পতিত স্বৈরাচার সরকারের অন্যতম দোসর
বিআইডব্লিউটিএ’র আরিফ উদ্দিন এখনও বহাল তবিয়তে
বিগত আওয়ামীলীগ সরকারের আমলে সরকারের দায়িত্বপ্রাপ্ত তৎকালীন নৌপরিবহন মন্ত্রীকে ম্যানেজ করে লুটপাট করার জন্য একে এম আরিফ উদ্দিন একটি সিন্ডিকেট তৈরি করেছিলেন। বর্তমানে বিআইডব্লিউটিএ-তে একে এম আরিফ উদ্দিন অতিরিক্ত পরিচালক হিসেবে বন্দর ও পরিবহন বিভাগ এবং ল্যান্ড এন্ড এস্টেট শাখার পরিচালক (অতিরিক্ত দায়িত্বে) হিসেবে কর্মরত আছেন।
অভিযোগ উঠেছে, তার নেতৃত্বে দুর্নীতিপরায়ণ কর্মকর্তারা পরস্পর যোগসাজসে কয়েক হাজার কোটি টাকার প্রকল্প থেকে হাতিয়ে নিয়েছে শত কোটি টাকা। একাধিক সূত্রে জানা যায়, সাবেক নৌপরিবহন মন্ত্রী শাহজাহান খান এবং খালিদ মাহমুদ চৌধুরীকে নির্দিষ্ট অংশের লভ্যাংশ দিয়ে তারা এসব প্রকল্পের কাজ করতো। সুত্র বলছে আওয়ামী লীগের সাবেক এই দুই মন্ত্রী বিআইডব্লিউটিএ থেকে প্রায় ১০ হাজার কোটি টাকা পকেটে ঢুকিয়েছেন। প্রকল্পের মেয়াদ শেষ হলেও অবৈধভাবে প্রকল্পের মেয়াদ ও টাকার পরিমাণ বাড়িয়েছে ইচ্ছামতো।
ছাত্র-জনতা গণঅভ্যুত্থানে ক্ষমতাচ্যুত সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সাথে ছিল তার সখ্যতা। আরিফ উদ্দিন যতবার শেখ হাসিনার সাথে দেখা করেছেন ততবারই নিজের ফেইসবুকে সেই ছবি প্রচার করে নিজের দাপট দেখাতেন। শেখ হাসিনার জন্মদিনে তুরাগ নদীতে নৌকা বাইচের আয়োজন করে একদিকে শেখ হাসিনার আস্থাভাজন হিসেবে নিজেকে পরিচিতি লাভ করান, অন্যদিকে নিজের পকেটে ভরেন সরকারি কাজের কোটি কোটি টাকা এবং একই সাথে শেখ হাসিনার জন্মদিন উদযাপনের নামে বিআইডব্লিউটি’র স্টে হোল্ডার ও বিভিন্ন পর্যায়ের কর্মকর্তাদের কাছ থেকেও কামিয়েছেন কয়েক কোটি টাকা। তার ছেলে সাদ ও মেয়ে আরিন দেশের বাইরে বসবাস করেন। এর মধ্যে তার স্ত্রী প্রায়ই যাতায়াতের মধ্যে থাকেন।
আরিফ উদ্দিন বড়িগঙ্গা, তুরাগ ও শীতলক্ষ্যা নদীর অবৈধ দখলদার উচ্ছেদ অভিযানের নামে কোটি কোটি টাকা বাণিজ্য করেছেন বলেও জনশ্রুতি আছে। এছাড়া টাস্কফোর্সকে না জানিয়ে নদীর সীমানা পিলার স্থাপন করা, নারায়ণগঞ্জের পাগলায় চায়না কোম্পানির দু’টি জাহাজ নিলামে দেওয়া, গাবতলীতে ১৭টি ট্রাক নিলামে দেওয়া হয়েছে। ব্যাক্তি মালিকানাধীন জমি সরকারি বলে অন্যত্র লিজ দেওয়ার অভিযোগও রয়েছে তার বিরুদ্ধে। পুরান ঢাকার ইসলামবাগে ১৮টি বৈধভবন মালিকের প্রতিপক্ষ লোকজনের কাছ থেকে মোটা অংকের টাকা নিয়ে ভাঙা, সদরঘাটে মসজিদ ভাঙা, লঞ্চের মাস্টারকে মারধর ও পিকনিকের লঞ্চে আর্মি অফিসার ও সচিবকে লাঞ্চিত করাসহ ব্যাপক অপকর্মের সাথেও তার জড়িত থাকার অভিযোগ রয়েছে।
আওয়ামীলীগ সরকার পতনের সাথে সাথে আরিফ উদ্দিন নিজেকে একটি বিশেষ দলের দুঃসময়ের কান্ডারি দাবি করেছেন। অথচ তিনি আওয়ামীলীগের এজেন্ডা বাস্তবায়নের লক্ষ্যে কোটা বিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সময় কোটি কোটি টাকা ডোনেশন দিয়েছেন বলে জানা গেছে। তার কথামতো কাজ না করলে মালিকানাধীন বৈধ ভবনও নিমিষের মধ্যে গুঁড়িয়ে দিতে দ্বিধা করেননি। আবার মোটা অঙ্কের টাকার বিনিময়ে অবৈধ ভবন উচ্ছেদ না করাসহ নানা অপকর্মের কারণে নারায়ণগঞ্জ নদীবন্দরে কর্মকালীন সময়ে একাধিক মামলা হয়েছে তার বিরুদ্ধে। এছাড়া ৪ কোটি টাকা কন্ট্রাক্ট নিয়ে মদনগঞ্জ ট্রলার ঘাটের পাশে শীতলক্ষ্যার পূর্ব পাড়ে মাহফুজুল ইসলামের আলিনা ডকইয়ার্ড ও শাকিলদের মুন্সি ডকইয়ার্ড অবৈধভাবে উচ্ছেদ করে কর্ণফুলী ডকইয়ার্ডকে জমি বুঝিয়ে দেন আরিফ উদ্দিন। এ ঘটনায় উচ্চ আদালতে রিট করেন মাহফুজুল ইসলাম। একপর্যায়ে স্ট্যাম্পের মাধ্যমে আরিফ উদ্দিন মীমাংসা করেন ডকইয়ার্ড মালিকদের সাথে। এতে মধ্যস্থতা করেন নারায়ণগঞ্জ বন্দর থানার তৎকালীন ওসি আবুল কালাম।
আরিফ উদ্দিনের বিরুদ্ধে নারায়ণগঞ্জ ডেক ইঞ্জিন পার্সোনাল ট্রেনিং সেন্টারের (ডিইপিটিসি) বহু গাছ কেটে আরেক ডকইয়ার্ড মালিকের কাছে জমি বুঝিয়ে দিলে মামলা হয় তার বিরুদ্ধে। কাঁচপুরে নদীতীরে বালু ভরাটের কাজে সহায়তার অভিযোগে মামলা হলে তাকে শোকজ করেন বিআইডব্লিউটিএর তৎকালিন চেয়ারম্যান কমডোর এম মোজাম্মেল হক। ঢাকা নদীবন্দর কর্মকর্তা থাকাকালীন রাজধানীর লালবাগের পূর্ব ইসলামবাগ এলাকায় প্রায় ১৮টি বৈধভবন উচ্ছেদ করেন আরিফ উদ্দিন।
এসব ভবন ভাঙার আগে বিদ্যুৎ কিংবা গ্যাসলাইন সংযোগ পর্যন্ত বিচ্ছিন্ন করেননি। এমনকি ভবনে বসবাসকারীদের নামারও সুযোগ দেননি। চকবাজার থানা এলাকার পূর্ব ইসলামবাগের ক্ষতিগ্রস্ত ৫৬/২সি, ৫৮/৩, ৫৮/১, ৫৮/১২বি, ৫৭/১খ,৩৮/৩/৪ ও ৫৭/৩খ হোল্ডিং ছাড়াও ভবন মালিক আবুল হোসেন, তোফাজ্জেল, হাবিব তালুকদার, শাহ আলম, রওশানারা হোসেন, শহিদ ও নুর মোহাম্মদ জানান, তাদের ভবনগুলো উদ্দেশ্যপ্রণোদিত ভেঙে ফেলা হয়েছে। তাদের কাছে ভবনপ্রতি কয়েক লাখ টাকা চাঁদা দাবি করায় তা দিতে না পারার কারণে এমনটা করেছেন তিনি। ২০১৮ সালের ৫ আগস্ট সদরঘাটে বায়তুল নাজাত মসজিদ ও মাদরাসা ভাঙা নিয়ে সংঘর্ষের ঘটনা ঘটান আরিফ। এ সময় পাঁচজন আহত হয়। মসজিদের দুইটি দোকান থেকে মাসে ৪০ হাজার টাকা দাবি করলে তা দিতে চাননি মসজিদ ও মাদরাসা কর্তৃপক্ষ। পরে নৌপরিবহন মন্ত্রণালয় ও পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা অতিরিক্ত ডিআইজি ও লালবাগ জোনের ডিসির নেতৃত্বে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনা হয়। পরের দিন মন্ত্রীর নির্দেশে সংস্কার করে দেয়া হয় মসজিদটি।
মূলত সাবেক নৌপরিবহন মন্ত্রী শাহজাহান খান এবং খালিদ মাহমুদ চৌধুরীর ছত্র ছায়ায় ছিলেন তিনি। এই দুই মন্ত্রীর কেউই আরিফের বিরুদ্ধে কোন রকম ব্যবস্থা নেননি। সদরঘাট থেকে একটি সংগঠন দুইটি লঞ্চ নিয়ে চাঁদপুরের দিকে পিকনিকে যাওয়ার আগে পোর্ট অফিসার আরিফ হানা দেয় লঞ্চটিতে। এ সময় আর্মি অফিসার, সচিব ও প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের এক কর্মকর্তা উপস্থিত ছিলেন। তুচ্ছ ঘটনা নিয়ে লঞ্চ মাস্টারকে মারধরের পর লঞ্চের ঝাড়ু দিয়ে পোর্ট অফিসারকে পিটায় বলেও জনশ্রুতি রয়েছে। কিন্তু আরিফ উদ্দিন মন্ত্রীর ঘনিষ্ঠ লোক হওয়ায় মন্ত্রণালয় বা বিআইডব্লিউটিএ থেকে কোনরকম পদক্ষেপ নেয়নি।
সম্প্রতি তার বিরুদ্ধে দুর্নীতি দমন কমিশনে ভুক্তভোগীরা একাধিক অভিযোগ দাখিল করেছে। যার স্মারক নং- ০০.০১.২৬০০.৬০৩.০১.২৩৪.২৩-৩২১৭ এ দুর্নীতি দমন কশিনের উপ-পরিচালক মো. হাফিজুল ইসলাম (অনু ও তদন্ত-২) টিমের পক্ষ থেকে ২০২৩ সালের ৩ সেপ্টেম্বর পরিচালক (প্রশাসন) বিআইডব্লিউটিএ বরাবরে এক পত্রে একেএম আরিফ উদ্দিন ওরফে আরিফ হাসনাত, যুগ্ম পরিচালক, বন্দর ও পরিবহন বিভাগ, বিআইডব্লিউটিএ, ঢাকা কর্তৃক নানাবিধ দুর্নীতির মাধ্যমে অবৈধ সম্পদ অর্জনের অভিযোগে সুষ্ঠ অনুসন্ধানের জন্য মাঠে নামে। দুদকের চাহিদাপত্রে যে সমস্ত কাগজপত্র চাওয়া হয়েছে: বিআইডব্লিউটিএ আওতাধীন নারায়নগঞ্জ পোর্ট হতে ২০১৯ সালের ১ জানুয়ারি থেকে ২০২২ সালের ৩১ ডিসেম্বর সময়ে সদরঘাট পোর্ট থেকে ওই সময় সংশ্লিষ্ট ব্যাংক খাতের হিসাব বিবরনী চাওয়া হয়।
এ ছাড়াও আরিফের ব্যক্তিগত নথি, উত্তোলিত বেতন ভাতার বিবরণ (শুরু থেকে ২৩ জুন সময় পর্যন্ত)। দায়-দায়িত্ব সম্পর্কিত অফিস আদেশ সমূহ ও তার নিজ স্ত্রী, সন্তান, ভাইদের নামে ব্যবসাবা শেয়ার পরিচালনায় আবেদন এবং অনুমোদন সংক্রান্ত সমুদয় রেকর্ডপত্র। একে এম আরিফ উদ্দিনের স্ত্রী শামীমার নামে ৩০১ এলিফ্যান্ট রোডে রয়েছে বিলাসবহুল বাড়ি। বারিধারার বসুন্ধরায় ব্লক সিতে তিনি প্রসাদতম ফ্ল্যাটে বসবাস করেন। পাশেই ১টি ফ্ল্যাট ক্রয় করে ভাড়া দেওয়া রয়েছে। এছাড়াও তার নামে ও তার পরিবারের নামে পাবনায় রয়েছে বিপুল সম্পদ। পাবনার সুজানগরেও রয়েছে অঢেল সম্পদ। পূর্বাচলে প্লট, বসুন্ধরা অংশীদারিত্বে ১টি ভবনের নির্মাণ কাজ চলমান।
২০০৮ সালে আওয়ামী সরকার গঠন করার পর শাহজাহান খান নৌপরিবহন মন্ত্রীর দায়িত্ব পেলে আরিফকে আর পেছন ফিরে তাকাতে হয়নি। একটানা বন্দর ও পরিবহন বিভাগে চাকরি করে আসছেন। নারায়ণগঞ্জ এবং সদরঘাটে থাকাকালিন ঘাট ইজারা দিয়ে, ফোরশোর লীজ এবং ঘাটের ইজারাদারকে দিয়ে কোর্টে মামলা দিয়ে ইজারার পরিবর্তে ঘাট খাওয়ানোর মাধ্যমে কোটি কোটি টাকা অবৈধভাবে উপার্জন শুরু করেন। ছেলে আমেরিকা এবং মেয়েকে লন্ডনে পড়াশোনা করাচ্ছেন তিনি। নতুন করে তার বিরুদ্ধে আরও একটি অভিযোগ- আবেদন দাখিল হয়েছে। চলতি বছর ২৮ আগস্ট এই আবেদনটি করেন মো. জাকির হোসেন নামের এক ব্যক্তি। বাদী হয়ে দুর্নীতি দমন কমিশন বরাবর আবেদনটি করেন তিনি। সেখানেও তার সম্পদের বিবরনি তুলে ধরা হয়েছে।
এসব বিষয়ে আরিফ উদ্দিন আজকের সংবাদকে জানান, এসব মিথ্যা অভিযোগ। আমি এসব বিষয়ে কথা বলতে চাই না। বিআইডব্লিউটিএ এর পিআরও সাথে যোগাযোগ করেন।