপুল অর্থ লেনদেনের কারণেই বন বিভাগের শীর্ষ কর্তৃপক্ষ কবিরের করা পাহাড়সম দুর্নীতির দিকে সবসময় নমনীয় ও অন্ধের ভূমিকা পালন করে থাকে, যা কাজে লাগিয়ে কবির মাসের পর মাস বনাঞ্চল উজাড় করে লক্ষ লক্ষ টাকার ব্যক্তিগত অবৈধ আয়ের রাজত্ব কায়েম করে চলেছেন।