বনবিভাগের ‘আলাদিনের চেরাগ’ ডেপুটি রেঞ্জার আব্দুল হামিদ; বনের জমি ও কাঠে গড়েছেন অঢেল সম্পদ

​বন রক্ষা যার পেশাদারিত্বের মূল মন্ত্র হওয়ার কথা, তিনিই মেতেছেন বন বিনাশের মহোৎসবে।

বনবিভাগের ‘আলাদিনের চেরাগ’ ডেপুটি রেঞ্জার আব্দুল হামিদ; বনের জমি ও কাঠে গড়েছেন অঢেল সম্পদ

​বন রক্ষা যার পেশাদারিত্বের মূল মন্ত্র হওয়ার কথা, তিনিই মেতেছেন বন বিনাশের মহোৎসবে।কক্সবাজার থেকে শুরু করে খাগড়াছড়ি—বনবিভাগের যেখানেই পা রেখেছেন ডেপুটি রেঞ্জার মো: আব্দুল হামিদ, সেখানেই অভিযোগ উঠেছে বনভূমি বিক্রি আর কাঠ পাচারের ‘সিন্ডিকেট’ গড়ার।

অনুসন্ধানে বেরিয়ে এসেছে তার দুর্নীতি ও ক্ষমতার অপব্যবহারের এক দীর্ঘ খতিয়ান। ​চট্টগ্রাম উত্তর বন বিভাগের হাটহাজারী রেঞ্জে থাকাকালীন আব্দুল হামিদ প্রথম আলোচনায় আসেন কাঠ পাচারকারী চক্রের ‘মূল নিয়ন্ত্রক’ হিসেবে। পার্বত্য চট্টগ্রাম থেকে অবৈধ কাঠ সমতলে আনার নিরাপদ রুট তৈরি করে দিয়েছিলেন তিনি। ইছামতি রেঞ্জে বদলি হয়ে তিনি নতুন কৌশলে দুর্নীতি শুরু করেন। অভিযোগ রয়েছে, মোটা অঙ্কের টাকার বিনিময়ে রেঞ্জের বিশাল এলাকার বনভূমি অবৈধভাবে দখলদারদের হাতে তুলে দিয়েছেন বর্তমানে সেই বনভূমিতে বন নেই, আছে শত শত অবৈধ বসতি।

মূল্যবান সেগুন ও গর্জন কাঠ পাচারকে ‘বৈধতা’ দিতে তিনি নিজেই ভুয়া পারমিট ইস্যু করতেন। শুধু তাই নয়, তার প্রত্যক্ষ মদদে ইছামতি রেঞ্জ এলাকায় ১৫৬টি অবৈধ ইটভাটা গড়ে তোলা হয়, যা বন উজাড় ও পরিবেশ দূষণের প্রধান কারণ হিসেবে চিহ্নিত। ​বান্দরবান পাল্পউড বন বিভাগে কর্মরত থাকাকালীন আব্দুল হামিদের বিরুদ্ধে সংরক্ষিত বনাঞ্চল থেকে কোটি কোটি টাকার কাঠ পাচারের অভিযোগ রয়েছে। জোত পারমিট’-এর আড়ালে সরকারি কাঠ ব্যক্তিগত সম্পদে পরিণত করেছেন। প্রাপ্ত তথ্যানুযায়ী, বন বিভাগে চাকরি করলেও ঢাকায় তার একটি বড় আকারের ফার্নিচারের ব্যবসা রয়েছে, যার যোগান আসে মূলত পাচারকৃত মূল্যবান কাঠ থেকে।

​বর্তমানে আব্দুল হামিদ রাঙামাটি অঞ্চলের খাগড়াছড়ি বন বিভাগে কর্মরত। তবে এই পোস্টিং নিয়ে রয়েছে চাঞ্চল্যকর অভিযোগ। সংশ্লিষ্ট মহলের দাবি খাগড়াছড়ি বন বিভাগের ডিএফও মো: ফরিদ মিয়াকে ৩০ লক্ষ টাকা উৎকোচ দিয়ে তিনি সুবিধাজনক স্থান মানিকছড়ি রেঞ্জে এবং অতিরিক্ত দায়িত্ব হিসেবে ‘গাড়ীটানা বিট কাম চেক স্টেশনে’ পোস্টিং নিয়েছেন।

বর্তমানে তিনি মানিকছড়িতে একদল পুরাতন কাঠ ব্যবসায়ীকে নিয়ে নতুন সিন্ডিকেট গড়েছেন। টেবিল জোত (কাগজপত্রে দেখানো কিন্তু বাস্তবে বনের কাঠ) পারমিট ইস্যু করতে তিনি প্রতি ঘনফুট কাঠ বাবদ ১০০ থেকে ১২০ টাকা নিচ্ছেন। প্রতি গাড়ি কাঠ লোডিংয়ের জন্য ১০ থেকে ১৫ হাজার টাকা দিতে হয় তাকে। সবচেয়ে বড় জালিয়াতি হচ্ছে চেক স্টেশনে। যে কাঠের টিপি (ট্রানজিট পাস) ইস্যু করা হয়, ট্রাকের কাঠের আকার বা পরিমাণের সাথে তার কোনো মিল নেই। মূলত টিপির আড়ালে বনের সংরক্ষিত বড় বড় গাছ পাচার হচ্ছে। অনুসন্ধানে প্রাপ্ত সম্পদের বিবরণ (সারসংক্ষেপ) ​অভিযোগ অনুযায়ী, একজন সাধারণ ডেপুটি রেঞ্জার হয়েও আব্দুল হামিদ বর্তমানে কোটি কোটি টাকার মালিক। তার অর্জিত অবৈধ অর্থের একটি বড় অংশ দিয়ে তিনি প্রভাবশালী মহলে লবিং করে নিজের বদলি ও পোস্টিং নিয়ন্ত্রণ করেন।

বনের জমি দখলদারদের সহযোগিতা করা এবং কাঠ পাচারকারীদের প্রশাসনিক সুরক্ষা প্রদানই তার আয়ের মূল উৎস। ​সরকারি সম্পদ রক্ষায় নিয়োজিত একজন কর্মকর্তার এমন বেপরোয়া দুর্নীতিতে জনমনে চরম ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে। পরিবেশবাদী সংগঠনগুলোর দাবি, আব্দুল হামিদের এই ‘সিন্ডিকেট’ বন্ধ না হলে খাগড়াছড়ির সংরক্ষিত বনাঞ্চল অচিরেই ধ্বংস হয়ে যাবে। এই বিষয়ে উচ্চপর্যায়ের তদন্ত কমিটি গঠন এবং বিভাগীয় ব্যবস্থা গ্রহণ এখন সময়ের দাবি।