অবাধ দুর্নীতিতে ডুবতে বসেছে জনতা ব্যাংক, দায়ী কারা!
অবাধ দুর্নীতিতে ডুবতে বসেছে জনতা ব্যাংক। প্রায় সাড়ে ৩ হাজার কোটি টাকার ক্ষতির টার্গেট নিয়ে এগিয়ে যাচ্ছে এক সময়ের প্রভাবশালী এই ব্যাংকটি।
অবাধ দুর্নীতিতে ডুবতে বসেছে জনতা ব্যাংক। প্রায় সাড়ে ৩ হাজার কোটি টাকার ক্ষতির টার্গেট নিয়ে এগিয়ে যাচ্ছে এক সময়ের প্রভাবশালী এই ব্যাংকটি। বছরের পর পর ঋণ গ্রহীতাদের থেকে কোটি টাকার সুবিধা নিয়ে ব্যাংকটিকে ধ্বংসের শেষ প্রান্তে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে বলেও রয়েছে জোর আলোচনা। আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় থাকতে এই ব্যাংকটির বিভিন্ন অনিয়ম ও দুর্নীতির কথা দেশবাসীকে চমকে দিয়েছিল। ঋণ গ্রহণে অনিয়ম ও ঘুষ গ্রহণসহ নানা ঘটনায় জড়িত থাকার অভিযোগে দুর্নীতিবাজ ব্যবসায়ী গ্রুপ ও ব্যাংক কর্মকর্তাসহ অনেকের নাম আলোচনায় উঠে এসেছিল এক সময়। তারপর নতুন সরকার এলে এক বছর পেরিয়ে গেলেও তারাই রয়ে গিয়েছেন ধরা ছোয়ার বাইরে। এমনও অভিযোগ রয়েছে, উল্টো ঋণ খেলাপী ও দুর্নীতিবাজদের স্বার্থ রক্ষায় এখনো তৎপর রয়েছেন ব্যাংকটির একাধিক কর্মকর্তা। তাদের স্বেচ্ছাচারিতা ও অনিয়ম করে কোটি কোটি টাকা অর্থ হাতিয়ে নেয়ার কারনেই এখন ঐতিহ্যবাহী এই ব্যাংকটির অবস্থা আরো বেহাল হতে চলেছে বলেও রয়েছে অভিযোগ।
জনতা ব্যাংকের একাধিক দায়িত্বশীল কর্মকর্তার থেকে জানা গেছে, জনতা ব্যাংকের খেলাপী ঋণের পরিমান ৭২ হাজার কোটি টাকা। যার মধ্যে বেক্সিমকো গ্রুপের ২৬টি কোম্পানির নামে ২৩ হাজার ২৮২ কোটি টাকা অর্থাৎ ৩২ শতাংশ ঋণ একটি গ্রুপের কাছে। এই ২৬টি কোম্পানির মধ্যে বেশ কয়েকটি নাম সর্বস্ব বলে জানান এক ঊর্ধতন ব্যাংক কর্মকর্তা। তিনি বলেন, এমনকি এই টাকা তুলে নেয়ার বিপরীতে ব্যাংকে ঋণ গ্রহীতার আবেদনপত্রও নেই। শুধু লেজার বকেয়া ছাড়া কোনো তথ্য নেই। এরই মধ্যে পুলিশের একটি সংস্থার অনুসন্ধানের প্রেক্ষিতে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) আদালতে মামলা দায়ের করেছে। তারপরও ব্যাংক কোনো মামলা করছে না।
প্রশ্ন উঠেছে, কার ক্ষমতায় ও সরাসরি নির্দেশনায় এমন ঋণ খেলাপীদের আইনের হাত থেকে রক্ষায় এখনো তৎপরতা চালানো হচ্ছে। কিসের বিনিময়ে এই তৎপরতা চালানো হচ্ছে। অভিযোগ রয়েছে, ব্যাংকটির একজন শীর্ষ কর্মকর্তা সরাসরি এই বিষয়ে হস্তক্ষেপ করছেন। উর্দ্বতন পর্যায়ের এক কর্মকর্তা ব্যাংকের স্বার্থ বিরোধী এমন সিদ্ধান্তের বিরোধিতা বারবার করে আসলেও সেটি আমলে না নিয়ে উল্টো ওই কর্মকর্তাকে বিপাকে ফেলতে তৎপর হয়ে পড়েছেন ওই শীর্ষ কর্মকর্তা। এই বিষয়টি এখন জনতা ব্যাংকের শীর্ষ কর্মকর্তাদের অনেকের কাছেই ওপেন সিক্রেট। তবু অজানা এক ভয় ও আতঙ্কে দিন কাটছে এখন অনেকেরই।
এছাড়াও এস আলম গ্রুপ, ক্রিসেন্ট লেদার গ্রুপসহ কয়েকটি কোম্পানি জনতা ব্যাংক থেকে হাজার কোটি টাকা ঋণ নিয়েছেন। এইসব ঋণের বেশিরভাগ টাকাই ব্যাক টু ব্যাক এলসি ও পিসির মাধ্যমে বের করা হয়েছে অর্থাৎ পেপার ট্রানজাকশন হয়েছে। খেলাপী ঋণের অর্থ আদায়ের দায়িত্ব সংশ্লিষ্ট শাখার হলেও তারা দিনের পর দিন রহস্যময় আচরণ করে যাচ্ছেন। ঋণের অর্থ তোলার বিষয়ে তারা যেন অনেকটাই উদাসীন। ঊর্ধতন কর্তৃপক্ষকে ম্যানেজ করেই কি তাহলে তারা এমন টেনশন ফ্রি রয়েছেন এমন প্রশ্নই এখন ব্যাংক জুড়ে।
খেলাপী ঋণ আদায়ে ব্যাংক কি করছে জানতে চাইলে বা কারো সাথে এই নিয়ে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেই তারা একজন আরেকজনের দিকে আঙুল তুলে নিজেদের দায়িত্ব এড়িয়ে যেতে চান। যারা এই ঋণ প্রদানের সঙ্গে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে জড়িত তাদের কেউ কেউ এখন ভোল পাল্টে আছেন বহাল তবিয়তে। তবে কখনো প্রকাশ্যে আবার কখনো অত্যন্ত গোপনে ঋণ খেলাপীদের নানা ধরনের সুবিধা দিতে তৎপরতাও চালাচ্ছেন তারা। তাদের বিষয়ে ব্যাংকের অনেকেই জানলেও ভয়ে কেউ সরাসরি মুখ খুলতেও রাজি হচ্ছেন না। ব্যাংকটিকে রক্ষায় আইন শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীদের হস্তক্ষেপও অনেকেই আশা করছেন।
একজন শীর্ষ কর্মকর্তা জানান, এ্যাননটেক্স গ্রুপ ভুক্ত ২২টি কোম্পানির কাছে জনতা ব্যাংক পাবে প্রায় সাড়ে ৮ হাজার কোটি টাকা। সর্বশেষ ঋণ আদায়ের মামলা করেছে জনতা ব্যাংক। ব্যাংকটি লোকাল অফিসের এক কর্মকর্তা বলেন, খেলাপী ঋণ আদায়ে ব্যাংকটির পক্ষ থেকে নানা ধরনের তৎপরতা চালানো হচ্ছে। তবে সেইসব তৎপরতা সম্পর্কে বিস্তারিত জানতে চাইলে তিনি কোনো উত্তর দিতে পারেন না। উল্টো এই বিষয়ে ব্যবস্থপনা পরিচালক সব বলতে পারবেন বলেও জানান তিনি।
আরেক শীর্ষ এক কর্মকর্তা বলেন, জনতা ব্যাংক প্রায় ৪ হাজার কোটি টাকার ক্ষতিতে আছে। ম্যানেজমেন্ট এবার নিজেরাই সাড়ে তিন হাজার কোটি টাকার লসের টার্গেট নিয়েছে। এভাবে চলতে থাকলে খুব শিগগিরই ব্যাংকটির অবস্থা ভয়াবহ খারাপ অবস্থায় চলে যাবে। এটি আমরা কখনোই প্রত্যাশা করি না। তবে এই পরিস্থিতিতে পরিকল্পিত উদ্যোগ না নিলে পরিনতি ভালো হবে না। ব্যাংকটির করুণ পরিনতি বরণ করে নিতে হতে পারে বলে ধারনা করেন তিনি।
এতদ্বসংক্রান্তে জনতা ব্যাংক’র এমআইএস বিভাগের দায়িত্ব প্রাপ্ত কর্মকর্তা মুহাম্মদ এহতেশাম জলিল জানান সংশ্লিষ্ট ব্যাংকের দ্বায়িত্ব প্রাপ্ত কর্মকর্তাদের কাছে লিখিত আবেদন করে এই বিষয়ে তথ্য জানতে হবে। এর বাইরে আর কিছু বলতে রাজি হননি তিনি।