বাগান নেই, আছে ৭০ লক্ষ টাকার বিল-ভাউচার চট্টগ্রাম উত্তর বন বিভাগে পুকুর চুরি, অভিযুক্তকে বাঁচাতে তদন্ত ধামাচাপা
সরকারের বন ও জীবিকা রক্ষার অন্যতম মেগা প্রকল্প ‘সুফল’ এখন এক শ্রেণির দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তার পকেট ভরার মেশিনে পরিণত হয়েছে। চট্টগ্রাম উত্তর বন বিভাগের কুমিরা রেঞ্জে বাগান সৃজনের নামে বরাদ্দকৃত টাকা উত্তোলন করে বাগান সৃজন না করে পরবর্তীতে বাগান রক্ষণাবেক্ষণ এর নামে প্রায় ৭০ লক্ষ টাকা আত্মসাতের চাঞ্চল্যকর তথ্য পাওয়া গেছে। অভিযোগের তীর কুমিরা রেঞ্জ কর্মকর্তা মঞ্জুরুল আলম চৌধুরীর দিকে হলেও, তাকে শাস্তির বদলে উল্টো পদোন্নতির তোড়জোড় চালাচ্ছে বন অধিদপ্তরের একটি প্রভাবশালী সিন্ডিকেট। অনুসন্ধানে জানা যায়, ২০২৩-২০২৪ অর্থ বছরে কুমিরা রেঞ্জে ১৮০ হেক্টর বাগান সৃজনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়। সরকারি নির্দেশ অনুযায়ী প্রতি হেক্টরে ২,৫০০টি চারা রোপণের বাধ্যবাধকতা থাকলেও, বাস্তবে ৪-৫ মিটার দূরত্বে নামমাত্র ২০০টি বা তার কম চারা লাগিয়ে বাগান সৃজনের বরাদ্দের সিংহভাগ অর্থ লোপাট করা হয়। না হওয়া বাগানের পরবর্তীতে বাগান রক্ষণাবেক্ষণের নামে মঞ্জুরুল আলম চৌধুরী আরও ৭০ লক্ষ টাকা উত্তোলন করেন বাগান রক্ষণাবেক্ষণ করার জন্য অভিযোগ রয়েছে, বাগানের রক্ষণাবেক্ষণের কোনো কাজ না করেই তৎকালীন ডিএফও, চট্টগ্রাম উত্তর বন বিভাগকে ম্যানেজ করে ভুয়া বিল-ভাউচারের মাধ্যমে তিনি এই টাকা আত্মসাৎ করেন অনেকটা পুকুর চুরি । বন ব্যবস্থাপনা পরিকল্পনা বিভাগ, চট্টগ্রামের দুটি পৃথক জরিপে ভয়াবহ দুর্নীতির চিত্র ফুটে ওঠে, প্রথম জরিপ (১৫ ডিসেম্বর ২০২৪): ১৭০.০ হেক্টর বাগানে জীবিত চারা পাওয়া যায় মাত্র ৬০.২০% (থাকার কথা ৮০%) এবং ১০.০ হেক্টরের অন্য বাগানে ছিল মাত্র ৫০.৪০%। দ্বিতীয় জরিপে জালিয়াতি ঢাকতে পুনরায় জরিপ করা হলে আরও ভয়ংকর তথ্য আসে। ৭০.০ হেক্টরে চারা টিকে আছে মাত্র ৩১.৬৫% এবং ১০.০ হেক্টরে মাত্র ২১.৬০%। বাস্তবে অনেক জায়গায় কোনো চারারই অস্তিত্ব নেই। অথচ রক্ষণাবেক্ষণের নামে ব্যয় দেখানো হয়েছে প্রায় ৭০ লক্ষ টাকা।
বাগান ব্যর্থ হওয়ার পর ২৬ নভেম্বর ২০২৫ তারিখে উপ-বন সংরক্ষক উম্মে হাবিবা অভিযুক্তদের তালিকা মো: সফিকুল ইসলাম, বিভাগীয় বন কর্মকর্তা, চট্টগ্রাম উত্তর বন বিভাগকে ৭ (সাত) দিনের মধ্যে প্রেরণের নির্দেশ দিলেও ২ মাসের বেশি সময় পেরিয়ে গেলেও তা আলোর মুখ দেখেনি। জানা যায় ডিএফও নিজেও রিপোর্ট পাঠাতে গড়িমসি করেছেন। অভিযোগ রয়েছে, বন সংরক্ষক (সিএফ) ড. মোল্যা রেজাউল করিমের একান্ত আস্থাভাজন এবং চট্টগ্রাম অঞ্চলের স্থানীয় হওয়ায় মঞ্জুরুল আলমকে বাঁচাতে তদন্ত প্রতিবেদনটি ধামাচাপা দেওয়া হয়েছে। গুঞ্জন রয়েছে, বড় অঙ্কের উৎকোচের বিনিময়ে এই ‘সিন্ডিকেট’ পুরো তদন্ত প্রক্রিয়াকে স্থবির করে রেখেছে । দুর্নীতির পাহাড় গড়লেও মঞ্জুরুল আলমের জয়জয়কার থামেনি। তাকে সম্প্রতি ডেপুটি রেঞ্জার পদে পদোন্নতি দেওয়া হয়েছে এবং বর্তমানে তাকে ফরেস্ট রেঞ্জার পদে পদোন্নতি দিতে বাংলাদেশ সরকারি কর্ম কমিশনে (পিএসসি) প্রস্তাব পাঠানো হয়েছে। সম্পদের পাহাড় ও রাজকীয় জীবনযাপন অনুসন্ধানে মঞ্জুরুল আলম চৌধুরীর অস্বাভাবিক জীবনযাপনের চিত্র উঠে এসেছে। চট্টগ্রামের অভিজাত এলাকা কাতালগঞ্জ আবাসিক এলাকায় অত্যাধুনিক ফ্ল্যাট এবং পাঁচলাইশ এলাকায় বহুমূল্যবান জমি ক্রয় করেছেন তিনি। সাধারণ একজন বন কর্মকর্তার এমন রাজকীয় সম্পদ অর্জনে জনমনে নানা প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। এছাড়াও জানা যায় মঞ্জুরুল আলম চৌধুরীর কখনও খারাপ পোস্টিং এ থাকেন নাই এলাকার প্রভাব বিস্তার করে সব সময় সেরা পোস্টিং এ থেকে বনভূমি বেদখলে সহায়তা, বনজ সম্পদ উজাড়, অবৈধভাবে কাঠ পাচার করে উর্ধতন কর্তৃপক্ষে ম্যানেজ করে হাতিয়ে নিয়েছেন লক্ষ লক্ষ টাকা। মাস কয়েক আগেও এই কর্মকর্তা ফৌজদারহাট বনজদ্রব্য পরীক্ষণ ফাঁড়িতে কর্মরত থেকে পার্বত্য অঞ্চলের সংরক্ষিত বনাঞ্চল হতে ভূয়া পারমিটের মাধ্যমে আসা বনজদ্রব্যের সঠিকতা যাচাই এর নামে গাড়ি প্রতি ৫/৬ হাজার টাকা নিয়ে অবৈধভাবে কাঠ পাচার করেছেন ঢাকা সহ সারা দেশে।
সরকারের উন্নয়ন প্রকল্পকে এবং বনভুমি ও বনাঞ্চলকে যারা ব্যক্তিগত আয়ের উৎস বানিয়েছেন, সেই চক্রটি এখনো ধরাছোঁয়ার বাইরে থাকা এবং উর্ধতন কর্তৃপক্ষ অর্থের লোভে রিপোর্ট ধামাচাপা দেওয়ায়, বন বিভাগের কর্মকর্তাদের মধ্যে তীব্র ক্ষোভ ও হতাশা বিরাজ করছে।