দুদকের মামলার পরেও লাগামহীন দুর্নীতি রাজউকের পরিচালক মোবারকের
জুলাইয়ের গণ-অভ্যুত্থানের পর দেশ সংস্কারের জন্য অন্তর্বর্তীকালীন সরকার গঠিত হয়। এই সরকারের অন্যতম উদ্দেশ্য হলো সরকারের রন্ধ্রে লুখিয়ে থাকা দুর্নীতিকারীদের খুঁজে বের করে শাস্তির আওতায় নিয়ে আসা। দেশের সার্বিক দুর্নীতির মধ্যে সরকারি কর্মকর্তাদের দুর্নীতি সবচেয়ে বেশি। দুর্নীতির মাধ্যমে জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদ অর্জনের অভিযোগে রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (রাজউক) পরিচালক মো. মোবারক হোসেন ও তাঁর স্ত্রী সাহানা পারভীনের নামে গত বছরের মাঝামাঝি মামলা করে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। দুদকের প্রধান কার্যালয়ের সহকারী পরিচালক আসিফ আল মাহমুদ বাদী হয়ে দুদকের সমন্বিত জেলা কার্যালয় ঢাকা-১-এ পৃথক দুটি মামলা করেছেন।
দুটি মামলার মধ্যে একটি মামলায় মো. মোবারক হোসেনকে একা আসামি করা হয়েছে। মামলার এজাহারে বলা হয়, দুদকে দাখিল করা সম্পদবিবরণী অনুযায়ী, তিনি ৪১ লাখ ৪৬ হাজার ৮৪৫ টাকা জ্ঞাত আয়ের উৎসের সঙ্গে অসংগতিপূর্ণ সম্পদ অর্জন করেছেন। অপর মামলার প্রধান আসামি সাহানা পারভীন। স্বামী মোবারক হোসেন দ্বিতীয় আসামি। মামলার এজাহারে বলা হয়, সাহানা ও মোবারক পরস্পর যোগসাজশে একে অপরকে সহযোগিতার মাধ্যমে ১ কোটি ৫৮ লাখ ৭৩ হাজার ১৫২ টাকা মূল্যের আয়বহির্ভূত সম্পদ অর্জন করেছেন।
পাবনা জেলার ভাঙ্গুড়া উপজেলার হাটগ্রামের হাজী মকবুল হোসেনের বড় ছেলে মোবারক ১৯৯৪ সালে রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (রাজউক)-এর উপ সহকারী প্রকৌশলী (সিভিল) হিসেবে যোগ দেন। ২০০২ সালে তিনি সহকারী প্রকৌশলী (সিভিল), ২০১৩ সালে অথরাইজড অফিসার এবং ২০২০ সালে পরিচালক পদে পদোন্নতি পন। দীর্ঘ সময়ে ধীরে ধীরে নিজের আধিপত্য বিস্তার করেন এই কর্মকর্তা।
মোবারক হোসনের বিরুদ্ধে ঘুষ, দুর্নীতি ও অনিয়মের মাধ্যমে ঢাকায় একাধিক আলিশান বাড়ি, প্লটসহ নিজ জেলা পাবনা শহর ও গ্রামের বাড়িতে কোটি কোটি টাকার সম্পদ অর্জনের অভিযোগ উঠেছে। মহাখালী জোন-৪ এ অথরাইজ অফিসার থাকাকালীন মিরপুর-১ ও ১০, মার্কেট পরিচালনা কমিটি, বিভিন্ন ডেভেলপার কোম্পানি ও বাড়ির মালিকদের থেকে উচ্ছেদ অভিযানের চিঠি দিয়ে ও উচ্ছেদের ভয় দেখিয়ে মার্কেট ও বাড়ির মালিকদের কাছ থেকে কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নেয়ার অভিযোগ রয়েছে মোবারক হোসেনের বিরুদ্ধে।
সূত্র জানায়, প্রকৌশলী মোবারক হোসেন তৎকালীন অথরাইজ অফিসার হিসাবে দায়িত্বে থাকা অবস্থায় নিয়ম-নীতি তোয়াক্কা না করে অবৈধভাবে শত শত প্ল্যান পাস করিয়ে দিয়ে অবৈধভাবে উৎকোচ গ্রহণ করে নিজে বিত্ত- বৈভবের মালিক বনে গেছেন। তিনি রাজউককে হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করে, উচ্ছেদ অভিযানের নামে মার্কেট ও ভবনের সামান্য কিছু অংশ ভেঙ্গে মালিকদের কাছ থেকে ৩০০ টাকার স্ট্যাম্পে মুচলেকা নিয়ে পানি, বৈদ্যুতিক সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে চলে যেতেন। পরবর্তীতে তার ঘনিষ্ঠ পরিদর্শক এবং তার দালাল সিন্ডিকেট দিয়ে ভবন মালিকদের কাছ থেকে মোটা অংকের টাকা নিয়ে নিতেন মোবারক হোসেন।
বর্তমান এই প্রকৌশলী রাজউক (উন্নয়ন নিয়ন্ত্রণ-২) এর পরিচালক হওয়ার পর থেকে ব্যাপক অনিয়ম-দুর্নীতির সাথে জড়িয়ে পড়ছেন। এখনও তিনি বিভিন্ন ভবন মালিকদের কাছ থেকে অবৈধ ঘুষ লেনদেনের মাধ্যমে গোপনে ভবন নির্মাণের অনুমতি প্রদান করেন। শুধু তাই নয়, এই কর্মকর্তার রয়েছে বিশাল ক্ষমতাসীল একটা সিন্ডিকেট ও দালাল চক্র। এই কর্মকর্তার বিরুদ্ধে ঘুষ দুর্নীতি অনিয়মে শত শত অভিযোগ রয়েছে। জানা যায়, ঘুষ বাণিজ্য অনিয়ম স্বেচ্ছাচারিতা ও অবৈধভাবে অর্জিত কালো টাকায় অবৈধভাবে সম্পদ অর্জনের অভিযোগে ২০১৭-১৮ সালে দুর্নীতি দমন কমিশন দুদক প্রকৌশলী মো. মোবারক হোসেনকে ও তার স্ত্রীকে অনুসন্ধানের বিষয়ে নোটির জারী করেন।
দুদক সূত্রে জানা যায়, এবার স্ত্রীকে বাদ দিয়ে পুনরায় গত ৩০/০৭/২০২৩ ইং তারিখে রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (রাজউক) উন্নয়ন নিয়ন্ত্রণ-২ এর পরিচালক প্রকৌশলী মো. মোবারক হোসেনেকে স্বেচ্ছাচারিতা ও অবৈধভাবে অর্জিত কালো টাকায় সম্পদ অর্জনের অভিযোগে অনুসন্ধানের বিষয়ে নোটির জারী করেন। আর এসব অনিয়ম দুর্নীতি বিষয়ে গত কয়েক মাসে উত্তরা দিয়াবাড়ির বাসিন্দা মোঃ আব্দুস সালাম, পিতা-জামাল উদ্দিন, মাতা-সালমা, বাসা নং-১৫৬, দিয়াবাড়ি, তুরাগ ঢাকা, রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (রাজউক) উন্নয়ন নিয়ন্ত্রণ-২ এর পরিচালক প্রকৌশলী মো. মোবারক হোসেনের বিরুদ্ধে দুর্নীতি দমন কমিশনে জ্ঞাত আয় বহির্ভূত সম্পদ তদন্ত পূর্বক ব্যবস্থা গ্রহনের জন্যে আবেদন করেছেন।
সূত্রমতে, অনৈতিক উপায়ে অর্জিত মোবারক হোসেনের সম্পদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হচ্ছে- ১। ফ্ল্যাট নং-এ–৪, বি-৪, প্লট নং- ৪৩, রোড নং- ৯, সেক্টর -১৩, উত্তরা, ঢাকা। উক্ত ৮ তলা বিশিষ্ট বাসার ৪ তলায় তার দুটি ফ্ল্যাট রয়েছে। যার বাজার মূল্য প্রায় ২ কোটি টাকা। ২। জি -ব্লকে, রোড নং- ৩/এ, সেক্টর -১৫, উত্তরা, ঢাকা। ৩ কাঠার একটি প্লট রয়েছে। যার বাজার মূল্য প্রায় ৪ কোটি টাকা। ৩। জি -ব্লকে, এভিনিউ রোডে, প্লট নং-৯, সেক্টর -১৫, উত্তরা, ঢাকা। ৩ কাঠার একটি প্লট রয়েছে। যার বাজার মূল্য প্রায় ৬ কোটি টাকা। ৪। মৌজা দিয়াবাড়ি, হরিরামপুর, তুরাগ ঢাকা। ০৫৭৮ অযুতাংশ জমি রয়েছে। টিন শেডের বাড়ি যার বাজার ৩ কোটি টাকা। ৫। আরেকটি টিন শেড বাড়ি রয়েছে, মৌজা দিয়াবাড়ি, হরিরামপুর, তুরাগ ঢাকা। ০২০৬ অযুতাংশ জমি রয়েছে। টিন শেড বাড়ি যার বাজার ৩.৫ কোটি টাকা। ৬। মৌজা হাটগ্রাম, দাগ নং- ৪৬০৪, ২৩ শতাংশ জমিতে, থানা-ভাংগুড়া, জেলা-পাবনা। টিন শেড বাড়ি রয়েছে, যার বাজার মূল্য কোটি টাকা। ৭। খালি জমি পরিমান, মৌজা হাটগ্রাম, দাগ নং- ৬৫৪৭, জমি পরিমাণ ১০.৫ শতাংশ, থানা-ভাংগুড়া, জেলা-পাবনা। যার বাজার মূল্য কোটি টাকা। ৮। এছাড়াও তার স্ত্রীর নামে রয়েছে দামি গাড়ি যার বাজার মূল্য প্রায় ৩০ লক্ষ টাকা, উক্ত গাড়িটির নাম্বার- ঢাকা মেট্রো চ ১৬-০৫৫৫। পাবনা জেলার ভাংগুড়া থানায় তার পরিবার ও আত্মীয় স্বজনের নামে বিঘায় বিঘায় জমি রয়েছে। বিভিন্ন ব্যাংকে রয়েছে বিপুল পরিমাণ অর্থ। যা তদন্ত সাপেক্ষে প্রমাণ পাওয়া যাবে।
সার্বিক বিষয় আমলে নিয়ে অনুসন্ধানে নামে দুদক। সত্যতা মেলে অভিযোগের। এরপর সম্পদের তথ্য চেয়ে চিঠি প্রদানসহ কয়েক দফা তাকে তলব করা হয় দুদক কার্যালয়ে। কিন্তু রাষ্ট্রপতির এলাকার মানুষ হওয়ার সুবাদে আওয়ামী লীগের ক্ষমতা বলে বিষয়টি কৌশলে এড়িয়ে যান মোবারক হোসেন। শেষ পর্যন্ত তিনিসহ তার স্ত্রীর বিরুদ্ধে মামলা করে দুর্নীতি দমন কমিশন।
এর পর পেরিয়ে গেছে বেশ খানিকটা সময়। পতন হয়েছে আওয়ামী লীগ সরকারের। কিন্তু অজানা কারণে এখনও অটুট মোবার হোসেনের চেয়ার। স্বপদে বহাল তবিয়তেই আছেন রাজউকের পরিচালক মোবারক হোসেন। দুদকের মামলা ও তার দুর্নীতির ফিরিস্তি জেনেও অজানা কারণে কোন পদক্ষেপ নেয়নি রাজউকের উর্দ্ধতন কর্মকর্তাসহ সরকার। মোবারকের বিষয়ে নাম প্রকাশ না করার শর্তে, রাজউকের একজন কর্মকর্তা জানান, পরিচালক প্রকৌশলী মো. মোবারক হোসেন উর্দ্ধতন কর্তৃপক্ষকে ম্যানেজ করে এবং চেয়ারম্যান, সচিব, রাজনৈতিক ব্যক্তিদের নাম ভাঙ্গিয়ে অনিয়ম- দুর্নীতি করে বিপুল সম্পত্তির মালিক হয়েছেন। তিনি এখনো সরকারের বিভিন্ন মহলে টাকা দিয়েই নিজের অবস্থান ধরে রেখেছেন।
এসব বিষয়ে মো. মোবারক হোসেনের সাথে মুঠোফোনে যোগাযোগ করে তার বক্তব্য চাওয়া হলে তিনি ঔদ্ধত্যভাবে দৈনিক আজকের সংবাদকে বলেন, দুদক মামলা করেছে, দুদক দেখছে। দুদক মামলা করেছে তারা বক্তব্য নিচ্ছে। আপনার কি? বক্তব্য নিয়ে আপনি কি করবেন?