প্রধান প্রকৌশলীর প্রত্যক্ষ তত্বাবধায়নে প্রকল্পের টাকা লুটপাট চললেও দেখার কেউ নেই

দেশের প্রান্তিক অঞ্চলে নিরাপদ ও সুপেয় পানি পৌঁছে দেওয়ার রাষ্ট্রীয় অঙ্গীকার এখন প্রশ্নের মুখে। জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তর (ডিপিএইচই)-এর শীর্ষ পর্যায়ের প্রশাসনিক বিশৃঙ্খলা এবং এক শ্রেণির অসাধু কর্মকর্তা ও শক্তিশালী ঠিকাদার সিন্ডিকেটের সীমাহীন দুর্নীতির অভিযোগে এই খাত গভীর সংকটে পড়েছে।

প্রধান প্রকৌশলীর প্রত্যক্ষ তত্বাবধায়নে প্রকল্পের টাকা লুটপাট চললেও দেখার কেউ নেই

কাগজে প্রকল্প বাস্তবায়ন, বাস্তবে নেই অনেক স্থাপনা

জ্যেষ্ঠতা উপেক্ষা করে নিয়োগে অধিদপ্তরে অস্থিরতা

পানির মান পরীক্ষায় ল্যাবরেটরি জালিয়াতির অভিযোগ

নিম্নমানের নির্মাণসামগ্রীতে দ্রুত অচল পানির উৎস

জনগণের ভোগান্তি বাড়ছে, তদন্তে নাম উঠছে প্রভাবশালীদের

দেশের প্রান্তিক অঞ্চলে নিরাপদ ও সুপেয় পানি পৌঁছে দেওয়ার রাষ্ট্রীয় অঙ্গীকার এখন প্রশ্নের মুখে। জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তর (ডিপিএইচই)-এর শীর্ষ পর্যায়ের প্রশাসনিক বিশৃঙ্খলা এবং এক শ্রেণির অসাধু কর্মকর্তা ও শক্তিশালী ঠিকাদার সিন্ডিকেটের সীমাহীন দুর্নীতির অভিযোগে এই খাত গভীর সংকটে পড়েছে। বিশেষ করে নতুন প্রধান প্রকৌশলী নিয়োগের পর থেকেই অধিদপ্তরের অভ্যন্তরে অস্থিরতা ও সমালোচনা তীব্র আকার ধারণ করেছে।

অভিযোগ রয়েছে, জ্যেষ্ঠতার ধারাবাহিকতা উপেক্ষা করে অন্তত ডজনখানেক যোগ্য কর্মকর্তাকে পাশ কাটিয়ে রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক প্রভাব খাটিয়ে তাকে এই শীর্ষ পদে বসানো হয়েছে। দায়িত্ব গ্রহণের আগেই তার বিরুদ্ধে একাধিক দুর্নীতির অভিযোগ থাকা সত্ত্বেও নিয়োগ দেওয়ায় অধিদপ্তরের ভেতরে যেমন ক্ষোভ তৈরি হয়েছে, তেমনি মাঠপর্যায়েও প্রতিষ্ঠানের কার্যক্রম নিয়ে জনমনে অসন্তোষ বাড়ছে।
প্রতি বছর নিরাপদ পানি সরবরাহের নামে হাজার হাজার কোটি টাকার প্রকল্প গ্রহণ করা হলেও বাস্তবে তার সুফল সাধারণ মানুষের কাছে পৌঁছাচ্ছে না। বরং অভিযোগ উঠেছে, পানির গুণগত মান পরীক্ষা এবং গভীর নলকূপ স্থাপন প্রকল্পের বড় অংশের অর্থ একটি প্রভাবশালী সিন্ডিকেটের মাধ্যমে আত্মসাৎ করা হচ্ছে।

অনুসন্ধানে জানা গেছে, দেশের অন্তত ৫৪টি জেলায় স্থাপিত ল্যাবরেটরিগুলোতে পানির মান পরীক্ষার নামে চলছে ব্যাপক অনিয়ম। আর্সেনিক, আয়রন ও ম্যাঙ্গানিজ পরীক্ষার জন্য প্রয়োজনীয় কেমিক্যাল ও রিএজেন্ট ক্রয়ের নামে কোটি কোটি টাকার ভুয়া ভাউচার দেখানো হলেও বাস্তবে অনেক ক্ষেত্রে কোনো পরীক্ষাই করা হয়নি। অভিযোগ রয়েছে, পরীক্ষার পরিবর্তে মনগড়া রিপোর্ট তৈরি করে বিল উত্তোলন করা হয়েছে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এটি শুধু আর্থিক দুর্নীতি নয়—বরং নিরাপদ পানির সনদ দিয়ে অনিরাপদ পানি পান করানোর মাধ্যমে মানুষের স্বাস্থ্যকে ঝুঁকির মধ্যে ফেলে দেওয়া হচ্ছে। অভিযোগ রয়েছে, প্রধান প্রকৌশলীর ছত্রছায়ায় থাকা একটি সিন্ডিকেট গত কয়েক বছরে হাজার হাজার গভীর নলকূপের পানির মান পরীক্ষা ছাড়াই ভুয়া মাস্টার রোল দেখিয়ে কয়েকশ কোটি টাকা আত্মসাৎ করেছে।

অধিদপ্তরের সদর দপ্তরে দীর্ঘদিন ধরে একই পদে বহাল থাকা একটি প্রভাবশালী বলয় এই পুরো দুর্নীতির নেটওয়ার্ক নিয়ন্ত্রণ করছে বলে অভিযোগ রয়েছে। তাদের মাধ্যমেই ঠিকাদারদের সঙ্গে অলিখিত কমিশন চুক্তি সম্পন্ন হয়। ফলে মাঠপর্যায়ের তদারকি কার্যক্রম কার্যত কাগজে-কলমেই সীমাবদ্ধ হয়ে থাকে।

দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে, বিশেষ করে উপকূলীয় এলাকা, হাওরাঞ্চল এবং উত্তরাঞ্চলের খরাপ্রবণ জেলাগুলোতে গিয়ে দেখা গেছে—অনেক পানির উৎস স্থাপনের কয়েক মাসের মধ্যেই অচল হয়ে পড়েছে। স্থানীয়দের অভিযোগ, নিম্নমানের পাইপ ও ফিল্টার ব্যবহার এবং প্ল্যাটফর্ম নির্মাণে বালু-সিমেন্টের ব্যাপক অনিয়মের কারণে এসব প্রকল্প টেকসই হচ্ছে না।

ভুক্তভোগী মানুষ জানিয়েছেন, নিরাপদ পানির জন্য তারা মাসের পর মাস সরকারি দপ্তরের দ্বারস্থ হলেও কার্যকর সমাধান পাচ্ছেন না। বরং যাদের অর্থ বা রাজনৈতিক প্রভাব রয়েছে তারাই সরকারি সুবিধা নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নিচ্ছেন।

এছাড়া বৃষ্টির পানি সংরক্ষণের জন্য নেওয়া ‘রেইন ওয়াটার হার্ভেস্টিং’ প্রকল্পেও অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। কয়েক হাজার ট্যাংক বিতরণের কথা থাকলেও সুবিধাভোগীদের ভুয়া তালিকা তৈরি করে সেগুলো খোলা বাজারে বিক্রি করে দেওয়ার ঘটনা সামনে এসেছে। উত্তরাঞ্চলের খরাপ্রবণ এলাকায় পুকুর পুনঃখনন প্রকল্পেও ডিজিটাল কারচুপির মাধ্যমে মাটির গভীরতা ও আয়তন বাড়িয়ে দেখিয়ে কোটি কোটি টাকা আত্মসাতের অভিযোগ রয়েছে।

এদিকে এই অনিয়ম ও বিতর্ক নিয়ে স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয় প্রধান প্রকৌশলী নিয়োগ এবং বিভিন্ন প্রকল্পে আর্থিক ও কারিগরি অনিয়মের অভিযোগ খতিয়ে দেখতে একাধিক উচ্চপর্যায়ের তদন্ত কমিটি কাজ করছে।

অন্যদিকে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) প্রধান প্রকৌশলীসহ অধিদপ্তরের কয়েকজন শীর্ষ কর্মকর্তার বিরুদ্ধে অস্বাভাবিক সম্পদ অর্জন এবং প্রকল্প থেকে অবৈধ কমিশন নেওয়ার অভিযোগের অনুসন্ধান চলমান বলেও জানা গেছে।

সুশীল সমাজ ও প্রকৌশল বিশেষজ্ঞদের মতে, জ্যেষ্ঠতা লঙ্ঘন করে বিতর্কিত কর্মকর্তাদের শীর্ষ পদে বসানোর কারণেই অধিদপ্তরে জবাবদিহিতা ভেঙে পড়েছে। ফলে নিরাপদ পানির প্রকল্পগুলো এখন মুষ্টিমেয় কয়েকজনের লুটপাটের হাতিয়ারে পরিণত হয়েছে।

এ বিষয়ে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি)  গণমাধ্যমকে বলেছে, এই খাতে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে প্রতিটি প্রকল্পের বিপরীতে জিপিএসভিত্তিক ডিজিটাল ডাটাবেজ এবং স্বাধীন থার্ড পার্টি অডিট ব্যবস্থা চালু করা জরুরি। অন্যথায় নিরাপদ পানির বিশাল বাজেটের অর্থ সিন্ডিকেটের পকেটেই চলে যাবে এবং দেশের মানুষ বিশুদ্ধ পানির মৌলিক অধিকার থেকে বঞ্চিতই থেকে যাবে