লামা রূপসীপাড়া ক্যাম্পের সেনাবাহিনীর অভিযানে কাঠবোঝাই ২ ট্রাক জব্দ ॥ কোটি টাকার বনভূমি ধ্বংসের নেপথ্যে শক্তিশালী সিন্ডিকেট
জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকি মোকাবিলায় গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের মাননীয় প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের দেশব্যাপী ৫ বছরে ২৫ কোটি বৃক্ষরোপণ কর্মসূচি যখন জাতীয় অগ্রাধিকার হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে, ঠিক তখনই খোদ বন বিভাগেই জেঁকে বসেছে একদল ‘বনভক্ষক’।
জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকি মোকাবিলায় গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের মাননীয় প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের দেশব্যাপী ৫ বছরে ২৫ কোটি বৃক্ষরোপণ কর্মসূচি যখন জাতীয় অগ্রাধিকার হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে, ঠিক তখনই খোদ বন বিভাগেই জেঁকে বসেছে একদল ‘বনভক্ষক’। সরকারের এই মহতী উদ্যোগকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে বান্দরবানের লামা বন বিভাগে সদর রেঞ্জ কর্মকর্তা (ডেপুটি রেঞ্জার) কে এম কবির উদ্দিনের প্রত্যক্ষ সহযোগিতা ও যোগসাজশে অবলীলায় ধ্বংস হচ্ছে পার্বত্য অঞ্চলের বনাঞ্চল। সর্বশেষ গত ২২ জুন ২০২৬ তারিখে লামা উপজেলার রূপসীপাড়া ক্যাম্প অবৈধভাবে পাচারের সময় কাঠবোঝাই দুইটি গাড়ি আটক করেছে সেনাবাহিনী, যা এই রেঞ্জ কর্মকর্তার দুর্নীতি ও কাঠ পাচার সিন্ডিকেটের থলের বিড়াল রাষ্ট্র করে দিয়েছে। স্থানীয় ও গোপন সূত্রে জানা গেছে, রূপসীপাড়া ইউনিয়নের দুইটি বাগান গাছ কাটার আড়ালে দীর্ঘদিন ধরে অবৈধভাবে সংরক্ষিত বনের কাঠ পাচারের চেষ্টা চলছিল। এই চক্রের মূল হোতা শফিক এবং তার সহযোগী (জামাই হিসেবে পরিচিত) জহির। অভিযোগ উঠেছে, লামা সদর রেঞ্জ কর্মকর্তা কে এম কবির উদ্দিনের প্রত্যক্ষ সহযোগিতা ও আশীর্বাদে জহির-শফিক সিন্ডিকেট তৈরি করে রাজকীয় কায়দায় এই অঞ্চলে অবৈধ কাঠ পাচার বাণিজ্যের সাম্রাজ্য গড়ে তোলা হয়েছে। ঘটনার দিন একইভাবে বনের মূল্যবান কাঠ পাচারের সময় রূপসীপাড়া আর্মি ক্যাম্পের সদস্যরা সন্দেহভাজন হিসেবে গাড়ি দুটিকে আটক করে এবং পরবর্তীতে জব্দকৃত গাড়ি ও কাঠ লামা বন বিভাগের নিকট হস্তান্তর করে। অনুসন্ধানে জানা যায়, এই জহির প্রকাশ ‘জামাই জহির’ অত্র অঞ্চলের একজন স্বীকৃত গাছ ও কাঠ চোর তথা কুখ্যাত বনদস্যু হিসেবে পরিচিত। ইতিপূর্বে গত ০২ জুন ২০২৫ তারিখে অবৈধভাবে সরকারি কাঠ পরিবহনকালে এই জহির এবং ট্রাক ড্রাইভারের নামে লামা কোর্টে একটি সুনির্দিষ্ট বন মামলা দাখিল করা হয়েছিল। একজন চিহ্নিত এবং আদালতের মামলার আসামি হওয়া সত্ত্বেও এই বনদস্যু কীভাবে বারবার বন বিভাগ থেকে অবৈধ ‘জোত পারমিট’ বাগিয়ে নেয় এবং কেনই বা তার সাথে সদর রেঞ্জ কর্মকর্তা কে এম কবিরের এতো গভীর সক্ষতা ও ওঠাবসা—তা নিয়ে খোদ বন বিভাগের সাধারণ কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের মধ্যেই এখন নানা গুঞ্জন ও ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে।
সেনাবাহিনীর সতর্ক নজরদারিতে কাঠ ও গাড়ি জব্দ করা হলেও এখন পুরো ঘটনাটি ধামাচাপা দেওয়া এবং মূল অপরাধী জামাই জহির ও শফিককে আড়াল করার জন্য নেপথ্যে কলকাঠি নাড়ছেন স্বয়ং রেঞ্জ কর্মকর্তা কবির উদ্দিন। মোটা অংকের উৎকোচের (ঘুষ) বিনিময়ে এই অপরাধী চক্রকে বাঁচাতে তিনি এখন ‘ত্রাণকর্তার’ ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়েছেন এবং অপরাধীদের আইনের হাত থেকে রক্ষা করতে ঘটনাটি হালকা করে ‘নামমাত্র’ একটি দুর্বল বন মামলা দায়েরের প্রক্রিয়া চালাচ্ছেন। অনুসন্ধানে আরও চাঞ্চল্যকর তথ্য বেড়িয়ে এসেছে যে, এই অবৈধ গাড়ি দুটির চলাচল পাশ ইস্যু করার জন্য কবির উদ্দিন ১০ লক্ষ টাকা উৎকোচ নিয়েছিলেন। এরপর কৌশলে অবৈধভাবে সংরক্ষিত বনাঞ্চল ও অন্যান্য এলাকা হতে আহরিত কাঠ ট্রাকে লোড এবং পরিমাপ করার জন্য বন প্রহরী মো: আমিরুল ইসলাম এবং মো: জুলহাস উদ্দিনকে পাঠানো হয়, যারা ট্রাক দুইটি লোড ও পরিমাপের বিনিময়ে ৮০ হাজার টাকা গ্রহণ করেন। গাড়ি দুইটি আর্মি ক্যাম্প পার হওয়ার সময় আটক হলে বন প্রহরী দুইজন কৌশলে কেটে পড়েন এবং আর্মি ক্যাম্প আটককৃত ট্রাক দুইটি জব্দ করে বন বিভাগের নিকট হস্তান্তর করে।
পরবর্তীতে কবির উদ্দিন ট্রাক দুইটি আনলোড না করেই অলৌকিক ক্ষমতা বলে ট্রাক দুইটির কাঠ জব্দ দেখান এবং একটি তথাকথিত নিখুঁত জব্দ তালিকা প্রস্তুত করে ইউডিওআর মামলা নং ৪৮ ও ৪৯/লামা অব ২০২৫-২০২৬ আদালতে প্রেরণ করেন। গাছ চোরকে অবৈধ সুযোগ দিয়ে ঘটনার ৫ দিন অতিবাহিত হলেও এখনো কাঠ ট্রাক থেকে আনলোড করা হয় নাই, যা প্রচলিত বন আইনের চরম লঙ্ঘন ও ক্ষমতার অপব্যবহারের শামিল। শুধু তাই নয়, জব্দকৃত কাঠে একাধিকবার হ্যামার (সিল) মেরে প্রকৃত তথ্য ও প্রমাণ লোপাটের অপচেষ্টা চালিয়েছেন সদর রেঞ্জার কবির হোসেন। স্থানীয় সূত্রের দাবি, জব্দকৃত কাঠের প্রকৃত পরিচয় ও উৎস গোপন করার উদ্দেশ্যে কয়েকটি কাঠে একাধিকবার হ্যামার মারা হয়েছে, যার মধ্যে একটি গাছে সর্বোচ্চ নয়বার পর্যন্ত হ্যামার মারার প্রমাণ মিলেছে, যা কাঠের প্রকৃত উৎস শনাক্তে উদ্দেশ্যপ্রণোদিত জটিলতা তৈরি করবে।
কে এম কবির উদ্দিনের এই দুর্নীতির ইতিহাস বেশ পুরোনো; তিনি যখন বান্দরবান বন বিভাগে কর্মরত ছিলেন, তখনও ক্ষমতার অপব্যবহার করে একইভাবে ভুয়া পারমিট তৈরি এবং অবৈধ টিপি (চলাচল পাশ) ইস্যু করে কোটি কোটি টাকার সরকারি কাঠ পাচার করে বিপুল অবৈধ সম্পদের পাহাড় গড়েছেন। এই ঘটনার রেশ ধরে গত ২৫ জুন ২০২৬ তারিখে চট্টগ্রাম অঞ্চলের বন সংরক্ষক মিহির কুমার দো লামা বন বিভাগ পরিদর্শনে যান এবং ডিএফও, এসিএফ ও রেঞ্জারদের সাথে একটি যৌথ আলোচনা সভা করেন। উক্ত সভায় বন সংরক্ষক কে এম কবির উদ্দিনের কাছে ট্রাক দুইটি সম্পর্কে জানতে চান এবং এক পর্যায়ে জিজ্ঞাসা করেন যে জব্দকৃত ট্রাক দুইটির কাঠের চলাচল পাস ইস্যু করা হয়েছিলো কিনা?? কবির উত্তরে স্বীকার করেন যে চলাচল পাস ইস্যু করা হয়েছিলো। আসামী থাকা সত্ত্বেও কেন পিওআর মামলা দায়ের করা হলো না—তা জানতে চাইলে রেঞ্জ কর্মকর্তা কবির কোনো সদুত্তর না দিয়ে ধৃষ্টতা দেখিয়ে সভা ত্যাগ করে চলে যান। এমন আচরণেও বন সংরক্ষক তার বিরুদ্ধে তাৎক্ষণিক কোনো আইনী পদক্ষেপ নেন নি বা নিতে বলেন নি। সচেতন মহলের দাবি, অবৈধ কাঠের চলাচল পাস ইস্যু করা প্রকারান্তরে বন ধ্বংসের একটি সুগভীর নীল নকশা এবং চট্টগ্রাম অঞ্চলের বন সংরক্ষক (সিএফ) কবির উদ্দিনের পূর্ব পরিচিত ও নিকটবর্তী হওয়ায় এবং অনৈতিক লেনদেন থাকায় তিনি মূলত কবিরের আশীর্বাদ ও সাপোর্ট দিতেই লামা বন বিভাগে এসেছিলেন বলেও সংশ্লিষ্ট মহলে আলোচনা হতে দেখা গেছে।
এই গুরুতর অভিযোগের বিষয়ে বক্তব্য জানতে লামা সদর রেঞ্জ কর্মকর্তা কবির হোসেনের সঙ্গে একাধিকবার মুঠোফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলে তিনি ব্যস্ততা দেখিয়ে লাইন কেটে দেন।
অন্যদিকে লামা বন বিভাগের ডিএফও মোস্তাফিজুর রহমানকেও একাধিকবার কল করা হলেও তিনি মোবাইল রিসিভ করেন নাই, তবে এর আগে তিনি জানিয়েছিলেন যে অভিযোগের তথ্য তদন্তে সত্য প্রমাণিত হলে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।