এআইইটি প্রকল্প বদলে দিয়েছে সারাদেশের প্রণিসম্পদ সেক্টর

এআইইটি প্রকল্প বদলে দিয়েছে সারাদেশের প্রণিসম্পদ সেক্টর।

এআইইটি প্রকল্প বদলে দিয়েছে সারাদেশের প্রণিসম্পদ সেক্টর

এআইইটি প্রকল্প বদলে দিয়েছে সারাদেশের প্রণিসম্পদ সেক্টর। যার কারনে রাজধানীসহ সারাদেশে পশুতে সয়লাভ, যার কারনে গত বেশ কয়েক বছর ধরেই বিদেশ থেকে আর গরু আমদানী করা লাগছেনা। আর বাংলাদেশ এখন মাংশে সয়লাভ আর  দুধেও হতে চলেছে। কথা গুলে বলছিলেন ৫৩ বছর বয়সী স্কুল শিক্ষক আজমল সরকার। রাজধানীর কলাবাগানে মেয়ে জামাইয়ের বাড়ি বেড়াতে এসে  যাবার পথে গাবতলি বাসষ্ট্যান্ডে চা খেতে খেতে দাড়িয়ে এক সহযাত্রীরসাথে গল্পে গল্পে কথাগুলো বলছিলেন তিনি।

পাশে সংবাদকর্মী পরিচয় পেয়ে এগিয়ে আসলেন আজমল সরকার নিজের পরিচয় দিয়ে এআইটি প্রকল্পের প্রশংসায় পঞ্চমুখ তিনি। পরে প্রতিবেদককে তিনি জানান, আমার ভাতিজা ইউনিয়ন পর্যায়ে একজন স্বেচ্ছাসেবী এই প্রকল্পের আন্ডারে সে এইআই কার্যক্রম বাস্তবায়ন করেন। ইউনিয়নের বিভিন্ন জায়গাযর গরু ডাকে আসলে তাকে ফোন করে আর সে ক্যান নিয়ে ছুটে যায় সেই খামারির বাড়িতে। এআই কার্যক্রম সম্পাদন করার পর পারিশ্রমিক নিয়ে ফিরে আসে। অথচ আমার এই ভাতিজা ৩'বছর আগেও কিছু করত না। এইসএসসি পর্যন্ত পড়াশোনার পর আর পড়াশোনা এগোতে পারিনি। এআই্ইটি প্রকল্পের অধীনে স্বেচ্ছাসেবী হিসেবে প্রশিক্ষণ নিয়ে কাজ শুরু করে । এখন আমার ভাতিজা বেশ ভালোই ইনকাম করে সংসার চালাচ্ছে । আর তার এই কার্যক্রমে এলাকাবাসি বেশ সন্তুষ্ট । স্কুল শিক্ষক আজমল সরকারের এমন কতগুলো সাংবাদিক হিসেবে মনদিয়ে শুনছিলাম পরক্ষনে কিছুদূর এগিয়ে গাবতলী পশুরহাটে সেখানেও ছিল পশুতে সয়লাব। বাজারে আসছে নতুন নতুন গরু।

সূত্রে জানা যায়, স্বাধীনতার পর ১৯৭৩ সালে ১২৭টি হলস্টাইন ফ্রিজিয়ান ষাঁড় আনার মাধ্যমে দেশে কৃত্রিম প্রজনন প্রযুক্তি প্রবর্তনের সূচনা হয়। ২০০২-০৩ সালে মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তর কর্তৃক বাস্তবায়িত ‘‘কৃত্রিম প্রজনন কার্যক্রম সম্প্রসারণ এবং ভ্রুন স্থানান্তর প্রযুক্তি বাস্তবায়ন” শীর্ষক প্রকল্পটি ১ম ফেজ অনুমোদিত হয়। ১ম ফেজ এর কর্মকান্ড সম্পাদনের পর পরবর্তীতে ২০০৯ সালে উক্ত প্রকল্পের ২য় ফেস অনুমোদিত হয়। ৩য় পর্যায়ে এসে বর্তমানে মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের অধিভুক্ত প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের অন্যতম সফল প্রকল্প হয়ে দাঁড়িয়েছে কৃত্রিম প্রজনন কার্যক্রম সম্প্রসারণ ও ভ্রূণ স্থানান্তর প্রযুক্তি বাস্তবায়ন প্রকল্প। এ প্রকল্প দেশের প্রাণিসম্পদ খাতকে অনন্য উচ্চতায় নিয়ে গেছে। দেশে এখন গরুসহ পশু উৎপাদন বাড়ার পাশাপাশি রপ্তানিও করা হচ্ছে।

এক দশক আগেও কোরবানিতে ভরসার অন্যতম জায়গা ছিল ভারত। কোটি পশু জবাইয়ে ভারত-মিয়ানমার থেকে আনা হতো গরু। কিন্তু ২০১৪ সাল থেকে ভারতীয় গরু আসা বন্ধ হয়ে যায়৷ প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের কার্যকর পদক্ষেপে গরু আমদানি বন্ধের সিদ্ধান্তই হয়েছে বাংলাদেশের জন্য আশীর্বাদ। বাংলাদেশ গবাদি পশুতে স্বয়ংসম্পূর্ণ হয়ে গরুর মাংস রপ্তানিও শুরু করেছে৷ দেশের বেশ কয়েকটি প্রতিষ্ঠান হিমায়িত গরুর মাংস দেশের বাইরে রপ্তানি করছে। সারাবছরই গরুসহ গবাদিপশুর চাহিদা থাকলেও গবাদি পশু বিক্রির সবচেয়ে লাভজনক বাজার বিবেচনা করা হয় ঈদুল আজহার মৌসুমকে। ২০২১ সালে ঈদুল আজহায় ৯০ লক্ষাধিক পশু কোরবানি হয়।

২০২২ সালে তা ৯৯ লক্ষে এবং ২০২৩ সালে তা ১ কোটি ৪১ হাজারকেও ছাড়িয়ে যায়। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য জায়গায় ছিলো গরু কোরবানির সংখ্যা। প্রতিবছর গড়ে প্রায় ৫০ লক্ষাধিক গরু কোরবানি হয়। গত কয়েক বছর ধরে ভারত থেকে কোনো গরু আমদানি করা না হলেও ঈদুল আজহাসহ সারা বছরের প্রয়োজন মিটিয়ে এসেছে দেশীয় গরু। প্রতিবছরই প্রয়োজনের অধিক সরবরাহ ছিলো, নিয়মিত হচ্ছে রপ্তানিও। গরু ছাগলের সংখ্যা আগের চেয়ে বেড়েছে,দেশ এখন গরু-ছাগলে প্রায় স্বয়ংসম্পূর্ণ৷ আর এই জায়গায় বড় ভূমিকা রেখেছে প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তর। কৃত্রিম প্রজনন কার্যক্রম সম্প্রসারণ ও ভ্রূণ স্থানান্তর প্রযুক্তি বাস্তবায়ন প্রকল্পের মাধ্যমে পশুর উৎপাদন ও উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি পাচ্ছে।

প্রকল্পের মাধ্যমে দেশীয় গরুর বিদেশ থেকে আমদানিকৃত শাহিওয়াল ও ফ্রিজিয়ান সিমেন ব্যবহার করে দেশিগরুর কৌলিক মান উন্নয়নের মাধ্যমে দুধ ও দুগ্ধজাত দ্রব্যের উৎপাদন বৃদ্ধি করা হচ্ছে। এসব কাজে নিয়োজিত থেকে দেশের জনসাধারণ আত্নকর্মসংস্থানের সুযোগ পাচ্ছে ও দারিদ্র্য দূরীকরণে সহযোগিতা পাচ্ছে। নারীরা প্রকল্পের অধীনে কাজ করে স্বাবলম্বী হওয়ার পাশাপাশি বাড়ছে নারীর ক্ষমতায়ন।

সূত্রে আরো জানাযায়, প্রকল্পের মাধ্যমে সারা দেশে আধুনিক কৃত্রিম প্রজনন কার্যক্রম সম্প্রসারণ ও সিমেন উৎপাদন বৃদ্ধি করা হয়েছে। খামারিদের কষ্ট লাঘবে ডিজিটালাইজেশন আনা হয়েছে প্রকল্পে। ফোন করলেই পাওয়া যায় কৃত্তিম প্রজনন সেবা। কৃত্তিম প্রজননের ফলে গরুর উৎপাদন সহজতর ও দ্রুত বৃদ্ধি পেয়েছে। ফলে দেশের জনগণের দুধ ও মাংসের চাহিদা পূরণের পাশাপাশি বিদেশে রপ্তানি করেও অর্জন করা যাচ্ছে বৈদেশিক মূল্য।

প্রকল্প সূত্রে জানাযায়,সিমেন উৎপন্নের জন্য রাজশাহী, সাভার, চট্টগ্রাম ও ফরিদপুরে ৪ টি ল্যাব তৈরি করা হয়েছে । ডোরস্টেপস সেবার জন্য দক্ষ প্রজনন কর্মী তৈরি করতে ৬ মাসব্যাপী প্রশিক্ষণ কর্মসূচির মাধ্যমে হাজার হাজার প্রজনন কর্মী তৈরি করা হয়েছে।

এ বিষয়ে কৃত্রিম প্রজনন কার্যক্রম সম্প্রসারণ এবং ভ্রুন স্থানান্তর প্রযুক্তি বাস্তবায়ন প্রকল্পের প্রকল্প পরিচালক ডা. মোঃ জসিম উদ্দিন বলেন, "চার হাজার ইউনিয়নে কৃত্রিম প্রজনন কর্মী তৈরি করা হয়েছে। সিমেন তৈরির জন্য দেশে চারটি ল্যাব তৈরি করা হয়েছে। এসব ল্যাব থেকে বছরে ৪৭ লক্ষ সিমেন উৎপন্ন করা হচ্ছে। সারা দেশের গরুকে প্রজনন করাতে সরকারি সংস্থা প্রয়োজনীয় ৬০% সিমেন উৎপন্ন করছে। সিমেন ও প্রজনন সামগ্রী কর্মীর হাতে ধারাবাহিক ভাবে পৌঁছেদিতে ২১জেলা কৃত্রিম প্রজনন কেন্দ্রে ২১ টি গাড়ি সরবরাহ করা হয়েছে। ফলে ১০ বছরে মাংস দুধের স্বয়ংসম্পূর্ণ হতে পেরেছে দেশ। বিগত পাঁচ বছরে আমদানি ছাড়াই প্রত্যেকটি কোরবানির হাটে ছিল আমাদের দেশীয় গরুর প্রাচুর্য । যা আমাদের প্রকল্পের অন্যতম বড় সফলতা বলে মনে করি। পুষ্টিসমৃদ্ধ উন্নত জাতিগঠন, খামার স্থাপন এর মাধ্যমে আত্মকর্মসংস্থান এবং বৈদেশিক মূদ্রার্জনের মাধ্যমে উন্নতদেশ বিনির্মানে এই প্রকল্প তার সবটুকু দিয়ে কাজ করেছে।

প্রকল্প সূত্রে আরো জানাযায়, কৃত্রিম প্রজনন প্রকল্প  ২ টি প্রধান উদ্দেশ্যকে সামনে নিয়ে প্রকল্প হাতে নেওয়া হয়। সেটি হলো প্রথমত ইউনিয়ন পর্যায়ে প্রজনন কর্মী তৈরি করে এই সেবা সহজ করা ও কৌলিক ( জেনেটিক)  মান উন্নয়ন করে দেশিয় গরুর উৎপাদন ও উৎপাদনশীলতা (সংখ্যা ও পরিমাণ)  বৃদ্ধি করা।

এজন্য প্রকল্পে ইউনিয়ন পর্যায়ে ৪ হাজার প্রশিক্ষিত কর্মী তৈরি করা হয়েছে, যারা কৃষকের বাড়িতে যেয়ে প্রজনন সেবা দেয়। সিমেন তৈরির জন্য ৪ টি ল্যাব তৈরি করা হয়েছে, যেখানে প্রজনন এর জন্য সিমেন তৈরি হয়। সিমেন সংগ্রহের জন্য ৩৪০ টি বুল ক্রয় করে ল্যাবে দেয়া হয়েছে।দেশি গরু যাতে বেশি দুধ ও মাংস দেয় সেই জন্য আমেরিকা ও কানাডা থেকে বেশি দুধ ও মাংস দেয়া ফ্রিজিয়ান জাতের ষাড়, ষাড় তৈরির জন্য বকনা ও সিমেন আনা হয়েছে। প্রজনন কাজের প্রয়োজনীয় সামগ্রী যেমন নাইট্রোজেন,  হ্যান্ডগ্লভস সহ অন্যান্য প্রজনন সামগ্রী প্রকল্প চলাকালীন একটানা সরবরাহ করা হয়েছে। এই প্রজনন সামগ্রী কর্মীর হাতে পৌছে দিতে দেশের ২১ টি জেলা কৃত্রিম প্রজনন কেন্দ্রের জন্য ২১ টি গাড়ি এবং তার ফুয়েল, ড্রাইভার দেয়া হয়েছে। ফলে কখনো কোনভাবেই প্রজনন কাজে বিগ্ন ঘটেনি।

এর ফলে প্রজনন সেবা সহজ ও উন্নত হওয়ায় দেশে গবাদিপশুর সংখ্যা বেড়েছে। মাংসে দেশ স্বনির্ভর হয়েছে। বিদেশে মাংস রপ্তানি হচ্ছে । দুধে স্বয়ংসম্পূর্ণতার পথে। ২০ লিটার দুধের গাভি দেশে আনাচে কানাচে। এবং কোরবানির ব্যাপক গবাদিপশুর চাহিদা দেশি গরুতে পূর্ণ হয়েছে।

পরিশেষে বলা যায় একটি মাত্র প্রকল্পে বিদেশ নির্ভরতা শূন্যের কোটায়, গবাদিপশুর উৎপাদন এই প্রকল্পের অবদান, ৪৭ লক্ষ সিমেন তৈরি যা মোট চাহিদার ৬০%, সরকারি পর্যায়ে ৯৮ ভাগ প্রজনন এই প্রকল্পের কর্মীদের হাতে হয়। স্বেচ্ছাসেবীর মাধ্যমে এই প্রকল্প এই বৃহৎ অর্জন সাধিত করেছে। এক কথায় দেশের প্রতিটি বাছুর এই প্রকল্পের কর্মীদের হাত ভূমিষ্ঠ হয়।