বনানী থানায় রহস্য: মানবপাচারের আসামি কীভাবে ছাড় পেল?

বায়রার সাবেক নেতা ফখরুলের আটক ও রহস্যজনক মুক্তি নিয়ে তোলপাড়

হাবিবুল্লাহ মিজান
হাবিবুল্লাহ মিজান
প্রকাশিত: নভেম্বর ১১, ২০২৫ ২০:০৬:৩২

জনশক্তি রপ্তানিকারকদের সংগঠন বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব ইন্টারন্যাশনাল রিক্রুটিং এজেন্সি (বায়রা)–এর বহুল আলোচিত সাবেক যুগ্ম মহাসচিব মো. ফখরুল ইসলামকে মানবপাচারের মামলায় সোমবার গভীর রাতে গ্রেপ্তারের পর রহস্যজনক কারণে সকালে ছেড়ে দিয়েছে পুলিশ। এ ঘটনায় নানা প্রশ্ন উঠেছে।

অসমর্থিত একটি সূত্র দাবি করেছে, মানবপাচার মামলার প্রধান আসামিকে মুক্তির পেছনে মোটা অংকের উৎকোচ বিনিময় হয়েছে। তাছাড়া জামিন ছাড়াই মানবপাচার মামলার আসামিকে মুক্তির পেছনে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের প্রভাবশালী একজন অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার, একজন উপ-পুলিশ কমিশনার এবং একজন পরিদর্শক জড়িত বলে অসমর্থিত সূত্রটি দৈনিক আজকের সংবাদের এই প্রতিবেদকের কাছে দাবি করেছে।

অভিযোগের বিষয়ে ঢাকা মহানগর পুলিশের গুলশান বিভাগের একাধিক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার মতামত জানতে চাইলে তারা কোনো কল রিসিভ করেননি। পরে হোয়াটসঅ্যাপে পরিচয় দিয়ে বার্তা পাঠানো হলেও রাত আটটা পর্যন্ত তারও কোনো জবাব মেলেনি। তবে সন্ধ্যা ৬টা ৩৬ মিনিটে ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) গণমাধ্যম ও জনসংযোগ বিভাগের উপকমিশনার মুহাম্মদ তালেবুর রহমান এক হোয়াটসঅ্যাপ বার্তায় দাবি করেন, “এ সংক্রান্ত কোনো তথ্য নেই আমার কাছে।” সন্ধ্যা ৭টা ২৮ মিনিটে ডিএমপি কমিশনার শেখ মো. সাজ্জাত আলীও দৈনিক আজকের সংবাদের এই প্রতিবেদককে এক ফিরতি হোয়াটসঅ্যাপ বার্তায় দাবি করেন, তিনি বিষয়টি সম্পর্কে অবগত নন।

একটি বিশ্বস্ত সূত্র এই প্রতিবেদককে জানায়, সোমবার রাত দেড়টার দিকে এয়ারপোর্ট ইমিগ্রেশনে মানবপাচার মামলার আসামি হিসেবে ফখরুলকে আটক করা হয়। পরে রাত তিনটায় তাকে বনানী থানায় হস্তান্তর করা হয়। তবে রহস্যজনক কারণে পুলিশের হেফাজত থেকে তাকে মুচলেকা নিয়ে ভোর পাঁচটায় ছেড়ে দেওয়া হয় এবং দুই দিনের মধ্যে আদালতে আত্মসমর্পণের শর্ত দেওয়া হয়। এর আগে রাজধানীর বনানী থানায় ফখরুল ইসলাম ও তার সহযোগী জসিম উদ্দিনের বিরুদ্ধে মানবপাচার এবং অর্থ আত্মসাতের অভিযোগে মামলা হয়। বনানী থানার মামলা নং ৪, তারিখ ৪/১১/২৫ ইং।

মামলার আসামি করা হয় হিউম্যান রিসোর্স ডেভেলপমেন্ট সেন্টারের প্রোপাইটর মো. ফখরুল ইসলাম এবং তার সহযোগী ফেনী জেলার দাগনভুইয়া উপজেলার ওমরপুর গ্রামের মো. জসিম উদ্দিনকে। প্রায় ৩ কোটি টাকা আত্মসাতের অভিযোগে মঙ্গলবার মামলাটি করেন আরইউএল ইন্টারন্যাশনাল নামে একটি রিক্রুটিং এজেন্সির ম্যানেজিং পার্টনার মো. রুবেল হোসেন। বিষয়টি বনানী থানার ওসি মো. রাসেল সরোয়ার নিশ্চিত করে জানিয়েছিলেন যে আসামিদের গ্রেপ্তারে অভিযান চলছে এবং তারা আত্মগোপনে রয়েছেন।

মামলার এজাহার অনুযায়ী, পাঁচ বছর আগে ফখরুল ও জসিমের সঙ্গে বাদীর ব্যবসায়িক পরিচয় গড়ে ওঠে। ২০২৩ সালের মে মাসে মালয়েশিয়ার বিভিন্ন কোম্পানিতে শ্রমিক পাঠানোর প্রলোভন দেখিয়ে তারা রুবেলের কাছ থেকে ৫৫ জন কর্মীর জন্য মোট ৩ কোটি ২ লাখ ৫০ হাজার টাকা নেন। পরবর্তীতে ভিসার প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী ২৮ জন শ্রমিককে মালয়েশিয়ায় পাঠালেও তাদের যথাযথ কর্মস্থলে না নিয়ে আটকে রেখে নির্যাতন করা হয় এবং অতিরিক্ত টাকা দাবি করা হয়। এ বিষয়ে রুবেল যোগাযোগ করলে আসামিরা নানা তালবাহানায় সময়ক্ষেপণ করেন। এখনো তাদের কাছে বাদীর ১ কোটি ৪৮ লাখ ৫০ হাজার টাকা পাওনা রয়েছে বলে অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে। এই বিষয়ে ফখরুল ইসলাম প্রথমে তাকে গ্রেপ্তার করা হয়েছিল সেটি অস্বীকার করেন। পরে এই প্রতিবেদকের প্রশ্নের জেরে স্বীকার করেন, তাকে আটক করা হয়েছিল।

আদালতে জামিন নেয়া ছাড়া কিভাবে তিনি বনানী থানা থেকেই মুক্তি পেলেন এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, “আইনি পদ্ধতির মাধ্যমেই তিনি মুক্ত হয়েছেন।” কিন্তু সেই আইনি প্রক্রিয়া সম্পর্কে তিনি বিস্তারিত জানাতে পারেননি। ফখরুল ইসলামের বিরুদ্ধে মানবপাচার আইনে মামলার বিষয়ে তিনি বলেন, মামলাটি মিথ্যা এবং ভিত্তিহীন। তার দাবি, তিনি সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে সোচ্চার থাকায় এবং আগামী বায়রা নির্বাচনে যাতে তিনি প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে না পারেন, সেই উদ্দেশ্যে তাকে আসামি করা হয়েছে।