ডিএফও’র আস্থাভাজন ২ কর্মকর্তা পেলেন নীতিমালা বহির্ভূত লোভনীয় নিয়োগ

পার্বত্য চট্টগ্রাম দক্ষিণ বন বিভাগের আওতাধীন প্রায় আড়াই লক্ষ হেক্টর আয়তনের রিজার্ভ ফরেস্ট অরক্ষিত হয়ে পড়েছে।

ডিএফও’র আস্থাভাজন ২ কর্মকর্তা পেলেন নীতিমালা বহির্ভূত লোভনীয় নিয়োগ

পার্বত্য চট্টগ্রাম দক্ষিণ বন বিভাগের আওতাধীন প্রায় আড়াই লক্ষ হেক্টর আয়তনের রিজার্ভ ফরেস্ট অরক্ষিত হয়ে পড়েছে। যা দেখার কেউ নেই। খোদ বিভাগীয় বন কর্মকর্তা (ডিএফও)’র পোস্টিং বাণিজ্য, রেঞ্জ/ স্টেশন থেকে মাসিক মাসোহারা আদায়, চোরাই কাঠের সিএফটি প্রতি প্রতি ৬ টাকা হারে চাঁদা আদায়ের ব্যস্ত সময় পার করে যাচ্ছেন। মাত্র ১৪ মাস চাকুরী থাকায় পিআরএলকে সামনে রেখে ডিএফও চালাচ্ছেন দু'হাতে অবৈধ উপার্জন।

সরেজমিন অনুসন্ধানে দেখা যায়, এই বন বিভাগের অতি গুরুত্বপূর্ণ বনবিটগুলো প্রায় ফাঁকা। প্রায় বিটে নেই কোন বিট অফিসার, নেই কোন বন প্রহরী। অথচ লোভনীয় বরকল, শুভলং, আলিখিয়াং রেঞ্জ, শহর রেঞ্জে ৫/৬ জন করে বন প্রহরী নিয়োগ দেয়া হয়েছে। এ কারণেই সংরক্ষিত বনাঞ্চল দেখভাল করার কেউ নেই। কর্ণফুলী রেঞ্জের মুখ বিটে এখনো অবৈধভাবে ১০০ বছরের পুরনো সেগুন গাছ কর্তনকৃত অবস্থায় পড়ে আছে ৭ হাজার ঘণফুট কাঠ। এছাড়াও এই বিটে ব্যাপক হারে রিজার্ভ ফরেস্ট দিবা রাত্রি উজাড় হচ্ছে।

আলিখিয়াং রেঞ্জে প্রবাস নামক এক ব্যক্তির নামে জোত পারমিট ইস্যু করা হয়েছে। ডি-ফরম পর্যন্ত দেয়া হয়েছে ৬ হাজার ঘণফুট কাঠের। অথচ ঐ জোটে ১০-১৫টি গাছ আছে। প্রবাস বিলাইছড়ি উপজেলার ক্যাংরাছড়ি গ্রামের বাসিন্দা। তাকে যে জোত ইস্যু করা হয়েছে তা ২ নং জোট বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে অভিযোগ। সুত্রমতে এই বন বিভাগের আওতায় জোত ভূমিতে গাছ না থাকলেও ২ নং জোট পারমিট ইস্যু করা হচ্ছে। জোত পারমিট অনুবলে রিজার্ভ ফরেস্ট থেকে লাখ লাখ ঘণফুট কাঠ কাটা হচ্ছে। এখান থেকে সংশ্লিষ্ট রেঞ্জ/বিট কর্মকর্তাগণ ডিএফও’র নামে সিএফটি প্রতি ৬ টাকা হারে আদায় করছেন।

ডিএফও সাহেব ঘরে বসেই এভাবে লাখ লাখ টাকা উপার্জন করছেন। বিভাগাধীন ঘাঘরা স্টেশনের দায়িত্বে থাকা ফরেস্টার মুরাদ মাসিক মাসোহারা হিসেবে ডিএফওকে ২ লাখ টাকা হারে নজরানা দিয়ে ১ বছর স্টেশনে থাকার নিয়ম থাকলেও দেড় বছর ধরে দায়িত্ব পালন করে আসছে। শুধু তাই নয় মাসিক নিয়মিত নজরানা দেয়ায় তাকে পুরস্কার স্বরূপ কাপ্তাই রেঞ্জ অফিসার হিসেবে ও অতিরিক্ত দায়িত্ব দিয়ে রেখেছেন। যা দেখার কেউ নেই।

সুত্রমতে অতি সম্প্রতি ডিএফও ছালেহ মোঃ শোয়াইব খান পৃথক অফিসাদেশে ২জন বিতর্কিত ফরেস্টারকে লোভনীয় নিয়োগ দেয়াকে কেন্দ্র করে সমগ্র রাঙ্গামাটি অঞ্চলে কর্মরত কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মধ্যে চরম ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে। এই ২ ভাগ্যবান ফরেস্টার হচ্ছেন বরকল ষ্টেশন কর্মকর্তা মোঃ নজরুল ইসলাম। তাকে গত ২৪ অক্টোবর ৫৬ নং অফিসাদেশে বরকল বন শুল্ক পরীক্ষন ফাডির স্টেশন কর্মকর্তা হিসেবে নিয়োগ দিয়েছেন।

অথচ ফরেস্টার নজরুল ইসলাম গত ২০১৬-১৮ সনে বরকলের সরকারী স্টেশন কর্মকর্তা হিসেবে দায়িত্বপালনকালে তদানীন্তন রেঞ্জ অফিসার নাজমুলকে পাস কাটিয়ে ব্যাপক অনিয়ম ও দুর্নীতির মাধ্যমে কয়েক লক্ষ ঘণফুট কাঠের জোট ইস্যু করার কাজের মূল নায়ক ছিলেন। নজরুলকে ফের দুই দুই বার বিভিন্নভাবে এই স্টেশনের দায়িত্বে দেয়া হয়। আবারও তাকে উক্ত অফিসাদেশে পূর্ণাঙ্গ বরকল স্টেশন কর্মকর্তার দায়িত্বদেন। ফলে একই পদে ৫ বছরের মধ্যে ৩ বার দায়িত্ব দেওয়া হয়। যা বদলী নীতিমালা পরিপন্থী।

ডিএফও সাহেব ঘুরিয়ে ফিরিয়ে কৌশলে তাকে এই লোভনীয় বরকল স্টেশনে রাখতে অপকৌশল অবলম্বন করছেন। নজরুল ইসলাম ফরেস্টার ইতিপূর্বে এই ডিএফও’র সাথে সুন্দরবন চাকরি করেছেন। আবার বরকল স্টেশনে ২০১৮ সালে আটককৃত ২ লাখ ঘণফুট কাঠের সাথে নতুনভাবে আরো ২ লাখ ঘণফুট কাঠ সংগ্রহ করে পুরনো ডি ফর্মের আড়ালে তা হালাল করে ডিএফও কে কয়েক লাখ টাকা অবৈধ উপার্জন করিয়ে দিয়েছেন। তারই পুরস্কার স্বরূপ পুনরায় তাকে নীতিমালা বহির্ভূতভাবে এই স্টেশনের স্টেশন কর্মকর্তা হিসেবে নিয়োগ দিয়েছেন বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে অভিযোগ রয়েছে। অন্য দিকে গত ১৭ অক্টোবর অফিসাদেশ নং ৫৪ এর মাধ্যমে কুষ্টিয়া থেকে সদ্য এই বিভাগে যোগদান কৃত ফরেস্টার মো: আব্দুল হামিদকে রাঙ্গামাটি সদর রেঞ্জে নিয়োগ দেন।

অথচ রাঙ্গামাটি দক্ষিণ বিভাগের প্রচলিত নিয়ম হচ্ছে এই বিভাগে কেউ যোগদান করলে প্রথমে কাপ্তাই বা কর্ণফুলী রেঞ্জে নিয়োগ দেওয়া হয়। ২ বছর পর শহর রেঞ্জ বা স্টেশনে বদলি করা হয়। অনেকেই ৮ বছর দুর্গম এলাকায় চাকুরী করার পর স্টেশনে নিয়োগ পেয়েছেন এই বন বিভাগে।

ফরেস্টার আব্দুল হামিদ ইতিপূর্বে এই ডিএফও’র সাথে কুষ্টিয়া সামাজিক বন বিভাগে কর্মরত থাকাকালীন মেয়েলী সংক্রান্ত একটি অনৈতিক কর্মকান্ড মামলায় বাদীনির সাথে মীমাংসা করে ডিএফও সাহেবের ইজ্জত বাঁচিয়েছিলেন বলে তাকে কুষ্টিয়া থেকে পার্বত্য চট্টগ্রাম দক্ষিণ বন বিভাগে বদলী করিয়ে এনে এই লোভনীয় নিয়োগ দেন বলে কুষ্টিয়া সামাজিক বন বিভাগে কর্মরত একজন ফরেস্টার জানান। ফরেস্টার আ: হামিদকে সদর রেঞ্জে নিয়োগ দেয়ায় এই রেঞ্জে বর্তমানে ফরেস্টার সংখ্যা ৬। অথচ কাপ্তাই রেঞ্জে ৫টি বিট চলে ৩ জন ফরেস্টার দিয়ে।

গুরুত্বপূর্ণ কাপ্তাই সদর বিট ও কামালছড়া বিট দেখেন কাপ্তাই রেঞ্জের অতিরিক্ত দায়িত্বে থাকা ফরেস্টার মুরাদ। কর্ণফুলী রেঞ্জের আওতাধীন ব্রীকফিল্ড ও কলমিছড়ি বিট ফাঁকা। চলছে একজন ফরেস্ট গার্ড দিয়ে। কর্ণফুলী সদর বিট অফিসার অতিরিক্ত দায়িত্ব পালন করেন ফ্রিংখং বিটের। আলিখিয়াং রেঞ্জের ৫ বিটের দায়িত্বে আছেন একজন ফরেস্টার। কাপ্তাই মুখ বিটে একজন পঙ্গু ফরেস্টারকে দায়িত্ব দেয়া আছে।

তিনি অসুস্থ বিধায় ঠিকমত দেখভাল করতে না পারায় এই বিটে ব্যাপক হারে মূল্যবান সেগুন গাছ কাটা ও পাচার হচ্ছে। এভাবেই চলছে পার্বত্য চট্টগ্রাম দক্ষিণ বন বিভাগের আড়াই লাখ একর সংরক্ষিত বনাঞ্চলের সংরক্ষন কর্মকান্ড। এই বনাঞ্চলের অবশিষ্ট সংরক্ষিত বনাঞ্চল রক্ষার্থে অবিলম্বে সংশ্লিষ্ট উর্দ্বতন কর্তৃপক্ষের বিশেষ হস্তক্ষেপ প্রয়োজন। নতুবা যেভাবে বৃক্ষ নিধন চলছে তাতে করে অচিরেই এই বনবিভাগের রিজার্ভ ফরেস্ট বলে কিছু থাকবে না বলে মনে করেন বন বিশেষজ্ঞগণ।