ব্যাংকে পরিচালকদের রাজত্ব
বেসরকারি ব্যাংকগুলোতে পরিচালকদের রাজত্ব দিন দিন বাড়ছে। কোনমতেই থামানো যাচ্ছে না তাদের। ব্যাংক পরিচালনায় অভিজ্ঞতা না থাকলেও ব্যাংক পরিচালনায় হস্থক্ষেপ করছেন। অভিজ্ঞ ব্যাপস্থাপকদের বুড়ো আঙ্গুল দেখিয়ে নামে-বেনামে ঋণ নিয়েই ক্ষান্ত হচ্ছেন না, এর পাশাপাশি তারা সিএসআরের (করপোরেট সামাজিক দায়বদ্ধতা) টাকায়ও ভাগ বসাচ্ছেন।
নিজেদের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের নামে সিএসআরের টাকা নিয়ে নিচ্ছেন। আর ব্যাংক সম্পর্কিত বিভিন্ন কাজ পেতে ভেন্ডর ও থার্ড পার্টি হিসেবে একাধিক কোম্পানি খুলেছেন অনেকে। ব্যাংকের নিয়োগ প্রক্রিয়ায় হস্তক্ষেপ, টাকার বিনিময়ে চাকরি এগুলো প্রতিনিয়তের বিষয়। এছাড়া অন্য গ্রাহকের ঋণ মঞ্জুর, সুদ মওকুফ ও ঋণ পুনঃতফশিলের ক্ষেত্রেও নানা সুবিধা নিচ্ছেন। রাজত্ব এখানেই শেষ নয়। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নিয়ম-কানুন তোয়াক্কা না করে বৃদ্ধি পাচ্ছে তাদের ঋণের পরিমাণ। পরিশোধের ক্ষেত্রে এ ঋণের সুদ মওকুফের অঙ্কও বেড়েছে।
এছাড়া অধিকাংশ বেসরকারি ব্যাংকগুলো পরিচালকদের সঙ্গে আঁতাত করে নিজেদের মধ্যেও সুদ মওকুফ করছে। আবার ব্যাংক পরিচালনা পরিষদের মিটিংয়ে উত্থাপন করে অনুমোদন নিয়ে নিচ্ছেন। আর এসব দেখে বাংলাদেশ ব্যাংকও ঋণ ও সুদ মওকুফ অনুমোদন পাশ করে দিচ্ছে। বর্তমানে ২৫টি ব্যাংকের ২৭৫ জন পরিচালক নিজ ব্যাংক থেকে ঋণ নিয়েই ক্ষান্ত হননি, অন্য ৫৫টি ব্যাংক থেকে ১ লাখ ৫৯ হাজার ৭৫৯ কোটি টাকারও বেশি ঋণ নিয়েছেন তারা। অর্থনীতিবিদরা বলছেন, ব্যাংকিং খাতে সংঘটিত ৯০ শতাংশ অনিয়ম-অপরাধে জড়িত ব্যাংকের নিজস্ব লোকজন। এভাবে ব্যাংক পরিচালিত হতে থাকলে খুব শিগগিরি বেশ কিছু ব্যাংক দেউলিয়া ঘোষণা করা সময়ের ব্যাপার।
ব্যাংক গুলোকে বাচাঁতে হলে রাজনৈতিক ও পরিবারতান্ত্রিক প্রভাব থেকে মুক্ত করতে হবে। তারা বলেন, ব্যাংক কোম্পানি আইনের সর্বশেষ ২০১৮ সালের সংশোধনী অনুযায়ী পরিচালকদের ক্ষমতা বৃদ্ধি করে দিয়েছে। ফলে পরিচালকরা ব্যাংকের বিভিন্ন কাজে অনিয়ম কার্যক্রমে লিপ্ত হয়েছেন। তাদের মতে, ব্যাংক আইনে, একই পরিবার থেকে দুইজনের পরিবর্তে চারজন পর্যন্ত পরিচালক রাখার বিধান, পরিচালকের মেয়াদ পরপর দুইবারে সর্বোচ্চ ছয় বছরের পরিবর্তে পরপর তিনবারে সর্বোচ্চ ৯ বছর করার এবং একই পরিবারের চার সদস্যের বাইরে অন্যান্য আত্মীয় স্বজনকে পরিচালক হিসেবে নিয়োগের সুযোগ রাখায় তাদের ক্ষমতা বেড়েছে।
চলতি অর্থবছরের প্রথম তিন মাসে কেন্দ্রীয় ব্যাংক বিভিন্ন ব্যাংকের ২ হাজার ৫৫৭ কোটি টাকার ঋণের সুদ মওকুফ করেছে। অর্থাৎ ব্যাংকগুলো আগের প্রান্তিকের তুলনায় ২ হাজার ৩৬৬ কোটি টাকা বেশি সুদ মওকুফ করেছে, যা প্রায় ১২ গুণ বেশি। তবে এ সুদ মওকুফ পাওয়া গ্রাহকের নাম প্রকাশ করেনি বাংলাদেশ ব্যাংক। তবে সুদ মওকুফের সিংহভাগ সুবিধা নিয়েছেন ব্যাংকের পরিচালকরা। দেশের ৫৫টি ব্যাংক থেকে বেসরকারি ব্যাংকগুলোর পরিচালকরা ১ লাখ ৫৯ হাজার ৭৫৯ কোটি টাকারও বেশি ঋণ নিয়েছেন, যা ব্যাংকগুলোর বিতরণকৃত মোট ঋণের ১১ দশমিক ২১ শতাংশ। দেশের সার্বিক অর্থনৈতিক কার্যক্রম স্বাভাবিক অবস্থায় থাকাকালীন ২০১৯ সালে ব্যাংকগুলো ঋণের সুদ মওকুফ করেছে ২ হাজার ২৯৩ কোটি টাকা। ২০২০ সালে করেছে ১ হাজার ৫৭৮ কোটি টাকা এবং বিদায়ী ২০২১ সালে ব্যাংকগুলো ১ হাজার ৮৫৫ কোটি টাকা ঋণের সুদ মওকুফ করেছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ প্রতিবেদনে এসব তথ্য তুলে ধরা হয়েছে। জানা গেছে, ব্যাংকের পরিচালক, পরিবারের সদস্য বা তাদের স্বার্থ সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের সুদ মওকুফে বাংলাদেশ ব্যাংকের পূর্বানুমোদনের যে বাধ্যবাধকতা দেওয়া ছিল, গত ২৪ মে তাতুলে দেয় বাংলাদেশ ব্যাংক। এই শর্ত শিথিলের পরই ব্যাংক ও পরিচালকরা কৌশলে নিজেদের ঋণের সুদ মওকুফ করে নিচ্ছেন। ব্যাংকের তথ্য বলছে, রাষ্ট্র মালিকানাধীন ব্যাংকগুলোর এই বছরের জুন মাস শেষে মোট ঋণের পরিমাণ ২ লাখ ৫২ হাজার কোটি টাকা দাঁড়িয়েছে।
এরমধ্যে ৫৫ হাজার ৪২৮ কোটি টাকা খেলাপি রয়ে গেছে, যা মোট ঋণের ২১ দশমিক ৯৩ শতাংশ। অন্যদিকে বেসরকারি ব্যাংকগুলোর ঋণের পরিমাণ ১০ লাখ ৪২ হাজার কোটি টাকা দাঁড়িয়েছে। এরমধ্যে খেলাপি ঋণের পরিমাণ ৬২ হাজার ৬৭৭ কোটি টাকা। নাম প্রকাশ না করার শর্তে দেশের দ্বিতীয় প্রজন্মের কয়েকটি ব্যাংকের এমডি জানিয়েছেন, রাজনৈতিক ও পরিবারতান্ত্রিক প্রভাব ব্যাংকগুলোকে প্রশ্নবিদ্ধ করছে। তাদের ব্যাংকের ঋণের একটি বড় অংশই পরিচালকদের স্বার্থসংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান ও অন্য ব্যাংকের পরিচালকদের। আর এসব ঋণ বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই খেলাপি হয়ে পড়েছে। কিন্তু কিছু বলা যাচ্ছে না।
পরিচালনা পরিষদের ক্ষমতা তাদের হাতে। এভাবেই ব্যাংকিং খাতে অনাদায়ী ঋণ বেড়ে যাচ্ছে। এ বিষয়ে জানতে চাইলে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক অর্থ উপদেষ্টা ড. এবি মির্জ্জা আজিজুল ইসলাম আজকের সংবাদকে জানিয়েছেন, অথনীতির প্রবৃদ্ধি বৃদ্ধি পায় ব্যাংকিং খাত থেকে। লেন-দেন না হলে, ব্যবসা বাড়বে কি করে। তাই বলে ঋণ নেয়া দোষের হবে? তবে ব্যাংক পরিচালকদের ঋণ নেয়ার প্রক্রিয়ায় গলদ আছে। পরিচালকরা যেসব প্রতিষ্ঠানের নামে ঋণ নিচ্ছেন তার বেশিরভাগই অস্তিত্ব¡ নেই।
এভাবে ঋণ নেয়া অনৈতিক ও সুশাসনের পরিপন্থী। এসব অনৈতিক ঋণ নেয়া প্রতিরোধ করতে সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন রাজনৈতিক সদিচ্ছার। যেই হোক না কেন, সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির বিরুদ্ধে কঠোর পদক্ষেপ নেয়া হলে এটা বন্ধ করা সম্ভব হবে। অন্যথায় যেভাবে নামে-বেনামে ব্যাংক থেকে জনগণের অর্থ বের করে নেয়া হচ্ছে তা বন্ধ করতে না পারলে দেশের সামষ্টিক অর্থনীতিই ঝুঁকির মুখে পড়ে যাবে। অন্য এক প্রশ্নে তিনি আরো বলেন, খেলাপি গ্রাহকের সার্বিক অবস্থা সত্যিকারের খারাপ থাকলে সেই ঋণের আসল টাকা আদায়ে সুদ মওকুফ করা হয়।
ব্যাংকগুলো ক্ষতিগ্রস্ত গ্রাহকদের স্বার্থে এটি করে থাকে, তবে অনেকেই চতুরতার মাধ্যমে এই সুবিধা নেন। এই ধারা অব্যাহত থাকলে ঋণ পরিশোধে অনেকেই নিরুৎসাহিত হবেন। টিআইবি’র নিবাহী পরিচালক ইফতেখারুজ্জামান আজকের সংবাদকে বলেন, ব্যাংকগুলোর মূলধন অধিকাংশ আমানতকারির। জনগণের আমানত কিছু মানুষের ব্যক্তিগত সম্পদে পরিণত হচ্ছে এবং খেয়াল খুশিমতো ব্যবহারের প্রবণতা দেখা যাচ্ছে। তিনি বলেন, ব্যাংকিং খাতে অনিয়ম নিয়ে টিআইবি গবেষণা প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে।
সেই প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, তথাকথিত ব্যাংক মালিক, বাংলাদেশ ব্যাংক ও সরকার এই তিন পক্ষই জনগণের আমানতের কথা ভুলে গিয়ে লুটপাটকারী ও ঋণখেলাপিদের সুযোগ করে দিচ্ছে। সরকার অনেক সময় ঋণখেলাপি, অর্থ আত্মসাৎকারী ও জালিয়াতদের সহায়ক শক্তির ভূমিকা পালন করছে। অনেক সময় মনে হচ্ছে সরকার তাদের কাছে জিম্মি। বাংলাদেশ ব্যাংকের আইন ও নীতিমালা এমনিতেই দুর্বল। সরকার আরো দুর্বল করে দিচ্ছে। পরিচালকদের ব্যাংক ঋণ পরিমাণ : বেসরকারি বাণিজ্যিক ব্যাংকের মধ্যে ৪ হাজার কোটি টাকার বেশি পরিচালক ঋণ রয়েছে এমন ব্যাংকের মধ্যে সাউথইস্ট ব্যাংক ৪ হাজার ৮৮৯ কোটি টাকা, যা মোট ঋণের ১২ দশমিক ১৬ শতাংশ, ন্যাশনাল ব্যাংক ৪ হাজার ৪৮৯ কোটি টাকা, মার্কেন্টাইল ব্যাংকের ৪ হাজার ৪৫৬ কোটি টাকা, ডাচবাংলা ব্যাংক ৪ হাজার ২৯৪ কোটি টাকা ঋণ দিয়েছে এবং যমুনা ব্যাংকের পরিচালক ঋণ রয়েছে ৪ হাজার ৩০৯ কোটি টাকা।
এছাড়া ৩ হাজার কোটি টাকার বেশি পরিচালক ঋণ রয়েছে এমন ব্যাংকের মধ্যে দ্য সিটি ব্যাংক ৩ হাজার ৯৭০ কোটি টাকা, এবি ব্যাংক ৩ হাজার ৩০৫ কোটি টাকা, ইস্টার্ন ব্যাংক ৩ হাজার ৪৩২ কোটি টাকা, ন্যাশনাল ক্রেডিট অ্যান্ড কমার্স ব্যাংক ৩ হাজার ৬১৪ কোটি টাকা, স্ট্যান্ডার্ড ব্যাংকের ৩ হাজার ৫২৯ কোটি টাকা, মিউচুয়্যাল ট্রাস্ট বাংকের ৩ হাজার ৭৩৭ কোটি টাকা, যা মোট ঋণের প্রায় সাড়ে ১৪ শতাংশ, প্রিমিয়ার ব্যাংকের ৩ হাজার ৪৯ কোটি টাকা, ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংকের ৩ হাজার ১৫ কোটি টাকা।
অপরদিকে ২ হাজার কোটি টাকার বেশি পরিচালক ঋণ রয়েছে এমন ব্যাংকের মধ্যে আল আরাফা ইসলামী ব্যাংকের ২ হাজার ৩৬৩ কোটি টাকা, ওয়ান ব্যাংকের ২ হাজার ৪৩৬ কোটি টাকা, ব্র্যাক ব্যাংকের পরিচালক ঋণ রয়েছে ২ হাজার ২০৫ কোটি টাকা। এ দিকে পরিচালক ঋণের ক্ষেত্রে পিছিয়ে নেই নতুন প্রজন্মের ব্যাংকগুলো। নতুন ব্যাংকের মধ্যে সর্বোচ্চ পরিচালক ঋণ দিয়েছে এনআরবি কমার্শিয়াল ব্যাংক ১ হাজার ৯০ কোটি টাকা, যা ব্যাংকটির মোট ঋণের প্রায় ১৪ শতাংশ। এরপরই উনিয়ন ব্যাংক ৯১৭ কোটি টাকা, এনআরবি গ্লোবাল ব্যাংকের ৯১৫ কোটি টাকা, মধুমতি ব্যাংক ৯১০ কোটি টাকা, সাউথ বাংলা এ্যাগ্রিকালচার অ্যান্ড কমার্স ব্যাংক ৬৩০ কোটি টাকা, মেঘনা ব্যাংক ৪৬১ কোটি টাকা, মিডল্যান্ড ব্যাংক ৬৩৩ কোটি টাকা, এনআরবি ব্যাংকের ৪৫৯ কোটি টাকা এবং পদ্মা ব্যাংকের রয়েছে ৭৭ কোটি টাকা।