কপ-৩০ ভেন্যুর বাইরে বিকল্প জলবায়ু সম্মেলন: হাইড্রোকার্বন উত্তোলন বন্ধের দাবি তীব্র

কপ-৩০-এর পঞ্চম দিনে সম্মেলনস্থলের বাইরে তীব্র জনঅসন্তোষ ও পরিবেশ আন্দোলনের রণধ্বনি স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। অ্যামাজনের আদিবাসী জনগোষ্ঠী, তৃণমূল সংগঠন, সামাজিক আন্দোলনকারী ও নাগরিকরা ফসিল জ্বালানি উত্তোলন বন্ধ এবং বনভূমি ধ্বংস রোধের দাবিতে ব্যাপক বিক্ষোভ প্রদর্শন করেন। একই সময়ে, সম্মেলন কক্ষে বিশ্ব পরিবেশ বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করেন-হাইড্রোকার্বন নির্ভরতা অব্যাহত থাকলে মানবসভ্যতা টিকে থাকবে না।
বিক্ষোভকারীদের প্ল্যাকার্ড, প্রাণবৈচিত্র্যের প্রতীক ও শ্লোগানে মুখরিত ছিল পুরো এলাকা। প্রবেশদ্বারে শুরু হওয়া এই বিক্ষোভের কারণে প্রধান সড়কে তীব্র যানজট দেখা দেয়, ফলে ডেলিগেটদের ভোগান্তি বাড়ে। আদিবাসীরা নিজেদের প্রকৃতির অংশ হিসেবে পরিচিত করে ব্রাজিলের প্রেসিডেন্ট লুই ইনাসিও লুলা দা সিলভা এবং কপ-৩০ সভাপতির প্রতি সরাসরি বার্তা দেন-বন নিধন ও ফসিল জ্বালানি উত্তোলন বন্ধ করতে হবে।
সম্মেলনের পঞ্চম দিনে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিনিধিদল অনুপস্থিত থাকায় পরিবেশবীদরা হতাশা প্রকাশ করেন। প্যারিস চুক্তি অনুযায়ী স্বল্পোন্নত দেশগুলোকে সহায়তা তহবিল বাস্তবায়নে উন্নত দেশগুলোর ব্যর্থতা নিয়েও ক্ষোভ শোনা যায়।
ব্রাজিলে কপ-৩০ আয়োজনের জন্য অ্যামাজনের বিশাল বৃক্ষ নিধন করে সড়ক নির্মাণ হওয়ায় আয়োজক দেশটিও সমালোচনার মুখে পড়েছে। স্থানীয়রা কপ-৩০-কে ব্যঙ্গাত্মকভাবে ‘ফ্লপ-থার্টি’ বলেও উল্লেখ করছে।
এদিকে সরকারি কপ-৩০-এর সমান্তরালে গুঞ্জন তুলেছে “পিপলস সামিট”-৬২টি দেশের ৩০ হাজারেরও বেশি পরিবেশভুক্তভোগী, ভূমিহীন কৃষক, নারী, যুব ও আদিবাসীর বিকল্প জলবায়ু সম্মেলন।
গুয়ারাজা উপসাগরে অন্তত ২০০ নৌকার প্রতীকী যাত্রা, গান, প্রার্থনা ও প্রতিবাদের মধ্য দিয়ে তারা জানান-এই পৃথিবীকে রক্ষার লড়াই মানুষের, কেবল কূটনীতিকের নয়।
বাংলাদেশ প্যাভিলিয়নে অনুষ্ঠিত আলোচনা সভায় মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ বিষয়ক উপদেষ্টা ফরিদা আখতার ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, “আগে গবেষক ও নাগরিক সমাজের প্রতিনিধি আসতেন; এখন ফসিল জ্বালানি কোম্পানির লোকরাই সম্মেলনে ভিড় জমাচ্ছেন। তাদের উদ্দেশ্য মহৎ নয়।”
তিনি লস অ্যান্ড ড্যামেজ কাঠামোতে ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীকে কেন্দ্রে রাখার প্রয়োজনীয়তা এবং দেশের যুবদের নেতৃত্বের প্রশংসা করেন।
ইয়ুথ লস অ্যান্ড ড্যামেজ গ্রুপ-এর কন্টাক্ট পয়েন্ট ও ড্যাফোডিল ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির শিক্ষার্থী জাসমিমা সাবাতিনা সেশনটি আয়োজন ও পরিচালনা করেন। তিনি প্রথমবারের মতো পূর্ণাঙ্গ আন্তর্জাতিক সাইড ইভেন্ট এককভাবে আয়োজন করে সরকার, আন্তর্জাতিক বিশেষজ্ঞ ও যুবদের আলোচনার প্ল্যাটফর্মে যুক্ত করেছেন। তিনি পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানান।
পরিবেশ অধিদপ্তরের অতিরিক্ত মহাপরিচালক মো. জিয়াউল হক এবং প্যানেল সদস্য ড. ফজলে রাব্বি সাদেক জানান-বাংলাদেশ একটি জাতীয় লস অ্যান্ড ড্যামেজ ফ্রেমওয়ার্ক প্রণয়ন করছে, যা আন্তর্জাতিক প্রক্রিয়ার সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ হবে।
নবায়নযোগ্য জ্বালানি, টেকসই পরিবহন ও কার্বন সংরক্ষণে আন্তর্জাতিক সহায়তা এখন সময়ের দাবি বলেও তারা উল্লেখ করেন।
বিশেষজ্ঞদের মতে-মানবমর্যাদা, অন্তর্ভুক্তিমূলক প্রবৃদ্ধি এবং সম্প্রদায়ের ক্ষমতায়ন-এই তিন স্তম্ভকে কেন্দ্র করে দুর্বলতাকে স্থিতিস্থাপকতায় রূপান্তর করা সম্ভব। এখন পদ্ধতিগত সংস্কার ও বৈশ্বিক সহযোগিতা ব্যর্থ হলে ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে আরও বড় দুর্ভোগের মুখোমুখি হতে হবে।
