জনস্বাস্থ্যের মিষ্টার এইট পারসেন্ট নামে পরিচিত, ‘টাকার কুমির’ প্রকল্প পরিচালক হাচানুজ্জামান!

ছাত্র-জনতার আন্দোলনের মধ্যে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর বিভিন্ন সরকারি বেসরকারী দপ্তরে দীর্ঘদিনের দুর্নীতি, অনিয়ম ও ক্ষমতার অপব্যবহার নিমূলে চলছে সংস্কারের কাজ, যেন সাধারণ জনগণ তাদের প্রাপ্য অধিকার থেকে বঞ্চিত না হয়।

জনস্বাস্থ্যের মিষ্টার এইট পারসেন্ট নামে পরিচিত, ‘টাকার কুমির’ প্রকল্প পরিচালক হাচানুজ্জামান!

ছাত্র-জনতার আন্দোলনের মধ্যে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর বিভিন্ন সরকারি বেসরকারী দপ্তরে দীর্ঘদিনের দুর্নীতি, অনিয়ম ও ক্ষমতার অপব্যবহার নিমূলে চলছে সংস্কারের কাজ, যেন সাধারণ জনগণ তাদের প্রাপ্য অধিকার থেকে বঞ্চিত না হয়। এমন পরিস্থিতিতেও সব নিয়ম নীতিকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের কিছু কর্মকর্তার অনিয়ম,দুর্নীতি থেমে নেই।

অভিযোগ আছে, বিশেষ করে আওয়ামী সরকারের সময়ে দুর্নীতি করে কোটি টাকা হাতিয়ে নেওয়া প্রকৌশলীরা রয়েছেন বহাল তবিয়তে। তারা এখনো দূর্নীতির করে লুটপাট চালিয়ে যাচ্ছেন বিভিন্ন প্রকল্পের মাধ্যমে। পানির গুণগতমান পরীক্ষা ব্যবস্থা শক্তিশালী করণ প্রকল্প জুলাই'২০১৯- জুন'২০২৪ ' এর প্রকল্প পরিচালক মুন্সী মো. হাচানুজ্জামানের বিরুদ্ধেও উঠেছে কোটি টাকার দুর্নীতিতে জড়িয়ে থাকার অভিযোগ। তিনি টেন্ডার বাণিজ্য করে হাতিয়ে নিয়েছেন কোটি টাকা। নিজেকে জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরে মিস্টার এইট পার্সেন্ট হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছেন তিনি আর তাই তাকে জনস্বাস্থ্যের ‘টাকার কুমির’ বলেও ডাকেন অনেকেই বলে রয়েছে জোর আলোচনা-সমালোচনা।

জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তর-এর পানির গুণমান পরীক্ষা ব্যবস্থাপনা শক্তিশালীকরণ প্রকল্পের আওতায় (অর্থবছর ২০২১-২০২২) জোনাল/জেলা ল্যাবরেটরিতে বিভিন্ন ধরনের ল্যাবরেটরি সরঞ্জামাদি সরবরাহ এবং স্থাপনের জন্য প্যাকেজ নং: গুডস-০৫.বি ৬৪৭২৭৮ নং দরপত্র আহবান করেন হাচানুজ্জামান। দরপত্রে অংশগ্রহণকারী সকল ঠিকাদারের দর মূল্যায়ন পর্যালোচনা করে দেখা যায় ৭ নম্বর দরদাতা টেকনোল্যাব ইন্সট্রুমেন্টকে কাজটি দিয়েছেন প্রকল্প পরিচালক হাচানুজ্জামান। নিম্ন দরদাতা ৬ জনকেই তিনি নন-রেস্পন্সিভ করেছেন। নন-রেস্পন্সিভ করে তিনি পুনরায় দরপত্র আহবান না করে টেকনোল্যাব ইন্সট্রুমেন্ট এর কাছ থেকে মোটা টাকা কমিশন নিয়ে কাজটি দিয়েছেন বলে অভিযোগ উঠেছে। এই দুর্নীতির জন্য দুদকে হাচানুজ্জামানের নামে একটি অভিযোগ দায়ের করেছেন ভুক্তভোগী ঠিকাদাররা। তারা দৈনিক আজকের সংবাদকে নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, হাচানুজ্জামান এই দরপত্রের কাজ দেওয়ার জন্য মোট প্রাক্কলিত মূল্যের ৮ শতাংশ কমিশন দাবি করেছিলেন। দরপত্রে দর মূল্যায়ন তিনি মূল্যায়িত করবেন না। যে কমিশন দিবে তাকেই তিনি কাজ দিবেন। দরপত্রের প্রাক্কলিত মূল্য প্রায় ত্রিশ কোটি টাকা। আর এই টাকার কমিশন আসে দুই কোটি চল্লিশ লাখ টাকা। টেকনোল্যাব ইন্সট্রুমেন্ট এই বিপুল অংক কমিশন দিয়ে তার কাছ থেকে কাজটি নিয়েছে বলে অভিযোগ আছে।

পানির গুণমান পরীক্ষা ব্যবস্থাপনা শক্তিশালীকরণ প্রকল্পের আওতায়-এর জোনাল/জেলা ল্যাবরেটরিতে ২৬ (ছাব্বিশ)টি আটমিক অ্যাবসোর্পশন স্পেকট্রোফোটোমিটার (এএএস) সরবরাহ ও স্থাপন, অর্থবছর ২০২১-২২, প্যাকেজ নং: গুডস-০৫.এ এবং প্যাকেজ নং: গুডস-০৫.বি, ৬৩৫৪২৩ ও ৬৩৬০২৯ নং দরপত্রগুলো থেকেও তিনি ৮ শতাংশ করে কমিশন নিয়েছেন বলে জানা যায়। এই কাজগুলো যৌথ ঠিকাদারকে দিয়েছেন কমিশনের বিনিময়ে। তিনি মেডি গ্রাফিক ট্রেডিং লিমিটেড-এর কাজ থেকে ৬৩৫৪২৩ নং দরপত্রের কাজ প্রায় দেড় কোটি টাকা ঘুষ দিয়ে নিয়েছে। মেডি গ্রাফিক ট্রেডিং লিমিটেড এর সাথে যৌথভাবে যেসকল ঠিকাদার কাজটি নিয়েছে তাদেরকেও তাদের কাজের মোট টাকার উপর ৮ শতাংশ করে কমিশন হাচানুজ্জামানকে দিতে হয়েছে। একইভাবে ৬৩৬০২৯ নং দরপত্রটির কাজটিও এই ৮ শতাংশ কমিশনের বিনিময়ে তিনি দিয়েছেন বলে জানা যায়। এই দুইটি দরপত্র থেকেই তিনি কমিশন নিয়েছেন প্রায় তিন কোটি দুই লাখ বাহাত্তুর হাজার টাকা।

এছাড়া পানি গুণমান পরীক্ষার ব্যবস্থাপনা শক্তিশালীকরণ প্রকল্প এর আওতায় জোনাল/জেলা পরীক্ষাগারে বিভিন্ন প্রকারের ল্যাবরেটরি যন্ত্রপাতি সরবরাহ এবং স্থাপন (অর্থবছর ২০২৩-২০২৪), প্যাকেজ নম্বর: গুডস-০৫.বি, দরপত্র নং ১০২৬৫৭৩, বিভিন্ন জেলার বর্তমান জোনাল ল্যাবরেটরির জন্য বিভিন্ন ধরনের আসবাবপত্র সরবরাহ, ফিটিং এবং স্থাপন (অর্থবছর ২০২৩-২৪) প্যাকেজ নম্বর: গুডস-১২, দরপত্র নং ৯৩২২৬২, ৫২টি (পঞ্চান্নটি) বিভিন্ন জোনাল/জেলা ল্যাবরেটরির জন্য কাচের পাত্র ও রাসায়নিক (অর্থবছর: ২০২৩-২৪), দরপত্র নং ৯১৩০৪৭, ১২টি (বারোটি) ফটোকপিয়ার সরবরাহ এবং স্থাপন (অর্থবছর ২০২৩-২০২৪), দরপত্র নং ৯১২৯৮৬, ৫৪টি (পঁচাত্তরটি) কম্পিউটার, প্রিন্টার, ইউপিএস, স্ক্যানার এবং মাল্টিপ্লাগ সরবরাহ এবং স্থাপন- নতুন নির্মিত ল্যাবরেটরি অফিস বিল্ডিং, (অর্থবছর ২০২৩-২০২৪), দরপত্র নং ৯১৩০০৪, ৫২টি (পঞ্চাশটি) কম্পিউটার, প্রিন্টার, ইউপিএস, স্ক্যানার এবং মাল্টিপ্লাগ সরবরাহ এবং স্থাপন- ৫২টি নতুন নির্মিত ল্যাবরেটরি অফিস বিল্ডিং, (অর্থবছর ২০২০-২০২১) প্রকল্পের আওতায়, প্রকৌশলী কর্তৃক নির্দেশনা ও অনুমোদনের ভিত্তিতে, সরবরাহ, পরিবহন, আইটি, ভ্যাট ইত্যাদি দরপত্র নং ৫৭৭৯৫০, ৫২টি (পঞ্চাশটি) ফটোকপিয়ার সরবরাহ এবং স্থাপন- নতুন নির্মিত ৫২টি (জেলা তালিকা অনুযায়ী) ল্যাবরেটরি অফিস বিল্ডিং, (অর্থবছর ২০২০-২০২১), দরপত্র নং ৫৭৮৩৯৬ দরপত্রগুলো থেকে প্রকল্প পরিচালক মুন্সী মো. হাচানুজ্জামান মোট প্রাক্কলিত মূল্যের ৫ শতাংশ করে উঢৌকন নিয়েছেন বলে অভিযোগ উঠেছে। এই দপত্রগুলোর মোট প্রাক্কলিত মূল্য প্রায় পঁয়তাল্লিশ কোটি একষট্টি লাখ ষাট হাজার টাকা হলে তার ৫ শতাংশ কমিশন হিসেবে দুই কোটি আটাশ লাখ আট হাজার টাকা নিয়েছেন হাচানুজ্জামান।  

এসব বিষয়ে মুন্সী মো. হাচানুজ্জামানের সাথে তার মুঠোফোনে যোগাযোগ করা হলে তিনি রিসিভ করেননি। তার হোয়াটসঅ্যাপে তার সাথে সাক্ষাতের সময় চেয়ে ক্ষুদে বার্তা পাঠালেও তিনি উত্তর দেননি। পরবর্তীতে জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরে তার সাথে দেখা করতে গেলে অধিদপ্তরের রিসিপশন থেকে সাংবাদিক পরিচয় পেয়ে তার সাথে দেখা করতে যেতে বাধা দেয়া হয়। তার সঙ্গে দেখা করতে না দেবার কারণ হিসেবে রিসিপশন থেকে জানানো হয় হাচানুজ্জামানের কাছ থেকে আগে মুঠোফোনে সাক্ষাতের সময় নিয়ে আসতে হবে। হাচানুজ্জামান ফোন রিসিভ করছেন না বলে রিসিপশন থেকে তাকে ফোন করে জানাতে বললে রিসিপশনিস্টের ফোন দেওয়া নিষেধ বলে জানান। জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরে অন্যদের প্রবেশাধিকার উন্মুক্ত থাকলেও শুধুমাত্র সাংবাদিকদের প্রবেশাধিকার বন্ধ করে প্রধান প্রকৌশলী এই নির্দেশনা দিয়েছেন বলে রিসিপশনিস্ট জানান।